.ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৫ ১৪২৬,   ১৩ শা'বান ১৪৪০

পবিত্র মদীনা শরীফের মর্যাদা ও মুমিনের আকুতি

 প্রকাশিত: ২০:০৫ ৪ নভেম্বর ২০১৮   আপডেট: ২০:০৫ ৪ নভেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আসার আগে মদীনা শরীফের নাম ছিল ইয়াছরিব। 

যে ব্যক্তি এই শহর আবাদ করেছিলেন তার নাম ছিলো ইয়াছরিব। ব্যক্তির নামে কোনো কিছুর নামকরণের প্রচলন আমাদের সমাজেও আছে।

তখনকার দিনে মদীনার ভূমি ছিলো অনুর্বর। সেখানে শস্য-ফল বেশি উৎপাদন হতো না। যে কারণে শুরুতে বসতি ছিলো কম। এমন কি এক পর্যায়ে মদীনা জন মানবহীন এলাকায় রূপান্তরিত হয়। ওই সময় ইয়ামানে যারা রাষ্ট্রপ্রধান হতেন, তাদের তুব্বা বলা হতো। এক তুব্বা বাদশাহ কোনো এক মাধ্যমে জানতে পারলেন সর্বশেষ নবী (সা.) মদীনায় বসবাস করবেন। 

কিসের মাধ্যমে তিনি জেনে ছিলেন সে ব্যাপারে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলেন, তিনি স্বপ্নে এই সুসংবাদ পেয়েছিলেন। আরেটি মত হলো, তিনি পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব পড়ে বুঝে ছিলেন। তখন থেকে তুব্বা বাদশাহ দলবল নিয়ে মদীনায় এসে বসবাস শুরু করেন। মদীনায় খেজুর বাগান তিনিই শুরু করেন। তুব্বা বাদশাহর এই ঘটনা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের এক হাজার বছর আগে ঘটে। তার পরে আরবের অন্যান্য গোত্রের লোকেরা এসে সেখানে বসতি স্থাপন করে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য লোক আসে আওস, খাযরাজ ও বনী নাজ্জার গোত্র থেকে। 

মদীনার এলাকাও হারাম শরীফ:

হজরত আনাস রাযিআল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণীত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মদীনার এই সীমা (‘আয়ের’ নামক পাহাড়) হতে ওই সীমা (উহুদ পাহাড় সংলগ্ন ‘ছওর’ নামক ছোট পাহাড়) পর্যন্ত হারামের অন্তর্ভূক্ত। এই সীমার কোনো বৃক্ষ কাটা যাবে না। এর মাঝে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা যাবে না। যে উক্ত এলাকায় এমন কাজ করবে, ওর ওপর আল্লাহ তায়ালা, সমস্ত ফেরেস্তা ও মানবজাতির লানত।’ (সহীহ বুখারী) 

সর্বসম্মতিক্রমে মদীনা মোনাওয়ারা হারামের হুকুমে। হানাফী মাজহাবের মতেও মদীনা হারাম শরীফের হুকুমে। শাইখুল ইসলাম তকী উসমানী দা.বা. বলেন, হানাফী মাজহাব মতেও মদীনা হারাম। তবে মদীনার হারামের হুকুম, মক্কার হারামের তুলনায় কিছুটা ব্যতিক্রম। যেমন মক্কার হারামে ইহরাম ছাড়া প্রবেশ করা যায় না; কিন্তু এখানে যায়। মক্কায় হারামের বাহির থেকে কোনো প্রাণী এনে বেঁধে রাখা যায় না কিন্তু মদীনার  হারাম এর ব্যতিক্রম। এ রকম আরো কিছু হুকুম রয়েছে, যেগুলোতে মক্কা ও মদীনার হুকুম ভিন্ন ভিন্ন। (ইনআমুল বারী শরহে সহীহুল বুখারী, খন্ড-৫. পৃষ্ঠা-৪৬৬)

অসৎ লোকদের স্থান মদীনায় নয়:

হজরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণীত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে এমন একটি এলাকাকে স্বীয় বাসস্থানরূপে গ্রহণের ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছি, যে এলাকা অন্য সকল এলাকার ওপর প্রাধান্য বিস্তার করবে। অনেকে ওই এলাকাকে ইয়াছরিব বলে ডাকে। কিন্তু উহার উপযুক্ত নাম হলো মদীনা। ঐ স্থান অসৎ ব্যক্তিরদেরকে নিজ সীমা থেকে বেছে বেছে বের করে দিবে যেরূপ কামারের চুলা লোহা থেকে জং ও মরিচাকে দূর করে।’ (বুখারী শরীফ) 

মক্কায় বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মসজিদ ‘মসজিদে হারাম’ বিদ্যমান। এবং অতি মহান বাইতুল্লাহও সেখানে। তবে মদীনার মর্যাদাও কম নয়; বিশেষ করে যেখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুয়ে আছেন। এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য হলো ‘মদীনা নগরীর যে ভূখন্ডে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুয়ে আছেন, সে ভূখন্ডকে আল্লাহ তায়ালা কাবা  হতে, বরং আরশ থেকেও অধিক মর্তবা ও ফযীলত দান করেছেন- ইহা আলেমগণের ঐক্যমতপূর্ণ সিদ্ধান্ত। (শাইখুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক রাহ, বুখারী শরীফ এর বাংলা ব্যাখ্যা, খণ্ড-২.পৃষ্ঠা-৩৮৯) 

উল্লেখিত হাদীসে মদীনার আরেকটি বৈশিষ্টের কথা আলোচনা হয়েছে যে, অসৎ লোকদেরকে বেছে বেছে বের করে দেয়। এই বৈশিষ্ট্যের ফলাফল কেয়ামতের আগে পূর্ণরূপে দেখা যাবে। দাজ্জাল আরবের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তৎকালিন সময়ের অধিকাংশ লোককে নিজের দলে নিয়ে আসবে। কিন্তু মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। অবশেষে মদীনার অদূরে একটি বসতিতে দাজ্জাল আসবে আর মদীনার অসৎ লোকগুলো মদীনা থেকে বের হয়ে মদীনাকে মুক্ত করে দিবে। এর আগেও সময় সময় মদীনার এই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাবে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৎ লোক হিসেবে কবুল করুন এবং পবিত্র মদীনার সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দান করুন-আমীন।

মদীনায় বসবাসের সুযোগ পাওয়া সৌভাগ্য:

হজরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণীত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক সময় এমন আসবে মদীনার অবস্থা ভালো থাকা সত্তেও লোকেরা মদীনাকে ছেড়ে চলে যাবে। এমনকি এক পর্যায়ে সেখানে শুধু পশু-পাখি থাকবে। সর্বশেষ মদীনার দিকে মুযায়না গোত্রের দুজন লোক আসবে। তাদের পেশা রাখালি। তারা তাদের ছাগলপাল হাঁকাইতে হাঁকাইতে মদীনার দিকে অগ্রসর হয়ে বাহিরে থাকতেই অনুভব করবে যে, মদীনা জনশূন্য। তারা যখন ‘ছানিয়াতুল বেদা’ নামক স্থানে পৌঁছবে তখন তারা সেখানে অধ:মুখী পতিত হয়ে মরে থাকবে। (সহীহ বুখারী শরীফ) 
কেয়ামতের পূর্বে দুনিয়াতে কাফেররাই শুধু থাকবে। কাবা শরীফও তখন কাফেরদের দখলে থাকবে। হাদীস শরীফে এসেছে, কাফেররা কাবা শরীফের এক একটি পাথর উঠিয়ে ফেলে দিবে। ঐ সময় মদীনা যদি রাসূলের দুশমনদের দখলে থাকে তাহলে কি অবস্থা হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দেহ মুবারকের সঙ্গে কেমন আচরন করবে? তাই আল্লাহ তায়ালার কুদরতি ব্যবস্থা হবে, ঐ সময় যখন ঘনিয়ে আসেব তখন আস্তে আস্তে মদীনাবাসী মদীনা ছেড়ে চলে যাবে। আল্লাহ তায়ালা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে মদীনাকে ভরে দিবেন। আল্লাহ তায়ালার কুদরতি নেজামের ভিত্তিতে মদীনাবাসী  চলে যাবেন, এ ক্ষেত্রেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  এর বর্ণনায় আক্ষেপ ও অনুতাপের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে যারা স্বাভাবিক অবস্থায় প্রাণের প্রিয় মদীনা ত্যাগ করবে তাদের প্রতি রাসূলের আক্ষেপ কেমন হবে? আরেক বর্ণনায় এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, (এমন এক সময় সামনে আসবে যখন ইয়ামান মুসলমানদের দখলে আসবে এবং সেই সময় কিছু মুসলমান সুখ-স্বাচ্ছ্যন্দের লিপ্সায়) মদীনা ছেড়ে পরিবারবর্গ নিয়ে দ্রুত ইয়ামানের দিকে ছুটবে। কিন্তু মদীনা তাদের জন্য অতি উত্তম, অতি উত্তম। হায়! যদি তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি থাকত। এভাবে শাম, ইরাক মুসলমানদের করতলগত হবে আর তখন কিছু লোক মদীনা ছেড়ে পরিবারবর্গ নিয়ে দ্রুত সে দিকে ছুটবে। কিন্তু মদীনা তাদের জন্য অতি উত্তম, অতি উত্তম। হায়! যদি তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি থাকত। (সহীহ বুখারী শরীফ) 

শেষ যমানায় আল্লাহর কুদরতে মদীনা খালি হবে, যার আলোচনা  ইতোপূর্বে হয়েছে। যারা দুনিয়ার লোভে মদীনা ত্যাগ করবে তাদের অবস্থা দু:খজনক, তা যেকোনো সময়েই হোক না কেন। 

ইমান মদীনার প্রতি ধাবিত হয়:

হজরত আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণীত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিশ্চই ইমান মদীনার প্রতি এরূপ আকৃষ্ট ও ধাবিত হবে যেরূপ সাপ স্বীয় গর্তের দিকে ধাবিত হয়। শাইখুল হাদীস (রহ). এই হাদীসের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘ইমানের আলো পবিত্র মদীনা হতে বিশ্বের কোণে কোণে ছড়িয়েছে, তাই এই আলো কারো অন্তরে থেকে থাকলে, সে ব্যক্তি বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক না কেন তার কেন্দ্রের প্রতি আকৃষ্ট হবেই। যেমন সাপ গর্ত থেকে বের হয়ে কোথাও গেলে, তা যত দূরেই হোক না কেন গর্তের দিকে তার আকৃষ্ট থাকে। খাঁটি ঈমানের আলামত হলো, মুমিন ব্যক্তি স্বীয় ইমানের আকর্ষণে মূল কেন্দ্র পবিত্র মদীনার দিকে ধাবিত হবে। সে মদীনার প্রতি আকর্ষণহীন অবস্থায় থাকতে পারবে না। যার অন্তরে এই আকর্ষণ নেই, বুঝতে হবে তার ভিতরে খাঁটি ঈমান নেই। (শাইখুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক (রাহ.), বুখারী শরীফ বাংলা, খন্ড-২. পৃষ্ঠা-৩৯৫)

মদীনাবাসীকে ধোকা দেয়ার পরিণতি:

হজরত সাদ রাযিআল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণীত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মদীনাবাসীদের ক্ষতি ও অনিষ্ঠ সাধনের উদ্দেশ্যে ফন্দি করবে, সে এরূপ ধ্বংস হবে যেমন লবন পানিতে গলে যায়। (বুখারী শরীফ) 

দাজ্জাল মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না:

হজরত আনাস ইবনে মালেক রাযিআল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণীত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মক্কা, মদীনা ছাড়া সকল শহর দাজ্জাল করতলগত করবে। উক্ত শহরদ্বয়ের সকল রাস্তায় ফেরেস্তারা পাহারায় থাকবে। অতপর মদীনার যমীন তিনবার প্রকম্পিত হবে। আল্লাহ তায়ালা সব মুনাফিক ও কাফেরকে সেখান থেকে বের করে দিবেন (ওরা বের হয়ে দাজ্জালের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হবে)। (বুখারী শরীফ)

দুনিয়ার বুকে বেহেস্তের বাগান রয়েছে মদীনায়:

আবু হুরাইরা রাযিআল্লাহু আনহু এর সূত্রে বর্ণীত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মসজিদ সংলগ্ন আমার গৃহ এবং মসজিদে বিদ্যমান মিম্বার, এই দুয়ের মধ্যবর্তী ভূখন্ড বেহেস্তের বাগান সমূহের একটি বাগান এবং আমার এই মিম্বার (হাশরের ময়দানে) হাওজে কাওসারের কিনারায় স্থাপিত হবে। (বুখারী শরীফ) 

সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা হাজরে আসওয়াদ বেহেস্ত থেকে এনে কাবা শরীফে স্থাপন করেছেন। তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মসজিদে, বেহেস্ত থেকে একটি অংশ এনে বসিয়ে দিবেন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে?

সোনার মদীনায় মৃত্যু নসীবের দোয়া করা:

সোনার মদীনায় মৃত্যু অনেক মর্যাদার বিষয়। আমার মনে হয় প্রত্যেক মুমিনের দিলের আশা হলো আমার মৃত্য যেন মদীনায় হয়। এ জন্য দোয়া করা এবং প্রিয় নবী (সা.) এর ভালোবাসা সর্বদা মনে জাগ্রত রাখা। 

মদীনায় মৃত্যুর জন্য নির্দিষ্ট দোয়ার কথা হাদীসে এসেছে। উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিআল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, তাহার পিতা হজরত ওমর রাযিআল্লাহু আনহু এই দোয়া করতেন,

اللهم ارزقنى شهادة فى سبيلك واجعل موتى فى بلد رسولك

‘হে আল্লাহ! তোমার রাস্তায় শহীদ হওয়ার সুযোগ দান কর এবং আমার মৃত্যু মদীনায় নসীব কর।’ (বুখারী শরীফ)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে