Exim Bank
ঢাকা, মঙ্গলবার ১৯ জুন, ২০১৮
Advertisement

পাকিস্তানিরা জার্মানিতে চাকরি খুঁজে পেতে এত সফল কেন?

 নিয়াজ মাহমুদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৩৭, ৮ জুন ২০১৮

২৩৩৫৮ বার পঠিত

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

জার্মানির ফেডেরাল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, গত কয়েক বছর ধরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে কাজ খুঁজে পেতে পাকিস্তানিরাই সবচেয়ে বেশি সফল। তাদের সফলতার পেছনের কারণগুলোই খুঁজে দেখেছে ডয়চে ভেলে। আর জার্মানিতে সবচেয়ে ভালো চাকরি পাওয়ার মূল চাবিকাঠিই হলো জার্মান ভাষায় রীতিমতো দক্ষ হয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে নিজেকে যোগ্য করে তোলা। ভাষা দক্ষতা এবং স্বীকৃত প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবেই পাকিস্তানি অভিবাসীদের রেস্টুরেন্ট সেক্টর ছাড়া অন্যান্য সেক্টরে চাকরি খুঁজে পাওয়া ছিল যেন সাত রাজার ধন।

সে জার্মান ভাষায় কথা বলতে পারেনা, বলতে গেলে এই ভাষা সে খুব একটা বোঝে না। ভাষা দক্ষতা অর্জনে জটিলতার সম্মুখীন হওয়া স্বত্বেও, জার্মানিতে পাকিস্তানের যে সব অভিবাসী রয়েছে তাদের মধ্যে ৩৭ বছরের আকবর আলীকে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। যাই হোক, সে খুব দ্রুতই শিখে নিয়েছে যে, ভারত পাকিস্তানের মশলার ব্যবহারে ঝাঝালো স্বাদের রান্নার জন্য উপমহাদেশীয় রন্ধনপ্রণালিকে কিভাবে জার্মান এবং ইউরোপীয়ান ভোজনরসিক মানুষগুলোর জন্য উপযুক্তভাবে তৈরি করা যায়, ওদের ওই ইউরোপীয়ান স্টাইলের সঙ্গে সমন্বয় করে। গত দশমাস ধরে আলী ওয়েস্টার্ণ জার্মানির বোন এর এক কিচেনে কাজ করে যাচ্ছে। তার এই চাকরির নিরাপত্তা বিধান করা এতটা সহজ ছিলনা। আর চাকরি খুজতে গিয়ে সবথেকে বড় যে সমস্যাটা ছিল তা হলো ভাষা না জানা। ওখানে এমন খুব কম মানুষই পেয়েছি যারা আমার ভাষা বুঝতে পারতো। এবং আমাকে কোনো সাহায্য করতে পারতো। বেকার জীবন এবং কোনো সামাজিক অবস্থান ছাড়া যে দিনগুলো কাটিয়েছিলাম, এর থেকে অসহনীয় দিন পাড় করিনি কখনো, আলী ডি ডব্লিউ কে এমন কিছুই বলছিল। কৌশল অবলম্বন করে কাজ করুন, মেকানিজ্যাম প্রোডিজি হয়ে উঠুন।

২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত জার্মানিতে প্রায় ৩০,০০০ এর মতো শরণার্থী প্রবেশ করেছে। তারমধ্যে আলীও একজন। তিনি আবার ওই ৪০ শতাংশ পাকিস্তানি অভিবাসীদেরও একজন যারা কিনা ইউরোপের এই বৃহত্তর অর্থনীতিতে চাকরি নিতে সক্ষম হয়েছিল এবং অবদান রাখতে পারছে।
জার্মানির ইন্সটিটিউট অফ এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ, আই এ বি এর সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জার্মানিতে যতগুলো দেশ থকেই অভিবাসীরা এসে কাজ করুক না কেন, পাকিস্তানিরাই সবথেকে সেরা।

আলীর কাছে একটা চাকরি পাওয়া মানে, বাড়তি আয় রোজগার করার থেকেও অনেক বেশি কিছু। তার ভাই গতমাসে পাকিস্তানেই মৃত্যুবরণ করেছে। তবে এখানে জার্মানিতে সে কাজের মধ্যেই অনেক ব্যস্ত ছিল। যা তার এই ভাই হারানো ব্যথিত হৃদয়কে একটু হলেও সান্ত্বনা দিতে পেরেছিল। দুঃখবোধ থেকে দূরে রাখতে পেরেছিল।

তিনি হন্যে হয়ে চাকরি খুজতে খুজতে তো প্রায় দু বছরই কাটিয়ে দিয়েছিলেন কিছু বাড়তি টাকা উপার্জনের আশায়। যতদিনে না তার আলিম লতিফের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আব্দুল লতিফ জার্মানিতেই রেস্টুরেন্ট ব্যবসার একজন সফল উদ্যোক্তা। যে কিনা গত বছর সাইবারগের কাছাকাছিই আরেকটা রেস্টুরেন্ট খুলেছেন।

ভাষা দক্ষতা এবং স্বীকৃত প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবেই পাকিস্তানি অভিবাসীদের রেস্টুরেন্ট সেক্টর ছাড়া অন্যান্য সেক্টরে চাকরি খুঁজে পাওয়া ছিল যেন সাত রাজার ধন। আমি আলিকে চাকরি দিয়েছিলাম কারন আমি জানতাম যে আলীকে ট্রেনিং দিলেই ও একজন দক্ষ কর্মচারী হয়ে উঠতে পারবে। বলছিলেন লতিফ। অনেক পাকিস্তানি শিক্ষার্থীই আমাদের সঙ্গে কাজ করছে এবং অনেক শিক্ষার্থীই আছে যারা পার্টটাইম চাকরি খুঁজছে।

সুতরাং সবকিছু বিবেচনায় নিলে, অভিবাসীদের জন্য সবসময়ই আমাদের একটা সহানুভূতির জায়গা ছিল এবং আছে। যদিও এজন্য কাগজপত্র নিয়ে অনেক ঝামেলা করতে হয়।

আর জার্মানিতে আসলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের স্বভাবতই একটু অগ্রাধিকার দেয়া হয়ে থাকে। ফেডেরাল বিধিমালা অনুযায়ী, জার্মানদের এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের চাকরির বাজারে অগ্রাধিকার দেয়া বাধ্যতামূলক। আর যারা ইউরোপের বাইরের কোনো দেশের নাগরিক তাদের নির্দিষ্ট কিছু চাকরির জন্যই অনুমতি দেয়া হয়, শুধুমাত্র সেই চাকরিগুলো যেখানে ইউরোপীয় কেউ কোন অবদান রাখতে চায়না। তবে ২০১৬ সালের দিকে এই আইনে শিথিলতা আনা হয়েছিল বেকার জীবন থেকে মুক্ত দিয়ে কর্মসংস্থানের হার বাড়ানোর জন্য। তবে তাও সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল শুধু সেই সব শরণার্থীর জন্য যাদেরকে জার্মান সরকার জার্মানিতে স্থায়ী বসবাসের জন্য অনুমতি দিয়েছিল।

দানিয়াল আলী রিজোয়ান, আরেক পাকিস্তানি শরণার্থী জার্মান প্রদেশ বাভারিয়া প্রদেশ নিউমারক্ট এলাকায় শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন এখন। রিজওয়ান পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যবর্তী সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে পালিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল এই জার্মানিতে। রিজোয়ান আমাদেরকে বলেন যে, তিনি ভারতীয় একটি রেস্টুরেন্টে এক বছরের জন্য চাকরি করেছিলেন। পরে তিনি অন্য একটা স্থানীয় কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছিলেন। তবে ফেডেরাল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি থেকে তাকে সেখানে আর কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। আর তখন থেকেই আমার কোনো চাকরি নেই। গ্রহণযোগ্যতা/ স্বীকৃতির কোটা দিন দিন নিম্নগামী ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর কার্যালয়, ইউরোস্ট্যাট এর মতে, ২০১৫-২০১৭ সালের মধ্যে জার্মানিতে মোট ২৮,৩৯৫ জন আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছে। যার মধ্যে প্রায় ১৫০০০ শরণার্থী আবেদনই পড়েছিল ২০১৬ তে। আবেদনকারীদের নব্বই শতাংশের উপরেই ছিল পুরুষ। মহিলা শিশু মিলিয়ে হয়েছিল বাকি দশ শতাংশ। যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে। প্রায় ৭৪ শতাংশেরই বয়স ছিল ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে।
নাম গোপন রাখার স্বার্থে, এক পাকিস্তানি দোভাষী যিনি জার্মানির ফেডেরাল অফিস ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি অফিসের সঙ্গে কাজ করেন, দাবি করছেন যে, পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষই এখন জার্মানিতে অভিবাসী হিসেবে আশ্রয়প্রার্থী হতে চায়, আর এদেরকেই বলা হয়ে থাকে অর্থনৈতিক অভিবাসী। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার পাঞ্জাব প্রদেশ থেকেই বেশি বলা যায়।

আর ২০১৫-১৭ এর মধ্যে যতোগুলো পাকিস্তানি আবেদন পড়েছিল, তার মধ্যে মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ আবেদনই গৃহীত হয়েছিল এবং অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী পুরুষ আবেদনকারীদের মধ্যে মাত্র ২.৭ শতাংশের আবেদনই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

তবে ২০১৪ সালে ইউরোপে শরণার্থী সংকট শুরু হওয়ার আগেই প্রায় সাতাশ শতাংশ পাকিস্তানি জার্মানিতে আশ্রয় পেয়েছিল। তবে টুকে রাখার মতো একটা বিষয় হল, যতোদিন না পর্যন্ত কোনো অভিবাসীর আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন পাশ না হচ্ছে, ততোদিন পর্যন্ত কোনো পাকিস্তানিকেই জার্মান ভাষা শিক্ষা এবং সমন্বয় কোর্সে ভর্তি নেয়া হয় না। তবে এই কোর্সগুলো সিরিয়া এবং ইরাক থেকে আগত শরণার্থীদেরকে স্বাভাবিকভাবেই অফার করা হয়। তারপরেও বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও, পাকিস্তানিরা এখনো অন্য সব দেশের আশ্রয়প্রত্যাশী অভিবাসীদের থেকে উচ্চহারে উচ্চবেতনেই চাকরি পাচ্ছে।

টাকার চেয়েও বড় বিষয় হল সম্মান দশ জন পাকিস্তানি যারা বননে বসে ডোয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তাদের মধ্যে পাঁচ জনই এরইমধ্যে চাকরি করছেন, যারা এখানে এসেছিলেন ২০১৫ সালের প্রথম দিকে। এবং তাদের অনেকেই ইসলামাবাদ আর লাহোরের ছোট ছোট শহর অথবা গ্রামীণ এলাকা থেকে এসেছেন, তারা বলছেন, তাদের নিজেদের ওই এলাকায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সম্ভাবনা আসলে খুবই কম।

বিশ বছর বয়সী উসমান ছিল তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ, সে একই সঙ্গে তাদের সবার মধ্যে জার্মান ভাষায় সবথেকে পারদর্শী ছিলেন।
আমি শুধুমাত্র টাকা উপার্জনের জন্যই এখানে কাজ করছি না। তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বেকার না থাকা, এবং চাকুরিজীবি হিসেবে নিজের একটা পরিচয় থাকা, যা আমাকে আমার কমিউনিটিতে সামাজিকভাবে সম্মানিত করে, বলছিলেন তিনি।

যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, আপনারা কি মনে করেন, সিরিয়ান কিংবা আফগানিদের থেকে চাকুরির বাজারে পাকিস্তানিদের এই সফলতার কারন কি। ওসমান আমাদেরকে সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে দিয়েছিল যে, সিরিয়ান, আফগানিরা, অথবা অন্যান্য যারা শরণার্থী আছে তারা হয়তো এই দেশের এই মাটিতেই তাদের ভবিষ্যতের দেনা পাওনা হিসেব করছে। কিন্তু পাকিস্তানিরা এ ও জানেনা যে কখন আবার তাদেরকে ফিরে যেতে বলা হয়। তাই আমরা এখানে যেকোনো ধরনের কাজই করি। যখন যে কাজ হাতে পাই সেটাই করি। বলছিলেন উসমান।

আবার, রেস্তোরার মালিক লতিফ, চাননা যে, এখানে এমন কোনো সংগঠন গড়ে উঠুক যা অভিবাসী ব্যবসায়ী এবং অভিবাসী কর্মীদের মাঝে যোগসূত্র স্থাপনে সহায়তা করবে। কিন্তু তিনি মনে করেন যে, পাকিস্তানিদের কমিউনিটিতে যে ভ্রাতৃত্ববোধ, আন্তরিকতা আছে তা অন্য কোন দেশের কোনো অভিবাসী কমিউনিটিতেই নেই।

যদিও জার্মানিতে পাকিস্তানি অভিবাসীদের কমিউনিটি কলেবরে খুব একটা বড় না, তবে যারা শেষ কয়েক যুগ ধরে এখানে বসবাস করছে, তারা প্রায় সবাই-ই এখন এখানে প্রতিষ্ঠিত। যখন কোন পাকিস্তানি শরণার্থী কিংবা অর্থনৈতিক অভিবাসী তাদের কাছ থেকে সাহায্য প্রত্যাশা করেন, তখন তারা তা বোঝার চেষ্টা করেন এবং যথাসম্ভব সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন।

আকবর আলী এদিকে বলছেন যে, সে কাজ করছে আসলে সে জার্মান সরকারের সামাজিক সহায়তার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চায় না তাই। আমি আমার নিজের হাতে জীবিকা উপার্জন করতে চাই, সে বললো।

আর লতিফ মনে করেন যে, পাকিস্তানি কমিউনিটিগুলোতে সামাজিকভাবে সম্মানিত একটা অবস্থান ধরে রাখার জন্যই আসলে সবাই একটা চাকরি খোজার চেষ্টা করে, আর এজন্যই হয়তো পাকিস্তানিরা অন্য সবার থেকে এগিয়ে জার্মানির চাকরির বাজারে। এবং তাদের কাছে সামাজিক সম্মানটাই বেশি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে

সর্বাধিক পঠিত