Alexa পুরুষের চারিত্রিক সনদ দেবে স্ত্রী

ঢাকা, বুধবার   ২০ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৫ ১৪২৬,   ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

পুরুষের চারিত্রিক সনদ দেবে স্ত্রী

শেষ পর্ব

মাওলানা ওমর ফারুক  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১২ ২৯ অক্টোবর ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নারীদের অধিকার: হজরত মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (র.) এর ‘হুকুকুন নিসা’ সম্পর্কে একটি ছয় খন্ডের ওয়াজ লিপিবদ্ধ আকারে আছে। সেখানে তিনি আল্লাহ তায়ালার ইরশাদ নকল করেন, ‘যেমনভাবে তোমাদের তাদের ওপর সহমর্মিতার অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদেরও তোমাদের ওপর উত্তম আচরণের অধিকার রয়েছে’।

আরো পড়ুন>>> পুরুষের চারিত্রিক সনদ দেবে স্ত্রী পর্ব-১

অর্থাৎ উভয়ের অধিকার সমান সমান। সেখানে তিনি আরো লিখেন, যদি স্বামীর পায়ে ব্যথা হয়, তাহলে স্ত্রী পা টিপে দেবে, আবার স্ত্রীর পায়ে যদি ব্যথা হয়, তাহলে স্বামীরও উচিৎ স্ত্রীর পা টিপে দেয়া। স্বামীর মাথা ব্যথা হলে যেমনভাবে স্ত্রী মালিশ করে দেয়, স্ত্রীর মাথা ব্যথা হলেও স্বামী মালিশ করে দেবে। এর নামই ইসলাম। এটাই নবীজি (সা.) এর সুন্নত। 

মোহতারাম দোস্ত! আমরা এমন সমাজে বসবাস করি, যেখানে রেওয়াজ ও রীতির অনুসরণ করা হয়। এই সমাজে মনে করা হয়, নারীরা তো হলো পায়ের জুতো। এদের আবার কীসের খেদমত করা হবে! আপনারা তো নবী করিম (সা.) এর এই হাদিস হয়ত অবশ্যই শুনেছেন যে, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমি যদি আল্লাহর পরে কাউকে সিজদা করার আদেশ দিতাম তাহলে নারীদেরকে তাদের স্বামীকে সিজদা করতে আদেশ দিতাম’। তিনি বলেছেন, যদি নির্দেশ দিতাম, তাহলে। নির্দেশ কিন্তু তিনি দেন নাই। অথচ আরেকটি হাদিস রয়েছে যা অনেকেই শোনেন নাই, যা তিনি বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন। তিনি একবার নয়, বরং নয়বার কথাগুলো বিদায় হজের সময় বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছি, আমার থেকে হজের মাসলাগুলো শিখে নাও। এরপর হয়তো আর সুযোগ হবে না’। শেষ জামারায় তিনি বলেন, ‘আজকের পর একত্রিতভাবে আমাদের সাক্ষাৎ হবে হাউজে কাউসারে’। এরপর তিনি নয়বার এই কথাটি বললেন, ‘আমি দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছি, নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো’। মিনার ময়দানে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘হাশরের ময়দানে আমি তিন ব্যক্তির অধিকার নিয়ে তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া করবো। ১. প্রতিবেশীর অধিকার নিয়ে ২. স্ত্রীর অধিকার নিয়ে ৩. শ্রমিকের অধিকার নিয়ে। এই সকল লোকেরা যার কাছেই শাফায়াতের দোয়া চাইবে, আমি তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাবো এবং তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া করবো’। 

হাশরের ময়দানে যারা নবী করিম (সা) এর শাফায়াত লাভ করবে, তারা জান্নাতে চলে যাবে। এই কারণে আমরা সারাজীবন দোয়া করে আসছি, হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে নবীজি (সা.) এর শাফায়াত লাভে ধন্য করুন’। এখন যদি শাফায়াত না পাই, বরং অন্যের থেকে শাফায়াত নিতে গেলে নবীজি (সা.) সামনে দাঁড়িয়ে যান, তাহলে তো এটা আমাদের জন্য বরবাদি ছাড়া আর কিছুই নয়। 

নবী করিম (সা.) নিজে স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তম আচরণের আমল করে আমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। বর্তমান যুগেও জাহিলিয়াতের যুগের মতো কন্যা সন্তান জন্ম নেয়াকে দোষ ও অমঙ্গল মনে করা হয়। অথচ নবী করিম (সা.) বলেছেন, যার চারটি মেয়ে রয়েছে, সে এই চার মেয়েকে নেয়ামত মনে করে লালন-পালন করে, বড় হওয়ার পর তাদের ওপর ছেলেকে প্রাধান্য না দেয় এবং বিয়ের সময় হলে উপযুক্ত পাত্র দেখে পাত্রস্থ করে তাহলে সে এবং আমি জান্নাতে এমনভাবে থাকবো, যেমন এই দুই আঙ্গুল (নবীজি (সা.) দুই আঙ্গুল একত্রিত করে দেখালেন)’। এক সাহাবি (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, যদি তার চারটি কন্যাসন্তান না হয়ে তিনটি হয়’? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সেও এভাবে আমার সঙ্গে থাকবে’। আরেক সাহাবি (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘যার দু’জন কন্যাসন্তান হয়’? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সেও এভাবে আমার সঙ্গে থাকবে’। আরেকজন সাহাবি (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘যাকে একজন কন্যাসন্তানই দান করেছেন আল্লাহ তায়ালা’? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তাকে যদি নেয়ামত মনে করে লালন-পালন করে এবং ছেলেদেরকে তার ওপর প্রাধান্য না দেয়, তাহলে সেও আমার সঙ্গে এভাবে জান্নাতে থাকবে’। আরেকজন সাহাবি (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, যাকে আল্লাহ কোনো কন্যাসন্তান দেননি, সে যদি নিজের বোনের সঙ্গে উত্তম আচরণ করে’? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সেও আমার সঙ্গে এভাবে থাকবে’।

দু’টি আমল:
একজন ঈমানদারকে যদি বলা হয়, তুমি তোমার শেষ দোয়া করে নাও। যা ইচ্ছা চাইতে পারো। তাহলে সে এক মাস, দু’মাস চিন্তা করে নিজের মুরুব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে এর চাইতে উত্তম দোয়া করতে পারে না যে, ‘হে আল্লাহ! জান্নাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কদম মোবারকের নিচে একটুখানি জায়গা দিও’। দু’টি আমল এমন রয়েছে, যার দ্বারা দোয়া করা ছাড়াই এই মর্যাদা লাভ হবে। প্রথম হলেন যিনি এতিমদের উত্তমরূপে লালন-পালন করে, দ্বিতীয়ত যিনি নিজ কন্যাসন্তানকে নেয়ামত মনে করে লালন-পালন করেন। 

নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সর্বোত্তম ঘর হলো ওই ঘর, যাতে কোনো এতিম উত্তমরূপে লালিত-পালিত হয় এবং তার সঙ্গে উত্তম আচরণ করা হয়’। বর্তমান যুগের মতো পূর্বযুগে কোনো এতিমখানার ব্যবস্থা ছিল না। এখনকার সময়ে এতিমখানার পরিচালকরা এতিমখানা তৈরি করে মনে করেন, খুব ভালো কাজ করে ফেলেছি। তারা মনে করেন এতিমখানা বানানোই বুঝি সবচে’ উত্তম কাজ। অথচ এসব এতিমখানায় গিয়ে এতিম শিশুরা নীচু মনা হয়ে যায়। এতিমদের লালন-পালন তো নিজ ঘরে নিজ সন্তান চাইতেও উত্তমরূপে হওয়া উচিৎ। অন্যের কন্যাসন্তানকে পুত্রসন্তানের ওপর প্রাধান্য দিয়ে লালন-পালন করার চাইতে উত্তম আর কী হতে পারে! আজকাল তো পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, ছেলে জন্ম নিলে আনন্দ উৎযাপন করা হয়, মিষ্টি বিতরণ করা হয়, আকিকা দেয়া হয়; কিন্তু মেয়েসন্তান জন্ম নিলে কেউ শুভেচ্ছাও দেয় না। কিছু আল্লাহওয়ালা বুজুর্গরাও এমন করে থাকেন। ছেলেসন্তান একটু বড় হলে তার ওপর খুব খরচ করা হয়, কিন্তু মেয়ের ওপর কোনো খরচ করে না। ছেলেকে খাটের ওপর সুন্দর বিছানায় শুতে দেয়া হয়, আর মেয়েকে নিচে শুতে হয়। মেয়ে একটু ভালো খাবার খেলেই বলা হয়, মেয়ে হয়ে ভালো খাবার খাচ্ছো? ঘি খাচ্ছো? ঘরের পুরুষদের আগে খেয়ে ফেলেছো? এগুলো সব জাহেলি যুগের কথাবার্তা। মেয়েরা পুরুষদের আগে খাবার খাবে, এটাই নিয়ম। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বপ্রথম ইসলামের দাওয়াত হজরত খাদিজা (রা.) এর নিকট পেশ করেছিলেন। তিনি কন্যাসন্তানকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর পর নবীজি (সা.) এর সবচে বেশি প্রিয় কে ছিল? হজরত আয়েশা (রা.) বললেন, ‘ফাতিমা’। হজরত ফাতেমা (রা.)-কে আল্লাহর রাসূল (সা.) নিজে বলেছিলেন, ‘ফাতেমা! তুমি কি চাও না যে, তোমার আব্বা যাকে চাইবেন তুমি তাকে ভালোবাসবে’? হজরত ফাতেমা (রা.) বললেন, ‘আব্বা, আমি অবশ্যই ভালোবাসবো’। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আয়েশা আমার মোহাব্বতের মানুষ, তুমিও তাকে মোহাব্বত করো’। হজরত আয়েশা (রা.) আরো বলেন, ‘ফাতেমা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সবচে’ প্রিয় মানুষ হওয়ার কারণ হলো, যখন নবী করিম (সা.) সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করতেন, তখন সবার আগে হজরত ফাতেমা (রা.) এর ঘরে যেতেন। আবার সফরে বের হওয়ার সময় সবার শেষে হজরত ফাতেমা (রা.) এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। হজরত ফাতেমা (রা.) এর আগমনে এত বেশি খুশি হতেন, অন্য কারো আগমনে এতটা হতেন না। নিজের বসা থেকে দাঁড়িয়ে গিয়ে মেয়ের কপালে চুমু খেতেন এবং ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করতেন। কন্যার সঙ্গে এমন ভালোবাসার নমুনা নবীজি (সা.) আমাদেরকে দেখিয়ে গিয়েছেন। 

তো উপস্থিত আমার বন্ধুবর্গ! রাসূলুল্লাহ (সা.) আমলের মাধ্যমে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন যে, এটা সঠিক আর এটা ভুল, এটা সঠিক রাস্তা আর এটা ভুল রাস্তা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে চলতে হবে। এর সঙ্গে পবিত্র কোরআনের জায়গায় জায়গায় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভালো-মন্দের পার্থক্য করে দেয়া হয়েছে। যাতে করে আমরা বুঝতে পারি কার ওপর কাকে প্রাধান্য দিতে হবে, কোন জিনিসকে অবলম্বন করতে হবে আর কোন জিনিসকে পরিত্যাগ করতে হবে। যে জিনিস আমাদেরকে অবলম্বন করতে হবে সেটা হলো হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাতলানো পথ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে নবী, আপনি বলে দিন, এটাই আমার রাস্তা। তোমরা ডাকো আল্লাহর রাস্তায় বিচক্ষণতার সঙ্গে’।

ভারতীয় দাঈ মাওলানা কালিম সিদ্দিকির কলাম থেকে অনূদিত

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে