Alexa পাঁচ শতাংশ পুরুষই লিপস্টিক ব্যবহার করেন

ঢাকা, রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ২ ১৪২৬,   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

লিপস্টিকে পুরুষের আকর্ষণ

পাঁচ শতাংশ পুরুষই লিপস্টিক ব্যবহার করেন

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০১ ২৮ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৩৬ ২৮ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

নারীর সাজ যেন অপূর্ণই থেকে যায় লিপস্টিক ছাড়া। তবে যদি কথাটা একটু ঘুরিয়ে এভাবে বলা হয়, পুরুষের সাজও লিপস্টিক ছাড়া যেন ফুটেই ওঠে না! কি ভাবছেন, ভুল বলেছি অবশ্যই না। অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। নারীর পাশাপাশি সেই অতীতকাল থেকে এখনো পুরুষের প্রসাধনী সামগ্রীতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে লিপস্টিক।  

এবার তবে জেনে নিন ইতিহাসের লিপস্টিক সম্পর্কিত অজানা বিষয়-

আপনি নিশ্চয়ই, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি জর্জ ওয়াশিংটনের নাম শুনে থাকবেন। ছবিতেও তার চেহারাটি দেখার সৌভাগ্য হবে গুগল ঘাটলেই। জানেন কি তিনি মাঝে মাঝে লিপস্টিক পরতেন। যেকোনো বড় আয়োজনে তিনি মেকআপ করতেন এবং পরচুলও পরতেন। লিপস্টিক পরাকে তিনি কখনো খাটো করে দেখেননি।

জর্জ ওয়াশিংটন
লিপস্টিকের ব্যবহার চলে আসছে বহুকাল আগে থেকেই। ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস এবং ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের রাজত্বকালে নারী এবং পুরুষ উভয়ই খুব গাঢ় করে ঠোঁট আবৃত করে রাখতেন। এর প্রধান কারণ ছিলো উভয় দেশে থিয়েটারের প্রসার এবং সাধারণ মানুষের জীবনে অভিনেতাদের হাল-ফ্যাশনের প্রভাব। কারমাইন আর চর্বির উপাদান নারী-পুরুষ উভয়েই ব্যবহার করতেন। এমনকি তখনকার দাড়ি-গোঁফওয়ালা পুরুষেরাও তাদের গোঁফে আবৃত ঠোঁটের নিচে লিপস্টিক পরতে দ্বিধা করতেন না। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, লিপস্টিক ব্যতীত সমস্ত প্রসাধনী রেশন হিসেবে বিনামূল্যে দেয়া হত। উইনস্টন চার্চিল শুধু লিপস্টিক ফ্রিতে দিতে নারাজ ছিলেন। সেসময় নারীদের তুলনায় পুরুষেরেই লিপস্টিক বেশি ব্যবহার করতেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যুদ্ধের সময় লিপস্টিক বিক্রির ধুম পড়ে গিয়েছিলো। আরো একটি মজার তথ্য হলো, রোমান সাম্রাজ্যে লিপস্টিক সামাজিক মর্যাদা বুঝাতে ব্যবহৃত হত। পুরুষেরা তাদের পদমর্যাদা নির্দেশ করতে ঠোঁটে রং ব্যবহার করতেন।

চতুর্দশ লুইবিশ্বের অধিকাংশ পুরুষদের ধারণা তাদের মেকআপ পরা নারীদের মতোই সৌন্দর্য শিল্পে অন্যতম একটি দিক। খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার সালে প্রাচীন মিশরীয়দের থেকে শুরু। এটি প্রথম শতাব্দীতে রোমান পুরুষদের মধ্যে শুরু হয়। পরবর্তিতে ১৮ তম শতাব্দীতে ফরাসী রাজকীয়দের মধ্যেও পুরুষদের মেকআপ জনপ্রিয়তা পায়। 

সেই থেকে পুরুষের লিপস্টিকের ব্যবহার শুরু। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুরুষেরাই মেকআপ হিসেবে লিপস্টিককেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। জনপ্রিয় সব সিনেমার তারকারাও লিপস্টিক চর্চা থেকে বিরত নন। নিশ্চয়ই আপনি খেয়াল করলে দেখতে পারবেন! আপনি জানেন কি জনপ্রিয় এই প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহার পুরো বিশ্ব জুড়েই। আর এজন্যই প্রতিবছরের ২৯ জুলাই লিপস্টিক দিবস হিসেবে বিশ্ব জুড়ে পালিত হয়।

ফাউন্ডেশনের বাহারএবার তবে জেনে নিন বিশ্বের কোন কোন দেশের ছেলেদের কাছে মেকআপ ও লিপস্টিকের ব্যবহার ডাল ভাত। লিপস্টিক থেকে বিবি ক্রিম, কনসিলার পর্যন্ত সবই তাদের নিয়মিত ব্যবহারের অনুষঙ্গ-

দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কলোম্বিয়া ও চীনে পুরুষের মেকআপের পাশাপাশি লিপস্টিক পরা সাধারণ মনে করেন। এর মধ্যে কোরিয়া পুরুষের প্রসাধনী ক্ষেত্রে সবচেয়ে ব্যয়বহুল দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ জন ব্রিটিশ পুরুষের মধ্যে একজন মেকআপ ব্যবহার করেন। তারা নিজেদেরকে সাজাতে অন্যান্য প্রসাধনীর পাশাপাশি লিপস্টিক, নেইলপলিশ ব্যবহার করেন। এটি পুরুষ ব্রিটিশ জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। 

কেমন লাগছে তাকে?মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরুষদের মেকআপে উৎসাহিত করতে প্রথম অনলাইন দোকান চালু করে। ডিফেরিও এমএমইউ ম্যান এবং কনটেক্সটের মতো শীর্ষ কসমেটিক ব্র্যান্ডগুলো ব্যবহারে অভ্যস্ত সে দেশের পুরুষেরা। এছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলের পুরুষদেরও এ বিষয়ে বেশ আগ্রহ রয়েছে। 

লিপস্টিক জন্মের ইতিকথা
 
প্রসাধনী সামগ্রী হিসেবে লিপস্টিকের শৈল্পিক ব্যবহার দেখা যায়, মেসোপটেমিয়ার ইন্দু উপত্যকা প্রদেশ এবং মিশরে। তারা পেয়ে গেলো কোসিনিয়াল নামের একধরনের পরজীবী পতঙ্গ, যা নোপল নামক ক্যাকটাস গাছে বাসা বাঁধে। এই পতঙ্গ থেকে ঠোঁট রাঙানো উপাদান পাওয়া এতটাও সহজ ছিলো না। কোসিনিয়াল নোপল গাছে বাসা বাঁধার পর পাতাগুলো কেটে আনা হতো। 

তিনি একজন বিউটি ব্লগারতারপর সেসব পাতা নব্বই দিন উষ্ণ জায়গায় রেখে তাঁ দেয়া হতো। এর ফলে পাতায় বাসা বাঁধা কোসিনিয়ালগুলো আকারে বড় হয়ে যায়। তিনমাস তাঁ দেয়ার পরে কোসিনিয়াল গুঁড়া করে তাতে পানি মিশিয়ে পাওয়া যায় কারমাইন রং। চমৎকার মেরুন রঙের এই প্রাকৃতিক তরল তখন ঠোঁটে এনে দিতো রাজকীয় সৌন্দর্য।

এরপর ১৬৫৬ সালে একজন জপমালা বা তসবিহ কারিগর ঘটালেন এক যুগান্তকারী ঘটনা। লোকটি ফরাসি, নাম ফ্রাঁসোয়া জ্যাকুইন। তিনি কিছু মাছের আঁশ থেকে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করে ফেললেন কৃত্রিম মুক্তার নির্যাস। এই নির্যাস ক্রিস্টালাইন গুয়ানাইন নামে পরিচিত। যা আধুনিক প্রসাধনীতে একটি সিনথেটিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। লিপস্টিকে এটি ব্যবহার করা হয় একটি স্বচ্ছ, উজ্জ্বল  আর চকচকে আভা দিতে। 

বাহারি লিপিস্টিকআধুনিক লিপস্টিকের যাত্রা

‘আধুনিক লিপস্টিক’ বলে আমরা যা বুঝি সেই ঘরানার উদ্ভাবন হয় ১৯২৩ সালে। সর্বপ্রথম সুইভেল-আপ লিপস্টিক উদ্ভাবন করেন আমেরিকার ন্যাশভিলের জেমস ব্রুস জুনিয়র। তিনি এই লিপস্টিককে বলেছিলেন ‘টয়লেট আর্টিকেল’। অতঃপর ১৯৩৯ সালে ম্যাক্স ফ্যাক্টর জুনিয়র একটি কিসিং মেশিন আবিষ্কার করলেন। একটি চাপ পরিমাপক যন্ত্রের সঙ্গে সেটি একটি রাবারের লিপস্টিকের ছাঁচ সংযুক্ত করা। এটি ব্যবহার করে তিনি কিস প্রুফ লিপস্টিক তৈরির চেষ্টা চালাতে শুরু করলেন। অনেক চেষ্টার পর সফল হলেন। 

লিপস্টিকের প্রসার

এদিকে লিপস্টিক যতই বাণিজ্যিক সফলতা পেতে লাগলো, কিস প্রুফ লিপস্টিক তৈরির লক্ষ্যও তত বাড়তে শুরু করলো। ১৯৩৯ সালে ম্যাক্স ফ্যাক্টর জুনিয়র একটি কিসিং মেশিন আবিষ্কার করলেন। যাতে একটি চাপ  পরিমাপক যন্ত্রের সঙ্গে একটি  রাবারের লিপস্টিকের ছাঁচ সংযুক্ত করা হত।  এটি ব্যবহার করে তিনি কিস প্রুফ লিপস্টিক তৈরির চেষ্টা চালাতে লাগলেন। তবে সে যাত্রায় ম্যাক্স ফ্যাক্টর জুনিয়র সফল হলেন না।

তিনি কিন্তু একজন পুরুষম্যাক্স ফ্যাক্টর সর্বপ্রথম বাণিজ্যিক লিপ গ্লস তৈরি করেন। যা শুধুমাত্র চলচ্চিত্র তারকারা ব্যবহার করতেন। এটি ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে এটি হয়ে যায় হলিউডের গ্ল্যামার আর সিনেমার স্বর্ণযুগের প্রতীক। সিনেমা তারকারা হয়ে ওঠেন অনুকরণীয় আর দেবতুল্য। ১৯৩০ সালে অভিনেত্রী ইভ আর্ডেন দাবি করেন, যেসব নারীরা লিপস্টিক পরিধান করেন, তাদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

লিপস্টিকের আইনি বৈধ্যতা 

ব্রিটিশ সংসদসহ শতাব্দী জুড়ে অসংখ্য সরকার মেকআপ নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। ১৬৫০ সালে সংসদ লিপস্টিক পরা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলো। তারা এটিকে ‘চিত্রকলার ভাইস’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। বিলটি শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি। পরবর্তিতে অনেক লড়াইয়ের পর ১৯১৫ সালে ক্যানসাস লিপস্টিকের   বৈধতা দেয়। মধ্যযুগে এসে লিপস্টিক আবারো পড়লো ধর্মের করতলে। 

তিনিও একজন বিউটি ব্লগারখ্রিস্টান ধর্মের প্রসারের ফলে লাল লিপস্টিক পরা হয়ে গেলো প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি একে শয়তানের কাজের সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হতো। প্রসাধনী নিষিদ্ধ করার জন্য পোপ একটি নির্দেশনা প্রচলন করলেন। এর ফলে লিপস্টিক পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।তবে লাল বা গাঢ় রঙের পরিবর্তে জায়গা করে নিলো প্রাকৃতিক গোলাপি রঙ। যা নারীদের পাপশূন্যতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিলো। 
 
লিপস্টিক সম্পর্কে ধারনা

গ্রীক সাম্রাজ্যের গোড়ার দিকে লাল লিপস্টিক বা ঠোঁটের পেইন্ট ব্যবহার করতো যৌনকর্মীরা। এমনকি এটি আইন করা হয়েছিলো যে যৌনকর্মীরা অবশ্যই লিপস্টিক পরিধান করবে। শুধু এখানেই শেষ নয়, যৌনকর্মী হয়েও লিপস্টিক না পরাতে বিচারের মুখোমুখিও হতে হয়েছিলো  কয়েকজন নারীকে। যৌনকর্মীদের পরিচয় বহন করায় অন্য নারীরা সাধারণত মেকআপ ছাড়াই চলাফেরা করতেন।

দাড়ি গোঁফ নিয়েও তিনি লিপিস্টিকে মুগ্ধ‘মেল’ পুরুষ বিউটি ব্লগার    

বর্তমানে ইউটিউব স্ক্রল করলেই আপনার সামনে কোনো না কোনো বিউটি ব্লগারের প্রসাধনী চর্চার ভিডিও সামনে পড়বেই! জানেন কি বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় সব বিউটি ব্লগার হলেন পুরুষেরা। কোটি কোটি মানুষকে তারা মেকআপ করা শেখাচ্ছে! সৌন্দর্য কীভাবে আরো ফুটে ওঠবে সে পরামর্শ দিচ্ছে তারা। 
 
বিশ্বসেরা দশ পুরুষ বিউটি ব্লগারের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন- জেমস চার্ল, জ্যাক জেমিন, পাটরিক স্টার, মান্নি গুটিইরেজ, রিউবিন দি মেইড। তারা সবাই বিশ্বের সবার সামনে মেকআপের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। তাদের সবার মতে, লিপস্টিক সমাজে টিকে থাকার লড়াইয়ে তাদেরকে আরো সাহসী করে তুলেছে।

মেকআপেও ঝোঁক বাড়ছে ছেলেদেরএভাবেই বহু ধাপ পেরিয়ে এক বিংশ শতাব্দীতে আমরা ব্যবহার করছি উচ্চ মানের আধুনিক কেমিক্যাল ফর্মূলার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লিপস্টিক। যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের লরিয়েল, এস্টি লডার, ম্যাক, কালার পপ, ওয়েট এন ওয়াইল্ড ইত্যাদি ব্র্যান্ডের মতো দামী দামী লিপস্টিকসহ এখন চীন আর জার্মানিও বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করছে ফোকালিউর কিংবা ইমাজিকের মতো খুবই সুলভ মূল্যের ব্র্যান্ডেড লিপস্টিক। তবে উচ্চমূল্যের ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকান ব্র্যান্ডের চেয়ে আমাদের দেশে সাধারণ স্তরে চায়না ব্র্যান্ডই এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস