Alexa পার্কে পার্কে রাইড আতংক

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৫ ১৪২৬,   ২০ মুহররম ১৪৪১

Akash

পার্কে পার্কে রাইড আতংক

 প্রকাশিত: ১৬:৩৫ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৬:৩৫ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কুমিল্লা নগরী ও আশেপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা পার্কগুলো নিয়ে বিনোদনপ্রেমীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাইডে চড়তে গিয়ে দুই পার্কে দুই কিশোরের মৃত্যু নিয়ে তাদের মধ্যে এ শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব রাইড পরিত্যক্ত লোহার টুকরো, পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত ও জাহাজ ভাঙার লোহা দিয়ে স্থানীয় ওয়ার্কশপে তৈরি করা হয়েছে।

কুমিল্লা নগরীর ঢুলিপাড়ায় ফান টাউন, সুয়াগাজি ড্রিমল্যান্ড পার্ক, লালমাই পাহাড়ে ব্লু-ওয়াটার পার্ক, লালমাই লেকল্যান্ড ও ডাইনোসা ড্রাগন পার্ক গড়ে উঠেছে। নগরীতে বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা এসব পার্কে রাইডও রয়েছে। 

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের নগর শিশু উদ্যানে ২৫ আগস্ট সন্ধ্যায় পার্কের শান্তা মরিয়ম রাইডে (নৌকা রাইড) চড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কলেজছাত্র মো. রায়হানের (২০) মৃত্যু হয়। রায়হান নগরীর ছোটরা এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে। সে সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই কলেজের ছাত্র ছিল। এরআগে ঈদের দিন সদর দক্ষিণ উপজেলায় ড্রিমল্যান্ড পার্কে এক কিশোর নাগরদোলায় চড়ার সময় সেখানে ঝুলে থাকা দড়ির সঙ্গে তার গলা পেঁচিয়ে ফাঁস লেগে মৃত্যু হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নগর শিশু উদ্যান পার্ক এবং সুয়াগাজি ড্রিমল্যাড পার্কের মতো কুমিল্লার অন্যান্য পার্কগুলোর রাইডগুলোও ত্রুটিপূর্ণ।

ঋষি দাস নামে বিনোদন প্রিয় এক কলেজ ছাত্র  বলেন, ‘নগর শিশু উদ্যান পার্ক এবং সুয়াগাজি ড্রিমল্যাড পার্কের মতো কুমিল্লার অন্যান্য পার্কের রাইডে চড়তে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটবেনা এমন নিশ্চয়তা কে দেবে। সবগুলো পার্কে গিয়ে রাইডগুলো পরীক্ষা –নীরিক্ষা করা হোক।’

নৌকা রাইডসহ নগর শিশু উদ্যানে ৩০টির বেশি রাইড রয়েছে। সবগুলো একেকটি মরণ ফাঁদ বলে জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ এসপি। দুর্ঘটনার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ কথা জানান।

এসপি সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে নৌকার রাইডটি তৈরি করা হয়। রাইডটি বিদ্যুৎ নয় জেনারেটরের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল। নৌকার এই রাইডসটিতে জেনারেটর থেকে ৪শ ভোল্টের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ হতো। অত্যন্ত হাই পাওয়ার বোল্টের জেনারেটরটির বৈদ্যুতিক ক্যাবল ছিল খুবই নিম্নমানের। ক্যাবলগুলো থেকে তার বেরিয়ে থাকতে দেখা গেছে। মাটিতে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।’

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মনজুর কাদের মনি বলেন, ‘নগর শিশু উদ্যান পার্কটি আমার ওয়ার্ডে পড়েছে। পার্কটি নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করলেও সব কথা বলা সম্ভব হয় না। পার্কটির রাইডগুলো সম্পর্কে মেয়র সাহেব খুব ভালো বলতে পারবে। কারণ তাদের অনুসারীরাই পার্কটি দেখাশুনা করে।’

অভিযোগ উঠেছে নগর শিশু উদ্যানের (শিশু পার্ক) ইলেকট্রিক রাইডগুলো ওয়ার্কশপের পরিত্যক্ত লোহার টুকরো, পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত ও জাহাজ ভাঙার লোহা দিয়ে তৈরি এই বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর মনজুর কাদের মনি বলেন, ‘যা দেখেছেন তাই সত্য, আমার বলার কিছু নেই।’

২৫ আগস্ট নগর শিশু উদ্যানে কলেজছাত্রের মৃত্যুর পর রাইড পরিচালনার দায়িত্বে থাকা শরিফ এবং কাসেম পালিয়ে যায়। তারা দুই জনই কুসিকের পিয়ন (অস্থায়ী নিয়োগ) বলে জানিয়েছেন কুসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম বড়ুয়া ।

কুমিল্লা কোতয়ালি মডেল থানায় রায়হানের বাবা বাদী হয়ে শরিফ ও কাসেমের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,রাইডের প্রত্যেকটি জোড়া ঝালাই করা। ৪শ’ ভোল্টের জেনারেটরে চালিত নৌকা রাইডটি ছিল একেবারে ঝুঁকিপূর্ণ। বৈদ্যুতিক তারগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের। বিদ্যুতের লাইন এদিক-সেদিক এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পার্কের ল্যাম্পগুলো ভাঙা। বিদ্যুতের তারগুলো হা করে তাকিয়ে আছে।

রবিবার ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে আসেন কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু কারও কাম্য নয়। ঈদের দিন থেকে কুমিল্লার পার্কগুলোতে দুইটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ঈদের দিন ২২ আগস্ট সদর দক্ষিণ উপজেলায় ড্রিমল্যান্ড পার্কে এক কিশোর নাগরদোলায় চড়ার সময় সেখানে ঝুলে থাকা দড়ির সঙ্গে তার গলা পেঁচিয়ে ফাঁস লেগে মৃত্যু হয়। ২৫ আগস্ট সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে রাইডে চড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কলেজছাত্র রায়হানের মৃত্যু হয়। যারা দায়িত্বে ছিলেন আমরা প্রাথমিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা নিয়েছি। এর বাইরে কারও কোনও দায়িত্বের অবহেলা আছে কিনা পুলিশ তদন্ত করছে। দায়িত্বে গাফিলতি থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’

এসপি বলেন, ‘কুসিকের নগর শিশু উদ্যান ছাড়াও কুমিল্লার আরও একাধিক পার্ক রয়েছে। যেগুলোতে ইলেকট্রিক রাইড রয়েছে। আমরা এই মামলার তদন্তের মাধ্যমে অন্যান্য পার্কগুলোর পরিচালকদেরকে একটি মেসেজ দেবো। যেন বিনোদন প্রিয় শিশু, কিশোর ও মানুষজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। তা নাহলে আর কোনও ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এসপি জানান, ২২ আগস্ট রাত ১০টায় কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায়র সুয়াগাজি এলাকার ড্রিমল্যান্ড পার্কে নিহত কিশোরের নাম জানা যায়নি। তবে তার বাড়ি উপজেলার সুয়াগাজি এলাকায়। এ ঘটনায় ড্রিমল্যান্ড পার্কের মালিক সাইফুল ইসলাম শাহিনকে আটক করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই দিন সন্ধ্যায় কিশোরটি একটি নাগরদোলায় চড়ার সময় সেখানে ঝুলে থাকা একটি দড়ির সঙ্গে তার গলা পেঁচিয়ে যায়। ওই সময় ফাঁস লেগে তার মৃত্যু হয়। পার্ক কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় নাগরদোলায় কিশোরের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।

ডাইনোসা ড্রাগন পার্কের পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, ‘ড্রাগন পার্ক বাংলাদেশের একমাত্র পার্ক, যার সবগুলো রাইড দেশের বাইর থেকে আনা হয়েছে। ড্রাগন পার্কে দেশে তৈরি কোনও রাইড নেই। আমরা সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা রাইডসগুলো পরীক্ষা করে থাকি। আমার জানা মতে কুমিল্লার আর কোনও পার্কে বিদেশ থেকে আনা রাইড নেই।’

নিহত কলেজছাত্র রায়হানের বাবা মো. বাবুল মিয়া বলেন, ‘রায়হানের সঙ্গে আরও তিন জন আহত হয়। রায়হান গুরতর আহত হলে তার বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আমি রায়হানকে মৃত পড়ে থাকতে দেখি। সিটি করপোরেশন আমার ছেলেকে হত্যা করেছে। আমি চাই না সিটি করপোরেশনের এই পার্কে এসে আর কারও মা-বাবার বুক খালি হোক। আমি প্রশাসনের কাছে এই হত্যাকান্ডের বিচার চাই।’

কুসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপম বড়ুয়া বলেন, ‘পার্কে রাইড বসানোর জন্য কুসিকে আবেদন করতে হয়। পরে আমাদের কর্মরত প্রকৌশলীরা যাচাই-বাছাই করে জায়গা নির্ধারণ করে দেয়। পার্ক সিটি করপোরেশনের হলেও রাইডের মালিক কুসিক না। তবে কুসিক পার্ক দেখাশুনা করে থাকে।’

নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এবং বৈদ্যুতিক তার দিয়ে তৈরি রাইডে চড়তে গিয়ে মৃত্যুর কারণ এবং রাইডসের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, ‘পার্কে রাইডে চড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কলেজছাত্রের মৃত্যুর ঘটনা শুনেছি। রাইডের মান সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। পার্ক আমরা দেখাশুনা এবং উন্নয়ন করে থাকি। যেকোনও ব্যক্তি পার্কে রাইড বসাতে আবেদন করলে আমরা যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দিয়ে থাকি। রাইডগুলো তারা ঢাকার বিভিন্ন কোম্পানি থেকে এনেছে। একেক জন একেক কোম্পানি থেকে। আমরা সবগুলো রাইড মালিকদের সঙ্গে বসবো। কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করবো।’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর