পতিতাবৃত্তি ভারতের যে সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

পতিতাবৃত্তি ভারতের যে সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য

ডেস্ক নিউজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৭ ৪ জুন ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

দেহ ব্যবসা বা পতিতাবৃত্তি। আমরা যেখাবেই বলি না কেনো এইটি সমাজের চোখে একটি ঘৃণ্য কাজ। কিন্তু এমন একটি সম্প্রদায় আছে যেখানে পতিতাবৃত্তিকে ভাবা হয় তাদের ঐতিহ্য। 

শুনে একটি অবাক লাগলেও ভারতের পশ্চাৎপদ বাচ্ছারা সম্প্রদায়ে পতিতাবৃত্তিকে ঐহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর পরিবারের বড় মেয়েই এই ঐতিহ্য রক্ষা করে থাকে। এই পতিতা বাণিজ্য শুরু হয় মেয়ের মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর বয়সেই। আর তারা ‘খেলোয়াড়’ হিসাবে সম্প্রদায়ে পরিচিতি পায়।

পরিবারের পুরুষ সদস্য থেকে শুরু করে বাকি সবার জীবন ওইটুকু মেয়ের আয়ের ওপরই নির্ভর করে। কয়েকটি ক্ষেত্রে মেয়েটির বাবা অথবা ভাই দালাল হিসেবে কাজ করে। যখন এই মেয়েটির বয়স হয়ে যায়, তখন তার স্থলে জায়গা করে নেয় তারই ছোট বোন। এভাবেই এই প্রথা সম্প্রদায়ের সবার গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভর করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পালন হয়ে আসছে।

এই সম্প্রদায়ে বিয়েটাও হয় ভিন্নভাবে। এখানে বিয়ে দেয়ার সময় কনের পরিবার বরের পরিবারের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থ দাবি করে। যেটাকে অনেকেই উল্টো যৌতুক হিসেবে আখ্যা দেন।

এই ঐতিহ্য রাখতে গিয়ে পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়া একজনের নাম হিনা। জন্মের পর থেকে এই ধরণের জীবনের জন্য প্রস্তুত করা হয় তাকে। তারপরে খুব অল্প বয়সেই তাকে এই কাজে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, আমাকে যখন এই পেশায় ঠেলে দেয়া হয় তখন আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে আমাকে আমার মা ও নানীর দেখানো পথেই চলতে হয়েছে।

প্রতিদিন তার কাছে গ্রামীণ ধনী থেকে শুরু করে ট্রাক চালক পর্যন্ত একাধিক খদ্দের আসতো।

হিনা আরো বলেন, ১৮ বছর বয়সে, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার সঙ্গে কত অন্যায় হয়েছে এবং ভীষণ রাগও হয়েছিল তখন। কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কি-ই বা করার ছিল? যদি আমি এভাবে উপার্জন না করতাম তাহলে আমার পরিবার কীভাবে বাঁচত?

ভারতের বাচ্ছারা সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধারণত ভীষণ দারিদ্র্য পীড়িত। পরিবারের জন্য উপার্জন এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে তারা নারী সদস্যদের ওপর নির্ভর করে।

স্থানীয় এনজিওর সমন্বয়ক আকাশ চৌহানের মতে, এই পেশার আসা এক তৃতীয়াংশের বেশি মেয়ে বয়সে অনেক ছোট।

এরআগে, বাচ্ছারা ছিলো একসময় যাযাবর উপজাতি গোষ্ঠী। পরে তারা কেন্দ্রীয় রাজ্য মধ্য প্রদেশের তিনটি জেলায় ছড়িয়ে যায়। এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা বেশিরভাগ গ্রামীণ এলাকা বা মহাসড়কের পাশে থাকে, যেখানে ট্রাক ড্রাইভাররা বিরতি নিয়ে থাকে।

পথের দুই পাশেছোট দোকানের মত বুথ থাকে, সেখানে মেয়েটির দালাল হিসেবে তার ভাই না হলে বাবা, খদ্দেরকে নিমন্ত্রণ জানায়। তারা চালকদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যা সাধারণত গ্রাহক প্রতি ১০০ থেকে ২০০ ভারতীয় রুপি হয়ে থাকে। ডলারের হিসাবে সেটা দেড় থেকে তিন ডলারেরও কম।

স্থানীয়দের মতে, একটি কুমারী মেয়ের জন্য সর্বোচ্চ দাম পাওয়া যায়। খদ্দের প্রতি সেটা পাঁচ হাজার রুপি বা ৭২ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

হিনা বলেন, প্রতিদিন, দিনের বেলা প্রায় চার থেকে পাঁচজন পুরুষ আসে। রাতের বেলা, আমরা হোটেল বা কাছাকাছি অন্য কোথাও যাই। সবসময় সংক্রমিত রোগে ভোগার ঝুঁকি থাকে।

এছাড়া ‘খেলোয়াড়’ নামে পরিচিত এই মেয়েরা প্রায়ই রাস্তার পাশে বিভিন্ন দোকানের কাছে অপেক্ষা করে। এসব খেলোয়াড়দের অনেক মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এই পেশায় আসায় কয়েক বছরের মাথায় হিনা একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দেয়।

মা হওয়ার পরও তাকে আরো বেশি বেশি পরিশ্রম করার জন্য চাপ দেয়া হতো। অনেক মেয়েরা এক পর্যায়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লেও তাদের এই কাজ চালিয়ে যেতে হয়। সন্তানদের যত্ন নেয়ার জন্য আরো অর্থ উপার্জন করতে চাপ দেয়া হয় তাদের।

একজন যৌনকর্মী হওয়ার অর্থ হচ্ছে যে সে তার সম্প্রদায়ের মধ্যে কাউকে বিয়ে করার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

সামাজিকভাবে অনুমোদিত এই প্রথার উৎস নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে। তাদের মধ্যে একজন জানায়, কিভাবে নরমেডিক উপজাতিদের বাহিরাগত হিসেবে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে সংগ্রাম করতে হয়েছিল। পরে তারা এই যৌন বাণিজ্যকে দরিদ্রতা কাটিয়ে ওঠার উপায় বলে মনে করতে থাকে।

ভারতে মেয়ের চাইতে ছেলে সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকায় দেশটিতে লিঙ্গের অনুপাতে ভয়াবহ অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। কিন্তু বাচ্ছারা সম্প্রদায়ে এই সমস্যাটি পুরোই উল্টো।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ