পায়ে চলা মাছ

ঢাকা, বুধবার   ০৩ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২০ ১৪২৭,   ১০ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

পায়ে চলা মাছ

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১০:৩৯ ২১ মে ২০২০   আপডেট: ১০:৪৮ ২১ মে ২০২০

আমার কৈশোরের একটা উল্লেখযোগ্য সময় কেটেছিল টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের দুর্গম গড়ের ভেতরে। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে। সপ্তম শ্রেণী হতে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। কি কারণে লোকালয় থেকে দূরে নিবিড় বনের ভেতরে এই বিদ্যাপিঠটি স্থাপন করা হয়েছিল, সে সম্পর্কে আমার স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে বনাচ্ছাদিত এই বিদ্যাপিঠে আমার অবস্থান বা বাস নিবিড় প্রকৃতির সাথে আমার একটা যোগসুত্র ঘটিয়ে দিয়েছিল। এই যোগাযোগের স্মৃতি কখনই আমার মন থেকে মুছে যায়নি।

‘আফ্রিকা’ মহাদেশের সঙ্গে আমার পরিচয় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতা দিয়ে। ১৯৭৮/৭৯ সনে।  উল্লেখ্য ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি আমাদের কোন শ্রেণিতেই পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই সময়ে আন্তঃক্যাডেট কলেজ সাহিত্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আফ্রিকা কবিতার আবৃত্তি এই প্রতিযোগিতার অংশ ছিল। মোট ৬টি ক্যাডেট কলেজ ছিল তখন। ৪টি পুরাতন কলেজ। ফৌজদার হাট, রাজশাহী, ঝিনাইদহ, এবং মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ এবং ২টি নতুন। সিলেট ও রংপুর ক্যাডেট কলেজ।

একই বছরে আমাদের কলেজের আন্তঃহাউজ সাহিত্য প্রতিযোগিতাগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিল আন্তঃক্যাডেট কলেজ প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি হিসেবে। একই আদলে। সুতরাং ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি এই প্রতিযোগিতায় বাংলা কবিতা আবৃত্তির অংশ ছিল। মাত্র বছর দুই পূর্বে আমি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকার একটি গ্রামের স্কুল থেকে এসে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছি। কবিতার প্রতি আমার আকর্ষণ তখন নিতান্তই নগণ্য। আমার মূল আকর্ষণ ফুটবল ও ভলিবল খেলার প্রতি। কারণ, আমার বাড়ির পাশের স্কুলের জীবনের সাথে যোগসূত্র ছিল এই খেলা দুটোরই। তবে আন্তঃহাউস কবিতা আবৃত্তির প্রতিযোগিতার অব্যবহিত পূর্বে আমাদের হাউজের প্রতিযোগী তানভীর ভাই ও এহসান (রাজ) ভাই এই কবিতা আবৃত্তির অনুশীলন করতেন।

এই সময়ে কবিতাটির প্রতি আমার একটি প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল। অদ্ভুত অনুরণনের সৃষ্টি করত কবিতাটির আবৃত্তি আমার কর্ণকুহরে এবং তখন থেকেই কবিতার লাইনগূলো আমার মাথার ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। মনে হত কবিতার সুর ও কথা আমাদের হাউজ পেরিয়ে মধুপুরের গড়ের শালবনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে খাল, নদী, সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে প্রায়ান্ধকার এক মহাদেশের দিকে ছুটে চলে যাচ্ছে। এন্ডারসনের রূপকথার সাগরপারের সেই জেলে সন্তানের হাতের খোলা বাক্স থেকে উবে চলে যাওয়া ধোঁয়ার মত। যার ভেতরে বন্দী হয়েছিল কত শত বছরের বসন্ত কাল। সেই সাথে আমার মনও হয়ত বা উড়াল দিত অদৃশ্য এক দুর্গম মহাদেশের পানে। তবে বাস্তব জীবনে আমার কখনই আফ্রিকায় ভ্রমণ বা গমন করা হবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

ম্যান্ডেল বা ডারউইনের বিবর্তনের সুত্রগুলো আমরা পড়েছিলাম নবম/দশম নবম শ্রেণিতে। জনাব প্রভাত কুমার দাশ আমাদেরকে উদ্ভিদবিদ্যা পড়াতেন। মজার ব্যাপার হল আমরা কখনই নবম-দশম শ্রেণীর জীববিজ্ঞান বা উদ্ভিদবিজ্ঞান বই অনুসরণ করতাম না। আমরা অনুসরণ করতাম অধ্যাপক মমিন মিয়াঁ এবং আরও একজনের বই, যা ছিল মূলত একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর পাঠ্য। এই সময়েও আফ্রিকার গমনের কথা আমার মনে হয়নি। কারণ আমি জানতাম যে, বিবর্তনের ঘটনাগুলো ঘটেছে দক্ষিণ আমেরিকায়। আমাজন ফরেস্টে বা অন্য কোন গহীন বনে। কারণ, আমাদের বাড়িতে কাঁঠাল কাঠের তৈরি আলমারির ভেতরে আমি একটা অদ্ভুত ভ্রমণের বই খুঁজে পেয়েছিলাম। সম্ভবত অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে। বইটির নাম ‘হারিয়ে যাওয়া জগত’। বইয়ের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়া এক বাঙালি স্কুল ছাত্র ও শ্মশ্রু মন্ডিত সর্বশরীরে বড় বড় লোম ওয়ালা জীববিজ্ঞানের এক অদ্ভুত প্রফেসর নিয়ে।

আমাজন বনের গহীনে তারা অভিযানে বের হয় প্রাচীন ডায়নোসরদের খোঁজে, যেখানে অনেক নৃতত্ববিদ অদ্ভুত কারণে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুত সব মজার মজার কাহিনী আছে এই উপন্যাসটিতে। লেজহীন বুদ্ধিদীপ্ত এক বানর সমাজের সদস্যদের সাথে পরিচয় হওয়া, প্রফেসরের শরীরে লোম থাকার কারণে বানর সর্দার কর্তৃক প্রফেসরকে অতিথির সম্মান দেয়া, অভিযাত্রী দলের অন্যদেরকে উঁচু পর্বতের উপর থেকে নীচের তীরের মত খাড়া হয়ে থাকা বাঁশ বনের উপরে নিক্ষেপ করে হত্যা করার চেষ্টা করা, গভীর বনের অন্ধকারে ডায়নোসরের ডিমের সন্ধান লাভ, বানরদের বিরুদ্ধে অভিযাত্রী দলের  বন্দুকযুদ্ধ, এবং পরিশেষে পশুর পাকস্থলীর ভেতরে নদীর জলের নীচে বুদ্বুদ হয়ে জলের উপরে উঠা হাইড্রোজেন গ্যাস ঢুকিয়ে বেলুন তৈরি করে অভিযাত্রী দলের সদস্যদের পালিয়ে আসা – ইত্যাদি সব অসাধারণ বর্ণনা ও কাহিনী ছিল বইটিতে। বইটির লেখকের নাম ছিল সম্ভবত রোমেনা আফাজ। সম্ভবত বলছি একারণে যে, এতবছর পর বইটা কে লিখেছিলেন সে সম্পর্কিত তথ্যানুসন্ধানের কোন অভিমুখ আসলেই আমার নিকটে নেই। বইটাও হারিয়ে গিয়েছিল।   

পগার-পুকুর, খাল-বিল, নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর ছাড়াও স্থলে যে, মৎস্য বা মৎস্য জাতীয় প্রাণীরা বসবাস অথবা বিচরণ করতে সক্ষম সে সম্পর্কে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা ১৯৮৮ সনে। আমি তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সদ্য পদোন্নতি প্রাপ্ত ক্যাপ্টেন পদবীর অফিসার। পূর্ণ যুবক। পরিপূর্ণ ব্যাচেলর। পার্বত্য চট্টগ্রামে তখন পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন দাবানল’। এর অধীনে রাজধানী ঢাকা থেকে আমাকে রাঙামাটি জেলার বরকল জোনের অন্তর্গত ভারত সীমান্তবর্তী ‘দশরথ’ নামক একটা সি আই ও (কাউন্টার ইন্সারজেন্সী অপারেশন) ক্যাম্পে সংযুক্ত করা হয়েছে। ছয় মাসের জন্যে। সারি সারি পাহাড় আর গভীর অরণ্যানীর ভেতরে এই ক্যাম্প।

‘সারারাত দখিনা বাতাসে আকাশের চাঁদের আলোয়’ ঘাই হরিণীর ডাক শোনা যায় এই ক্যাম্প থেকে। সমতল থেকে আমি সাথে করে নিয়ে এসেছি শুধুমাত্র একটা কবিতার বই। ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’। আমার ছয় মাসের খোরাক। সাথে একটা ড্রইং খাতা এবং কয়েকটা ৬বি পেন্সিল। প্রাকৃতিক দৃশ্য ও মানুষের পোট্রেট আঁকার ভীষণ শখ আমার। শৈশব হতেই। কিন্তু সেনাবাহিনীর চাকুরিকালে এই নান্দনিকতার সুযোগ আমাকে কেউ দেয়নি। এখানে আগমনের পর কিছুটা মৃত্যুভয় আমার ভেতরে কাজ করলেও তা বেশি প্রকট ছিল না। বরং দেশের এই অংশের প্রকৃতি, নিসর্গ আর মানুষজনকে জানার অনুসন্ধিৎসাই আমার ভেতরে প্রবলভাবে কাজ করছিল। 

নতুন স্থাপিত ক্যাম্প। তৎকালীন বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) এর ৯ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধীনস্ত। একটা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনা অফিসারের এই আগমন। এই ক্যাম্পে আমিই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম অফিসার। একটা জলজ ভূমি থেকে প্রায় ৩০০ ফুট উঁচুতে পাহাড়ের শীর্ষদেশে এই ক্যাম্পের অবস্থান। পাহাড় চুড়ারই কোন অবস্থান থেকে লুকানো একটা ক্ষীণ জলধারা পাহাড়ের শরীর থেকে চুইয়ে পড়তে পড়তে নীচ অবধি নেমে এসেছে। পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজের আস্তরণের কারণে দূর, এমনকি নিকট থেকেও এই জলের প্রবাহ দৃশ্যমান নয়। পাহাড়ের পাদদেশের জলজ অংশটুকু সম্ভবত এই জল থেকেই সৃষ্ট। পাহাড়টির চারদিক ঘিরে চার-পাঁচ শত গজ দূরে আরও কয়েকটা পাহাড়। আমারটার চেয়ে উচ্চতা কিছুটা কম। অথবা বেশি হলেও আমার অবস্থান থেকে তাদেরকে ক্ষুদ্রতর মনে হয়। অনেকটা হিন্দু অথবা বৌদ্ধ পুরাণে বর্ণিত দেবতাদের বাসস্থান ‘মেরু পর্বতের’ মত।

পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু স্থানে একটা কুঁড়েঘরে আমার বাস। অন্য পাহাড়ে যেতে হলে আমাদেরকে হাঁটুজল জল ডিঙিয়ে যেতে হয়। এই জলের ভেতরে অজস্র বন্য কচুর গাছ। দুর্গম এলাকায় অবস্থিত হবার কারণে আমাদের খাদ্যদ্রব্য এবং অন্যান্য রসদের জন্যে আমরা হেলিসাপ্লাই (হেলিকপ্টার সাপ্লাই) এর উপরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। প্রায়শই ভিআইপি মুভমেন্টের জন্যে আমাদের জন্যে নির্ধারিত হেলিসর্টি বাতিল করা হয়। তখন সব্জি ও মাছ-মাংস ছাড়াই শুধুমাত্র শুষ্ক রসদ খেয়ে আমাদেরকে জীবনধারণ করতে হয়। তবে আমার রানার প্রায় সময়েই ক্যাম্পের নীচের জলভূমি থেকে কচুর পাতা আর ডাঁটা সংগ্রহ করে আমার জন্যে বিশেষ ধরণের ভর্তা তৈরি করত আমার জন্যে।

পাহাড়ের শরীরে খাঁজ কেটে কেটে আমরা একাধিক আঁকাবাঁকা মাটির সিঁড়ি তৈরি করেছি। এই সিঁড়িপথগুলো দিয়ে আমরা উঠা-নামা করি। দেখতে অনেকটা এইচ জি ওয়েলস রচিত ‘ দ্য টাইম মেশিন’ কল্পকাহিনীতে বর্ণিত তৎকালীন দুই প্রকার মানব প্রজাতির একটি ‘এলয়’দের কর্তৃক পাহাড়ের গা ঘেষে তৈরী করা সিঁড়িগুলোর মত। দক্ষ না হলে আপনি নিমেষেই গড়িয়ে পড়ে যেতে পারেন নীচের অন্তহীন গহ্বরে। পাহাড় ঘেষে নামা দক্ষিণের সিঁড়িপথটা আমাদের প্রধান গমনাগমনের পথ। এই পথের পাশে পাহাড়ের শীর্ষ থেকে প্রায় ১০০ ফুট নীচে পাহাড়ের শরীরটা একটু ঝুলে গেছে। এখান থেকে চুইয়ে পড়া জল ছোট্ট একটা প্রপাতের সৃষ্টি করেছে। অনেকটা আমাদের স্নান-ঘরের শাওয়ারের মত। আমি ক্যাম্পের একমাত্র অফিসার। সুতরাং আমি একাই ওপরের ঝর্ণার সুশীতল জলে স্নান করি। ক্যাম্পের অন্য সকল সদস্যেরা ক্যাম্পের পাদদেশে অবস্থিত জলাশয়ে স্নান করে। তবে শান্তিবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ এবং পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী একটা চিতাবাঘের হামলা থেকে বাঁচার জন্যে এখানে তারা অস্ত্রশস্ত্রসহ দলবদ্ধ হয়ে গমন করে থাকে। যার অন্যথা কখনোই হয় না। 

ক্যাম্পে আমার আগমনের পর এক পক্ষকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। সকাল বেলা। ভোরের আলো তাঁতিয়ে উঠার পূর্বেই আমি স্নান করতে নেমেছি। আমার পায়ের তলায় কয়েক বর্গফুট সমতল জায়গা। দুর্বাঘাসের মত তৃণ দিয়ে আচ্ছাদিত। ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে স্বচ্ছ জল। জলের ভেতরে অনেকগুলো ক্ষুদ্র প্রাণী নড়াচড়া করছে। হাতে নিয়ে দেখি চিংড়ি মাছ। মাঝারি সাইজের। গাঢ় ছাই বর্ণের। দেখতে মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক সময়কালের। আমি ভীষণ অবাক। আমি স্নান থেকে ফিরে ক্যাম্পের সৈনিকদেরকে জিজ্ঞেস করলাম তারা এই চিংড়িগুলো দেখেছে কিনা। প্রায় একবাক্যে সবাই বলল যে দেখেছে। কিন্তু ভূমি থেকে ২০০ ফুট উপরে এরা আসলো কিভাবে? কেউ কি তাদেরকে এখানে এনে ছেড়ে দিয়েছে? নাকি এরা পাহাড়ের গা বেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এখান পর্যন্ত উঠে এসেছে? অথবা বৃষ্টির জলের সাথে এরা এখানে অবতরণ করেছে? আদম–হাওয়ার মত? কোন সদুত্তর পাওয়া গেল না। 

মাত্র কিছুদিন পুর্বে এই ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এখানে অন্য কোথাও থেকে জীবিত চিংড়ি এনে ছেড়ে দেয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। দিলেও বাঁচার কথা নয়। রাঙ্গামাটি, বরকল, আন্দারমানিক, উবুত্তাপাড়া হয়ে এই ক্যাম্প পর্যন্ত পেট্রোলিং করে আসতে আমাদের সময় লেগেছে প্রায় ১৮ ঘন্টা। আমরা যখন ক্যাম্পে পৌঁছই, তখন সূর্য পাটে যাচ্ছিল। নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখাই আমারদের জন্যে প্রানান্তকর হয়ে যাচ্ছিল। চিংড়ীর জীবন নিয়ে চিন্তার তো তো প্রশ্নই আসে না। ক্যাম্পের মোট জনবল ৩৫ জন। এক প্লাটুন। সবাই আমাকে নিশ্চিত করলো যে তারা ওখানে জীবিত বা মৃত কোন চিংড়ি ছাড়েনি। কয়েকটা চিংড়ীর পক্ষে পাহাড়ের গা বেয়ে এতটা পথ উপরে উঠে আসাও সম্ভব নয়। ভূমি থেকে ২০০ ফুট উপরে চিংড়ীর জন্মই বা কি করে হয়? সুতরাং বিষয়টার সত্যতা অমীমাংসিতই রয়ে গেল। শুধু মাহফুজ নামের এক সৈনিক আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলো যে, একবার তাদের গ্রামে আকাশ থেকে মৎস্য বৃষ্টি হয়েছিল। তার দাদা ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। সাথে সাথেই আমার ক্যাম্পের সিনিয়র জেসিও (জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার) প্রতিবাদ করলেন, 'স্যার, ওর কথা একদম বিশ্বাস করবেন না। সব সময়েই ফাউল কথা বলে।'

যাই হোক, এই গল্পের শিরোনাম বর্ণিত মাছের সঙ্গে আমার পরিচয় ও সাক্ষাৎ অনেক পরে। ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে। পশ্চিম আফ্রিকার সিয়েরালিওনে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে আমি এখানে এসেছি। আমার ইউনিটের নাম ব্যানসিগ-২ বা বাংলাদেশ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন-২। রাজধানী ফ্রি টাউন থেকে ধূলিধূসরিত পথে ছয় কিলোমিটার দূরে এক প্রস্তরময় স্থানে ইউনিট সদর দফতরের অবস্থান। ইউনিটের একপাশে আটলান্টিক মহাসাগর। অন্যপাশে সবুজ পাহাড়।   

এপ্রিল মাস। বাংলাদেশ থেকে জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়েছে সৈনিক লাইন, মসজিদ, অফিসকক্ষ। সবগুলোই টিনশডের। একটা লাল ধূলিধূসরিত একটা রাস্তা সমুদ্রের বেলাভূমির সমান্তরাল ইউনিটের সামনে দিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে। গন্তব্য রিভার-২ নামক একটা সাদা বালির সৈকতে। লেবানিজ মেয়েদের উচ্ছলতায় ভরে থাকে যেখানকার সকাল-দুপুর-বিকেল। ইউনিটের অব্যবহিত পশ্চিম পাশেই সবুজ বনের পাহাড়। রাস্তার ওপারেই। আমাদের দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর মত। সারি সারি হয়ে দিগন্তের দিকে মিলিয়ে গেছে। কাছের পাহাড়ের শরীরের ভাঁজে ভাঁজে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘরবাড়ি। পৃথিবীর এই অঞ্চলের মানুষদের নান্দনিকতার বোধ অনুভব করার মত। যারা যত বেশী সামর্থবান, তাদের বাসস্থান ততবেশি উপরের দিকে। কারণ সমুদ্র বা জনপদের প্যানারোমিক বা বার্ডস আই ভিউটা ওপর থেকেই বেশী সম্ভব। যদিও জলের সংকট যত উপরে উঠবেন তত বেশী। 

পাহাড়ের অন্তঃস্থল থেকে প্রবাহিত হয়ে একটা জলধারা ফ্রি টাউন টু রিভার-২ বিচ রাস্তার (পেনিনসুলার রাস্তা) সাঁকোর নীচ দিয়ে গড রিচ জেলেপাড়ার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে মিলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী খাল বা ছরা গুলোর মত। রাস্তা থেকে সাধারণভবাবে এই জলের অস্তিত্ব বা উৎস কোনটাই দৃশ্যমান নয়। তবে সাঁকোর কাছে দাঁড়ালে সারাক্ষণ জল পড়ার শব্দ শোনা যায়। উত্তর ভারতের মানালির জলপ্রপাতের অবিরাম শব্দের মত। এই শব্দে মাথা ঝিম ধরে যাবে আপনার। প্রতিনিয়ত জোয়ারভাটা হয় এই খালের ভেতরে। সমুদ্রের সাথে তার গভীর আত্মীয়তার কারণে। 

প্রতিদিন সকালের মোহন আলোতে প্রতিনিয়ত আমরা সমুদ্রকে অবজ্ঞা করে পেনিন সুলার রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি দৌড়াদৌড়ি করি। আজ আমি ক্যাপ্টেন হাসিবকে সাথে নিয়ে এসেছি জেলেপাড়ার দিকে। গডরিচ বীচের সমান্তরালে একটা মাটির রাস্তা। শহরতলীর মতন এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা পথের শেষপ্রান্তে। চারপাশের একতলা টিনের ছাঁদের ঘরগুলো অদ্ভুত রকমের সুন্দর। যুদ্ধের আগে সম্ভবত রিসোর্ট অথবা হোটেল হিশেবে ব্যবহৃত হত। এখন স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করছে। ভেতরের দিকে একটা গির্জা। গির্জার দেয়ালে মেরীর কোলে যিশু। রিলিফ উয়ার্ক। দুজনের রঙই কাল। এমনকি তাদেরকে ঘিরে আকাশের ভেতরে পরীর পাখা নিয়ে উড়তে থাকা দেবদূতদের রঙও। আমি জীবনে এই প্রথম কালো রঙের মেরী আর যীশু প্রত্যক্ষ করলাম। 

গডরিচ বীচের পার্শ্ববর্তী রাস্তাটা যেখানে শেষ, সেখান থেকে একটু উত্তরে দুই বাড়ির মধ্য দিয়ে সরু রাস্তা। এই পথে একটু এগোতেই প্রপাত বা ছোট খালের ওপরে একটা কাঠের সেতু। এটা সেই খাল পেনিন সুলার সড়কের নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলেপাড়ায় যেতে হলে এই খাল পার হয়ে যেতে হয়। 

ভাঁটার সময়। সাঁকোর নীচের জল সমুদ্রের দিকে নীচে নেমে গেছে। নীচে কর্দমাক্ত মাটি। জলকাদায় একাকার। এর ওপর দিয়ে আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম কয়েকটা টাকি মাছের মত মাছ স্বচ্ছন্দে হাঁটাচলা করছে। উভচর। খুব বেশি হলে ছয় ইঞ্চি দীর্ঘ। চোখ দুটো ব্যাঙের মত দেহের বাইরে। অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে সাঁকোর ওপরে আমাকে দেখছে। অপলক নেত্রে। আমি বিস্মিত ও মুগ্ধ। একটা অসীম কালের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের সুতো দুদিক থেকে টেনে টেনে আমাদের মাঝখানের দূরত্বকে ঘুচিয়ে দিতে চাইছে। আত্মীয়ের মত। জল থেকে স্থলের দিকে আমাদের  অনন্ত-যাত্রা তা কি এভাবেই শুরু হয়েছিল?

(সমাপ্ত)

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ