পানির মতোন সস্তা কয়েকটি দ্বীপ

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

পানির মতোন সস্তা কয়েকটি দ্বীপ

খালিদ মাহমুদ খান

 প্রকাশিত: ১২:১৪ ১১ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১২:১৪ ১১ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

দ্বীপ শব্দটি শুনতে যেমন সুন্দর তেমনি সুন্দর এর বাহ্যিক অবয়বও৷ বিশ্বে প্রায় ২ হাজার দ্বীপ রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বীপ হল গ্রীনল্যান্ড যেটি ৮ লাখ ৪০ হাজার ৪ মাইল। গ্রীনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক সাগর এবং আর্কটিক সাগরের মধ্যে অবস্থিত। অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দ্বীপ হলো ম্যানহাটন দ্বীপ যার আকৃতি একটি টেনিস কোর্টের সমান। আবার বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান দ্বীপ হলো তিন হাজার একর জায়গা দ্বারা বেষ্টিত এবং ২৪০ মিলিয়ন ইউরো বা ৩১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের লিসবন দ্বীপ যেটি পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই দ্বীপে গলফ কোর্ট, অনেকগুলো আবাসিক ইউনিট ছাড়াও রয়েছে আরো অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা। অন্যদিকে পৃথিবীতে এমনো কিছু সস্তা দ্বীপ রয়েছে যেগুলো বলতে গেলে পানির দামেই পাওয়া যায় এবং আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে এত অল্প দামে পাওয়া গেলেও এই দ্বীপগুলো কেনার সাহস কেউ দেখায় না বিশেষ কিছু অদ্ভুত, ভূতুরে এবং রহস্যজনক কারণে। চলুন জেনে নেয়া যাক এমনি কয়েকটি রহস্যময় সস্তা দ্বীপ সম্পর্কে-

ডাকসা আইল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া-

ক্রোয়েশিয়া যেমন সুন্দর গোছানো একটি দেশ তেমনি ডাকসা আইল্যান্ড দ্বীপটিও ছবির মতনই সুন্দর। তবে ডাকসা আইল্যান্ডকে অনেকে ডেক্সা আইল্যান্ড গোস্ট বলেও ডেকে থাকে৷ যার অর্থ হলো ভূতের দ্বীপ। এই দ্বীপ অ্যাড্রয়েটিক সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থিত। এই দ্বীপটির দাম অনেক বছর ধরেই দুই মিলিয়ন ইউরো নির্ধারিত রয়েছে অর্থাৎ মাত্র ১৬ কোটি টাকা যা কিনা এত বড় আইল্যান্ডের জন্য খুবই কম। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই দ্বীপটি কেনার জন্য কেউই আগ্রহ প্রকাশ করেনি। এমনকি সব হিসেব বিবেচনা করার পরেও কেউ এটা কিনতে চায় না। এই দ্বীপ মনোমুগ্ধকর পরিবেশ দিয়ে ঘেরা রয়েছে। এখানে কয়েকটি ভবন আগে থেকেই তৈরি করা রয়েছে যেখানে একটি লাইট হাউস রয়েছে আর পাশের গ্রামে যাওয়ার জন্য একটি রাস্তা রয়েছে। ১৬ কোটি টাকা ধনীদের জন্য কোনো কিছুই না তারপরও কেন এই দ্বীপটি কেউ কিনতে চায় না? আসলে এই দ্বীপটিকে অভিশপ্ত হিসেবে ধারনা করেন অনেকেই। কারণ এই দ্বীপে ৫৪ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। এদের মধ্যে আইল্যান্ডের এক পাদ্রী, ক্রোয়েশিয়ার ডুবরণিক শহরের মেয়রও ছিলেন। এই হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ডুরবণিক শহরকে নাৎসী বাহিনী থেকে মুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেখানকার ৩০০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে তন্মধ্যে ৫৩ জনকে ঐ দ্বীপে নিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। এখনো দ্বীপটিতে মানব কঙ্কালের অস্তিত্ব দেখা যায়। এই কারণেই দ্বীপটি কেউ কিনতে চায় না৷

ফোর্ট ক্যারল

এই পুরো দ্বীপটি আপনি মাত্র সাড়ে তিন হাজার ডলারে কিনে নেতে পারবেন যেখানে একটি ভবন রয়েছে তাও আবার মার্কিন নগরে। যুক্তরাষ্ট্রে এত অল্প টাকায় ভালো গাড়িই কেনা যায় না কিন্তু আপনি এই টাকা দিয়ে সম্পূর্ণ একটি দ্বীপ কিনতে পারবেন। ফোর্ট ক্যারল সাড়ে তিন একর জমি জুড়ে বিস্তৃত। ১৮৪৮ সালে বাল্টিমোর শহরের নিরাপত্তা জোরদার করতে মার্কিন সেনা দ্বারা তৈরি করা হয় দ্বীপটি। এই জায়গায় ৩৫০টি কামান লাগানো রয়েছে। এছাড়াও দুইটি দোকান ও এই অঞ্চলের লোকজনদের দেখাশোনা করার জন্য একটি ঘর রয়েছে। ১৮৬৪ সালে ধবংসাত্নক এক বন্যায় এই স্থানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং বন্যা পরবর্তী সময়ে এটি আর বসবাসের জন্য সুরক্ষিত থাকে না। আর কয়েক বছর পরে অস্ত্রশস্ত্র আধুনিক হয়ে যাওয়ায় এই জায়গার আর কোনো দামই থাকেনা। তারপর থেকে এই জায়গাটি ফাঁকা পড়ে রয়েছে। পরে এই দেশের সরকারও দ্বীপটি বিক্রি করতে চায় এবং অনেকে কিনতে রাজিও হয়েছিল কিন্তু কেউই জায়গাটি কিনতে পারেনি দুইটি কারণে- প্রথম কারণ এই জায়গাতে পাখিরা বসবাস করত আর তাই এখানে বসবাস করে পাখিদের কোনো ক্ষতি কেউ করতে চায়নি আর দ্বিতীয় কারণ এখানে অনেক ডেভেলপার কোম্পানি নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল। বর্তমানে কেউ যদি এই জায়গায় থাকতে চায় তাহলে এই জায়গায় ময়লার স্তূপের মধ্যে থাকতে হবে অথবা তাঁবু টানিয়ে বসবাস করতে হবে। কারণ এই জায়গাতে নতুন করে কোনো কিছুই নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

 

নেপলেস ইসোলালা গায়োলা

এটি অনেক সুন্দর একটি দ্বীপ যা কিনা দক্ষিণ ইতালির রাজধানী নেপলসের পাশে অবস্থিত। এই দ্বীপে একটি বড় দালানকোঠার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এই দ্বীপটির চারপাশে পরিষ্কার পানির জলধারা। আর এটা পাড়ের খুব কাছে যেখানে যে কেউ সাঁতরেও পৌঁছাতে পারে। তারপরেও এই দ্বীপটি কেউ কিনতে চায় না। এর পেছনে অবশ্য অনেক গল্প রয়েছে। এই জায়গাটিকে অভিশপ্ত বলে মনে করে স্থানীয়রা। জায়গাটি নাকি ভয়ংকর এবং ভুতুড়ে। ১৯২০ সালে ওই দ্বীপের মালিকের লাশ দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় আর তার কয়েকদিন পরেই তার স্ত্রীর সঙ্গে একটি দুর্ঘটনা ঘটে, সে পানিতে পড়ে যায় এবং তার মৃত্যু হয়। এই ভবনের পরবর্তী মালিক হার্ট অ্যাটাক করে মৃত্যুবরণ করে, তার পরবর্তী মালিকের মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যায় আর সে আত্মহত্যা করে। এতকিছুর পরেও এই দ্বীপটির মালিকদের অভিশাপ যেন পিছু ছাড়ছিলো না পরবর্তীতে এই দ্বীপটির ক্রয় করেন জার্মানির স্টিল ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট বেরেন কাল পল লিংহাম। এই দ্বীপটিকে কেনার পর এই ইন্ডাস্টিয়ালিস্টের ব্যবসায় লোকসান হয় এবং তিনি দেউলিয়া হয়ে যান।  এরপর এটা ক্রিয়েট কোম্পানির হেড জিয়ানি অনলি ক্রয় করেন। আর কিছুদিন পরেই তার একমাত্র ছেলে আত্নহত্যা করে। এত কিছু জানার পর পরবর্তীতে এই দ্বীপটিকে আর কেউ কেনার সাহস দেখায়নি।

গাটারস আইল্যান্ড

ছয় একর জমিতে বিস্তৃত এই দ্বীপটি ডেলাওয়্যার নদীর মাঝখানে অবস্থিত। এই জায়গায় কোনো ভবন বা ঘর নেই। কিন্তু এই জায়গা থেকে আপনি নৌকায় করে সামান্য দূরে দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনতে পারবেন। এই দ্বীপটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি টাকা যা কিনা ধনী ব্যক্তিদের জন্য কিছুই না কিন্তু তারপরেও কেউ এই দ্বীপটি ক্রয় করতে চায় না। তার প্রধান কারণ হলো এই জায়গাটিকে পেনসিলভেনিয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা বলে মনে করা হয়। আর এর জন্যই কেউ পরিবার নিয়ে এখানে বসবাস করতে ভয় পায়। এই আইল্যান্ডটির নাম গ্রেটার আইল্যান্ড যা কিনা একজন খুনি চার্লস গ্রেটারের নামে রাখা হয়েছে। গ্রেটার একজন মহিলাকে গলা টিপে হত্যা করে। পরবর্তীতে গ্রেটারকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয় এই দ্বীপে। আর তা দেখতে আশেপাশে থাকা ২০ হাজার লোক ওই দিন দ্বপিটিতে জড়ো হয়েছিল। ফাঁসি দেয়ার আগে তিনি না-কি সকলকে হাত উঁচু করে অভিশাপ দিয়ে যাযন। ওই দিনের পর থেকে এই দ্বীপে অনেক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছে। অনেকে বলেন তারা নাকি গ্রেটার আর তার দ্বারা হত্যা করা মহিলাকে সেখানে দেখতে পেয়েছে। এসব ভুতুড়ে কারণেই এই জায়গাটিকে কেউ কিনতে চায় না।

পিটক্যারিন দ্বীপ

এই দ্বীপের সবচেয়ে মজার বিষয় হলো আপনি এখানে ফ্রিতে থাকতে পারবেন কিন্তু সেখানে যেতে হলে আপনাকে হাজার ডলার ফি পূর্বেই পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এত বড় আইল্যান্ডের জন্য এটা কিছুই না। এই আইল্যান্ড সাউদার্ন প্যাসিফিক ওশেনে অবস্থিত। এই জায়গার আবহাওয়া সারা বছরই স্বাভাবিক থাকে আর কোনো সমস্যাও নেই। এমন কি সরকার এই দ্বীপটিতে থাকার জন্য বাড়িঘরও নির্মাণ করে দিয়েছে। বর্তমানে এই জায়গায় ৫০ জনেরও কম লোক বসবাস করে। এই জায়গায় তখনই দাগ লেগে গিয়েছে যখন বাচ্চাদের সঙ্গে ২০০৪ সালে এই দ্বীপে অপরাধ করা হয়। যে অপরাধে ৬ জনের জেল হয়ে গিয়েছিল আর তারপর থেকেই এই দ্বীপটি সরকারের নজরে রয়েছে। তবুও সরকার এই দ্বীপটি বিক্রয় করতে পারছে না।  এই দ্বীপের জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই জায়গায় ২০০ এর বেশি লোক বসবাস করতো। বর্তমানে মানুষদের ডেকে অনুরোধ করা হয় এই দ্বীপে এসে বসবাস করতে। কিন্তু এখন আর কেউ এখানে এসে বসবাস করার আগ্রহ দেখায় না। এই জায়গার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানে কোনো উপার্জনের উপায় নেই। এখানে বসবাসরত লোকজন প্রথমে স্ট্যাম্প বিক্রি করে তাদের খরচ চালাত কিন্তু বর্তমানে স্ট্যাম্পের ব্যবহার অনেকাংশেই কমে গেছে। এই দ্বীপে একটি জেনারেল স্টোর রয়েছে যেটি কিনা সপ্তাহে তিন দিন খোলা হয়। খাবার-দাবারের জিনিস ওই দোকানে ৩ মাস আগে থেকে অর্ডার করতে হয় আর ওই খাবার সুদুর নিউজিল্যান্ড থেকে ক্রয় করে এনে তাদেরকে দেয়া হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস