Alexa নির্বাচন সামনে বিরোধী জোটের সন্ত্রাস সম্ভাবনা

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৬ ১৪২৬,   ২১ মুহররম ১৪৪১

Akash

নির্বাচন সামনে বিরোধী জোটের সন্ত্রাস সম্ভাবনা

অমিত গোস্বামী

 প্রকাশিত: ১৬:০০ ২০ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৬:০৫ ২০ ডিসেম্বর ২০১৮

অমিত গোস্বামী
কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

আমার বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সফরে বিরোধী দলের সমর্থকদের একটি কথা খুব শুনলাম– যদি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হয় তাহলে শাসক দল তিরিশটাও আসন পাবে না।

অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন মানে? যদি সহিংসতা না হয়, শাসক দল বলপ্রয়োগ না করে, যদি পুলিশ বাহিনী সরকারি দলের হয়ে গুণ্ডাবাজি না করে। কথাটা শুনে হাসি পেল। বাংলাদেশের কামাল-জামাল-বামাল’রা কি ভোটের হিসাব করেন না? না কি তাদের কোন সেফোলজিস্ট নেই? আন্দাজ বুদ্ধি তো থাকা উচিত। ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ এর হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫ আর নারী ভোটার ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটার ছিলেন ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন। ২০০৮ সালে ছিলেন ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার। অর্থাৎ গত ১০ বছরে তরুণ ভোটার বেড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ। আঠারো থেকে আঠাশ বছর বয়সের ভোটার অর্থাৎ তরুণ ভোটার ২ কোটি ১৫ লক্ষ, যা মোট ভোটারের ২০.৬৫%। এই নব্য ভোটাররা মুক্তিযুদ্ধ, আদর্শ, দলাদলি কম বোঝে। এরা বোঝে উন্নয়ন। এরা বোঝে রাস্তাঘাটের উন্নতি। এরা বোঝে এই দেশে আমার ভবিষ্যৎ কী। এরা বোঝে এই দেশে আইন শৃঙ্খলা কোন মানের। এই নব্য ভোটাররা শেখ হাসিনার উন্নয়ন চোখে দেখেছে। তাই তারা হাসিনা জোটের পক্ষে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ৪৯.০ শতাংশ ভোট নিয়ে আসন পায় ২৩০টি। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ৩৩.২ শতাংশ ভোট নিয়ে আসন পায় মাত্র ৩০টি। দশ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে যে স্বাভাবিক জনপ্রিয়তাহ্রাস যদি মাথায় রাখা যায় তাহলেও ক্ষমতাচ্যুতির ন্যুনতম সম্ভাবনা আওয়ামী লীগের নেই। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? ‘চোরের মায়ের বড় গলা’ বাক্যটির সাথে সবাই পরিচিত। বিরোধী পক্ষ আগেই গাইতে শুরু করেছে যদি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়... এখানেই আমি অন্তত সিঁদুরে মেঘ দেখছি। কারণ আমি এই ছক নিজের চোখে দেখেছি পশ্চিমবঙ্গে ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। সেবার পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃনমূল কংগ্রেসের পক্ষে তুমুল হাওয়া। লড়াকু মমতা কখনোও শান্তিপুর্ণ কখনও মারমুখী আন্দোলন করে জনসমর্থনের তুঙ্গে বিরাজ করছেন। বদল চাই আওয়াজ দিকে দিকে। ঘুঁটি সাজালো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধারী বামজোট। সকাল থেকেই বুথ জ্যাম, সাংবাদিকদের সাথে কানামাছি খেলা, সকাল দশটায় বিভিন্ন বুথে বোমা পড়ল – মমতার আগে তারা চেঁচিয়ে বলল সন্ত্রাস, সন্ত্রাস। যেন সব মমতার কারসাজি। ভোটের ফলাফল বেরোল। বামজোট ২৩৫ আসন বিরোধীরা ৩৫। মানুষ বুঝল খেলাটা কোথায় হল, কিন্তু ততক্ষণে বিরোধীদের হাত থেকে তাস বেরিয়ে গেছে। তাই এবারে যখন বাংলাদেশের বিরোধীদের মুখে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট সম্পর্কে সন্দেহবানী শুনছি তখনই আমার মাথায় সন্দেহ জাগছে যে এই আগাম জিগিরের পিছনে উদ্দেশ্য কী?

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে যে আওয়ামী লীগ তুমুল ভাবে জয়ী হবে তা আজ নিশ্চিত। কিন্তু বিরোধীদের কথা বার্তা কিন্তু অন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মাত্র কিছুক্ষণের খেলায় আওয়ামী জোটকে কাবু করতে পারলে অনেক হিসাব উলটে ফেলা যাবে। দায় পড়বে সরকারের ঘাড়ে কারণ তারা নির্বাচন পরিচালনা করছে। একটা কথা আজ ক্ষমতাসীন নেতৃত্বকে মাথায় রাখতে হবে তা হল তাদের দলীয় কর্মীরা সন্ত্রাসের শিক্ষা নেয়নি। পুলিশ বা র‍্যাব বাহিনী ট্রেনিং নিলেও সম্মিলিত সন্ত্রাসের মোকাবিলা করতে সময় নেবে। যা তারা ২০১৩ ও ২০১৪ তে করে দেখিয়েছে। ঝটিতি সন্ত্রাসের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। অথচ তাদের বিরোধী দলের রেকর্ড স্মরণযোগ্য। দেখুন তাদের রেকর্ড। 

বিএনপি-জামায়াত ৪ দলীয় জোট সরকার (২০০১-০৬) সময়ের সন্ত্রাস

২০০১ সালে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের "সন্ত্রাস-রাজনীতি” সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া ও সাবেক সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টারসহ আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতা ও কর্মীদের হত্যা করে। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ১৮ বারের বেশি চেষ্টা চালানো হয়। আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। হামলার উদ্দেশ্য ছিলো দলের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সকল নেতাকে হত্যা করা। এরপর ২১শে আগস্ট হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী এবং এর সহযোগী সংগঠনের সদস্যরা নিহত হন এবং আহত হন ৩শ’ জনেরও বেশি নেতাকর্মী। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মরহুম প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমান।

সংখ্যালঘুদের উপর সহিংসতা:

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট মতে, “২০০১ সালের ১ অক্টোবর বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে ভোট না দেয়ার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামাত জোট একের পর এক হামলা করতে শুরু করে, কারণ তাদের বিশ্বাস ছিলো যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটারেরা আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে। নির্বাচনের পরের অবস্থা ছিলো আরো পরিকল্পিত, ছকবদ্ধ এবং গুরুতর। প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় সেসময় বিএনপি জোটের হামলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ছিলো বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, যশোর, কুমিল্লা ও নরসিংদী। ওই সময় আক্রমণকারীরা হিন্দুদের বাড়িতে ঢুকে তাদের পরিবারের সদস্যদের মারধর, তাদের সম্পত্তি লুটপাট এবং অনেক হিন্দু নারীদের ধর্ষণও করে।”

কানাডার ইমিগ্রেশন এবং শরণাথী বোর্ডের গবেষণা অধিদফতরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর বাংলাদেশে নির্বাচনের সময়কালে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর সহিংসতার ঘটনাগুলো বিবিসি (১০ অক্টোবর ২০০১), গাল্ফ নিউজ (১২ ফেব্রুয়ারী ২০০২), প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (২০ অক্টোবর ২০০১), এবং প্যাক্স ক্রিস্টি (২৬ নভেম্বর, ২০০১) ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পায় । এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, “ঘটনাগুলোতে ধর্ষণ, নির্যাতন, হত্যা ও লুটপাটের পাশাপাশি হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। সহিংসতার শিকার হয়ে শত শত হিন্দু পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়। দ্য ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়য়েন্স জানায় যে বেশিরভাগ সহিংসতা বিএনপির কর্মীদের দ্বারা সংঘটিত হয়... হিন্দুদের উপর আক্রমণগুলো সারাদেশে বিভিন্ন জেলায় ঘটেছে।”

২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকে ধর্মীয় সংখ্যাঘুদের উপর হামলা অব্যাহত রয়েছে আর এ কারণেই বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মন্দির এবং গির্জায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি প্রয়েজন পড়ছে।

বাংলাদেশে সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগের তদন্ত অনুযায়ী, দেখা গেছে (বিএনপি) এবং জামায়াতের ২৬,৩৫২ নেতা এবং সমর্থকদের ওই দাঙ্গায় জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয় গেছে। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২৬ জন মন্ত্রী এবং আইনপ্রণেতারা রয়েছেন। অভিযুক্ত ৬ মন্ত্রী হলেন: রহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আবদুস সালাম পিন্টু, মতিউর রহমান নিজামী, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, তারিকুল ইসলাম ও হাফিজউদ্দিন। তাদের মধ্যে, আলতাফ হোসেন চৌধুরী তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।

যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতা (২০১৩)

২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াত-শিবির সমর্থকরা ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। ২০১৩ সালে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক সহিংসতার ৪১৯ টি প্রধান ঘটনায় ৪৯২ জন নিহত হয় এবং ২২০০ জন আহত হয়।

দশম জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা (২০১৪-২০১৫) ২০১৪: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিরোধিতা করে বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়। তারা সেসময় শত শত যানবাহন ভাংচুর করে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় তাদের পেট্রোল বোমা, হাতে বানানো বোমা এবং অন্যান্য সহিংসতায় ২০জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। সহিংসতার সময় রাস্তার পাশে থাকা হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলে জামায়াত-শিবির কর্মীরা।

২০১৫: ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন আবারও জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু করতে চায় বিএনপি-জামায়াত জোট। ওই সময় ২৩১ জনকে হত্যা করে তারা। যাদের বেশিরভাগই পেট্রোল বোমা এবং আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায়। ওই ঘটনায় আহত হয় আরো ১ হাজার ১শ’ ৮০ জন। সেসময় ২,৯০৩টি গাড়ি, ১৮টি রেলগাড়ি এবং ৮টি যাত্রীবাহী জাহাজে আগুন লাগিয়ে হামলা চালায় তারা।

আমি নিজের চোখে দেখেছি সে সময়ের বাংলাদেশকে। সে সময় শেখ হাসিনার হাতে পুলিশ বা র‍্যাব ছিল। কিন্তু তাকে এই সন্ত্রাস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে সময় লেগেছিল। এবারে সারা দেশে ভোট একদিনে। কাজেই ভোটপ্রক্রিয়াকে কিছু সময় ধরে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন কাজ নয়। মুখে বিরোধীপক্ষ একটি রটনা ছড়াচ্ছে যে আওয়ামী লীগ সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোট নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু একথা বলছে না যে এই অপকর্ম বিভিন্ন সময়ে তারা করে দেখিয়েছে। সরকারকে এবারে সাবধানে থাকতে হবে। তাদের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হচ্ছে। তারা জিতলে বিরোধীরা নিশ্চিতভাবে বলবে যে সরকারি ক্ষমতার অপপ্রয়োগে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু মাত্র কয়েকঘন্টার দেশব্যাপী সন্ত্রাসসৃষ্টি করে বিরোধীরা যদি ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছে যায় তাহলে বলবে – দেখো, সরকারি তত্ত্বাবধানে সংগঠিত নির্বাচনে আমরা ক্ষমতা পাচ্ছি, অথচ আমাদের সন্ত্রাসী বলছে পরাজিত সরকারি দল, এ কি বিশ্বাসযোগ্য? কাজেই বাংলাদেশ সরকারকে ভোটের দিন সন্ত্রাস রুখতে হবে এবং নির্বাচন অবাধ শান্তিপূর্ণ করতে হবে যা তাদের দলের বিজয় লক্ষ্যের প্রথম সোপান।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর