‘নেক কাজে পরস্পর প্রতিযোগিতা কর’ 

ঢাকা, শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২২ ১৪২৬,   ১১ শা'বান ১৪৪১

Akash

‘নেক কাজে পরস্পর প্রতিযোগিতা কর’ 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:৩৯ ২৪ মার্চ ২০২০  

‘নেক কাজে পরস্পর প্রতিযোগিতা কর।’ (সূরা: মায়িদা, আয়াত: ৪৮)।

‘নেক কাজে পরস্পর প্রতিযোগিতা কর।’ (সূরা: মায়িদা, আয়াত: ৪৮)।

হজরত আবু হোরায়রা রাদি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যা তোমাকে উপকার দান করে তা লাভের আকাক্সক্ষা পোষণ কর। (মুসলিম)।

অর্থাৎ যে আমল ও কর্ম পরকালে উপকার ও মুক্তির কারণ হবে তার জন্য লোভী হও। দেখুন, লোভ করা খারাপ এবং নিষিদ্ধ। সম্পদ, সম্মান এবং খ্যাতির লোভ করো না। এসব বিষয়ের লোভ করা মানুষের জন্য অনেক বড় দোষের। বরং এসব বিষয়ে অল্পতুষ্টি অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে, বৈধ পন্থায় চেষ্টা ও পরিশ্রম করার ফলে তোমাদের যে সম্পদ, সম্মান ও খ্যাতি লাভ হয় তাতে সন্তুষ্ট থাক এবং মনে কর এটাই আমার জন্য উত্তম।
 আরো বেশি পাওয়ার লোভ করা ঠিক নয়। দুনিয়াতে কেউই নিজের সব বাসনা ও চাওয়া কখনও পূরণ করতে পারে না। যত বড় বাদশাই হোক না কেন কিংবা যত সম্পদশালী ব্যক্তি হোক না কেন, কাউকে তুমি এরূপ পাবে না যে, সে বলতে পারে আমার সব বাসনা পূর্ণ হয়েছে।

হাদিস শরিফে আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কোনো আদম সন্তান স্বর্ণের একটি পাহাড় লাভ করে তাহলে সে আরেকটি লাভ করার আকাক্সক্ষা করে। যদি দু’টি লাভ করে তাহলে তৃতীয় আরেকটি পাওয়ার আকাক্সক্ষা করে। মাটি ছাড়া আর কিছুই আদম সন্তানের পেট ভরতে পারে না। যখন কবরে যাবে তখন কবরের মাটি তার উদরপূর্ণ করবে। দুনিয়ার কোনো জিনিস তার উদরকে পূর্ণ করবে না। অবশ্য একটি জিনিস আছে যা তার উদরকে ভরতে পারে তা হলো অল্পতুষ্টি। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা বৈধ পন্থায় তাকে যা কিছু দিয়েছেন তার ওপর তুষ্ট হওয়া এবং আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করা। এ ছাড়া পেট ভরার আর কোনো মাধ্যম নেই।

দ্বীনের লোভ পছন্দনীয়:

দুনিয়ার ধন-সম্পদ ও সামগ্রী নিয়ে লোভ করা খারাপ, তা থেকে বেঁচে থাকার আদেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু দ্বীনি কাজের ক্ষেত্রে, নেক আমলের ক্ষেত্রে এবং ইবাদতের ক্ষেত্রে লোভ করা ভালো। যেমন, কোনো ব্যক্তি নেক আমল করছে তাকে দেখে এই লোভ করা যে, আমিও নেক আমল করি। কিংবা অমুক ব্যক্তি দ্বীনি নেয়ামত লাভ করেছে আমিও ওই দ্বীনি নেয়ামত লাভ করি। এ ধরনের লোভ কাম্য এবং পছন্দনীয়। 

হাদিস শরিফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথাই বলেছেন যে, এমন কাজের লোভ কর যা আখেরাতে উপকার দান করে। 
কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ

‘নেক কাজে পরস্পর প্রতিযোগিতা কর।’ (সূরা: মায়িদা, আয়াত: ৪৮)।

নেক কাজের প্রতি সাহাবায়ে কেরাম রাদি. এর লোভ:

নেক কাজের প্রতি সাহাবায়ে কেরামরা রাদি. ছিলেন প্রচন্ড লোভী। সর্বদা তারা এ চিন্তায় ব্যস্ত থাকতেন যে, কীভাবে আমাদের আমলনামায় নেক আমল আরো বৃদ্ধি পায়। হজরত ওমর ফারুক রাদি. এর ছেলে হজরত আবদুলাহ ইবনে ওমর রাদি. একবার হজরত আবু হোরায়রা রাদি. এর কাছে গেলেন। তিনি তাকে হাদিস শোনালেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কোনো মুসলমান অপর কোনো মুসলমানের জানাযায় শরিক হয় তাহলে সে এক কিরাত সাওয়াব পায়। আর যদি সে তার দাফনেও শরিক হয় তা হলে দুই কিরাত সাওয়াব পায়।

কিরাত তখনকার যুগের প্রচলিত একটি পরিমাপ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি পরিমাণ বুঝানোর জন্য কিরাত শব্দের উল্লেখ করেছেন এবং তিনি এ শব্দটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, আখেরাতের কিরাত হবে উহুদ পাহাড়ের চেয়েও বড়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝাতে চেয়েছেন, এটি দুনিয়াবি কিরাত নয়। এর দ্বারা পরকালীন কিরাত উদ্দেশ্য, দুনিয়াবি পরিমাপে যা উহুদ পাহাড়ের চেয়েও বড় হবে। তবে এর দ্বারাও সাওয়াবের পূর্ণ পরিমাপ হয় না। কারণ পরকালের পরিমাপকে দুনিয়াবি শব্দে বুঝানো মানুষের সাধ্যের বাহিরে। কেননা মানুষের ব্যবহৃত শব্দ তা বুঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের বুঝার সুবিধার্তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিরাত শব্দটি এবং পরকালে কিরাত উহুদ পাহাড়ের চেয়ে বড় হবে কথাটি বলেছেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদি. যখন হাদিসটি শুনেন, হজরত আবু হোরায়রা রাদি.-কে বলেন, আপনি কি সত্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কথাটি শুনেছেন? হজরত আবু হোরায়রা রাদি. বলেন, আমি স্বয়ং হাদিসটি শুনেছি। তখন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদি. বলেন, দাফনে শরিক হলেও যে এক কিরাত সাওয়াব পাওয়া যায়, এটা আমি জানতাম না। আফসোস! আমি এ পর্যন্ত অনেক কিরাত সাওয়াব নষ্ট করেছি। যদি আগে থেকে এটি জানা থাকত, কখনই এ সুযোগগুলো নষ্ট হতে দিতাম না। সব সাহাবিরই নেক আমলের প্রতি এরূপ লোভ ছিল। তারা কোনোভাবেই একটি নেক আমলের সুযোগ হাতছাড়া হতে দিতেন না। আমরা ওয়াজ-নসীহতের মধ্যে শুনে থাকি অমুক আমলের এই সাওয়াব, অমুক আমলের এই সাওয়াব। এগুলো ওলামায়ে কেরাম বলেন যাতে আমাদের হৃদয়ে সেই আমলগুলো করার লোভ জাগ্রত হয়। ফরজ ও ওয়াজিবের বাইরে অনেক মুসতাহাব ও নফল আমল আছে যা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। একজন মুসলমানের হৃদয়ে সেসব ফজিলত লাভের আকাক্সক্ষা জাগ্রত হওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা যাদেরকে দ্বীনের লোভ দান করেছেন তারা সর্বদা এই ফিকিরে থাকে যে, কীভাবে আমাদের আমলনামায় নেক আমল আরো বৃদ্ধি পায়।

রাসূল (সা.) এর দৌড় প্রতিযোগিতা:

হাদিস শরিফে আছে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম সফরে ছিলেন। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদি. সঙ্গে ছিলেন। পায়দল সফর ছিল। রাস্তায় একটি নির্জন ও খোলা মাঠ পড়ে। আশেপাশে কেউ ছিল না, তাই পর্দা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আয়েশা রাদি.-কে বললেন, আয়েশা, আমার সঙ্গে দৌড় লাগাবে? হজরত আয়েশা রাদি. বললেন, হ্যাঁ, দৌড় লাগাবো। এ দৌড়খেলায় একদিকে হজরত আয়েশা রাদি.-কে আনন্দ দেয়া উদ্দেশ্য ছিল এবং অন্যদিকে উম্মতকে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে যে, অনেক বড় বুজুর্গ এবং নেককার হয়ে ঘরের কোণায় পড়ে থাকাও ভালো নয়। 
বরং সাধারণ মানুষের মতো দুনিয়াতে থাকা উচিত। অন্য এক হাদিসে হজরত আয়েশা রাদি. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুবার আমার সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। প্রথমবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিতেছিলেন এবং দ্বিতীয়বার যখন দৌড় প্রতিযোগিতা হয়, তখন যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাসের শরীর ভারী হয়ে গিয়েছিল তাই তিনি পেছনে পরে যান আর আমি জিতে যাই। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, تلك بتلك দু’জন সমান সমান; একবার তুমি জিতেছ, একবার আমি জিতেছি। এবার দেখুন বুজুর্গানে দ্বীন এ সুন্নতের ওপর আমল করার জন্য কীভাবে সুযোগ সন্ধান করেন।

এ সুন্নতের ওপর হজরত থানবি রহ. এর আমল:

একবার হজরত হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলি থানবি রহ. থানাবন থেকে সামান্য দূরের একটি গ্রামে দাওয়াতে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে তার স্ত্রী ছিলেন। জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পায়ে হাটা পথ ছিল এবং সঙ্গে অন্য কেউ ছিল না। যখন নির্জন স্থানে পৌঁছেন, তখন মনে উদয় হলো, আলহামদুলিল্লাহ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক সুন্নতের ওপর আমল করা তাওফিক হয়েছে কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে দৌড় লাগানোর সুন্নতের ওপর আমল করার সুযোগ এখনও হয়নি। আজকেই সুযোগ। সে মতে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে তখনি দু’জন দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন এবং এ সুন্নতের ওপর আমল করেন। স্বভাবতই দৌড় প্রতিযোগিতা করার কোনো শখ ছিল না কিন্তু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সুন্নতের ওপর আমল করার জন্য দৌড় দিয়েছিলেন। এটা হওলা ইত্তেবায়ে সুন্নতের লোভ, নেককাজের লোভ, সাওয়াব ও নেকি হাসিলের লোভ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবার মধ্যে এ লোভ সৃষ্টি করুন। আমিন।

হিম্মতও আল্লাহ তায়ালার কাছে চাওয়া:

অনেক সময় হয় যে, মনে একটি নেক কাজ করার আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং মন চায় অমুক ব্যক্তি ইবাদত করছে, আমিও ইবাদতটি করি। সঙ্গে সঙ্গে মনে উদয় হয় যে, এই ইবাদত এবং নেক কাজ করা আমার সাধ্যের মধ্যে নয়, আমি এটা করতে পারব না, এটা অন্যদের কাজ। যখন এ কথা মনে আসে তখন কি করব? তাই হাদিসের অংশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَا تَعْجَزْ

এরূপ অবস্থায় হতাশ ও হীনবল হয়ো না যে, আমার দ্বারা এ ইবাদত হবে না। বরং আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য চাও এবং বল, ‘হে আল্লাহ! এ কাজটি তো আমার সাধ্যের মধ্যে নয় কিন্তু আপনার সাধ্যের মধ্যে, আপনি আমাকে এ নেক কাজ করার তাওফিক দান করুন। এটি করার সাহস ও মনোবল দান করুন।’
উদাহরণত, নেককার লোকদের ব্যাপারে আমরা শুনি যে, তারা রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়েন এবং আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে কান্নাকাটি করেন। এখন আমারও মনে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এসেছে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া আমার সাধ্যের মধ্যে নয়; আচ্ছা বাদ দাও। এবং হতাশ হয়ে তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা ত্যাগ করি। এরূপ করা উচিত নয়। বরং আল্লাহ তায়ালার কাছে বলো, আমার চোখ খুলে না, আমার ঘুম পুরা হয় না, হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তাহাজ্জুদ পড়ার তাওফিক দান করুন এবং তার ফজিলত দান করুন।

যখন আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করবে এবং তাওফিক প্রার্থনা করবে তখন দুটোর একটি অবস্থা অবশ্যই হবে। হয়ত আল্লাহ তায়ালা বাস্তবেই এ আমলের তাওফিক দান করবেন। তাওফিক হাসিল না হলে, ইনশাআলাহ! এ নেক আমলের সাওয়াব অবশ্যই অর্জিত হবে। এর প্রমাণ হলো হাদিস শরিফে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার কাছে শাহাদাত আকাক্সক্ষা করে এবং বলে যে, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার পথে শাহাদাত লাভের তাওফিক দান করুন’, যদিও সে বিছানার ওপর স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে তথাপি আল্লাহ তায়ালা তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে