ন্যূনতম শেয়ার না থাকায় পদ হারাচ্ছেন ১৬৮ পরিচালক!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

ন্যূনতম শেয়ার না থাকায় পদ হারাচ্ছেন ১৬৮ পরিচালক!

মীর সাখাওয়াত সোহেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৯ ১০ জুন ২০১৯   আপডেট: ১৯:২৫ ১০ জুন ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

পদ হারাতে যাচ্ছেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৭ কোম্পানির ১৬৮ জন পরিচালক। ন্যূনতম শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা না মানার কারণেই পদ হারাতে হচ্ছে বলে বাংলাদেশ সিকউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সূত্রে জানা গেছে।

সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক কোম্পানিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ এবং পরিচালকদের ব্যক্তিগতভাবে ২ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক। তবে ন্যূনতম শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা মানছে না তালিকাভুক্ত ৪৭টি কোম্পানি। এসব কোম্পানিতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে শেয়ার ৩০ শতাংশের কম। এর মধ্যে কোনো কোম্পানিতে মাত্র ১ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তাদের। বাকি ৯৯ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এই স্বল্প পরিমান শেয়ার দিয়ে উদ্যোক্তারা পুরো কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থাৎ তারাই এই কোম্পানির মালিক। ফলে এসব কোম্পানি দেউলিয়া হলেও উদ্যোক্তারা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।

জানা গেছে, আইন লঙ্ঘন করে কয়েকটি কোম্পানি আবার রাইট শেয়ারও ঘোষণা করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতার পর টনক নড়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এরই ধারাবাহিকতায় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সংস্থাটি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, ৪৭টি কোম্পানিতে উদ্যোক্তাদের ৩০ শতাংশ শেয়ার নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে ডেল্টা স্পিনার্স। এ কোম্পানির ২৮ জন পরিচালকের মধ্যে ২৫ জনের ২ শতাংশ শেয়ার নেই। কোম্পানিটির উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে শেয়ার ১৮ শতাংশ। আবদুল আউয়াল মিন্টুর মালিকানাধীন দুলামিয়া কটনের ১২ পরিচালকের মধ্যে ৯ জনের ২ শতাংশ শেয়ার নেই। 

এ ছাড়া পিপলস লিজিংয়ে ১৮ জন, কে অ্যান্ড কিউতে ১১ জন, নর্দান জুটেক্সে ৮ জন, মিথুন নিটিংয়ে ৬ জন, পিপলস ইন্স্যুরেন্সে ৫ জন, মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৬ জন, উত্তরা ব্যাংকে ৫ জন, ফুয়াং ফুডে ৩ জন, ম্যাকসন্স স্পিনিংয়ে ৬ জন, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৮ জন, তাল্লু স্পিনিংয়ে ৫ জন, কনফিডেন্স সিমেন্টে ৩ জন, পিপলস ইন্স্যুরেন্সে ৫ জন, ইনটেক অনলাইনে ৮ জন, ফুয়াং সিরামিকে ৪ জন, অ্যাপোলো ইস্পাতে ৩ জন এবং বে লিজিংয়ের ৫ জন পরিচালকের ২ শতাংশ শেয়ার নেই।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, নিজেরা শেয়ার না রেখেই কোম্পানির মালিক সেজে যারা বসে আছেন, তারা আসলে পরের ধনে পোদ্দারি করছেন। বিএসইসি’র আরো আগেই ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওইসব পরিচালকদের বাজারের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এখানে থাকতে হলে নিয়ম মেনে, বিনিয়োগ করেই তাদের থাকতে হবে বলে উল্লেখ করেন আবু আহমেদ। 

এদিকে, কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ধারণের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন।

নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানিতে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার না থাকলে ওই কোম্পানির কোনো উদ্যোক্তা বা পরিচালক এখন থেকে শেয়ার বিক্রি করতে পারবে না। এমনকি কোনো শেয়ার হস্তান্তর বা ঋণ নেয়ার জন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বন্ধকও রাখতে পারবে না। 

সেই সঙ্গে কোনো কোম্পানি অথবা প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির ২ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার ধারণ করলে সেই কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান ওই কোম্পানির পরিচালক পদের জন্য একজন ব্যক্তিকে মনোনীত করতে পারবে। এ ছাড়াও ২ শতাংশ শেয়ার ধারণে ব্যর্থতায় কোনো পরিচালকের পদ শূন্য হলে  ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে শূন্য পদে পরিচালক নিয়োগ দেয়া হবে। আর ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে ব্যর্থ কোম্পানির জন্য স্টক এক্সচেঞ্জে আলাদা ক্যাটাগরি চালু করবে বলেও সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আইন অনুসারে শেয়ার ধারণ বাধ্যতামূলক। আর শেয়ার না থাকলে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কেননা, শেয়ার কম থাকলে পরিচালকদের দায় কম ।

ডিএসইর পরিচালক মো. রকিবুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, যারা শেয়ার ছাড়া কোম্পানির মালিকানা ধরে রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে বিএসইসির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে। 

এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য এরই মধ্যে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন সম্মিলিতভাবে একটি প্লাটফর্মে মিলিত হয়েছে বলে জানান তিনি । এ প্লাটফর্ম বাজারের উন্নয়নে কাজ করবে। এর মধ্যে শেয়ার ধারণের বিষয়টি অন্যতম একটি ইস্যু। 

তিনি বলেন, এর আগে বেশকিছু কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে শেয়ার বিক্রি করেছে। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএস/এমআরকে/এস