Alexa পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মাদকসম্রাট!

ঢাকা, শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৯ ১৪২৬,   ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মাদকসম্রাট!

 প্রকাশিত: ১৩:০৫ ১০ নভেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৩:১৬ ১০ নভেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মেক্সিকো শহরের নৃশংসতা সম্পর্কে অনেকেরই নিশ্চয়ই ধারনা রয়েছে! এর মূল কারণ হল মাদক। মেক্সিকো পৃথিবীর ‘ড্রাগ হ্যাভেন’ নামে পরিচিত। মেক্সিকোর আইনকানুন অনেক শক্ত হলেও যুগ যুগ ধরে চলে আসা মাদক কেন্দ্রিক রাজনীতি এবং দুর্নীতি মেক্সিকোকে মাদক সম্রাটদের জন্য উপযুক্ত এক ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। কিছু কিছু দিক থেকে মেক্সিকোর সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করে থাকে মাদক সম্রাটরাই। সেইসঙ্গে অন্যান্য দেশের মাদকসম্রাটদের থেকে এরা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর! বর্তমানে মেক্সিকোর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মাদক সম্রাট সিনালোয়া কার্টেলের প্রধান এল চাপো। পাবলো এসকবারের মৃত্যুর পরে এল চাপোই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মাদকসম্রাট হিসেবে পরিচিত হন। তার উত্থান, দু’বার মেক্সিকান সিকিউরিটি প্রিজন থেকে পালানো এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাদক নেটওয়ার্ক তৈরির ইতিহাস যে কোনো হলিউড সিনেমার গল্পকে হার মানাবে। কিন্তু কে এই এল চাপো? আর কীভাবেই বা উঠলেন মেক্সিকোর মাদক সম্রাজ্যের শিখরে?

পুরো নাম “জাকিন গুজমান লয়েরা”। উচ্চতা কিছুটা কম বলে তাকে এল চাপো নামে ডাকা হয়। মেক্সিকোর সিনালোয়া প্রদেশের বাদিরাগুয়াতো গ্রামে তার জন্ম। দরিদ্র পরিবারে জন্ম এবং তার পিতার নিষ্ঠুর আচরণে বখে যাওয়া চাপো ছোটবেলাতেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বাড়ি ত্যাগ করেন কিশোর ভয়ে। অন্যান্য গ্রামবাসীর মত চাপোও তখন অল্প অর্থের বিনিময়ে মারিজুয়ানা চাষ শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই চাপোর পারদর্শীতা স্থানীয় মাদক কিংপিন লুইস সালজার এর চোখে পড়ে এবং সালজার চাপোকে তার নিজের দলে স্বাগত জানায়। কিশোর বয়স থেকেই চাপো সমুদ্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিকটবর্তী সিনালোয়া প্রদেশের মাদক চোরাচালান পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।

বিশ বছরে পা রাখতে না রাখতেই শান্ত কিন্তু উচ্চাভিলাশী চাপো তৎকালীন গুয়াতালাজার কার্টেলের প্রধান মিগেল এঞ্জেলের একজন উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে এক মার্কিন এক ডিইএ (ড্রাগ ইনফোর্সমেন্ট অ্রাডমিনেস্ট্রেশন) এজেন্ট হত্যার দায়ে মিগেল এঞ্জেল গ্রেফতার হওয়ার পর এল চাপো মেক্সিকোর মাদক সম্রাজ্যে বস বনে যান। মিগেলের উত্তরাধিকারী হিসেবে এল চাপো সামান্য এলাকার নিয়ন্ত্রণ পান এবং প্রতিষ্ঠা করেন সিনালোয়া কার্টেল। একইসঙ্গে তিনি তৎকালীন এক সরকারি আমলা কনোরাডোর সঙ্গে ভাল সম্পর্ক স্থাপন করেন যা তার উত্থানে বড় ভূমিকা পালন করেন। এভাবেই মেক্সিকোতে শুরু হয় এল চাপোর যুগ। কিন্তু কীভাবে চপো আহরণ করেন ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে?

এল চাপো প্রথম দিকে পাবলো এসকবারের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন চোরাচালান করতেন এবং চাপো নিজেই মেথ, মারিজুয়ানা ও হিরোয়িন চোরাচালান শুরু করেছিলেন। এভাবে ধীরে ধীরে চাপো নিজের নেটওয়ার্ক বাড়াতে থাকেন। তাছাড়াও চাপো সিনালোয়া এবং আশেপাশের অন্যান্য ড্রাগ কিংপিনদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখেন। যারা তার সঙ্গে ব্যবসায় যেতে অস্বীকৃতি জানায় চাপো তাদেরই কঠোর হাতে দমন করতেন। এভাবে সিনালোয়া এবং আশেপাশের অন্যান্য কার্টেলের সঙ্গে চাপো সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং সিনালোয়ার সকল কার্টেল একত্রে করে নিজেকে লিডার ঘোষণা করেন। পাবলো এসকবার এবং কলম্বিয়ার অন্যন্য কার্টেল এর পতনের পর সিনালোয়া কার্টেল কোকেন ব্যবসায়ও নিজেদের প্রধান্য বিস্তার করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ড্রাগ অপারেশনগুলো ঠিকমত পরিচালানার জন্য চাপো মার্কিন বিভিন্ন প্রদেশেও তৈরি করেন নিজস্ব গ্যাং। এছfড়াও মাদক পাচার এর জন্য পুরো সিনালোয়া মার্কিন বর্ডারে তৈরি করেন কয়েকশত টানেল। এভাবেই চাপো ধীরে ধীরে সিনালোয়া কার্টেলকে শিখরে নিয়ে যেতে শুরু করেন। কিন্তু এজন্য তাকে অন্যান্য বড় কার্টেলের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে হয়। যা ছিল নৃশংস এবং ভয়ঙ্কর। এসকল যুদ্ধে অনেক নিরীহ মানুষে প্রাণ যেতে থাকে। এমনি এক সংঘাতে মৃত্যু হয় মেক্সিকোর এক বিখ্যাত ধর্মজাজকের যার জন্য ১৯৯৩ সালে গুয়াতেমালা থেকে মেক্সিকান অথোরিটি তাকে গ্রেফতার করেন এবং ২০ বছরের শাস্তি ঘোষণা করেন। কারাগারে কয়েক বছর অবস্থানের পর তখনকার মেক্সিকান উপদেষ্টা কনরাডোর সহায়তায় তিনি একটু কম কঠোর কারাগারে হস্তান্তরিত হন।

নতুন কারাগারে চাপো ঘুষের বদলে সকল সুবিধাই ভোগ করতে থাকেন। এমনকি তিনি কারাগার থেকে তার ব্যবসাও পরিচালনা করতেন। ২০০১ সালে চাপো লন্ড্রী ভ্যানে লুকিয়ে কারাগার থেকে পালায়। কারগার থেকে পালিয়ে চাপো একে একে তার সকল শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ততদিনে চাপোর সরকারি সহায়ক কনরাডো মেক্সিকোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যান। একারণে চাপো এসব যুদ্ধগুলোতে সরকারি সহায়তা পান। একই সঙ্গে কনোরাডোও মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে চাপোর শত্রু কার্টেলগুলোকে দমন করতে থাকেন। চাপোর সবচেয়ে বড় শত্রু  জুয়ারেজ কার্টেলকে দমন এর পরে পুরো মেক্সিকোর নিয়ন্ত্রণ চলে আসে এল চাপোর হাতে। তিনি তার ব্যবসা বড় করতে থাকেন। চাপো এবার যুক্তরাষ্ট্রের গন্ডি পেরিয়ে ইউরোপ এবং এশিয়ায় তার ব্যবসা বিস্তার করেন। এমনকি চাপো এশিয়ায় নিজের মাদক কারখানা স্থাপনের কথাও চিন্তা করেন। চাপো তার মাদক পাচারের জন্য দুইটি সবমেরিন ও তৈরি করেন। যা যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন ও হিরোয়িন পাচারে ব্যবহৃত হত। এভাবেই চাপো পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মাদক সম্রাটে।

এল চাপো ২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের অন্যতম ধনী ও ক্ষমতাধরদের তালিকায় আওতাভুক্ত হন। ধারণা করা হয়, সিনালোয়া কার্টেল তখন বাৎসরিক ভাবে ৫ বিলিয়ন ডলারের মাদক ব্যবসা করতেন এবং এল চাপোর সম্পদের পরিমান ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এভাবেই চাপো মার্কিন সরকারের নজরে পড়েন। মার্কিন ডিইএ চাপোকে মোস্ট ওয়ান্ডেড লিস্টে প্রথম তালিকাভুক্ত করেন এবং চাপোর ব্যপারে কোনো তথ্য দিয়ে সহায়তা করলে ৫ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কারও ঘোষণা করেন। অবশেষে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক তোপের মুখে মেক্সিকান সরকার এল চাপোকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারের মাত্র ১৮ মাসের মাথায় ২০১৫ সালে চাপো তার জন্য নির্মিত ১ মাইল দীর্ঘ সুরঙ্গ থেকে আবার কারাগার থেকে পালান এই মাদক সম্রাট। এরপর চাপোকে পুনরায় গ্রেফতার করার জন্য অনেক মিশন পরিচালনা করা হয়। এমনি একটি মিশনে চাপো হাতে এবং মুখে আঘাত পান। অবশেষে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এল চাপোকে মেক্সিকান আর্মি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারের পরে এল চাপোকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেরণ করা হয়। বর্তমানে এল চাপো যুক্তরাষ্ট্রে কারবন্দি জীবন অতিবাহিত করছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস

Best Electronics
Best Electronics