নুসরাত হত্যাকাণ্ড ও মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

নুসরাত হত্যাকাণ্ড ও মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিবর্তন

 প্রকাশিত: ১৬:১৯ ১৭ এপ্রিল ২০১৯  

ফকির-ইলিয়াস--কবি-প্রাবন্ধিক-স্থায়ীভাবে-বসবাস-করছেন-নিউইয়র্কে-প্রকাশিত-গ্রন্থসংখ্যা---১৮-কমিটি-টু-প্রটেক্ট-জার্নালিস্টসএকাডেমি-অব-আমেরিকান-পোয়েটস-দ্যা-এমনেস্টি-ইন্টারন্যাশনাল-আমেরিকান-ইমেজ-প্রেস--এর-সদস্য

ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত জাহান রাফি এখন একটি প্রতিবাদের নাম। জীবন দিয়ে আমাদের সমাজের অপর পৃষ্ঠার একটি অনুজ্জ্বল মুখোশ উন্মোচন করে গিয়েছেন নুসরাত। তিনি জানিয়ে গেছেন, মাদরাসা শিক্ষার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে কিভাবে লুকিয়ে রয়েছে কিছু অজগর।  

হ্যাঁ, আমি এদের অজগর বলতে চাই। বলতে চাই এজন্য, কারণ এদের বিষকামড়গুলো কেউ জানে না। জানতে পারে না। ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে এরা ঝাপটে ধরে কোমলমতি কিশোর-কিশোরীর গলা। এরা বলৎকার করে! যেমনটি নির্যাতিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে এই দেশের নারী-কিশোর-কিশোরী।

কী জঘন্য এমন মানসিকতা! একজন শিক্ষকের মুখোশ পরে, সিরাজুদ্দৌলারা কী পরাক্রমশালী হয়ে উঠেছে আজকের বাংলাদেশে! মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার ষড়যন্ত্র কীভাবে করা হয়েছিল, কীভাবে তা কার্যকর হয়েছিল - পুলিশের কেন্দ্রীয় তদন্ত বিভাগের প্রধান তা সাংবাদিকদের বলেছেন। সোনাগাজি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলার সূত্র ধরে ৬ই এপ্রিল মাদরাসার ছাদে রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ১০ই এপ্রিল তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান।

পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার সাংবাদিকদের বলেছেন, ৫ই এপ্রিল সকালে মাদরাসার একটি হোস্টেলে বসে রাফিকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করা হয়। মাদ্রাসার দুটো ছাত্রাবাসের একটিতে - পশ্চিম হোস্টেলে- বসে পাঁচজন মিলে রাফিকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে মারা পরিকল্পনা করা হয়। পিবিআই প্রধানের ভাষ্যমতে, দুটি কারণে তাকে হত্যার এই পরিকল্পনা হয়।

প্রথমটি হচ্ছে, হত্যাকারীরা মনে করেছে রাফি মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করে 'আলেম সমাজকে হেয় করেছে'। দ্বিতীয় কারণ, নুসরাত আসামীদের একজনের প্রেমের প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করায় ঐ ব্যক্তি তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।

হত্যার এই পরিকল্পনা তারা মাদরাসার আরো পাঁচজন ছাত্রছাত্রীকে জানায় যাদের দুজন ছাত্রী। একটি মেয়ের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনটি বোরকা এবং কেরোসিন জোগাড় করে আনার।৬ই এপ্রিল পরীক্ষার দিনে সকালে পরীক্ষা শুরুর কিছু আগে পরিকল্পনা অনুযায়ী ঐ দুই ছাত্রীর একজন অন্য এক ছাত্রীকে মারা হচ্ছে বলে নুসরাতকে ফুসলিয়ে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। সেখানে অপেক্ষারত অন্য কজন ওড়না পেঁচিয়ে তাকে বেঁধে ফেলে কেরোসিন ঢেলে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।
পুলিশের ভাষ্যমতে, এরা ভেবেছিল তারা ঘটনা সামাল দিতে পারবে। কারণ আগেও রাফির গায়ে চুনকালি মাখিয়েছিল তারা, তার জন্য রাফিকে পাহাড়তলি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।  সে ঘটনা তারা সামলেছিল। তারা ভেবেছিল এবারও তারা পারবে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে,একটি মহল আগে থেকেই নুসরাতের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে উত্যক্তি করে আসছিল,নিপীড়ন করছিল। নুসরাত এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আইনী সহায়তাও চেয়েছিলেন।কিন্তু পাননি। কেন পাননি? এর নেপথ্য কারণ কী?  শিক্ষক সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে এখন বিস্তর অভিযোগ বেরিয়ে আসছে।২০০৭ সালে ফেনীর দলিয়া এলাকার সালামতিয়া মাদরাসার এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে চাকরিচ্যুত হন তিনি। এছাড়া, আল জামিয়াতুল ফালাইয়া মাদরাসায় এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগেও তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের রংমালা মাদরাসায়ও নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে চাকরি হারান সিরাজ। পরে জাল সনদ দিয়ে ফেনীর সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় উপাধ্যক্ষ পদে চাকরি নেন বলে অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

শিক্ষক সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে এবার মাদ্রাসা ছাত্রকে বলৎকার করার অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে এই অভিযোগ করেছেন ফেনীর দৌলতপুরের বাসিন্দা আবুল বাসার। আবুল বাশার বলেছেন, তার দাদার প্রতিষ্ঠা করা মাদ্রাসার সুপার থাকাকালীন সময়ে সিরাজউদ্দোলার সমকামিতা ও বলৎকারের ঘটনার প্রতিবাদ করে রোষানলে পড়েছিলেন তিনি।

২০১৭ সালের ১২ই জুলাই ফেনীর ৮ নম্বর দরিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কাছে সিরাজের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনেন ইশরাফিল নামে একজন। অভিযোগের পর তাকেও হত্যার হুমকি দেয়া হয়। ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর নিজের প্রবাসী চাচাতো ভাই নূরনবীকে হত্যার হুমকি দেন সিরাজ। পরে ফেনীর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এই বিষয়ে সমঝোতা হয়। একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি রফিকুল ইসলাম নামে একজন শিক্ষককে পরীক্ষা কক্ষে লাঞ্ছিত করারও অভিযোগ রয়েছে সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে। পরের বছর ২০১৮ সালে ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে চেক জালিয়াতির অপরাধে তার বিরুদ্ধে ৩২৫/১৮ নম্বর মামলা করা হয়।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, জেলা প্রশাসক এই সমঝোতার মধ্যমনি ছিলেন? তিনি এই অপকর্মগুলোর অতীত খতিয়ে দেখলেন না কেন?

বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার অনেকগুলো স্থাপনায় এমন অপকর্মের অভিযোগ আমরা দীর্ঘদিন থেকে শোনে আসছি। এর বিহীত হচ্ছে না কেন? অতিসম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। এই রিপোর্ট অনুযায়ী পনেরোজন ওয়াজকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী এরা, ওয়াজের নামে বক্তৃতা দেয়ার সময় সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানো, জঙ্গিবাদে উৎসাহ দেয়া, ধর্মের নামে বিভিন্ন উপদল ও শোবিজ তারকাকে নিয়ে বিষোদগার, নারীদের পর্দা করা নিয়ে কটূক্তি, ধর্মবিদ্বেষ, জঙ্গিবাদ, গণতন্ত্রবিরোধী ও দেশীয় সংস্কৃতিবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে এই পনেরো বক্তাকে চিহ্নিত করে ছয়টি নির্দেশনা সম্বলিত একটি চিঠি ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বিভাগীয় কমিশনারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও আইসিটি) আবু বকর সিদ্দিক এ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের এখানে ওয়াজ মাহফিল সবসময় মনিটরিং হয়। ওয়াজ মাহফিলে কে কোথায় কী বলেন, তা আমরা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা দপ্তর থেকে পেয়ে আবার বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে থাকি। আমরা গোয়েন্দা রিপোর্ট যেভাবে পাই সেভাবে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে পাঠাই।’

তিনি জানিয়েছেন, ‘এসব প্রতিবেদনের কন্টেন্টগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তৈরি করে না। আমরা নিয়মিতই গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে রিপোর্ট পাই, আগাম ব্যবস্থা হিসেবে সেগুলোর বিষয়ে রিলেডেট জায়গাগুলোতে কমিউনিকেট করতে হয়, সেটাই আমরা করেছি।’

রিপোর্টে বাল হয়েছে, ওয়াজে তারা যা বলছেন- এর মাঝে রয়েছে ‘আল্লাহর রাস্তার প্রতিষ্ঠায় উত্তম জিহাদ হচ্ছে সশস্ত্র জিহাদ’, ‘আল্লাহ রাসুলকে গালি দিলে কোপাতে হবে’, ‘ইসলামের বিরুদ্ধে আইন করলে কোপাতে হব’, ‘মূর্তি ভাঙা ধর্মীয় কাজ’, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাফের’, ‘অমুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়’, ‘গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ধর্মনিরেপক্ষতাবাদ মুশরিকদের কাজ’, ‘শহীদ মিনারে ফুল দেয়া, প্রতিমূর্তিতে ফুল দিয়ে নীরবতা পালন করা শিরক’, ‘গণতন্ত্র ইসলামে নাই, ইহা হারাম’ এবং ‘জাতীয় সংগীত কওমি মাদরাসায় চাপিয়ে দেয়া যাবে না’ ইত্যাদি।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অনেকেই আছেন, যারা হেলিকপ্টারযোগে ওয়াজ মাহফিলে যোগ দেন এবং ঘণ্টাচুক্তিতে বক্তব্য দিয়ে বিশাল অংকের অর্থ গ্রহণ করেন। তারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে আয়কর প্রদান করেন কিনা তা নজরদারির জন্য আয়কর বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করা দরকার।
হ্যাঁ, তারা বড় অংকের টাকা আয় করেন। তারা এর আয়কর রাষ্ট্রকে দেন কি? এটা অবশ্যই খতিয়ে দেখা দরকার।  বাংলাদেশে কওমি মাদরাসাগুলো সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সেই শিক্ষাবোর্ড আধুনিক হয়েছে কি? না হয়নি। কেন হয় হয়নি-সেটাও সরকারকে খতিয়ে দেখা দরকার। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ নিয়ে আমরা অনেক কথাই শুনি। কিন্তু এই মাদরাসাগুলোর শিক্ষকদের সার্বিক প্রশিক্ষণের বিষয়টি সামনে আসছে না। আমি এই বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। এক-কওমি ও আলীয়া মাদরাসার শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। তাদেরকে সামাজিক অপরাধ ও তা নির্মূল বিষয়ে সচেতন করে গড়ে তোলা হোক। জানানো হোক কোন অপরাধের চূড়ান্ত শাস্তি কী।

দুই- প্রতিটি মাদরাসার অভিভাবক পরিষদে বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তি মনস্ক তরুণ-তরুণীদের স্থান দেয়া হোক। যারা প্রয়োজন মতো শিক্ষকদের সঙ্গে বসে তাৎক্ষণিক অনেকগুলো সমস্যা সমাধান করতে পারবেন। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকার মাদরাসাগুলোর প্রয়োজনে একটি 'বিকল্প গভর্নিং বোর্ড' গঠন করা হোক। যারা প্যারান্টস কমিটির কার্যক্রমে নজর রাখবেন। প্রয়োজনে ওই কমিটিকে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে পরামর্শ দেবে। তিন- প্রতিটি ফাজিল, কামিল মাদরাসায় ছাত্র সংসদ কার্যক্রম জোরালো করা হোক। যাতে ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের ক্রান্তিকালে একে অপরকে সাহায্য করতে পারে।

চার- প্রতিটি এলাকায় তরুণ-তরুণীদের নেতৃত্বে সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ ও নির্মূল কমিটি হঠন করা হোক। যে কমিটি যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিংবা সামাজিক অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখবে। জনমত তৈরি করবে।

পাঁচ- ধর্ষণ,বলৎকার এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে আইনী বিধান আরও শক্তিশালী করা হোক। এবং তা গ্রামে গ্রামান্তরে প্রচার করা হোক বিভিন্ন সভা,সেমিনারের মাধ্যমে।
জেলা প্রশাসক,পুলিশ সুপার,এমপি এবং সচেতন প্রতিটি মানুষ এতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন।

বলাৎকার একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। তা নির্মূল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তা না করতে পারলে একটি পরিশুদ্ধ সমাজ আমরা আশা করতে পারি না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর