.ঢাকা, সোমবার   ২৫ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ১১ ১৪২৫,   ১৮ রজব ১৪৪০

পাহাড়-প্রপাতে বিস্ময়কর অভিযান

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েল

 প্রকাশিত: ১২:৪৩ ১৩ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১২:৪৩ ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নাফাখুম পর্ব সেরে এবার রেমাক্রি খাল বরাবর আমাদের পথ চলা। যতক্ষণ না রেমাক্রি ফলসের দেখা না পাই ততক্ষণ হাঁটতে হবে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে নৌকা। যেটা সাঙ্গু নদী বেয়ে নিয়ে যাবে থানচি আর আমাদের অভিযাত্রারও সমাপ্তি ঘটবে।

প্রথম পর্ব পড়ুন: স্বর্গরাজ্য নাইক্ষ্যাং

দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন: নাইক্ষ্যাং: পাহাড়ে স্বচ্ছ সবুজাভ জলের ধারা

এই পথ যেন আর শেষই হতে চায় না। ৩ দিনের ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর। পিঠের ব্যাকপ্যাকটা যেন মিনিটে মিনিটে ভারী হয়ে উঠছে। পায়ে বিভিন্ন জায়গায় কেটে-ছিঁড়ে খুবই খারাপ অবস্থা। কয়েক জায়গায় জোঁকের কামড়ে লাল হয়ে আছে। কোথাও যে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করবো তাতেও ভয়! পুরো জোঁকের রাজ্য যেন এটা। দাঁড়ালেই কিলবিল করে শরীর বেয়ে উঠতে থাকে।

বাদাম ক্ষেত পেরিয়ে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে

তবে নাফাখুম থেকে রেমাক্রি যাবার ট্রেইলটা ছিলো এই ট্রেকিং-এ দেখা সবচেয়ে সুন্দর ট্রেইল। পাথুরে খালের চকচকে পরিষ্কার অল্প পানিতে ছোট ছোট মাছের আনাগোনা, দু পাশে কোথাও পাহাড়ী জনবসতি, কোথাও চীনাবাদাম চাষের ক্ষেত, আবার অনেক জায়গায় দেখা গেল- মাঠে বুনো গরু চরে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা হাঁটার পর দেখা পেলাম রেমাক্রি ফলসের। শীতকাল হবার কারণে ফলসের আসল সৌন্দর্যটা দেখতে পেলাম না। গিয়ে ফলসের জলে পা ডুবিয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। মন চাচ্ছিলো, জলের স্রোত আমার ভোর থেকে ১৬ কিলোমিটার পাথর আর ঝিরিপথ ধরে হাঁটার ক্লান্তিগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যাক।

কিছুক্ষণ পর আমরা চড়ে বসলাম নৌকাগুলোতে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ধেঁয়ে আসা জলরাশি একটি পাথর গড়িয়ে আর একটি পাথরে কলকলিয়ে আছাড় খাচ্ছে। আর মাছেরা চোখের সামনে থেকে লম্ফ দিয়ে নিমিষেই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। মনে হবে আপনাকে চোখ টিপ্পনি দিয়ে কেটে পড়লো বুঝি। দু’পাশের সবুজ বন-বনানী; শুভ্রনীল আকাশ আর পাহাড় ছুঁয়ে ওড়াউড়ি করা মেঘবালিকারা। আবার যখন তখন বৃষ্টি হয়ে নিচেও নেমে আসে। এ যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। তবে এগুলো খুব ছোট নৌকা। ৫ জন যাত্রী আর দু মাথায় ২ জন চালক আর হেল্পারের ভার নিতে পারে। নৌকাগুলো দেখলে মনে হয়, পিছনে একটা ইঞ্জিন আর পাখা লাগিয়ে জোর করে নৌকাকে ট্রলার বানানো হয়েছে! এই বাহনটা সাঙ্গু নদীর স্রোতের মাঝে ভয়ানক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে।

রেমাক্রির পথে

পুরোপুরি ২ ঘণ্টা লাগে রেমাক্রি থেকে তিন্দু, বড়পাথর হয়ে থানচি পৌঁছাতে। চুপচাপ রোবটের মতো বসে থাকতে হয় এ দুঘণ্টা। কারণ একটু নড়লেই ভয়ঙ্কর ভাবে দুলে ওঠে নৌকা। মাঝে মাঝে নদীর তলদেশের পাথরে ঘষা লাগলে মনে হয়, এই বুঝি পড়ে গেলাম! নদীর মাঝে বড় বড় পাথরের মধ্যে দিয়ে এমনভাবে তীব্রবেগে এগিয়ে চলে এই নৌকা। নিজের কাছে অবাস্তব মনে হয়! দারুন কোনো অ্যাডভেঞ্চারাস গেম প্লে দেখছি। এভাবে হাত-পা শক্ত হয়ে যাওয়া ভয় নিয়ে আমরা বড়পাথর এলাকায় এসে পড়লাম!

বিশালকায় সব পাথর নদীর মাঝে সগর্বে দাঁড়িয়ে। পাথরগুলো এতোই ঘন যে তারমধ্যে নৌকা বের করে নিতে চালকের হিমশিম খেতে হয়। কোনো একটার সাথে বাড়ি লাগলেই দুমড়ে-মুচড়ে যাবে ঐ নৌকা। এভাবে বড় পাথর, ছোট পাথর, রাজা পাথর নামক সব দৈত্যাকার পাথর পার হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৫ টার কাছাকাছি আমরা থানচি পৌঁছে গেলাম।

রেমাক্রির পথে

মনে হলো, কতদিন পর নিজের চেনা জগতে ঢুকলাম! ভালোও লাগলো, আবার মিস করতে শুরু করলাম পিছনে ফেলে আসা পথটাকে। ফ্রেশ হয়ে দ্রুত উঠে গেলাম জিপে বান্দনবানের উদ্দেশ্যে। কারণ বিজিবি চেকপোস্ট ৬ টার পর বন্ধ হয়ে যায়। তার আগেই বের হতে হবে আমাদের। ধীরে ধীরে থানচির ব্রিজটা দূরে সরে যাচ্ছে আর ভাবছি, এ তিনদিন অদ্ভুত এক রাজ্যে ছিলাম। এ যেন সবুজের স্বর্গ।

আমরা যেখানে থাকি, আর যেখানে গিয়েছিলাম। যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটো পৃথিবী। কোনো মিল নেই এই দুটো পৃথিবীর। আমার পৃথিবীতে শ্বাস নেবার মতো বিশুদ্ধ বাতাস নেই। তাদের পৃথিবী অনেক অনেক বেশি সত্য। অনেক বেশি সুন্দর। আমার পৃথিবীতে রোদ, ঝড়, বৃষ্টি ইত্যাদি অযুহাতের শেষ নেই। আর সেই পৃথিবীর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ২টা পাহাড় পাড়ি দিয়ে স্কুলে যায়। জীবন সহজ করার প্রতিযোগীতায় নেমে আধুনিক থেকে আধুনিক প্রযুক্তির ঘেরাটোপে বন্দি হচ্ছি প্রতিদিন। আর তারা ১৫-২০ কেজি বোঝা নিয়ে অনায়াসে উঠে যায়। যে পাহাড় টপকিয়ে আমি বিশাল এক ফিচার লিখে ফেললাম। সেই পাহাড় তাদের প্রতিদিনের চলার পথ। ভাগ্যিস এই লেখা সুউচ্চ অট্টালিকায় বসে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে পড়া হবে। সেই পৃথিবীর কেউ পাহাড়ের কোলে বসে এই লেখা পড়লে আমি লজ্জিত হতাম।

থানচি থেকে বান্দরবান যাবার পথে

তাদের জন-জীবন, তাদের আথিত্য, তাদের শ্রমজীবি মুখগুলো আমাকে এখনো টানছে। সেই বাচ্চাটা আমাকে টানছে, যে সবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখেই সারাদিন গাছ কেটে বানানো সিঁড়ি বেয়ে টং থেকে নামার চেষ্টা করে। সে এর মধ্যেই বুঝে গেছে তার সংগ্রামটা। ওই বাচ্চাটা আমাকে অনেককিছু শেখায়। এমন কিছু শিখতে আবার কখনো ফিরে যাবো থুইসা পাড়ায়। আবারও ফিরে যাবো নাক্ষিয়ং-এ।

নোট: যদি অল্পসময়ে নাফাখুম ঘুরে আসতে চান তাহলে বান্দরবন থেকে বাস বা জীপে সোজা চলে যাবেন থানচিতে। থানচি যেতে প্রায় ৪/৫ ঘন্টার মতো লাগে। থানচি নেমে প্রধান কাজ হলো একজন গাইড ঠিক করা। এবার থানচি থেকে নৌকা নিয়ে রোমাক্রি বাজারে চলে যান, থানচি থেকে রোমাক্রি প্রতিজন ২০০ টাকা করে তবে পর্যটকদের দেখলে রিজার্ভ ৩০০০/৪০০০ হয়ে যায়। যদি থানচি থেকে সকাল সকাল রওনা দেন তাহলে রোমাক্রি নেমে হাঁটা ধরুন নাফাখুম ঝরনার উদ্দেশ্য। প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটলে আপনারা পেয়ে যাবেন নাফাখুম এর দেখা। এখানে কিছুক্ষন ছবি তুলে, বিশ্রাম নিয়ে এবার সাজাই পাড়ার দিকে রওনা হয়ে যান।

নাফাখুম

নাফাখুম ঝরনা থেকে হাঁটা শুরু করলে ৩/৪ টা ঘণ্টার মধ্যেই আপনারা পৌঁছে যাবেন সাজিয়া পাড়া। সাজিয়া পাড়াতে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল সকাল উঠে পড়ুন এবং সাজিয়াপাড়া থেকে একজন গাইড নিয়ে রওনা হয়ে যান আমিয়াখুমের উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রে গাইডকে ৫০০ টাকার মতো দিতে হবে। প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিনঘণ্টা অসাধারণ সব রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই পেয়ে যাবেন আমিয়াখুম ঝরনা। আমিয়াখুম দেখে আবার ফিরে চলুন সাজিয়াপাড়া, রাতটুকু সাজিয়াপাড়া কাটিয়ে সকালে আবার আগের রাস্তায় ফিরে আসতে পারেন থানচিতে।

ডেইলিবাংলাদেশ/এনকে