Alexa দ্বীন প্রচারের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৬ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

দ্বীন প্রচারের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা

 প্রকাশিত: ১৮:৩৪ ৬ অক্টোবর ২০১৮   আপডেট: ১৬:৪৭ ৭ অক্টোবর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মনে করুন! যদি কোনো অমুসলিম ভাইকে প্রশ্ন করা হয়, বলুনতো দেখি ইসলাম কাদের ধর্ম?

নিশ্চই তিনি উত্তরে বলবেন, মুসলমানদের ধর্ম। একই প্রশ্ন যদি কোনো মুসলমান ভাইকে করা হয়, তারাও উত্তর দেবে, এতো আমাদের ধর্ম। কিন্তু একটু বুকে হাত রেখে চিন্তা করুন, আদৌ এই উত্তরটি কি সঠিক? আসুন এর বাস্তবতায় পৌঁছাতে আমরা পবিত্র কোরআনুল হাকীমের মাঝে গভীরভাবে চিন্তা করি।
 
পবিত্র কোরআনুল হাকীমে মহান আল্লাহ সুব্হানাহু তায়ালা তাঁর ইবাদাতের হুকুম দিতে গিয়ে ইরশাদ করেন,
 
يَـٰأَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُواْ رَبَّكُمُ الَّذِىْ خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
 
সূরা বাকারার এই আয়াতে মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালা يَـٰأَيُّهَا النَّاسُ শব্দ ব্যবহার করেছেন। যার অর্থ হয় হে মানবগণ! এখানে ‘النَّاسُ’ শব্দের ভেতর রাসূলে কারীম (সা.) থেকে নিয়ে কেয়ামাত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে সকলেই এই মানুষের অন্তর্ভুক্ত। এখানে না আছে কোনো যুগের শর্ত, না আছে কোনো অঞ্চল নির্দিষ্ট? বরং সকল মানুষকে মহান আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিচ্ছেন (يَـاأَيُّهَا النَّاسُ) হে মানব সকল! পৃথিবীর ৬ শত কোটি মানুষ সকলেই মানুষের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো ৬ শত কোটি মানুষ সকলেই কি মহান আল্লাহর ইবাদত করে? অথবা কমপক্ষে এতটুকু কি তাদের জানা আছে যে, আমাদেরকে এক মহান আল্লাহর ইবাদত করতে হবে? যদি উত্তর ‘না’ হয়। তাহলে কোনো মুসলমানের পক্ষ থেকে অমুসলিম ভাইদের কাছে এ কথা পৌঁছানো হয়েছে কি? তবে এ গুরুদায়িত্বটি কাদের?
 
এমনি ভাবে যদি প্রশ্ন করা হয় মুহম্মদ (সা.) কাদের নবী? হিন্দুভাইদের পক্ষ থেকে উত্তর আসবে তিনি মুসলমানদের নবী। তারা বলবে, আমাদের অবতারতো শ্রীকৃষ্ণ ও রামের রুপধারণ করে এসে ছিলেন। তদ্রুপ খ্রিস্টান ভাইদের পক্ষ থেকে উত্তর আসবে, তিনি হলেন মুসলমানদের নবী। আমাদের নবী হলেন ঈসা (আ.)। ঠিক মুসলমানদের পক্ষ থেকেও উত্তর আসবে তিনি তো আমাদেরই নবী। আচ্ছা এই উত্তরগুলো কি সঠিক? রাসূলুল্লাহ (সা.) কি শুধু মুসলমানদেরই নবী?
 
আসুন! আমরা পবিত্র কোরআনুল হাকীম থেকে জানি, পবিত্র কোরআন এ ব্যাপারে কী বলে? পবিত্র কোরআনুল হাকীমে মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাল্লাহ তায়ালা বলেন, হে নবী! আপনি বলে দিন, হে মানব জাতি! আমি তোমাদের সকল মানুষের জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। (আরাফ-০৭:১৫৮)
 
অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, ইহুদী, খ্রিস্টান ইত্যাদি, এদের সকলেরই নবী হলেন হজরত মুহম্মদ (সা.)। এখন প্রশ্ন হলো, আদৌ কি তারা জানে যে, হজরত মুহম্মদ তাদেরও নবী?
 
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে পবিত্র কোরআন দান করা হয়েছে। যদি হিন্দু ভাইদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়, বলুনতো পবিত্র কোরআন কাদের কিতাব? উত্তরে তারা বলবে এটা মুসলমানদের কিতাব। আমাদের কিতাবতো হলো গিতা, রামায়ণ ইত্যাদি। খ্রিস্টান ভাইয়েরা এমন প্রশ্নের উত্তরে বলবে, আমাদের কিতাব তো হলো বাইবেল, আর কোরআন হলো মুসলমানদের কিতাব। ইহুদীরা একই প্রকার উত্তর প্রদান করবে। এবার আমরা দেখি পবিত্র কোরআনুল কারীম এ ব্যাপারে কী বলে।
 
পবিত্র কোরআনুল হাকীমে মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,
 
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىۤ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنٰتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ 
 
অর্থ: ‘বরকতয় রমজান মাসে সকল মানুষের হেদায়াতের জন্য কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে।’ (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।
 
শুধু মুসলমানদের হেদায়াতের জন্য নয়। অর্থাৎ এই মাহা পবিত্র গ্রন্থ সকল মানুষের জন্য হেদায়াত নামা।
এখন প্রশ্ন হলো ৬০০ কোটি অমুসলিম ভাই-বোন তারা কি জানে যে এই কিতাব তাদের জন্যও পথ প্রদর্শক? এর উত্তরে আপনি নিজেই বলবেন, অবশ্যই তারা জানে না। আমরা জানি। আমরা কি তাদের কাছে এ বার্তাটি পৌঁছিয়েছি?
 
এক অমুসলিম ভাইকে বলা হলো, পবিত্র কোরআন তোমাদের জন্যও পথ প্রদর্শক, হেদায়াত নামা। সে খুবই আশ্চর্যের সঙ্গে বলল, এটা যদি আমাদের কিতাব হতো, তাহলে এতোদিন তোমরা আমাদেরকে দাওনি কেন? উত্তরে বলা হলো, এ কথা অধিকাংশ মুসলমানও জানে না। মুসলিম-অমুসলিম সকল মানুষকে অন্ধকার ও পথ ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচানোর জন্য এই কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে। শুধু মুসলমানদের জন্য অবতীর্ণ করা হয়নি।
 
উল্লেখিত আয়াত তিনটিকে যদি একটু মনযোগ দিয়ে পড়ি তাহলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যাবে, এই আয়াতগুলোতে الناس শব্দ ব্যাবহার করা হয়েছে। এই আয়াতগুলো একত্রে আমরা এভাবে বুঝতে পারি।
 
(১) ইবাদাত (সকল মানুষের জন্য)
 
(২) রিসালাত (সকল মানুষের জন্য)
 
(৩) কোরআন (সকল মানুষের জন্য)
 
(৪) মুসলিম (সকল মানুষের জন্য)
 
এর উদ্দেশ্য হলো, সকল মানুষকেই মহান আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। চাই সে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যেই হোক না কেন। হজরত মুহম্মদ (সা.)  মুসলিম-অমুসলিম সকল মানুষের নবী এবং কুরআন পুরো দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য পথ পদর্শক। চাই সে যে কোনো ধর্মেরই হোক না কেন। এখানেও সেই একই প্রশ্ন উঠবে, বাস্তবে এসব কিছু জানে কারা? কারা এর ধারক বাহক? প্রকৃত পক্ষে আমরা মুসলমানরাই এ ব্যাপারে জ্ঞাত। আমরাই এর ধারক-বাহক। এখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে এই মুসলমানদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে কেন? পবিত্র কোরআনুল হাকীম এই প্রশ্নের উত্তর এভাবে দেয়।
 
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ 
 
‘তোমরাই সর্বোত্তম জাতি। তোমাদেরকে বের করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা মানুষকে সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজ হতে নিষেধ করো। এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করো।’ (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত :১১০)।
 
অর্থাৎ বিশ্বের মানুষকে মহান আল্লাহ তায়ালা দু’ভাগে বিভক্ত করেছেন। (১) خَيْرَ أُمَّةٍ   উত্তম জাতি। (২) الناس মানুষ। অর্থাৎ ২০০ কোটি মুসলমান যারা خيرامة উত্তম জাতি। আর বাকি ৬০০ কোটি অমুসলিম ‘মানুষ’ এর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। ২০০ কোটি মুসলমান خَيْرَ أُمَّةٍ  উত্তম জাতি, ৪৮০ কোটি অমুসলিম মানুষকে المعروف সৎকাজের আদেশ দিবে এবং المنكر অসৎ কাজ থেকে বাধা প্রদান করবে।
 
উল্লেখিত আয়াতের তাফসীরে মুফাসিরগণ লিখেছেন:  خَيْرَ أُمَّةٍ হওয়ার জন্য ৩টি শর্ত।
 
(১) امربالمعروف সৎকাজের আদেশ।
 
(২) المنكر عن نهي অসৎকাজের নিষেধ।
 
(৩) بالله ايمان আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা।
 
একটু চিন্তা করি, আমরা কি এই তিনটি শর্তের ওপর আমল করছি? যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তাহলে আমরা কি উত্তম জাতি? যদি উত্তর হয়, ‘না’ তাহলে এই জাতিকে  خير امة উত্তম জাতি হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত: উত্তম জাতি বানানোর ফিকির করতে হবে কি-না? এ জন্য আমাদেরকে امربالمعروف এবং  نهي لمنكر ا عن অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের দাওয়াত ও তাবলীগ করতে হবে। যদি আমরা এই জিম্মাদারী আদায় না করি, তাহলে আমাদের ওপর মহান আল্লাহর কঠিন শাস্তি আসতে পারে।
মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি, তিনি যেন উম্মতকে তাদের জিম্মাদারীর হক আদায় করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
 
দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান কী?
 
ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, অমুসলিম ভাই-বোনদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া ফরজে কেফায়া। অনেকে বলেছেন সাধ্যানুযায়ী ফরজে আইন। আমরা ফরজে কেফায়াই ধরে নিলাম। এবার আমাদের জানতে হবে ফরজে কেফায়া কাকে বলে?
 
ফরজে কেফায়া:
 
ফরজে কেফায়া বলা হয় এমন হুকুম বা কাজ, যা সকল মুসলমানের ওপর ফরজ, তবে সকলের পক্ষ থেকে যদি কিছু মানুষ ওই কাজ আদায় করে দেয়, তাহলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে এবং মহান আল্লাহর  পক্ষ থেকে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে না।
 
সাধারণত ফরজে কেফায়া বলতে আমারা জানাজার নামাজকে বুঝি। উদহারণ স্বরুপ, যদি জানাজার নামাজকেই ধরা যায়, তাহলে (কাফন দাফন সহ) জানাজার নামাজ সম্পূর্ণ করতে হলে কম পক্ষে চারজন লোকের প্রয়োজন। জামাতের জন্য একজন ইমাম হলে, বাকি তিনজন মুক্তাদি। দাফনের জন্য দু’জন, কবরের ওপরে দু’জন, আর কবরে নেমে দু’জন মুরদাকে রাখবে। মোট কথা, কাফন-দাফন সম্পন্ন হতে হলে মোট চারজন লোকের প্রয়োজন। তাহলে ফরজে কেফায়া আদায় হবে। যদি ফরজে কেফায়া আদায় না হয়, তাহলে ওই মহল্লার সকলেই গুনাহগার হবে এবং সমাপ্ত করার দায়িত্ব পরবে পার্শ্ববর্তী সকল মুসলমানের ওপর। যদি তারাও আদায় না করে, তাহলে পর্যায়ক্রমে সকল মুসলমান গুনাহগার হবে।
 
তদ্রুপ অমুসলিমদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো হলো ফরজে কেফায়া। প্রত্যেক অমুসলিমদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য এমন কিছু লোক থাকতে হবে। যাদের মাধ্যমে তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছে যায়। যদি সকলের কাছে দাওয়াত না পৌঁছে, তাহলে সকল মুসলমান গুনাহগার হবে।
 
জানাজার নামাজের সঙ্গে মিলালে বোঝা যায়, প্রত্যেক এলাকায় কমপক্ষে চার জন ব্যক্তি এমন থাকতে হবে, যারা সর্বদায় অমুসলিমদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিবে। যদিও চারজন দ্বারা দাওয়াতের ফরজে কেফায়া আদায় হবে না।
 
প্রিয় পাঠক! এবার আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, আপনি বলুন তো দেখি! আপনার এলাকায় (আপনি যে অঞ্চলেরই হোন না কেন।) এমন চারজন ব্যক্তি আছে, যারা সর্বদায় অমুসলিদের দাওয়াত দিচ্ছে? যদি এলাকায় না থাকে তাহলে আপনার পুরো জেলায় এমন চারজন মানুষ আছেন কি? যারা সর্বদা সকল মুসলমানদের পক্ষ থেকে অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিচ্ছে?
 
যদি উত্তর হয় ‘না’। তাহলে আমরা কি ফরজে কেফায়া আদায় করছি? যদি আদায় না করে থাকি তাহলে আমরা কি গুনাহগার হচ্ছি না? অবশ্যই হচ্ছি। আর কতদিন এই ফরজে কেফায়া ছেড়ে দেয়ার গুনাহ মাথায় নিয়ে ঘুরবো? যদি কোনো ব্যক্তি এককভাবে দাওয়াত দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি নিজে গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে। কিন্তু সমষ্টিগত ভাবে সকলেই গুনাহগার হবে।
 
প্রিয় পাঠক! এখনো সময় আছে আসুন অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দিয়ে নিজে গুনাহ থেকে বাঁচি, অন্যকে বাঁচাই। আর পরস্পরে একে অপরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করি।
 
মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালা সকল মুসলিম উম্মাহকে অমুসলিম ভাইদের কাছে তাওয়াত দেওয়ার কাজে শরীক হওয়ার তওফিক দান করুন। আল্লাহুম্ম আমিন। (চলবে...)
 
ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে