নুহ জাতির ওপর মহাপ্লাবন ও উম্মতে মুহাম্মদির শিক্ষা (শেষ পর্ব)

ঢাকা, শুক্রবার   ২৯ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৭,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

নুহ জাতির ওপর মহাপ্লাবন ও উম্মতে মুহাম্মদির শিক্ষা (শেষ পর্ব)

মাওলানা ওমর ফারুক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৫২ ৩১ মার্চ ২০২০   আপডেট: ২০:৫৭ ৩১ মার্চ ২০২০

আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতার কারণেই তিনি যুগে যুগে মানুষকে আজাব দিয়ে সতর্ক করেন। এসব আজাব থেকে একমাত্র মুমিনরাই শিক্ষা গ্রহণ করে।  -প্রতীকী ছবি

আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতার কারণেই তিনি যুগে যুগে মানুষকে আজাব দিয়ে সতর্ক করেন। এসব আজাব থেকে একমাত্র মুমিনরাই শিক্ষা গ্রহণ করে। -প্রতীকী ছবি

সব ধরনের দলিল তাদের নিকট পেশ করা হলো, তখন আর কোনো ওজর বাকি রইল না। দাওয়াতি কাজ প্রায় দশ শতাব্দী পর্যন্ত চলল, নুহ (আ.) তাদের থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, নুহ আরো বলল, হে আমার পালনকর্তা, আপনি পৃথিবীতে কোনো কাফের গৃহবাসীকে রেহাই দেবেন না। যদি আপনি তাদেরকে রেহাই দেন, তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল পাপাচারী, কাফের। (সূরা : নুহ, আয়াত : ২৬-২৭)।

আরো পড়ুন >>> নুহ জাতির ওপর মহাপ্লাবন ও উম্মতে মুহাম্মদির শিক্ষা (পর্ব-১)

তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে কিস্তিু তৈরি করতে বললেন। অতঃপর আমি তার কাছে আদেশ প্রেরণ করলাম যে, তুমি আমার দৃষ্টির সামনে এবং আমার নির্দেশে নৌকা তৈরি কর। (সূরা : মু’মিনুন, আয়াত : ২৭)।

তিনি নৌকা তৈরী করতে লাগলেন, আর তার কওমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন পার্শ্ব দিয়ে যেত, তখন তাকে বিদ্রুপ করত। (সূরা : হুদ, আযাত : ৩৮)।

নুহ (আ.) তাদেরকে শিষ্টাচার ও নরম ভাষায় জবাব দিয়েছেন। তিনি বললেন, তোমরা যদি আমাদের উপহাস করে থাক, তবে তোমরা যেমন উপহাস করছ আমরাও তদ্রুপ তোমাদের উপহাস করছি। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৩৮)।

পরে তিনি তাদেরকে আল্লাহর আজাবের ভয় ও হুমকি দিলেন, অতঃপর অচিরেই জানতে পারবে লাঞ্ছনাজনক আজাব কার উপর আসে এবং চিরস্থায়ী আজাব কার উপর অবতরণ করে। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৩৯)।

কাজ দ্রুত এগিয়ে চলল, কিস্তিু তৈরি শেষ হলো, অতঃপর আল্লাহ তায়ালা নুহ (আ.)-কে ঈমানদার ও প্রত্যেক প্রাণী থেকে একজোড়া করে কিস্তিুতে উঠাতে নির্দেশ দিলেন। অবশেষে যখন আমার হুকুম এসে পৌঁছাল এবং ভূপৃষ্ঠ উচ্ছসিত হয়ে উঠল, আমি বললাম, সর্বপ্রকার জোড়ার দু’টি করে এবং যাদের উপরে পূর্বাহ্নেই হুকুম হয়ে গেছে তাদের বাদ দিয়ে, আপনার পরিজনবর্গ ও সব ঈমানদারদেরকে নৌকায় তুলে নিন। বলাবাহুল্য অতি অল্পসংখ্যক লোকই তার সঙ্গে ঈমান এনেছিল। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪০)।

তিনি ঈমানদার ও প্রত্যেক প্রাণী থেকে একজোড়া করে কিস্তিুতে উঠালেন। আর তিনি বললেন, তোমরা এতে আরোহন কর। আল্লাহর নামেই এর গতি ও স্থিতি। আমার পালনকর্তা অতি ক্ষমাপরায়ন, মেহেরবান। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪১)।

ডুবে যাওয়া : 

দাম্ভিকতা এবং ইতিহাস বিকৃতি- 

মধ্যযুগে খৃষ্টানেরা মানবজাতির মাঝে উচ্চ-নিম্ন শ্রেণিতে শ্রেণিবিন্যাস করত। সিফরে কাতবীনে এ ধরণের শ্রেণি বিন্যাসের কথা উল্লেখ আছে। তারা একে নতুন স্তুরে ভাগ করত। তারা বিশ্বাস করত যে, ধর্মযাজকেরা নুহ (আ.) এর সন্তান সামের বংশধর থেকে, সেনাবাহিনী ও বীরেরা ইয়াফেসের বংশধর থেকে ও গরীব মিসকিনেরা হামের বংশধর থেকে। এমনকি ১৯৬৪ সালে আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ার সিনেটর বার্ড রবার্ট আমেরিকার রাজনীতিতে শ্রেণি বিন্যাসে নুহ (আ.) এর উক্ত ঘটনাকে তাদের দলিল হিসেবে ব্যবহার করল।

নুহ (আ.) যখন ঈমানদার ও প্রত্যেক প্রাণী থেকে একজোড়া করে কিস্তিুতে আরোহণ করলেন তখন আকাশ থেকে মুশল ধারে বৃষ্টি ঝড়তে শুরু করল, জমিন থেকে পানি নির্গত হতে লাগল। তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দ্বার প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হলো এক পরিকম্পিত কাজে। আমি নুহকে আরোহণ করালাম এক কাষ্ঠ ও পেরেক নির্মিত জলযানে। যা চলত আমার দৃষ্টির সামনে। এটা তার পক্ষ থেকে প্রতিশোধ ছিল, যাকে প্রত্যখ্যান করা হয়েছিল। (সূরা : কামার, আয়াত : ১১-১৪)।

নুহ (আ.) তার বেঈমান ছেলেকে দেখল পানিতে ডুবা থেকে ভাগার চেষ্টা করছে, তিনি তাকে ডাকলেন, তিনি বললেন, প্রিয় বৎস! আমাদের সঙ্গে আরোহন কর এবং কাফেরদের সঙ্গে থেকো না। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪২)।

ছেলে ঈমান আনতে অস্বীকৃতি জানাল, বাবার নসিহত শুনল না, সে নুহ (আ.)-কে এ বলে জবাব দিল, সে বলল, আমি অচিরেই কোনো পাহাড়ে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানি হতে রক্ষা করবে। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৩)।

তখন নুহ (আ.) তার দিকে দয়ার দৃষ্টিতে তাকালেন, নুহ (আ.) বললেন আজকের দিনে আল্লাহর হুকুম থেকে কোনো রক্ষাকারী নেই। একমাত্র তিনি যাকে দয়া করবেন। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৩)।

এরপরে কি হলো? এমন সময় উভয়ের মাঝে তরঙ্গ আড়াল হয়ে দাঁড়াল, ফলে সে নিমজ্জিত হলো। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৩)।

নুহ (আ.) ছেলের প্রতি আসক্ত হয়ে আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে তাকে রক্ষার জন্য দোয়া করতে লাগলেন, যেহেতু আল্লাহ তায়ালা তার পরিবার পরিজনকে হেফাজত করার ওয়াদা করেছেন। অতঃপর নুহ (আ.) বললেন, আর নুহ (আ.) তার পালনকর্তাকে ডেকে বললেন, হে পরওয়ারদেগার, আমার পুত্র তো আমার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত; আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য আর আপনিই সর্বাপেক্ষা বিজ্ঞ ফয়সালাকারী। (সূরা : হুদ, আয়া : ৪৫)।

তখন আল্লাহ তায়ালা জবাবে বললেন, তিনি যে পরিবারের ব্যাপারে ওয়াদা করেছেন তারা হলেন ঈমানদাররা। আল্লাহ বলেন, হে নুহ! নিশ্চয় সে আপনার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চই সে দুরাচার! (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৬)।

তাই দ্বীনের মধ্যে কোনো মধ্যস্থতা নেই যে, সে তোমার পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হবে, এক আল্লাহর ওপর ঈমান না আনলে সন্তান হলেও কোনো লাভ নেই।

জমিন যখন পানিতে একেবারেই ডুবে গেল, তখন সব কাফির ধ্বংস হলো। আর নির্দেশ দেয়া হলো, হে পৃথিবী! তোমার পানি গিলে ফেল। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৪)।

এরপরে জমিন তার পানি শুকিয়ে নিল, আসমানকে বলা হলো, আর হে আকাশ, ক্ষান্ত হও। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৪)।

বৃষ্টি বর্ষণ থামাও, বৃষ্টি থামল। আর পানি হ্রাস করা হলো এবং কাজ শেষ হয়ে গেল, আর জুদী পর্বতে নৌকা ভিড়ল। (সূরা : হুদ, আয়াত : ৪৪)।

যে পাহাড়ে কিস্তিু ভিড়ল, তখন নুহ (আ.)-কে আল্লাহ বললেন, হুকুম হলো হে নূহ! আমার পক্ষ হতে নিরাপত্তা এবং আপনার নিজের ও সঙ্গীয় সম্প্রদায়গুলোর উপর বরকত সহকারে অবতরণ করুণ। (সূরা : হুদ, আয়া : ৪৮)।

নুহ (আ.) ও ঈমানদারেরা কিস্তিু থেকে নামল, তারা শহর গড়ে তুলল, গাছপালা রোপণ করল, যেসব পশুপাখি তাদের সঙ্গে ছিল সেগুলো ছেড়ে দিল, এভাবে জমিন আবাদ করা শুরু করল, লোকজন সন্তান সন্তুতি জন্ম দেয়া শুরু করল।

পবিত্র কোরআনুল কারিমে এভাবেই নুহ (আ.) এর জাতির ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘটনা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্ববাসীর জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো। আল্লাহর নাফরমানি ও অবাধ্যতার কারণেই তিনি যুগে যুগে মানুষকে আজাব দিয়ে সতর্ক করেন। এসব আজাব থেকে একমাত্র মুমিনরাই শিক্ষা গ্রহণ করে। তাওবা ইস্তেসফার করে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে