গভীর জলের রহস্যময় মাছ

ঢাকা, শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২০ ১৪২৬,   ০৯ শা'বান ১৪৪১

Akash

গভীর জলের রহস্যময় মাছ

ধ্রুব ইকরামুল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪৩ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১১:৫৫ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একটি ছয় ইঞ্চি লম্বা, ভুতুড়ে সাদা এবং চোখবিহীন মাছ। পৃথিবীর গভীরতম নদীর মাছ এটি। কঙ্গো নদীর উপকূলে বসবাসরত বুলু সম্প্রদায়ের জেলেরাই ২০০৭ সালে প্রথম এই মাছের সন্ধান পায়। তাদের কাছে মাছটি মন্ডেলি ব্যুরো নামে পরিচিত। এর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো পানিতে থাকা অবস্থায়ই তারা মৃত্যুবরণ করে। তবে কেন এই রহস্য? 

নিউইয়র্কের আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টোরি জাদুঘরের কিউরেটর ডা. মেলানি স্টিয়াসনি বলেন, এর ত্বক ও ফুলকার নিচে নাইট্রোজেন বুদবুদ তৈরি হয়েছিল। এটি ‘ডিকম্প্রেশন সিকনেস’ এর একটি স্পষ্ট লক্ষণ। প্রাণঘাতী এ অসুস্থতার ফলে প্রাণীরা দ্রুত হতাশাগ্রস্ত হয়ে যায়। মানুষের ক্ষেত্রে, গভীর পানি থেকে দ্রুত উপরে উঠার সময় রক্তে যে নাইট্রোজেন বুদবুদের সৃষ্টি হয় তাকে বেন্ড বলা হয়। ড. মেলানির মনে প্রশ্ন জাগে, এই মাছগুলো কি সত্যিই বেন্ডের সঙ্গে মরে যেতে পারে? যদি এমনই হয় তবে মাছটি যেখানে ছিল সেখানকার পানি কতটা গভীর?

কঙ্গোর গভীরতম নদীমারিয়েন এনগাউবি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মৎস্যবিদ ভিক্টর মামোনেকেনের মতে, স্থানীয়ভাবে মন্ডেলি ব্যুরো নামে পরিচিত এই মাছটি। দীর্ঘদিন ধরে বুলু গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে পরিচিত। তাদের কাছ থেকেই ড. মেলানি স্টিয়াসনি সর্বপ্রথম এই মাছটি সংগ্রহ করেছিলেন। এই মাছটি তেলাপিয়া ও ব্লুগিল গোত্রের অন্তর্ভুক্ত করে। তবে সে তার গোত্রের চেয়ে ভিন্ন- খুব ছোট, চোখহীন এবং কেভ ফিশের মতো ফ্যাকাশে।

কঙ্গো নদীটি আফ্রিকার নিরক্ষীয় অববাহিকা পেরিয়ে আড়াই হাজার মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই নদীটি ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে প্রবাহমান। কঙ্গোর নদীতে অন্তত ৩০০ প্রজাতির মাছের সন্ধান মিলেছে। তাদের মধ্যে এই মাছটিই অন্যতম, যার বৈশিষ্ট্য অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এতোটাই গভীর পানির মাছ এটি যে উপরে উঠতে গিয়ে সে মরতে বসেছে। এবার নদীর গভীরতা মাপার সময় এলো।

মাছের বৈশিষ্টড. মেলানির এই কঙ্গো প্রজেক্টের সঙ্গে রিপাবলিক অব কঙ্গোর মারিয়েন এনগাউবি বিশ্ববিদ্যালয়, ডিএনসির কিনশাসা বিশ্ববিদ্যালয়, এবং এএমএনএইচ-এর সঙ্গে যৌথভাবে এই গবেষণা কাজটি করেন। তারা ২০০৮ ও ২০০৯ সাল নাগাদ নদী গর্ভের অনন্য মাছ এবং এর গভীরতা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করেন। 

তারা কম পানির মৌসুমে নদীর গভীরতা পরীক্ষা শুরু করেন। তবে অত্যাধিক স্রোত থাকায় তারা সেখানে নৌকা নিয়ে যেতেও ব্যর্থ হন। কারণ নদীর গভীরতম স্থানটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। অতঃপর তারা নদীর গভীরতা মাপার কাজে অ্যাকোস্টিক কারেন্ট প্রোফাইলার ব্যবহার করেন। তাদের তথ্যমতে, সত্যিই নদীটি অনেক গভীর। অন্তত সাড়ে ৭৫০ ফিট নিচে তারা মাটি খুঁজে পান। তাদের এই গবেষণাটি ২০০৯ সালে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভেতে প্রকাশ পায়।

গভীরতম নদীর মাছমূলত নদীর গভীরতম অঞ্চলের প্রতিকূল পরিবেশ মাছের প্রজননকে পানির সর্বনিম্ন গহ্বরে পাঠাতে বাধ্য করে। গবেষক দলটির অনুমান যে, মন্ডেলি ব্যুরো নামক মাছটি গভীর জলের গিরিখাতগুলোতে বাস করে। মাঝে মাঝে পাথরের দেয়ালের সঙ্গে স্রোতের জোরালো ধাক্কায় তারা উপরে উঠে আসে। পৃষ্ঠ থেকে প্রায় শত ফুট উপরে উঠে আসতেই তাদের রক্ত থেকে নাইট্রোজেনের বুদবুদ বেড়িয়ে আসে। তারা অন্তত ১০০ ফিট উপরে উঠতে গিয়েই বেন্ডের কারণে মারা যায়। 

ড. মেলানি গবেষণার পর জানান, নদীর একেবারে তলদেশে অসংখ্য ছোট মাছের বসবাস। এই মাছটিও ঠিক এমনই। মন্ডেলি ব্যুরোর মতো কঙ্গোর নিম্নাঞ্চলে আরো ছয়টি মাছের সন্ধান পায় গবেষকরা। তারা আকারেও ছোট, ফ্যাকাশে রঙের ও ছোট চোখ কিংবা চোখহীন। অন্যান্য প্রজাতির মধ্যে- ক্যাটফিশ, এ্যালিফ্যান্ট ফিশ এবং স্পাইনি ইলস জাতীয় বৈচিত্র্যময় মাছ নদীর অগভীর পানিতে পাওয়া যায়। এসব গভীর জলের মাছে পুষ্টিগুণের উপস্থিতিও অনেক কম।

তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস