পাখি দিয়ে মাছ শিকার করেন তারা

ঢাকা, বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ১৪ ১৪২৭,   ১২ সফর ১৪৪২

পাখি দিয়ে মাছ শিকার করেন তারা

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৩৬ ৪ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১২:৩৮ ৪ আগস্ট ২০২০

বিশেষ মাছ ধরার রীতিতে জাপানের গিফু অঞ্চলের নাগারা নদীতে নামানো হয় পানকৌড়িদের। ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ মাছ ধরার রীতিতে জাপানের গিফু অঞ্চলের নাগারা নদীতে নামানো হয় পানকৌড়িদের। ছবি: সংগৃহীত

‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এটি একটি প্রবাদ। যে প্রবাদে বাঙালির পরিচয়কেই তুলে ধরা হয়েছে। এ পরিচয় হাজার বছরের। একবেলা মাছ ছাড়া যেন খাওয়াই হয়না। আর আমাদের দেশে মাছ শিকারের রয়েছে অনেক পদ্ধতি। ছিপ ফেলে বড়শিতে গেঁথে কিংবা বিভিন্ন ধরনের জাল ফেলে। এই দুই পদ্ধতি বেশি প্রচলিত হলেও গ্রামাঞ্চলে রয়েছে আরো বেশকিছু পদ্ধতি। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় টেটা বা কোঁচ, পলো, ঘূর্ণি। তবে পাখি দিয়ে মাছ ধরার কথা জানেন কি? শুনতে অনেকটা অসম্ভব মনে হলেও এটি সত্যি। পাখি মাছ শিকার করে আপনাকে এনে দেবে! তবে এ পদ্ধতি আমাদের দেশে দেখা যায় না।

পাখি দিয়ে মাছ শিকার করা হয় সুদূর চীন এবং জাপানে। প্রায় ১৩০০ থেকে ১৫০০ বছর ধরে তারা মাছ শিকারের এই পুরনো প্রথা মেনে আসছে। জাপানে ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতিকে করমোর‌্যান্ট ফিশিং বা উকাই বলা হয়। করমোর‌্যান্ট হচ্ছে দীর্ঘ গলাওয়ালা একধরনের সামুদ্রিক মৎস্য শিকারি পাখি। এই পাখির মালিককে বলা হয় উশো। বিশেষ মাছ ধরার রীতিতে জাপানের গিফু অঞ্চলের নাগারা নদীতে নামানো হয় পানকৌড়িদের। ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে, মশাল জ্বেলে জেলে বা উশোরা মাছ ধরতে নামেন।

উশোদের ধৈর্য ছাড়া এই উকাই সম্পন্ন করা অসম্ভব। সূর্য ডোবার পর বিশাল আকারের মশাল জ্বেলে ছোট ছোট ট্রাউট মাছ ধরেন তারা। এই রীতি অতীতে ইউরোপে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে তা শুধু চীন বা জাপানেই দেখা যায়। উকাই এর জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ প্রজাতির পানকৌড়ি। জাপানের ইবারাকি প্রান্ত থেকে এই অঞ্চলে আসার পর যাদের ধরে ফেলেন উশোরা। এরপর তিন বছর ধরে চলে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পালা। প্রশিক্ষণ শেষে প্রতি বছরের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে এই মাছ ধরা। আর বছরের বাকি সময়েও নিয়মিত অনুশীলন করাতে হয় এই পাখিদের।

গলায় ফাঁস থাকায় সেই মাছ পাখিগুলো গিলতে পারে না। ছবি: সংগৃহীত
 
সাধারণত ছোট্ট একটি ভেলা ও সঙ্গে পাঁচ থেকে ছয়টি করমোর‌্যান্ট পাখি নিয়ে জেলেরা মাছ ধরতে যায়। তারপর একটি নির্দিষ্ট স্থানে ভেলা রেখে পাখিগুলোর গলায় দড়ি বেঁধে ছেড়ে দেয়া হয় পানিতে। গলায় এমনভাবে দড়ি দিয়ে ফাঁস দেয়া হয় যেন তারা কোনো বড় মাছ গিলতে না পারে। পাখিগুলো পানিতে ডুব দিয়ে মাছ খোঁজা শুরু করে। মাছ পেয়ে গেলে সেই মাছ নিয়ে পাখিটি উপরে উঠে আসে। গলায় ফাঁস থাকায় সেই মাছ পাখিগুলো গিলতে পারে না৷ ফলে মাছ গলাতে আটকে থাকে। জেলেরা পাখির মুখ থেকে তখন মাছটি সংগ্রহ করে নেয়। এভাবে একটি প্রশিক্ষিত করমোর‌্যান্ট পাখি কিছুক্ষণের মধ্যে ডজনখানেক মাছ ধরতে পারে।    

উশোরা উশো হওয়ার প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন উত্তরাধিকার সূত্রে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই অভিনব ধারায় জীবিকা অর্জন করে চলেছে। মাছ ধরার এই রীতি কয়েকশ’ বছরের পুরনো হলেও ১৮৯০ সাল থেকে রাজপরিবার এর জন্য বিশেষ লাইসেন্স দেয়া শুরু করে। হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পের জন্য রাজকীয় লাইসেন্স পেয়েছেন এমন মাত্র নয়জন উশো বর্তমানে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বছরে আটবার তারা  রাজপরিবারের হয়ে মাছ ধরতে নামেন। এই কাজের জন্য তাদের আট হাজার ইয়েন অর্থাৎ ৭১ মার্কিন ডলার বেতন দেয়া হয়।

আমাদের দেশে কিন্তু একসময় ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করা হতো। একে আঞ্চলিক ভাষায় ধাড়িয়া বা ধেড়েও বলা হয়। ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকার করা বেশ পুরনো ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি। তবে কালের বিবর্তনে এ পদ্ধতি আজ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে সুন্দরবনের নদীগুলোর এবং চিত্রা নদীর পাড়ের বেশ কিছু জেলে পরিবার এখনো ভোঁদড় দিয়ে মাছ শিকারের প্রথা টিকিয়ে রেখেছেন।

পাখি দিয়ে মাছ শিকার করা হয় চীন এবং জাপানে

জেলেদের নৌকার একপ্রান্তে বাঁশের চটা দিয়ে তৈরি করা ঘরে ভোঁদড় আটকে রাখা হয়। মাছধরার জন্য ত্রিভুজ আকৃতির জাল ব্যবহার করেন তারা। নদীতে জাল ফেলার সময় ভোঁদড়ের ঘরের দরজা খুলে দেয়। জালের দুইপাশ নামিয়ে দেয় পানিতে। ভোঁদড়ও জালের সঙ্গে নেমে পড়ে পানিতে। পানিতে নেমে ভোঁদড় মাছকে তাড়িয়ে জালের মধ্যে নিয়ে এলে জেলেরা জাল টেনে ডাঙায় ওঠান।

অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত নৌকা আর ভোঁদড় নিয়ে নদীপথে পাড়ি জমান স্থানীয় জেলেরা। ভোঁদড়কে এ পরিবারগুলো অন্যান্য গৃহপালিত পশু-পাখির মত লালন-পালন করেন। শিকারে যাওয়ার আগে ভোঁদড়কে মাছ খাওয়ানো হয়। আবার জালে যেসব মাছ ধরা পরে তার একটি অংশও ভোঁদড় পায়। ফলে সে জেলেদের প্রতি থাকে বিশ্বস্ত।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে