নেই বিক্রেতা, তারপরও চলছে দোকান

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২০ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

নেই বিক্রেতা, তারপরও চলছে দোকান

 প্রকাশিত: ১২:৪৯ ১৯ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ২০:১২ ১৯ জুলাই ২০১৮

কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে হামিদুর রহমান শিপনের ‘ভিন্নরকম দোকান’

কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে হামিদুর রহমান শিপনের ‘ভিন্নরকম দোকান’

ভিন্নরকম দোকান। তায়েবা রুমাল। ব্যতিক্রম এক উদ্যোগ। যার নেই কোনো বিক্রেতা। সারাদিন খোলা থাকে দোকান। ক্রেতারা আসেন, ঘুরে দেখেন। নিজেই হাতেই খোঁজেন  পণ্যের মান। পছন্দ হলে নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করে নিয়ে যান প্রয়োজনীয় জিনিস। দোকানের মালিক কুষ্টিয়ার হামিদুর রহমান শিপন। জীবন সংগ্রামে হার না মানা শিপন হয়েছেন স্বনির্ভর। 

দোকানভরা পণ্যের পসরা। বেচা-কেনাও বেশ। দোকানে এসে ক্রেতারা কিনছেন পছন্দের পণ্য। প্রতিটি পণ্যের গায়ে লেখা রয়েছে দাম। দোকানটিতে পণ্য থাকলেও, নেই বিক্রেতা। পণ্য কিনে দাম পরিশোধের জন্য রয়েছে বাক্স। সেই বাক্সে ক্রেতারা ফেলেন টাকা। বিস্ময়কর হলেও সত্য। এভাবেই চলতে থাকে বছরের পর বছর। শুধু তাই নয়, এত বছরে কখনো চুরি হয়নি একটি পণ্যও। হিসাবেরও হয়নি কোনো গড়মিল। 

‘ভিন্ন রকম দোকান’তায়েবা রুমাল। কুষ্টিয়া কুমারখালি রেলস্টেশন প্লাটফর্মের পাশেই চোখে পড়বে ব্যতিক্রমী দোকানটি। ট্রেনের যাত্রী থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের নজর কেড়েছে কাজীপাড়া গ্রামের শিপনের ব্যাতিক্রম এই উদ্যোগ। সংসারে একটু বাড়তি আয়ের উদ্দেশ্যে হকারির পাশাপাশি ভিন্নরকম আয়োজন হামিদুরের। মানুষের বিশ্বাসের ওপর ভর করে ‘অস্বাভাবিক’ভাবনাটি বাস্তবে রূপ দিয়েছেন শিপন। অনেকে তাকে ভিন্ন শিপন বলে ডাকেন।

হামিদুর পেশায় হকার। তিনি কখনো বাসে, কখনো ট্রেনে চেপে আবার কখনো বা ফুটপাতে বসে বিক্রি করেন গামছা, রুমাল, লুঙ্গি। কুমারখালি রেলস্টেশনে প্রতিদিন আসা-যাওয়া, শত শত যাত্রীর। শিপনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে খুশি হয়ে, অনেকেই প্রয়োজনীয় পণ্যটি কেনেন তার‘ভিন্ন রকম দোকান’থেকে। 

হামিদুর রহমান শিপন জানান, একযুগের বেশি সময় হকারি করছেন তিনি। কিন্তু দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে একটু ভালো থাকতে, তার এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, ফুটপাতে রুমাল ও গামছা বিক্রি করি। বাড়তি আয়ের জন্য দোকান দিয়েছি। কিন্তু দোকানে বসে থেকে বাড়তি আয় সম্ভব নয়। সংসার চালানোর খরচ দোকান থেকে ওঠে আসে না। তাই দোকান খুলে রেখে, ফুটপাতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করি গামছা-রুমাল। ক্রেতারা দোকানে এসে পণ্য পছন্দ হলে, দামের তালিকা দেখে টাকা বাক্সে রেখে যান। শিপন জানান, আমি মানুষকে অনেক বেশি বিশ্বাস করি। এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই দোকান করেছি। ভিন্ন শিপন জানান, রাতে দোকানে এসে পণ্যের সঙ্গে টাকার হিসাব মিলিয়ে নেন। সকালে মালামালের হিসাব তৈরি করে দোকান খোলা রেখে চলে যান শিপন।  

হামিদুর আরো জানান, দোকানে দৈনিক ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। সেখান থেকে আয় হয় দেড়শ থেকে দু’শ টাকা। এর পাশাপাশি হকারি করে যে টাকা আয় হয়, তা দিয়ে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়াসহ সংসারটা ভালোই চলে যাচ্ছে বলে জানান শিপন। 

শিপনের বড় মেয়ে সুমাইয়া ১০ শ্রেণিতে আর ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান জিম চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ের বয়স ৫ বছর। 

হামিদুর রহমান বলেন, অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি অনেকটা সময়। পরিবারে ১০ ভাই-বোন। সবাই আলাদা। কুমারখালি এমএম পাইলট স্কুল থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছি। অভাবের কারণে কর্মজীবনে প্রবেশ শিপনের। বর্তমানে মা, দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে শিপনের সংসার। তিনি বলেন, সংসার চালাতে এক পেশা যথেষ্ট নয়। তাই ভিন্নকিছু করার ভাবনা ছিল অনেকদিনের। সেই ভাবনা থেকেই ‘ভিন্নরকম দোকান’-এর পরিকল্পনা তার। 

শিপন বলেন, কাপড় কিনে নিজেই কেটে ও সেলাই করে বিক্রি করি। কিন্তু শুধু এক কাজ করে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। আর পাশাপাশি দু’টি কাজ একই সময়ে করাও, সম্ভব নয়। তাই এ পরিকল্পনা। করি। দিন শেষে হিসেবে কোনো গড়মিল পান কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, সবার দোয়াতে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। আশেপাশের ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা পান কিনা,  প্রশ্নে তিনি বলেন, পাশে একটি লাইব্রেরি আছে। যতটুকু সম্ভব দেখাশুনা করেন। তারও তো কাজ থাকে। সারাদিন হয়তো নজর রাখা সম্ভব হয় না। তারপরও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ভালোই চলছে। তিনি আরো বলেন, সকাল ৯টায় দোকান খুলে আমি চলে যাই। কুষ্টিয়া, রাজবাড়ি ও পাংশায় হকারি করি। 

প্রতাপ শর্মা নামে এক ক্রেতা জানান, ভিন্নরকম দোকানের কথা শুনে আমি কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়া থেকে দেখতে আসি। 

সমাজে এখনো অনেকে আছেন নিজের বিশ্বাসকে আকড়ে ধরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। এদেরই একজন হামিদুর। মানুষের প্রতি একজন হকারের যে বিশ্বাস, তা আসলেই অবিশ্বাস্য। স্যালুট, হকার হামিদুর রহমান ভিন্ন শিপন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এলকে