নিশি ।। পর্ব-৪

ঢাকা, বুধবার   ০৩ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২০ ১৪২৭,   ১০ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

ধারাবাহিক উপন্যাস

নিশি ।। পর্ব-৪

ইব্রাহীম খলিল জুয়েল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৪১ ২৬ নভেম্বর ২০১৯  

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

অলঙ্করণ: মিজান স্বপন

সাত.

শোভনদের আসর বসেছে সাজিদের রুমে। সাজিদ কিছু বলতে পারছে না। কারণ শোভনের সঙ্গে যে পাঁচটি ছেলে এসেছে তাদেরকে তার মোটেই ভালো বলে মনে হচ্ছে না। শোভন যতোই খারাপ হোক, তবু তাকে যে কোনো কথা বলতে ভরসা হয়।

খারাপ বললে ও’ শুধু হাসে। ধমক দিলেও হাসে। হাজার খারাপের মাঝেও একটু ভদ্রতা, শুভ্রতা যেন তাকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। আর বাকিগুলোকে ভাই ডাকতেও ভরসা হয় না। এক্ষুণি খুন করে ফেলবে এমন ভাব। এদের মধ্যে বাবুল নামের ছেলেটি, যার মাথার চুল খুবই ছোট, লিকলিকে গড়ন, তাকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মনে হয়। সে ক্যাম্পাসে বহিরাগত। চারটি খুনের মামলা তাকে খুঁজে ফিরছে। পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে তালাশ করছে। কিন্তু সে ফেরারি।

এখান থেকে সামনে মাসে নতুন কোথাও চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো সাজিদ। প্রয়োজনে শোভনকেও নতুন ঠিকানা দেবে না। কিন্তু শোভন ক্যাম্পাসে কারো কাছ থেকে জেনে যেতে পারে। কারণ তাদের দুজনেরই কিছু কমন ফ্রেন্ড আছে। কী করবে, কী করা উচিত, সাজিদ ঠিক বুঝতে পারছে না।

শোভন একটি ফেনসিডিলের বোতলের মুখ খুলে গলায় ঢেলে দিলো। নিমেষেই বোতলটি শেষ হলো। রাসেল, কচি, মামুন, কনক, তারাও ঢালতে শুরু করলো। সাজিদ পাশে বসে দেখছে। মামুন নামের তরুণটি তাকে খুব জোরাজুরি করছে। কিন্তু সে বিনয় ভঙ্গিতে বললো, আপনারা খান, আমিতো বাধা দিচ্ছি না। আপনাদের যে কোনো ধরনের সহযোগিতার দরকার হয়, আমি করবো। কিন্তু আমার মায়ের নিষেধ। সিগারেট থাকে তো দিন একটা। বসে বসে টানি।’

‘শুধু সিগারেট খাইয়া ফিলিংস পাওয়া যায় না। ডাইল খাইয়া সিগারেট টানলে জীবনটা অন্য রকম মনে হয়। ডাইলের পরে চা আর সিগারেটই আসল। কড়া মিষ্টি দিয়া চা,’ বলে মামুন জ্বলন্ত সিগারেটটিতে ফুক দিলো। এক টানেই সিগারেটের অর্ধেক শেষ। বেহুঁশ হয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে। ধোঁয়া দিয়ে ছোট-বড় বল বানাচ্ছে।

ফেন্সিডিলের পাশাপাশি সবাই একটু করে ওয়াইন-ও টেস্ট করলো। সবার চোখই লাল হয়ে এলো, ভীষণ লাল। সাজিদ স্টোভে চা’র পানি বসিয়ে দিয়েছে। ফুটন্ত পানিতে পাতা আর চিনি একসঙ্গেই ঢেলে দিলো। চিনি একটু বেশি দিলো। বেশি করে কনডেনসড মিল্ক মেশানো চা সাজিদ সবাইকে সার্ভ করছিল। সবাই চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর সিগারেট টানছে। জানালা দিয়ে ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে বেরোচ্ছে।
শোভন সাজিদ কে ডাকলো। সাজিদ জবাব দিলো, ‘কী ডিয়ার ফ্রেন্ড।’

‘কাল ক্লাস আছে?’

‘আছে মোমেন স্যারের ক্লাস, কম্পিউটার ইন কমার্স।’

‘কর, ভালোভাবে ক্লাসগুলি করিস। আমাকে দিয়ে আর লেখাপড়া হবে না বলেই মনে হচ্ছে। মামুন, কচিদেরও একই অবস্থা। সবাই এ কোন পথে যাচ্ছে! তুই গ্রাম থেকে এসেছিস। আদর্শ ছেলে। তোর লেখাপড়া হওয়া দরকার। নইলে তোর বাবা-মা ভীষণ কষ্ট পাবে।’

সাজিদ আপত্তির স্বরে তাৎক্ষণিক বললো, ‘তোর বাবা, মা পাবে না?’

‘না। তারা কষ্ট পাবে না। কারণ আমার ওপর তাদের সংসারের ভার পড়বে না। আমার আয়ের ভরসাও তারা করে না। তাদের দরকারও নেই। কিন্তু তোর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।’

‘কিন্তু রোজগার ছাড়া পড়াশোনার আসল উদ্দেশ্যটাকে আমরা একেবারেই ভুলে গেছি। আগে যা-ও বড়দের কাছে শুনতাম লেখাপড়ার আসল উদ্দেশ্য মানুষের মতো মানুষ হওয়া; অনেক বড়, অনেক মহৎ হওয়া। কিন্তু এখন সে কথাগুলো হারিয়ে গেছে। জীবনের প্রয়োজনে আর অভাবের তাগিদে মানুষ আর দূরে দেখতে পাচ্ছে না। তাই একটি চাকরি পাওয়াই পড়াশোর মূল উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে।’

শোভন এ প্রসঙ্গে আর কিছু বলল না। তার কথা জড়িয়ে আসছিল। সে ফ্লোর থেকে উঠে এসে সাজিদের খাটে শুয়ে পড়লো। তার মুখ শুকিয়ে আসছে। মুখে কোনো লালা পর্যন্ত নেই। জিহ্বা শুকনা দেখাচ্ছে। সে জিহবা নেড়ে চেড়ে মুখে রস আনার চেষ্টা করছে।

বাকি পাঁচজন পা ছড়িয়ে মুখোমুখি গোল হয়ে বসছে। মামুন তৈরি করা গাঁজা ধরিয়ে ফেললো। এটি ক্রমে হাত বদল হচ্ছে। মামুন হঠাৎ হাসতে শুরু করলো- হো.. হো.. হা... হা.. হা..। শোভন খাটে ঘুমিয়ে পড়েছে। কনক, রাসেল ও কচি এ লাইনে নতুন এসেছে। পরপর দুটি নেশার ধাক্কা তারা সামলাতে পারছে না। গাঁজার তিন টানের মাথায় কনক অ... করে বমি করে দিলো। মামুন কনককে কষে একটি থাপ্পর দিলো। ‘ব্যাটা বাথরুমে যাইতে পারলি না। পুরান পাগল না খাইয়া মরে, নতুন পাগলের আমদানি।’সে গাঁজায় টান দিয়ে আবার বসে পড়লো। কচি ও রাসেল উপরের দিকে তাকিয়ে অ.. অ.. করছে। কিন্তু বমি করতে পারছে না।

কনক বমি করার পর বাবুলের পাশে গিয়ে বারান্দায় বসেছে। কনকের মাথা এখন হালকা লাগছে। শরীর খুব হালকা ও আরাম বোধ করছে। এতোক্ষণ অস্থির অস্থির লাগছিল। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলো। তারপর কচি ও রাসেলকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘তোরা যাবি? আমি যাই।’

কচি বললো, ‘এক মিনিট দাঁড়া দোস্ত। বমিটা কইরা লই।’

কচি বাথরুমে ঢুকে মুখের ভেতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিলো। অমনি অ... অ... করে বমি করলো। সে বসে পড়লো। রাসেলও কচিকে অনুসরণ করলো। বমি শেষ করে তারা তিনজন একসঙ্গে নেমে গেলো।

বমির টক টক গন্ধে সাজিদেরও বমি আসার উপক্রম হয়েছে। তখন থেকেই সে বারান্দায় থু থু করছিল। সে এবার মামুনকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী ভাই এখন কেমন লাগে?’

মামুন বললো, আমার কোনো রকম লাগে না। আমি ঠিকই আছি। ঝামেলা করে সব নতুন পাগলে। হালাগরে যে কে আনল এইখানে। সব দোষ শোভনের। দুধের বাচ্চারে লইয়া আইছে আসরে। সব আড্ডায় তাগরে আনা ঠিক না। বাবুল কই? চল যাই।’

বাবুল বারান্দায় শুয়ে ছিল। সে উঠে এলো। ‘শোভন কি ঘুমায়?’ মামুনকে জিজ্ঞেস করলো।

‘হ্যাঁ- চল আমরা যাই। শোভন ঘুমায়।’

তারা দুজনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলো। সাজিদ মনে মনে শুকরিয়া আদায় করলো। এতোক্ষণ যে কান্ড হলো ভাগ্যিস বাড়িওয়ালা এ বাসায় থাকে না। না হলে তোলপাড় হয়ে যেতো। বাড়িওয়ালা সব জেনে যেতো। মানসম্মান কিছুই থাকত না। তাছাড়া বাড়িওয়ালা লোক যেমন ভালো তেমন বাঁকা। একটু ইনফরেমশন পেলে কালই তাকে বাসা ছাড়তে বাধ্য করাতো। এমনিতেও সে কাল থেকে অন্য এলাকায় বাসা খুঁজবে, এ এলাকা ছেড়ে অনেক দূরে। শোভনকেও সে নতুন ঠিকানা বলবে না।

সাজিদ বালতিতে করে পানি এনে নাকে গামছা বেঁধে ঘর ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করলো। তার ভীষণ খারাপ লাগছে, মাথা ঘুরাচ্ছে। নেশা করলে যেমন মাতাল মাতাল হয় তেমন লাগছে। রাতে সে কিছুই খেলো না।

আট.

নিশি ভেবেছিল তার ভাই জাহেদ পর দিনই পিয়ারপুর চলে আসবে। কিন্তু এলো না। দুদিন পর একটি রেজিস্ট্রি চিঠি এলো করিম সাহেবকে সম্বোধন করে যার মূল অংশ ছিল...

‘আমি জানি নিশি পিয়ারপুরেই আছে। এ ছাড়া সে অন্য কোথাও যাবে না। অন্য কোথাও থাকার অভ্যেসও তার নেই। গেছে যখন কিছুদিন থেকে আসুক। সম্ভব হলে পরীক্ষা দেবে, না হলে অনিবার্য নয়। আগে হলো জীবন, পরে পরীক্ষা। জীবনের জন্যেই পরীক্ষা, পরীক্ষার জন্যে জীবন নয়। ঢাকায় আর কিছুদিন থাকলে সেও অসুস্থ হয়ে পড়বে, এমনকি মাদকাসক্তও হতে পারে কিংবা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা তাকে সারাজীবন পুড়িয়ে শেষ করবে। শোভন নামের এক তরুণের সাথে তার বন্ধুত্ব রয়েছে। সে তরুণটি মাদকাসক্ত এবং আর্মস ক্যাডার হিসেবে চিহ্নিত কিছু পথভ্রষ্ট তরুণের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই পরিস্থিতিতে জেনে শুনে তাকে আমরা ভাসিয়ে দিতে পারি না। আমরা ভালো আছি। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আপনি এবং আম্মাজান বেড়াতে আসবেন।
ইতি আপনার স্নেহের পুত্র- জাহেদ।’

করিম সাহেব চশমাটি কাপড় দিয়ে ভালো করে মুছে আবার চোখে লাগালেন। তিনি দ্বিতীয়বার চিঠিটি পাঠ করছেন। মাঝে মাঝে তার ভ্রু কুচকে যাচ্ছে। চিঠিটি তিনি দ্বিভাঁজ করলেন। তারপর একটু উঠে গিয়ে বুক শেলফে একটি মোটা বইয়ের ভেতর রেখে দিলেন। করিম সাহেবকে বেশ খুশিই দেখাচ্ছে। ঢাকা থেকে চিঠি এসেছে এ খবর বাড়ির কেউ পেলো না।

নিশি উঠানে বড়ই গাছতলায় চেয়ারে বসে গল্পের বই পড়ছে। এখন ফাল্গুন মাসের শেষ। আমের বোল এবং কাঁঠালের মুচিতে চারদিকের গাছগুলো ছেঁয়ে গেছে। নিশি মৌ-মৌ গন্ধ পাচ্ছে। এর সঙ্গে পাচ্ছে মাটির গন্ধ। শুকনো মাটি। মাটির গন্ধ তার খুব ভালো লাগে, খুব আপন মনে হয়। ‘জন্মেছি মাগো তোমার কোলেতে মরি যেন এই দেশে’কবিতার চরণ দুটিকে খুবই সার্থক মনে হয়। কয়েকটি প্রজাপতি রঙ-বেরঙের পাখা মেলে তার চারপাশে ঘুরছে। বরই গাছের ডালে বসছে আবার উড়ে যাচ্ছে। খুব দূরে যাচ্ছে না, আবার আগের জায়গাতেই বসছে। এক অজানা ভালো লাগার অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করেছে।

নিশি একটি গল্পের বই পড়ছে। কৃষণ চন্দরের লেখা। গল্পে একটি ছোট্ট মেয়ে, নাম জলিয়া। সে তার মায়ের সঙ্গে ট্রেনে যাচ্ছে শিমুলিয়া। আগামীকাল ওর বাবার ফাঁসি হবে শিমুলিয়া জেলখানায়। একটি লোককে হত্যার দায়ে তার ফাঁসি হচ্ছে। জলিয়া তার মায়ের কোলে বসে যাচ্ছে। যেতে যেতে লেখকের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং ভাব জমে ওঠে। কাল ওর বাবার ফাঁসি এ কথা সে লেখককে জানালো। তার মা তাকে জোরে একটি থাপ্পর দিয়ে কোলে টেনে নিলো। একটি ছোট্ট চার বছরের মেয়ে নিশ্চিত জানে পরদিন তার বাবার মৃত্যু হবে এবং বাবার সঙ্গে এটিই তার শেষ দেখা। কিভাবে সে এ যন্ত্রণা সইবে! কষ্টে নিশির মনটা ভার হয়ে এলো।

নিশির মা ও বাবা এদিকে আসছেন। দু’জনই হাসিমুখে। নিশি লক্ষ করলো সে আসার পর থেকে তাদের দু’জনের মাঝে সে বৈরী ভাব আর নেই। তারা এখন হাসিখুশী, কাজের অবসরে গল্পগুজব করেন। কাল বিকেলে লাউয়ের মাচা বেঁধেছেন। এখন তাদেরকে দেখে মনে হয় বিশ্বের সেরা সুখী দম্পতি। তাহলে এ পরিবর্তন কি নিশি আসার পরই হয়েছে, না কি তাদের শূন্যতা, অসুখ, ক্ষোভ, না পাওয়ার দুঃখ তারা নিশিকে বুঝতে দিচ্ছেন না। নিশি চলে গেলে সম্পর্ক কি আবার আগের মতোই হয়ে যাবে? নিশি ঠিক ভেবে পাচ্ছিলো না। তার এটুকু বয়সে মানুষের নানারকম অদ্ভুত স্বভাবের সঙ্গে সে পরিচিত হয়েছে। তার বাবা-মার সম্পর্কে জানা উচিৎ। সমস্যাটা তাদের নিজের। নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই অংশ নিয়ে মিটমাট করা ভালো। কিন্তু বাবা-মা বলেই তাদের সম্পর্কে কিছু বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ইচ্ছে হলেও আবার প্রচন্ড অনিচ্ছা তাকে বাধা দিচ্ছে। আর ছোট হয়ে বড়দের বিষয়ে জড়িয়ে পড়াটা বেমানান দেখায়। এ বিষয়ে তারা তাকে সহজভাবে নাও নিতে পারে। এটা মানসিকতার বিষয়। ছোটদের মতামত গ্রহণের মানসিকতা থাকতে হবে। সে আরো ভাবছে যে আমাদের চিন্তা এবং বোধশক্তিতে কিছু ভুল রয়েছে। গতিশীল বিশ্বকে আমরা খুব সহজে মেনে নিতে পারি না। এটি হয়তো আমাদের সংস্কারও হতে পারে। বয়সে যে যতো ছোট তাকে ততো প্রবীণ ভাবতে হবে। কারণ বয়সের কারণেই বড়দের চেয়ে এই বিশ্বকে সে নতুন দৃষ্টি নিয়ে দীর্ঘদিন দেখতে পারবে। বড়দের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও গবেষণার জ্ঞানকে বই পড়ে অল্প সময়েই সে জেনে নিতে পারে এবং এর পর থেকে সে তার অভিযাত্রা শুরু করতে পারে। এদিক থেকে বয়সে যারা বড় তাদের থেকে সে বড়।

নিশি এতোক্ষণ অন্যমনস্ক ছিল। কী একটি ভাবনা তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। তার ঘোর কাটল, সে মনে মনে লজ্জিত হলো। গ্রামে এলেই তার এ রকম হয়। মাটির গন্ধ, এটিতেও মনে হয় নতুন কিছু আছে। সন্ধ্যাবেলায় একটি আতাগাছকে দেখে মনে হয় এটি যেন কার তপস্যা করছে। ধানের ক্ষেত দেখেও তার নতুন কিছু মনে হয়। এখানে তার জীবনের গতি অনেকটা থেমে যায়, ধীর হয়ে যায়, ঘড়ির কাঁটা এখানে যেন ধীরে চলে। তার আর কোনো বন্ধুকে তো সে এমন হতে দেখে না!

করিম সাহেব জিজ্ঞেস করেলন, কি করছিস মা।’
‘এই তো গল্পের বই পড়ছি। বই পড়ার খুব সুন্দর সময় এখন।’
মা হাতে করে একটি মোড়া নিয়ে এসেছিলেন। তিনি নিশির পাশেই বসলেন। তিনি সহাস্যে বললেন, ‘দেখি তোর মাথা দেখে দিই। তিন বছর মাথায় হাত পড়ে না। সেই কবে দেখেছিলাম। অশ্রু সংবরণ করতে নিশির কষ্ট হচ্ছিলো। এতোদিনে সে আবিষ্কার করলো তার নিজের মাঝেও একটি গহ্বর রয়েছে, রয়েছে শূন্যতা। কিন্তু এটাকে সে মোটেও পাত্তা দেয়নি। একটু সহানুভূতি আজ একে জাগিয়ে তুললো। করিম সাহেব স্কুলে যাবেন বলে চলে গেলেন। তার মুখে হাসি, প্রাণ তার আনন্দে নাচে।

নিশি মাকে বলল, ‘আচ্ছা মা, ভাইয়া ঢাকায় বাসা নেয়ার পর তুমি এবং বাবা কেউ গেলে না। ভাইয়া চিঠিও লিখেছে অনেক বার যাবার জন্যে।’
‘সময় করে উঠতে পারি না। আর চার মাস আছে তোর বাবার রিটায়ারমেন্টের। এরপর যাবো। বৌ-মা অনেক দিন ধরে আসছে না। জাহেদকে লিখতে হবে ওকে নিয়ে আসার জন্যে। সারাদিন একা একা বাসায় থাকে। এখানে কদিন রাখতে বললাম। জাহেদ রাজি হলো না। ওর সেখানে অসুবিধা হয়।’

নিশি খুব তৎপর হয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলো, ‘আচ্ছা মা, শিক্ষকতা পেশাটা কেমন?’
‘ভালো,’ তিনি উদাসভাবে বললেন আর নিশির মাথায় বিলি দিতে লাগলেন।
‘কিন্তু তুমিতো শিক্ষকতা পছন্দ করো না। বাবাকে তো তুমি সারাজীবন পছন্দ করো নি শিক্ষকতা করেন বলে।’
‘তোকে কে বললো?’

বলবে কে, আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। তোমরা কোনোরকমে সংসারের দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে যাচ্ছ। কারো প্রতি কারো আন্তরিকতা নেই আবার ঝগড়াও হয় না। কিন্তু যার যার ইচ্ছাতে দু’জন চলো, কোনো আন্ডারস্ট্যান্ডিং নেই।’
‘সবই আছে। তুই বুঝতে পারিস না তাই এমন মনে হয়।’

‘বুঝতে পারি না বলেই তো তিন বছর ধরে আসি না। ভাইয়াও তো আসে না। শুধু চিঠি লিখে।’

নিশি অযাচিতভাবেই বললো, ‘একটি বড় লোকের ছেলেকে আমি জানি, শিল্পপতির ছেলে। সে নষ্ট হয়ে গেছে। তার পারিবারিক বন্ধন নেই। সবাই যার যার মতো আছে। যে কোনো সমস্যাকে টাকা দিয়ে বিচার করে। কিন্তু ছেলেটি একেবারেই বাজে হয়ে গেছে। বাঁচবেও না বেশি দিন।’
‘কে? তুই জানিস কিভাবে।’

‘ঢাকাতেই থাকে। আমাদের বাসা যে এলাকায় সে এলাকায়ই ওর বাসা। জানো মা, ওর হাজার দোষের মধ্যে একটি বড় গুণ হলো ও ভালো ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কিন্তু এতোদিনে খারাপ হয়ে গেছে। পড়াশোনাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছে। ও ড্রাগ এডিকটেড।’

‘ড্রাগ এডিকটেড!’

‘হ্যাঁ, চলো মা ঘরে যাই। ভীষণ রোদ উঠেছে। পাতার ফাঁক দিয়ে আঁচ আসছে।’

‘হ্যাঁ চল ঘরে যাই, চোখ ব্যথা হয়ে গেছে।’

**
শোভনের কথা নিশির খুব মনে পড়ছে। ভুলে থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু বারবারই সে ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। শোভনের সঙ্গে আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, জাদুঘর, চারুকলা ঘুরে দেখা; জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে প্রকৃতির কোলে সময় কাটানো- সুন্দর সে ক্ষণগুলোর কথা মনে পড়ছে খুব।
লালবাগ কেল্লায় গিয়ে বললো, ‘দেখো নিশি, এটা পরী বিবির মাজার। পরী বিবি ছিলেন বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খাঁর কন্যা।’
‘আমি জানি। পন্ডিতি করতে হবে না।’

শোভন আবার বলতে শুরু করলো, ‘শায়েস্তা খাঁ এ দুর্গ নির্মাণ করার সময় ১৬৮৪ সালে তার অতি আদরের মেয়ে ইরান দুখত রাহমাত বানু যিনি পরী বিবি হিসেবে পরিচিত, তিনি মারা যান। কন্যা মারা যাওয়ার পর শায়েস্তা খাঁ দুর্গ তৈরির কাজ অসমাপ্ত রেখেই বন্ধ করে দেন। শায়েস্তা খাঁর আগে অবশ্য এর নির্মাণ কাজ প্রথমে শুরু করেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র, মুঘল রাজপুত্র আজম শাহ। কিন্তু মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য পিতা সম্রাট আওরঙ্গজেবের ডাকে তিনি দিল্লি চলে যান।’
শোভনের ‘পান্ডিত্য’নিশির বেশ ভালোই লাগছে।
টিপ্পনি কেটে বললো, ‘তারপর?’

‘লালবাগ কেল্লার নিচে আছে অনেকগুলো সুড়ঙ্গ। সুবাদার ও তাদের সৈন্যরা শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে এসব সুড়ঙ্গ পথে নিরাপদে সরে যেতেন। তেমন একটি সুড়ঙ্গ আছে এখানে, যার ভেতর কেউ ঢুকলে তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। এমন কথাই প্রচলিত আছে। পরীক্ষা করার জন্যে একবার দুটো কুকুরকে চেইনে বেঁধে সেই সুড়ঙ্গে নামানো হয়েছিল। চেইন ফেরত এলেও কুকুর দুটো ফিরে আসেনি।’
শোনে নিশির গা কেমন কাটা দিয়ে উঠলো।

শোভন একদিন বললো, ‘দেখো আমরা কতো দূরে ঘুরতে যাই। কিন্তু ক্যাম্পাসে আছে কার্জন হল। এটাকে ভালো করে দেখি না। এটি শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ভবন ও পুরাকীর্তি। এর নির্মাণশৈলী স্থাপত্য বিদ্যার ক্লাসে পড়ানো হয়। ইউরোপ ও মুঘল স্থাপত্য রীতির অপূর্ব সংমিশ্রণে নির্মিত এই ভবন ঢাকার অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন।’বলতে বলতে পুরো কার্জন হল ঘুরে দেখালো।
একদিন নিয়ে গেলো বলাকায় সিনেমা দেখাতে। নিশি যাবে না, যাবে না বলেছে। তাতে কী? শোভন বললো, ‘সিনেমা না দেখলে মনের দুয়ার খোলে না।’

‘তুমি তো ভালোই কাব্যিক হয়েছো।’
‘কিসের কাব্যিক। সত্য কথা বললেই কাব্যিক!’

‘আরে বাবা, সত্য-মিথ্যার বিষয় না। কাব্য করে কথা বলেছ তাই বললাম। মজা করেছি।’

‘শোনো তাহলে একটি ধাঁধা দেই তোমাকে। মনের দুয়ার নিয়ে একটি বিখ্যাত গান আছে একজন বিখ্যাত শিল্পীর। বলতো গানটি কী?’
নিশি অনেক চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলো না। শোভন একটু গুন গুন করতেই মনে পড়ল।

‘ওহ্, বুঝতে পেরেছি। ‘ওগো মনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থেকো না, ঘরের দুয়ারে এসো, শুধু হৃদয় নদীর ঢেউ দিয়ে আজ, চোখের জোয়ারে মেশো।’ আরতি মুখার্জির গান।’
‘একশতে একশ’।

ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবৃত্তি, টিএসসি চত্বরে কনসার্ট, পথনাটক এসবের দিকে শোভনের ঝোঁক ছিল। অংশ নিতো না কিন্তু মনোযোগী দর্শক ছিল। সেই ছেলেটি কিভাবে মাদকের প্রতি আকৃষ্ট হলো বুঝতে পারছে না নিশি। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কি! কিন্তু নিজের কি কোনো বিবেক বুদ্ধি নেই? প্রথম কিভাবে শুরু হয়েছিল, কী দিয়ে শুরু হলো ভেবে কোনো ক্লু পাচ্ছে না নিশি। তবে কি শোভনের মাঝে আছে কোনো ক্ষোভ, বঞ্চনা, পরিবারের কোনো ঘটনা, যা তার মাঝে বড় কোনো শূন্যতা সৃষ্টি করেছে? যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। অথচ ভেতরে তাকে স্লো পয়জনের মতো শেষ করে দিচ্ছে। তার পরিবার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। মনে হয়েছে সুখী পরিবার। কখনো কিছু জানতে চাইলে দ্রুত উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যেতো। কারো ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে বেশি জানার আগ্রহ দেখানোটাও ঠিক না। তাই নিশি খুব বেশি জানতেও চায়নি কখনো।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর