‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’

ঢাকা, বুধবার   ০৩ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২০ ১৪২৭,   ১০ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১২ ১৯ মে ২০২০  

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

(১৯৬১ সালের এই দিনে আসামের প্রাদেশিক সরকার ‘অহমিয়া’ ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণা করলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সেখানকার বাঙালিরা। সেবছর ১৯ মে আসাম রাইফেলস প্রতিবাদ মিছিলের উপর গুলিবর্ষণ করে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাবিপ্লবী।)

পৃথিবীর প্রতিটা বৃহদাকার নদ- নদীই একেকটা স্বতন্ত্র মহাকাব্য। এদের প্রতিটির গতিপথেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য কাহিনী। সীমান্তের কাঁটাতারকে ভেংচি কেটে, কোমর দুলিয়ে, ছন্দ তুলে গ্রাম-শহর-প্রান্তর, এমনকি মহাকালকে বন্যার জলের স্রোতে ভাসিয়ে এরা উৎস থেকে মহাসাগরের দিকে ধেয়ে চলে অনন্তকাল ধরে। মহাকালের এই যাত্রাপথে নব নব সৃষ্টি হয়, আবার বিস্মৃতির আড়ালেও হারিয়ে যায় অনেক কিছু। কোনোটিরই ইয়ত্তা নেই।

আমার দাদির বাপের বাড়ি ছিল নদীর তীরে। জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ থানার পশ্চিম দিকে অবস্থিত যমুনার পাড়ে। গ্রামের নাম ছিল চর কয়লাকান্দি। এখন নেই। যমুনার উচ্ছ্বলতায় কখন যে স্মৃতি হয়ে গেছে আমি খেয়ালই করিনি অনেক বছর। অথচ ছেলেবেলায় প্রবল বন্যার সময়েও আমার অন্যতম গন্তব্য ছিল এই জলমগ্ন গ্রাম।

আমার মনে আছে বর্ষাকালে কোনটা নদী, কোনটা মাঠ, কোনটা বাড়ির উঠোন কিছুই বুঝে ওঠার উপায় ছিল না। দিগন্ত বিস্তৃত ধু ধু জলের ভেতরে ভাসত শুধুমাত্র কয়েকটা টিনের চালাঘর, কুঁড়েঘর আর সবুজ গাছপালা। প্রতিটি বাড়ির উঠোন তখন হাঁটুজলের নিচে। বন্যার কারণে।

কুঁড়েঘর বা টিনের চালার ঘরগুলোর চতুষ্কোণ বেজমেন্ট ভেসে থাকত জলের উপরে। কলাগাছের ভেলার মতো। আমার প্রায়ই মনে হতো এই অঞ্চলের গ্রাম বা বাড়িগুলোও স্থায়ী নয়। এরা হয়তো কোনো একদিন হিমবাহ বা কচুরিপানার স্তূপের মতো জলের স্রোতে ভাসতে ভাসতে চলে যাবে। অতঃপর একদিন দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরের বিশাল জল-কলরোলের ভেতরে অন্তর্লীণ হয়ে যাবে। চিরকালের জন্যে।

এই বাড়িতে আমার গমন হতো সারাবছরই। তবে বর্ষাকালের স্মৃতিটিই আমার শুধু মনে আছে। আমি কতবার ডিঙি নৌকার গলুই থেকে লাফ দিয়ে একেবারে ঢুকে পড়েছি এই বাড়ির ঘরের মেঝেতে তার ইয়ত্তা নেই। বাড়ির উঠোনে থাকত হাঁটুর উপরে জল। ঘরের দরজায় ভিড়ত ডিঙি নৌকা। এই জলের ভেতরেই স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়াত বাড়ির বউ-ঝি ও শিশুরা। আপনি যদি নৃতত্ত্ববিদ হন, তাহলে আপনার কাছে হয়তো মনে হতো- ‘বরফ যুগ’ শেষ হবার পর এই জলজ চরাচরে নিওলিথিক সময় শুরু হয়েছে। তবে সভ্যতার আগমন হতে এখন ঢের দেরি!

আমার দাদি মারা গিয়েছিলেন এখন থেকে প্রায় চার দশক পূর্বে। ১৯৮৩ সনে। সম্ভবত হাঁপানি রোগে। সম্ভবত বললাম একারণে যে, হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার গিয়াসের ক্ষুদ্র এক বোতল মিষ্টি জল ভিন্ন এই সমস্যাসঙ্কুল জনপদে তখন কোনো চিকিৎসা ছিল না। আমার দাদা নৌকায় করে বোতল ভর্তি জল নিয়ে গিয়াস ডাক্তারের বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতেই আমাদের দাদি সংসারের মায়া কাটিয়ে চলে গিয়েছিলেন। দৃশ্যটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। অথচ দাদি মারা যাওয়ার এক দশক পূর্বের এক বর্ষাকালের শেষের দিকে আমরা যখন নৌকায় করে বালিজুরি বাজার থেকে ফিরছিলাম, তখন প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হারুন স্যার যমুনা আর সান্ধ্যকালীন আকাশের মিলনস্থলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে দ্রুতবেগে ধাবমান দলছুট কোন উল্কা বা নক্ষত্রকে দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘দ্যাখো, দ্যাখো, এপোলো-১১ মিশন শেষ করে চাঁদ থেকে ফিরে আসছে!’

আমার দাদির বড় ভাইয়ের নাম ছিল এজাজ মাস্টার। আসলেই মাস্টার ছিলেন কিনা তিনি তা জনি না। তবে আমাদের এলাকায় এই নামেই পরিচিত ছিলেন তিনি। শ্রুত কাহিনী অনুসারে এজাজ মাস্টার তার কনিষ্ঠ দুই ভাই ও ছোট এক বোনকে নিয়ে ব্রহ্মপুত্র–যমুনায় ভাসতে ভাসতে সুদূর আসাম থেকে চলে এসেছিলেন এই জলজ ভাটির দেশে। এখানে তিনি বিবাহও করেছিলেন। এই কাহিনী দেশভাগেরও পূর্বেকার। তবে ১৯৪৭ সনে ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের পর তিনি মনঃস্থির করেন আসামে ফিরে যাবার। অতঃপর সম্ভবত ১৯৫২ সালে নেহেরু–লিয়াকত চুক্তির অধীনে তার ছোটভাইকে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন আসামের ব্রহ্মপুত্র– বরাক উপতাক্যায়। ততদিনে আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জী বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনশিপ (এন আর সি) তৈরি সম্পন্ন হয়ে গেছে। সেখানে তার বা তার ভাইয়ের নাম থাকার অবকাশ ছিল কি ছিল না তা আমার জ্ঞানের বাইরে। তবে চর কয়লাকান্দিতে রয়ে গিয়েছিলেন তার একমাত্র বোন, যিনি ছিলেন আমাদের দাদি। এছাড়াও ছিল এজাজ মাস্টারের বিবাহিতা স্ত্রী এবং তার অন্য ভাই। আমরা গল্প শুনেছিলাম যে, এজাজ মাস্টার আসামে প্রত্যাবর্তনের পর পুনর্বার বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন।

আসামে সংখ্যালঘু বাঙালিরা কখনোই স্বস্তিতে ছিলো না। উগ্র জাতীয়তাবাদী ‘অহমিয়া’ ও ‘বোড়ো’দের আক্রমনে বার বার আক্রান্ত হয়েছে। নাগরিকত্ব বিষয়ক সমস্যা ছাড়াও তাদের ভাষার উপরেও আঘাত এসেছিল। ১৯৫২ সালে উর্দুভাষীদের কর্তৃক বাংলা ভাষা আক্রান্ত করার মত। ১৯৬১ সালে আসামের প্রাদেশিক সরকার ‘অহমিয়া’ ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সেখানকার বাঙালিরা। এই বছরই ১৯ মে আসাম রাইফেলস গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাবিপ্লবী। আহত হন অর্ধশতাধিক। ফলে রাজ্য সরকার সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। আসামে বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

তবে আসামে বাঙালি নিধন থামেনি। বড়মাপের বাঙালি এবং সংখ্যালঘু মুসলিম গণহত্যার সর্বশেষ সংযোজন ছিল নেলির দাঙ্গা। ১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্য দিবালোকে নগাঁও’এর নেলীতে খুন হয় ২১৯১ মানুষ (বেসরকারি হিসেবে ৫০০০ এর বেশি)। উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ১৯৯৩, ১৯৯৪, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ২০০৮ সালে অযুত মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই এপিসোডের সমাপ্তি হয়নি এখনো। বরং নতুন নতুন মাত্রা পাচ্ছে প্রতিবছর।

১৯৮৩ সাল। আমার দাদির মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন এজাজ মাস্টার। অহমিওদের আক্রমণে তিনি পঙ্গু ও চলৎশক্তিহীন হয়ে গিয়েছিলেন। চর কয়লাকান্দিতে ফেলে যাওয়া তার প্রথমা স্ত্রী মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তাকে ভালবেসে সেবা যত্ন করেছেন।

শুনেছি দাদির অন্য ভাই তার সন্তান-সন্ততিসহ চেষ্টা করেছেন অহমীয়াদের মূল স্রোতে মিশে যাওয়ার। তার এক ছেলে গৌহাটিতে চাকরি করতেন সরকারি অফিসার হিসেবে। শেষ খবর অনুযায়ী তিনিও তার চাকরিটা হারিয়েছলেন।

ভাঙ্গনের ইতিহাস কখনো শেষ হয় না।

‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, রক্তে জল ছল ছল করে
নৌকোর গলুই ভেঙ্গে উঠে আসে কৃষ্ণ প্রতিপদ
জলজ গুল্মের ভারে ভরে আছে সমস্ত শরীর
আমার অতীত নাই, ভবিষ্যতও নেই কোনোখানে।’ -শঙ্খ ঘোষ

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর