.ঢাকা, শুক্রবার   ২২ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৭ ১৪২৫,   ১৫ রজব ১৪৪০

পানি পান করার আদব (পর্ব -১)

মাওলানা ওমর ফারুক

 প্রকাশিত: ১৬:৪৭ ১২ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৬:৫১ ১২ জানুয়ারি ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

হজরত আনাস (রা.) বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করার জিনিসকে চাই তা পানি হোক; কিংবা শরবত হোক- তিন শ্বাঁসে পান করতেন। 

অর্থাৎ পাত্র থেকে মুখ সরিয়ে নিঃশ্বাস গ্রহণ করতেন। (মুসলিম, হাদীস নং-৩৭৮২, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১২৭৩)

وعن ابن عباس رضى الله عنهما قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم  لا تشربوا واحدا كشرب البعير ولكن اشربوا مثنى وثلاث وسموا إذا انتم شربتم واحمدوا إذا انتم رفعتم

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, পান করার কোনো জিনিসকে উটের মত এক শ্বাঁসে পান করো না। অর্থাৎ একই শ্বাঁসে একবারে মানুষ ঘটঘট করে পুরো গ্লাস পানি গিলে ফেলে যা ঠিক নয়। (তিরমিযী, হাদীস নং-১৮০৭)

তিনি এই কাজটিকে উটের আমলের সঙ্গে উপমা দিয়েছেন। কারণ উটের অভ্যাস হচ্ছে- এক শ্বাঁসে পুরো পানি পান করে ফেলা।  তোমরা এরকম করো না বরং; যখন তোমরা পানি পান করবে দুই শ্বাঁসে পান কর অথবা তিন শ্বাঁসে পান কর।  যখন পানি পান করা আরম্ভ কর আল্লাহর নাম নিয়ে এবং বিসমিল্লাহ পড়ে শুরু কর, ঢক ঢক করে পানি গিলে ফেলো না।

পানি কুদরতি নেযামের কারিশমা:

পানির গোটা ভান্ডার আল্লাহ তায়ালা সমুদ্রের মাঝে রেখেছেন। অথচ সমুদ্রের পানিকে তিনি লবণাক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। কারণ সমুদ্রের পানি যদি মিঠা হত, তাহলে কিছুদিন পরেই সব নষ্ট হয়ে যেত। লাখো সৃষ্টিজীব সমুদ্রে পঁচে ও গলে, তবুও সমুদ্রের পানি নষ্ট হয় না কেন এবং স্বাদ ও গন্ধে কোনো পরিবর্তন দেখা দেয় না কেন? কারণ সমুদ্রের পানি লবণাক্ত বিধায় লাখো জানোয়ার হজম করার শক্তি তার আছে।

যদি আমাদেরকে সরাসরি সমুদ্র থেকে পানির প্রয়োজন পূরণ করতে বলা হত, তাহলে সেক্ষেত্রে আমরা  কষ্টে পড়ে যেতাম। সমুদ্র থেকে পানি জোগাড় করা কী চাট্টিখানি কথা! জোগাড় করলেও তা পান করার উপযোগী তো নয়। তাই আল্লাহর কুদরতের কারিশমা দেখুন, তিনি সমুদ্রের পানিকে নীরবে বাষ্পাকারে উঠিয়ে নেন ও মেঘমালায় পরিণত করেন। উঠানোর প্রক্রিয়াটাও আশ্চর্য কী? এ প্রক্রিয়ার মাঝেও তিনি এমন স্বয়ংক্রিয় মেশিন স্থাপন করেছেন যে, লবণাক্ত পানির ‘লবন’ সমুদ্রে থেকে যায়। সমুদ্রের লোনা পানি মিঠা করার এ এক বিস্ময়কর ব্যবস্থা তিনি করেছেন, যেন এর পেছনে মানুষের কোনো শ্রম বা অর্থ ব্যয় করতে না হয়। 

আল্লাহ মেঘমালা থেকে সুমিষ্ট পানি বর্ষণ করেন। কোনো মানুষের এ শক্তি নেই যে, সারা বছরের অথবা ছয় মাসের পানি একত্রে সঞ্চয় করে রাখবে। সেজন্য তিনি ভাসমান মেঘমালার পানি পাহাড়ে বর্ষণ করে জমাট আকারে পাহাড়ে সংরক্ষণ করেন। পানির মনোরম এ হিমাগার পাহাড় চূড়ায় হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য সৃষ্টি করার পাশাপাশি আমাদের পিপাসাও নিবৃত্ত করে।

উপরন্তু মানুষ নিজে গিয়ে সে তুষার ভান্ডার থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয় না। বরং তিনি সূর্যের তাপ দ্বারা বরফ গলিয়ে নদী ও পাহাড়ী ঝর্না তৈরি করেন এবং পৃথিবীর কোনায় কোনায় পানি সরবরাহের এমন পাইপ লাইন বিছিয়ে দেন যে, মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই মাটি খনন করে পানি আবিষ্কার করতে পারে। আল্লাহ বলেন,

فاسكناه فى الارض

‘অতপর আমি পানিকে যমীনের বুকে সংরক্ষিত করি।’ (সূরা মুমিনুন ১৮)

সমুদ্র থেকে পানি ওঠিয়ে  পর্বতচূড়ায় সংরক্ষণ করা এবং পুনরায় ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের মাধ্যমে পৃথিবীর সর্বপ্রান্তে পৌঁছানোর এ বিশাল কর্মধারায় মানুষের শ্রম, চিন্তা, প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনার কোনোই ভূমিকা নেই। পানির যে ‘ঢোক’ আমরা এক মূহুর্তে কণ্ঠনালি দিয়ে গড়িয়ে দেই এর প্রতিটি ফোঁটা আল্লাহর এক বিশাল কুদরতি ব্যবস্থাপনা অতিক্রম করে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পানি পান করার আগে বিসমিল্লাহ বল।’ মূলত: এর মাধ্যমে তিনি উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, তোমরা পানি নামক নেয়ামতটি ভোগ করার পূর্বে আল্লাহর এই বিরাট অনুগ্রহকে স্মরণ কর, তোমাদের অধর পর্যন্ত  পানির প্রতিটি ফোঁটা পৌঁছানোর জন্য তিনি তাঁর বিশ্বজগতের কতগুলো সৃষ্টিকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

পুরো রাজ্যের মূল্য এক গ্লাস পানি:

একবার বাদশাহ হারুনুর রশিদ শিকারের উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। চলতে চলতে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছেন। পাথেয় যা এনেছিলেন, সব আগেই শেষ করে ফেলেছেন। ইতোমধ্যে প্রচন্ড পিপাসাও পেয়েছে। হঠাৎ একটু দূরে একটি কুঁড়ে ঘর দেখতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেন এবং ঘরের মালিককে বললেন, ‘ভাই! একটু পানি দাও।’ মালিক ছিলেন একজন দরবেশ পানি আনলেন এবং বাদশার হাতে দিলেন। বাদশাহ পানি পান করার জন্য ঠোঁটের কাছে নিচ্ছিলেন, তখন দরবেশ বলে ওঠলেন, ‘আমিরুল মুমিনীন! একটু থামুন।’ বাদশাহ নিরস্ত হলেন। দরবেশ বললেন, ‘বলুন তো! প্রচন্ড পিপাসার মুহূর্তে পানির জন্য আপনি প্রয়োজনে কী পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করবেন?’

বাদশাহ বললেন, ‘পানি তো এমন এক জিনিস যা ছাড়া  মানুষ বাঁচতে পারে না। তাই আমি প্রচন্ড পিপাসার মুহূর্তে পানির জন্য প্রয়োজনে আমার অর্থ রাজত্ব ব্যয় কর।’ দরবেশ বললেন, ‘এবার পান করুন।’ তিনি পান করা শেষ করলে দরবেশ পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,  ‘আমিরুল মুমিনীন! এ এক গ্লাস পানি যদি আপনার দেহের ভেতরে থেকে যায়, বাইরে বের হতে না পারে। তখন তা বের করার জন্য আপনি কী পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করবেন?’ বাদশাহ উত্তর দিলেন, ‘ভাই! এটা তো আরো বড় মসিবত। এ মসিবত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে আমি অবশিষ্ট অর্ধেক রাজত্বও ব্যয় করে ফেলব।’ তখন দরবেশ বলল, ‘তাহলে আপনার গোটা রাজত্বের মূল্য হলো এক গ্লাস পানি। আপনি একবারের জন্যও কী ভেবে দেখেছেন, আল্লাহ আপনাকে প্রতিদিন কতটি রাজত্ব দান করেন।’

ঠান্ডা পানি এক মহান নেয়ামত:

হজরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) একবার হজরত থানভী (রহ.)-কে বলেন, ‘মিয়া আশরাফ আলী! পানি পান করতে চাইলে ঠান্ডা পানি পান করবে। যেন তোমার শিরা-উপশিরা থেকে আল্লাহর শোকর প্রকাশ পায়।’ সম্ভবত এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়ার তিনটি জিনিস আমি খুব পছন্দ করি। একটি হলো, ঠান্ডা পানি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো পানাহারের বস্তু ঘটা করে জোগাড় করেছেন বলে কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। কিন্তু একমাত্র ঠান্ডা পানি তিনি দুই-তিন মাইল দূর থেকেও সংগ্রহ করেছেন। ‘বীরে গরস’ নামক কূপ- যার চি‎‎হ্ন এখনো মদীননাতে আছে, সেখান থেকে গুরুত্বসহ ঠাল্ডা পানি জোগাড় করতেন।

তিন শ্বাসে পানি পান করা:

উল্লেখিত হাদীসসমূহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানি পান করার আদব শিক্ষা দিয়েছেন। তন্মধ্যে একটি আদব হলো, তিন শ্বাসে পানি পান করা। এ সম্পর্কীয় হাদীসমূহের আলোকে ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, এ পদ্ধতিতে পানি পান করা উত্তম। দুই কিংবা চার শ্বাসেও পান করা যাবে। তবে এক শ্বাসে সব পানি শেষ করে দেয়া উত্তম নয়। কোলো কোলো আলেম লিখেছেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণে এক শ্বাসে পানি পান করা টিক নয়। যা হোক, আমাদের দেখার বিষয় হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পদ্ধতিতে পানি পান করা থেকে নিষেধ করেছেন। ওলামায়ে কেরামের সর্বসম্মতিক্রেমে এক শ্বাসে পান করা যদিও হারাম নয়; তবে উত্তমও নয়।

হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা:

তিনি আমাদের রাসূল। রাসূল হিসেবে যে আদেশ-নিষেধ করেন, তা মেনে চলা আমাদের কর্তব্য। রাসূল হিসেবে তিনি যে নিষেধাজ্ঞা করেন, সেটা আমাদের জন্য হারাম। পক্ষান্তরে উম্মতের জন্য তিনি একজন দরদী রাহবারও। যে পথে ও যে কাজে কল্যাণ রয়েছে, সে পথ ও কাজের প্রতিই তিনি দিকনির্দেশনা দেন। প্রয়োজনে আদেশ করেন, প্রয়োজনে নিষেধ করেন। এ আদেশ-নিষেধ হলো, তাঁর কোমলতার পরিচয়। এটি হলো উম্মতের জন্য দরদী নবী (সা.) এর পরামর্শ। এটি প্রকৃত আদেশ নয়; প্রকৃত নিষেধ নয়। তাই মেনে চলা উম্মতের নৈতিক দায়িত্ব হলেও শরয়ী কর্তব্য নয়। এজন্য কেউ কাজটি না করলে একথা বলা হবে না যে, সে গুনাহ করে ফেলেছে। হ্যাঁ, একথা অবশ্যই বলা হবে যে, সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পছন্দনীয় তরীকা পরিহার করেছে। আর যে ব্যক্তির হৃদয়ে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা আছে, সে ব্যক্তি হারাম কাজগুলো তো অবশ্যই পরিত্যাগ করে, পাশাপাশি যে কাজ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করেন না তাও সে পরিহার করে।

পানি পান করো, সওয়াব অর্জন কর:

এজন্য ফিকহশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণে আমি বলেছিলাম, এক নিঃশ্বাসে পানি পান করা হারাম নয় এবং গুনাহও নয়। তবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত আশেকের জন্য এটা শোভনীয় নয়। যার অন্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা আছে, সে এ ধরনের কাজের কাছেও যাবে না। তাই ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, এক নিঃশ্বাসে সম্পূর্ণ পান করা অনুত্তম। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, মাকরূহে তানযিহী। পানি যখন পান করবই, তখন অযথা একটি অনুত্তম কিংবা মাকরূহে তানযিহী কাজ কেন করতে যাব? তিন নিঃশ্বাসে পান করলে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুশি হবেন। তাঁর সুন্নত আদায় হবে। পানি পান ইবাদতে পরিণত হবে।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের ওপর আমল করার কারণে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় পাত্র হওয়া যাবে। একটু মনোযোগ দিলেই এতসব সাওয়াব পাবে। তাই অবহেলা না করে সুন্নতমাফিক আমল করাটাই ভালো হবে।

মুখ থেকে পাত্র সরিয়ে নিঃশ্বাস নেবে:

عن ابى قتادة رضى الله عنه ان النبى صلى الله عليه وسلم نهى ان يتنفس فى الاناء 

‘হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাত্রের ভেতর নিঃশ্বাস নেয়া থেকে নিষেধ করেছেন।’ (মুসলিম, হাদীস নং-৩৭০৮, তিরমিযী, হাদীস নং- ১৮০৫)

হাদীসটির বিস্তারিত বিবরণ অন্য হাদীসে এভাবে এসেছে যে, এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে আরজ করল, হে আল্লাহর রাসূল! পান করার সময় বারবার আমার নিঃশ্বাস নিতে হয়, আমি কীভাবে নিঃশ্বাস নেব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, যখন নিঃশ্বাস নেয়ার প্রয়োজন হবে, তখন পাত্রকে মুখ থেকে সরিয়ে রাখবে। কিন্তু পান করার সময় পাত্রের ভেতরে নিঃশ্বাস ফেলবে না অথবা ফু দেবে না। সুতরাং এ ধরণের কাজ আদব ও সুন্নত পরিপন্থী।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে