নীল তিয়াস ।। কাজী লাবণ্য
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=196008 LIMIT 1

ঢাকা, শনিবার   ০৮ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৫ ১৪২৭,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

নীল তিয়াস ।। কাজী লাবণ্য

গল্প ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:০৪ ২৪ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৬:০৮ ২৪ জুলাই ২০২০

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

গতরাতে শেষ ফ্লাইটে আমরা বাসায় ফিরেছি। রাতে আর কেউই কিছু মুখে দেইনি। জয়কে বলেছিলাম-
-একটা ডিম ভেজে ফ্রিজের ভাত গরম করে দেই তোকে।
-তুমি খাবে? 
-না আমি খাব না।

-আমারও একদম খিদে নেই, তুমি আগে ওয়াশরুমে যাও ঝপ করে গোসলটা সেরে আসো। এই বলে ড্রয়ার খুলে জামা কাপড় দিয়ে আমাকে ঠেলে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে সে বের হয়ে গেল।

গরম, ক্লান্তির চেয়েও মানসিক ধকল যা গেল! গোসলটা যে আসলেই খুব জরুরি ছিল, বুঝলাম শাওয়ারের নিচে দাঁড়াতে। 
বাথরুম থেকে বেড়িয়ে দেখি জয় ফ্রিজ থেকে কিছু খাবার বের করে ওভেনে গরম করে এনেছে। 
ইতোমধ্যে ও ফ্রেস হয়ে নিয়েছে। বললাম 

-বাবা, আমি কিচ্ছুটি খাব না। তুই একটু খেয়ে নে। 

-ওকে। জাস্ট, পানিটা নাও। খেয়ে নিলে সে আমাকে ধরে বিছানার কাছে এনে বলল

-এবার শুয়ে পর। এবং ঘুমাও। কোনো দুশ্চিন্তা করবে না। ও, দাঁড়াও তোমার ওষুধ দেই।


-আমি খাচ্ছি। যা তুই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড় বাবা। মশারি টাঙিয়ে নিস। ঢাকা শহরে ডেঙ্গু ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। ছেলেটা কিছুতেই মশারি দিতে চায় না। নিত্যরাতে এ কাজটি আমিই করে থাকি।   

-আমাকে নিয়ে চিন্তা কর না। আম ফাইন, আমি একদম ঠিকঠাক ঘুমুব। কাল আমার অফিস আছে। তড়িৎ, মুখ তুলে তাকালাম ওর দিকে-
-কী! চমকাচ্ছ কেন! আমি অফিসে যাব না! আমার তো অফিস করতে কোনো প্রবলেম নেই। তাহলে আননেসেসারি অফ যাব কেন? অবশ্য তুমি না চাইলে যাব না। কিন্তু তুমিই বা এত ভেঙ্গে পড়ছ কেন বলত...বরং একথা খুব সত্যি আমরা এতদিনে মুক্তি পেলাম। আমি আরেকবার চমকে উঠে ছেলের মুখের দিকে তাকালাম। অনিন্দ্য সুন্দর নিস্পাপ মুখটি একদম নির্বিকার। কোনো ছাপ নেই। নির্মেঘ আকাশ, জ্বলজ্বল করছে। যে সারাজীবন একজন অদ্ভুত জন্মদাতাকে দেখেছে, যে জানেনা বাবার ভালোবাসা কাকে বলে!  
-হ্যাঁ মাম্মা, এটাই চরম সত্যি। মনে মনে সেটা তুমিও জানো আমিও জানি। কেবল আমার রিকোয়েস্ট সত্যিটাকে স্বীকার কর এবং স্বাভাবিক থাকো।

-তুই যা, শুয়ে পড়। 
-ওকে, মাম্মা গুড নাইট। বলে দু পা গিয়ে আবার ফিরে এসে পাশে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরে
-মাম্মা, আই মাইট হ্যাভ সেইড ইট ইন অ্যা রুড ওয়ে। বাট এটাই আমাদের জন্য স্বস্তির এবং শান্তির। হোল লাইফ তুমি কিসের মধ্যদিয়ে গেছ, তা আমরা দুজনই জানি। আজ যখন আল্লাহ্‌ আমাদেরকে মুক্তি দিয়েছে তখন তুমি কেন খুশি হবে না! তুমি তো এর আগে বহুবার মুক্তি চেয়েও পাওনি। এখন পেয়েছ, সেটা এনজয় কর। অনেক কষ্ট পেয়েছ জীবনে, আর না। মাম্মা, লাইফ ইজ ঠু স্মল, নট টু বি ইন পেইন, নট টু স্টে গ্লুমি এন্ড ওরিড। এবার তুমি ঘুমাও। কোনরকম চিন্তা করো না, আমি আছি। ওকে, আমি কাল অফিসে যাব না। ছেলে দুহাতে আমার মুখ ধরে কপালে আদর দেয়। এরপর ঘর ছেড়ে চলে যায়। ওর চোখ দুটি জলে ভরে ওঠে। তিন দিন পরে আজ প্রথম ছেলেটার কান্না দেখলাম। ওর কান্না দেখে আমার বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগলো আবার কেন যেন স্বস্তিও এনে দিলো। 


২.
দিন তিনেক আগের কথা। ভীষণ গরম পড়েছে। বৃষ্টির দেখা নাই। কালি মেঘেরা গর্জন করে, বজ্রপাতে মানুষ মারা যায় কিন্তু তেমন বৃষ্টি হয় না। আপাত নির্দোষ একটা দিন কিভাবে পরের দিনগুলোকে আমূল পালটে দিলো।  

দুপুরের দিকে আমি একটা বই পড়ছিলাম, বুদ্ধদেব বসুর ‘তিথিডোর’। ফোনটা বেজে উঠলো। সেটি চার্জে দেয়া ছিল। ইচ্ছে করছিল না, তবু উঠে গিয়ে হাতে নিয়ে দেখি রাজ্জাক ভাইয়ের ফোন, ধরলাম-
-ভাবি, জয় কোথায়? 

-অফিসে। ভাবি একটা খবর আছে।  

-কী খবর ভাই! 

এরপরে জানলাম বদরুলের গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে। ভয়াবহ এক্সিডেন্ট। স্পট ডেথ। জয় এলো, বদরুলের ভাইবোন, বন্ধুরা সবাই এলো। পুলিশ ডেডবডি ময়নাতদন্ত ছাড়া দিবে না। পরে ওর বন্ধুরা অনুরোধ করে ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিয়ে আসল। সকল রকম ফর্মালিটিজ সেরে ডেডবডি বহনকারী ফ্রিজিং গাড়িসহ আমরা একটা মাইক্রোবাসে সবাই রওয়ানা দিলাম। সেখানে ওর ছোটভাই সবরকম ব্যবস্থা করে রেখেছিল। ওর দাফন, দুদিন পরের মিলাদ সবকিছু সেরে আমরা মা ছেলে রাতের ফ্লাইট ধরে চলে এলাম ঢাকার বাসায়।
আমি বাসে আসতে চেয়েছিলাম। জয় বলল তুমি এত লং জার্নি করতে পারবা না। ও অনলাইনে প্লেনের টিকেট করে ফেলল। ছেলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশনা করে পাশ করার পরপরই, ৩মাস হলো একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ঢুকেছে। প্রচুর খাটুনি কিন্তু সেলারির ফিগার চমৎকার। এজন্যই ছেলে এখন অনায়াসেই ভাবতে পারে-
বাই রোডে যেতে মাম্মার কষ্ট হবে। 


৩.
আমরা ফিরেছি জেনে অনেকেই দেখা করতে আসে। বদরুলের বন্ধুরা, ভাবিরা আসে। পরিজনেরা আসে। এরা সবাই আমাদের সব ঘটনা অবগত। ভাবিরা আমাকে সান্তনা দেয়। নানাভাবে বোঝায় যা হবার হয়ে গেছে,  এবং এও ঠিক যা ঘটে ভালোর জন্য ঘটে। কিন্তু একটা প্রসঙ্গ সকলেই সযত্নে এড়িয়ে যায়। ভালোমন্দ জানি না। আসলে মনে হচ্ছে আমি সকল বোধের উর্ধে চলে গেছি। কিছুই আমাকে স্পর্শ করছে না। আমি কী শোকে পাথর! ক্ষোভে উম্মাতাল! অসহায়ত্বে দিশেহারা! আমি ঠিক জানিনা। কেবল জানি আমার সমস্ত শরীর যেন অচল, মন স্তব্ধ, মাথা শূন্য। আরো অবিশ্বাস্য একটি ব্যাপার আমার ভেতরে ঘটছে, আমি কিছুতেই বদরুলের মুখ মনে করতে পারছি না। কেমন একটা ঝাপসা পর্দা চোখের সামনে দুলে উঠে হারিয়ে যাচ্ছে। একটি ভয়ংকর তক্ষকের মতো ঠুকরে ঠুকরে যাচ্ছে।   

বিয়ের পর থেকেই দেখেছি যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে সে কেবল কাবিননামার স্বামী। তার সঙ্গে কোনদিনই আমার ভালোবাসা দূরের কথা বন্ধুত্ব বা স্বাভাবিক সম্পর্কও গড়ে ওঠেনি। আর এমন গড়ে না ওঠা সম্পর্কের মাঝে সে মাঝেমধ্যে স্বামীত্ব ফলাতে এলে আমার নির্লিপ্ততা দেখে আক্রোশে আরো ক্রুদ্ধ হয়ে উঠত। অত্যাচারের অলিগলি আরো পঙ্কিল হতো।  

কিন্তু এরই মধ্যে ঘটনা বা দুর্ঘটনাক্রমে জয় চলে আসে পৃথিবীতে। 

ধীরে ধীরে বুঝতে পারি বদরুল অন্য কোথাও আসক্ত। 

যেদিন প্রথম বুঝতে পারলাম, ছোট্ট জয়কে বুকে জড়িয়ে বজ্রাহত হয়ে রইলাম কয়েকদিন। এরপর যখন বদরুলের মুখোমুখি হলাম সে পুরোটা অস্বীকার করল। তারপর তেরিয়া এবং দাম্ভিক হয়ে বলল ‘তোমাদের খাওয়া পরার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে’! 
নাহ খাওয়া পরার কোনো অসুবিধা ছিল না, আজও নেই। আমাদের মধ্যবিত্তের সমাজে খাওয়া পরার অসুবিধা অনেক বড় ব্যাপার তারচেয়েও বড় ব্যাপার খাওয়া পরার সুবিধা। মৌলিক চাহিদার বিজয় কেতন বাতাস ছাড়াও পতপত করে।  
কাজেই কেটে গেল দুই যুগের অধিক কাল। কী সহজ আর ছোট্ট একটি বাক্য! কেটে গেল দুইযুগ! কিভাবে কেটে গেল তার খবর কেউ কি জানে! জানি আমি, জানে আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা। আর কিছুটা জানে আমার সন্তান। 

৪.
আরো দুদিন পরে ওর অফিস থেকে ফোন এলো। এটি একটি বিদেশি অফিস। এদের ডেকোরাম অনুযায়ী কেউ আকস্মিক মারা গেলে তার সমুদয় অর্থকড়ি তার স্ত্রী পাবে। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি কী সত্যিই ওর স্ত্রী ছিলাম! এই অর্থকড়িতে আমার অধিকার কতটুকু! তাছাড়া অধিকারের চেয়েও বড় প্রশ্ন, আমার রুচিতে যায় না। আমার মন চায় না। আমার সম্ভ্রমে বাঁধে।  
রাজ্জাক ভাই সহ অনেকেই এলেন। এই প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা চলল, জয় বলল 
-মাম্মা না চাইলে ওই টাকা নেবার দরকার নেই। 

জয়ের চাচা, মামা, বদরুলের বন্ধুরা সবাই একমত হয়, একই কথা বলে যে টাকা নেয়াই ঠিক হবে।  
আমি সামনে রাখা লাল চায়ের কাপে স্থির তাকিয়ে থাকি, দু’ফোঁটা লেবুর রসে চায়ের রঙটা কী অদ্ভুত সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। কিন্তু কিছুতেই বদরুলের মুখ আমার মনে ফুটে ওঠে না। সবাই চায় আমি যেন অফিসে যাই, কিন্তু আমি কী চাই সেটা একবারের জন্যও কেউ জিজ্ঞেশ করে না।    

-বাবা জয় আমার কথা শোন, আইনত এবং ধর্মমতে ভাবি বদরুলের স্ত্রী, এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। আর টাকাও ভাবিরই প্রাপ্য। কেন সে টাকা নেবে না! বাবা, জীবন চলার জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। তুমি এখনো ছোট আছ, তুমি মাকে বোঝাও অফিসের লোকজন ভাবিকে যেতে বলেছে। 

কদিন ধরে আরো অনেকের সঙ্গে অনেক আলাপ, আলোচনার পর সবাই ঠিক করে আমি অফিসে যাব।
সারারাত ঘুম এলো না। এলেও ছাড়া ছাড়া, অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম, জয় আমি ওর বাবা আমরা কোথায় যেন বেড়াতে গেছি, ছোট্ট জয় ঘুরে ঘুরে খেলছে আর বাবা বাবা বলে চিৎকার করছে। আর ওর বাবা হেঁটে হেঁটে দূরে চলে যাচ্ছে, আরো দূরে।
ঘুম ভাঙ্গার পর সিদ্ধান্ত নিলাম অফিসে যাব। আমার দূর সম্পর্কের এক বোন দুঃস্থ নারীদের নিয়ে একটি সংগঠন চালায়। কিন্তু অর্থের কারনে  হিমসিম খাচ্ছে। ভাবলাম, ওর পাশে দাঁড়ানো দরকার। নারীদেরকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই সংগঠনকে দাঁড় করাটা জরুরি।  
পরদিন সকালে ক’দিন আগের পত্রিকাটা ড্রয়ার খুলে বের করলাম। সেখানে বদরুলের দুর্ঘটনার ছবিসহ খবর ছাপানো হয়েছিল।
‘যমুনা রিসোর্টের কাছাকাছি একটি প্রাইভেট কার দুর্ঘটনায় একজন নারী ও একজন পুরুষ নিহত, ড্রাইভার গুরতর আহত’
বদরুলের সঙ্গে শীলাও ছিল। আমার কাছে থাকা এই এক কপি পেপার কুচি কুচি করে ছিঁড়ে কমোডে ফেলে ফ্লাশ করে দিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে ঘর থেকে পা 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর