Alexa পুকুর ভরাটে পুকুর চুরি!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৬ ১৪২৬,   ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

পুকুর ভরাটে পুকুর চুরি!

জামালপুর প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:০৭ ৭ নভেম্বর ২০১৯  

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

পুকুর ভরাটে পুকুর চুরি। ভয়াবহ এই দুর্নীতির ঘটনাটি ঘটেছে জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলায়।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সূত্রে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগকারীরা জানান, উপজেলা গুনারীতলা ইউপির ৫৩০ জন অতি দরিদ্র শ্রমিকদের মজুরি বাবদ ৪৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দের সিংহভাগই হরিলুট করা হয়েছে। ফলে এই প্রকল্পের শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। 

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতি দরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ওই বরাদ্দে কাজের অংশ হিসেবে মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারিতলা ইউপির মোসলেমাবাদ নুরুন্নাহার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাটের জন্য ৪৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয় জেলা প্রশাসন।

মাঠ ভরাট করার কথা বলা হলেও বিদ্যালয়ের একটি পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। প্রকল্পটির জন্য ৫৩০ জন অতিদরিদ্র শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে দৈনিক ২০০ টাকা মজুরিতে মাটি কেটে পুকুরটি ভরাট করার কথা ছিল। কিন্তু স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইমরান খান বাছেদ প্রকল্পটির সভাপতি হলেও মূলত ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আয়না নিজেই কাজটির তত্ত্বাবধান করেন। প্রকল্পের শুরু থেকেই তিনি শ্রমিক দিয়ে কাজ না করিয়ে আইন ও প্রকল্পের নীতিমালার কোনো তোয়াক্কা না করেই নিকটবর্তী ডোবায় ড্রেজার বসিয়ে বালিমাটি কিছু মাটি দিয়ে পুকুরটি ভরাট দেখিয়ে পুরো টাকা তুলে করে তা আত্মসাৎ করেন। 

পরে ঘটনাটি ফাঁস হলে স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা ইউএনও’র কাছে ইউপি চেয়ারম্যান আয়নার বিরুদ্ধে প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করে। অভিযোগে বলা হয় গত অর্থবছরের ১৫ জুনের মধ্যেই কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনো কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু প্রকল্প কমিটি কাজের পুরো বিল তুলে নিয়েছে গত জুন মাসের মধ্যেই। বিষয়টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকেও জানানো হয়। 

উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুর রহমান বেলাল গত ১৬ অক্টোবর সরজমিনে গিয়ে ডেজার দিয়ে পুকুরে মাটি ভরাট কাজের অস্তিত্ব পান। তিনি শ্রমিকদের দিয়ে কাজ না করানোর বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং তার তদন্ত প্রতিবেদনটি ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ডিসি কার্যালয়সহ বিভিন্ন দফতরে পাঠিয়ে প্রকল্পটির কাজে অনিয়মের উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানান।  

ইউপি চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন আয়না দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে নতুন করে ফের ড্রেজার মেশিন বসিয়ে কয়েকদিন ধরে পুনরায় ড্রেজারে মাটি ভরাট কাজ শুরু করেছেন। 

গত মঙ্গলবার দুপুরে প্রকল্প স্থানে দেখা গেছে, পাইপ দিয়ে ড্রেজারে বালিমাটি এনে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। সেখানে কোনো অতি দরিদ্র শ্রমিক নেই। প্রকল্পের কোনো সাইনবোর্ডও নেই। 

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মোস্তাফিজুর রহমান সাজু অভিযোগ করে বলেন, গত অর্থ বছরের এই কাজ এখন বাস্তবায়ন দেখানোর পায়তারা চালাচ্ছে। এরপরও সেখানে শ্রমিক দিয়ে কাজ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়ম রয়েছে সেখানে তিনি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে কাজ করছেন। এভাবেই ড্রেজারে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। ফলে কাগজে কলমে ৫৩০ জন শ্রমিকের তালিকা জমা দিলেও কার্যত কোনো শ্রমিক মজুরি পায়নি। ইউপি চেয়ারম্যান আয়না প্রকল্প সভাপতিকে দিয়ে শ্রমিকদের ভুয়া টিপ/স্বাক্ষরের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে শ্রমিকদের মজুরির পুরো টাকাই আত্মসাৎ করেছেন তারা। এ নিয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাচ্ছি না।’  

প্রকল্পটির সভাপতি গুনারীতলা ইউপি সদস্য ইমরান খান বাছেদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সময়মতোই কাজ বুঝিয়ে দিয়েছি। কাজের বিলও তুলেছি।’ শ্রমিকদের দিয়ে কিছু কাজ করেছি আবার ড্রেজার দিয়েও কাজ করেছেন বলে জানান। তবে কতজন শ্রমিককে মজুরি দেয়া হয়েছে এবিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। 

গুনারিতলা ইউপি চেয়ারম্যান মো. জয়নাল আবেদীন আয়না অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘পুকুর ভরাট কাজে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। এখন যে ড্রেজার দেখলেন তা প্রকল্পের কাজ নয়। আমি বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আরো কিছু বালিমাটি ভরাট করে দিচ্ছি। স্থানীয় একটি মহল হয়রানি করার উদ্দেশে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দফতরে মিথ্যা অভিযোগ করেছে।’   

মাদারগঞ্জের ইউএনও আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পুকুর ভরাট প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ 

মাদারগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুর রহমান বেলাল অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরজমিনে গিয়ে পুকুর ভরাট প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করেছি। তদন্তকালে উপজেলার প্রশাসনের অনুমোদিত তালিকাভুক্ত অতি দরিদ্র শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হয়নি বা এরকম কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে ড্রেজার দিয়ে বর্তমানে মাটি কাটা হচ্ছে এমন প্রমাণ মেলেছে। ৫৩০ শ্রমিকের মজুরি ও নন ওয়েজকষ্টসহ ৪৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রকল্পটির বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উচ্চ পর্যায়ে তদন্তের জন্য প্রতিবেদনসহ সুপারিশ করে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। 

গত ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিদরিদ্রদের জন্য ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির প্রকল্প বাস্তবায়নের (দ্বিতীয় পর্যায়ে) জন্য ৪৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৩ হাজার ৩৯৩ জন শ্রমিকের মজুরি এবং নন ওয়েজকষ্ট বাবদ ২ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। 


 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ