Alexa পরিবারে কারো নেই, তবুও এক গ্রামের ৯০০ শিশুই এইডসে আক্রান্ত

ঢাকা, সোমবার   ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

পরিবারে কারো নেই, তবুও এক গ্রামের ৯০০ শিশুই এইডসে আক্রান্ত

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৫৪ ১ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাবার কোলে চুপচাপ বসে আছে একটি শিশু। ডাক্তার তার পোশাক সরিয়ে স্টেথোস্কোপ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করছে। শিশুটিকে ধীরে ধীরে নিশ্বাস নিতে বলেন ডাক্তার। ওই কক্ষের বাইরে অন্তত আরো এক ডজন রোগী নিজেদের পরীক্ষা করানোর জন্য অপেক্ষা করছেন। তাদের কারো কারো বয়স কয়েক সপ্তাহ। তাদের মধ্যে অনেকেই মরণব্যাধী এইডসে আক্রান্ত। 

চলতি বছরের এ বছরের এপ্রিলে সেখানকার একজন স্থানীয় চিকিৎসক তার ক্লিনিকে আসা শিশুদের উপসর্গ দেখে সন্দেহ করেন। তিনি সেসব শিশুর এইচআইভি পরীক্ষা করার উপদেশ দেন। আটদিনের মধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষের শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি আছে বলে জানা যায়। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক এক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। শুধু পাকিস্তানেই নয়, এশিয়াতেও এত মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে একসঙ্গে এইচআইভি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার নজির নেই বললেই চলে।

ডাক্তার পরীক্ষা করছেন এক শিশুকেবিস্ময়কর সংক্রমণের কারণ
পাকিস্তানের ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার মত বিষয়টি হলো, সেখানে এইচআইভি আক্রান্ত হওয়া শিশুদের অধিকাংশের বয়সই ১২ বছরের কম। তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও এই রোগের কোনো উপস্থিতি ছিল না। সবচেয়ে বেশি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে রাতোদেরোতে। সেখানকারই  একটি ছোট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার মুজাফফর ঘাঙরো। শিশুদের ডাক্তার হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল, তার কাছে চিকিৎসা করানোর খরচও কম ছিল। তবে তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর সব বদলে যায়।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে শিশুদের মধ্যে এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমণ করার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। এরপর গ্রেফতার করা হয় অনিচ্ছাকৃত হত্যার দায়ে। ডাক্তার ঘাঙরো এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, আমি কোনো অপরাধ করিনি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ভীষণ চাপের মুখে ছিল। তাদের অযোগ্যতার দায় কারো না কারো ওপর চাপাতে হতো। বলির পাঁঠা হই আমি। কয়েক সপ্তাহ পরে পাকিস্তানের সরকার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হওয়া এক তদন্তের পর ডাক্তার ঘাঙরোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের গুরুত্ব কমানো হয়।

অভিযোগ করা হয় যে তার দায়িত্বে অবহেলার মাত্রা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। ডাক্তার ঘাঙরো বলেন, গত দশ বছর ধরে আমি চিকিৎসা পেশায় আছি। এখন পর্যন্ত একজনও আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেনি যে আমি সুঁই পুনর্ব্যবহার করেছি। আমি স্থানীয়দের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়ও ছিলাম। তাই পেশাগত হিংসা থেকে অন্যান্য ডাক্তার এবং সাংবাদিকরা আমার বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ এনেছে। নিজেও এইচআইভি আক্রান্ত থাকা ডাক্তার ঘাঙরো কিছুদিন পর জামিনে ছাড়া পান।

ডাক্তার ঘাঙরোডাক্তার ঘাঙরোর ক্লিনিক থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে শুভানা খান গ্রামে ৩২জন শিশু এইচআইভি আক্রান্ত। এই শিশুদের পরিবারের কোনো সদস্যরই এইচআইভি ছিল না। কয়েকটি শিশুর মায়ের অবস্থা উন্মাদপ্রায়। তাদের সন্তানরা অপুষ্টিতে ভুগছে আর ক্রমাগত কাঁদছে। কারণ তাদের দামি ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই। পাকিস্তানের সরকার এইচআইভি’র ওষুধ বিনামূল্যেই দিচ্ছে। তবে অধিকাংশ রোগীরই এইচআইভি’র প্রভাবে শরীরে অন্যান্য যেসব রোগের সংক্রমণ হয়ে থাকে সেগুলোর ওষুধের খরচ বহন করতে পারেন না।

শুধু আর্থিক দৈন্য নয়, রাতোদেরোর শিশুদের অভিভাবকদের যন্ত্রণা দিচ্ছে সমাজের মানুষের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্তদের সম্পর্কে মনোভাব। আমাদের সন্তানদেরকে ঘৃণা করা হয়। এমনকি আমাদেরও স্পর্শ করতে চায় না মানুষ। তাদের বাসায় যেতে বারণ করে। অন্যদের ধারণা আমাদের সংস্পর্শে আসলে তারাও অসুস্থ হয়ে পড়বে। এরকম অবস্থায় কী করার আছে আমাদের? প্রশ্ন এক মায়ের। তিনি জানান গ্রামের স্কুলও চায় না যে তাদের শিশুরা সেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যাক।

জাতিসংঘের ২০১৯ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বে এইচআইভি’র ব্যাপক প্রাদুর্ভাব থাকা ১১টি দেশের একটি পাকিস্তান। তবে সেখানে যে পরিমাণ মানুষের এইচআইভি রয়েছে তাদের অর্ধেকের বেশি সংখ্যক মানুষ জানেই না যে তাদের এইচআইভি আছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের তুলনায় পাকিস্তানে বর্তমানে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। এশিয়ার মধ্যে ফিলিপিন্সের পরে পাকিস্তানেই দ্রুততম হারে এইডস ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানান পাকিস্তানে ইউএন এইডসের পরিচালক এলেনা বরোমেয়ো।

সন্তানকে কোলে নিয়ে মায়ের কান্নাসাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণের ঘটনায় সরকারও নড়েচড়ে বসেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী আযরা পেচুহো। আনুমানিক ৬ লাখ অযোগ্য ডাক্তার বেআইনিভাবে পাকিস্তানে চিকিতসা কাজ চালায় বলে মনে করা হয়। পাকিস্তানের অনেক হাসপাতালেই চিকিৎসা পদ্ধতি নৈতিকতার নিয়ম মেনে পরিচালিত হয় না বলে অভিযোগ ওঠেছে। অগাস্টে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জাফর মির্জা এক টুইটে উল্লেখ করেন, বিশ্বের মধ্যে মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি ইঞ্জেকশন ব্যবহারের দিক থেকে শীর্ষে পাকিস্তান। আর এসব ইঞ্জেকশনের ৯৫ শতাংশই অপ্রয়োজনীয়।

ঘাটতি সচেতনতায়ও
এইচআইভির ঝুঁকিতে রয়েছে, এমন মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে পাকিস্তানের সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোও প্রচারণা চালাচ্ছে। তবে পাকিস্তানে যেহেতু বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক এবং সমকামিতা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ, তাই এই বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রচারণা বেশ রাখঢাক করে করতে হয়। অধিকাংশ মানুষের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছানোই হয়ে ওঠে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস