Alexa নির্বাচনী বার্তা পৌঁছাতে প্রয়োজন পেশাদারী সাহায্য

ঢাকা, রোববার   ১৮ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৩ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

নির্বাচনী বার্তা পৌঁছাতে প্রয়োজন পেশাদারী সাহায্য

অমিত গোস্বামী

 প্রকাশিত: ১৪:৪১ ২ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৪:৪১ ২ ডিসেম্বর ২০১৮

অমিত গোস্বামী
কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচনে ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ এর হিসেব অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫ আর নারী ভোটার ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটার ছিলেন ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন।

২০০৮ সালে ছিলেন ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার। অর্থাৎ গত ১০ বছরে তরুণ ভোটার বেড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ। আঠারো থেকে আঠাশ বছর বয়সের ভোটার অর্থাৎ তরুণ ভোটার ২ কোটি ১৫ লক্ষ, যা মোট ভোটারের ২০.৬৫%। (তথ্য সূত্রঃ ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস ০১/০২/২০১৮)। একেবারে নতুন ভোটার ৪৩ লক্ষ। তরুণ ভোটারের কোনো সংজ্ঞা নেই, তবে ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সের ভোটারদেরই তরুণ ভোটার বলে বেশির ভাগ গণতান্ত্রিক দেশ সংজ্ঞায়িত করে থাকে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে ধারণা করা হয় যে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৯ কোটি ভোটারের মধ্যে ৬০ শতাংশ তরুণের সংজ্ঞায় পড়ে। কাজেই এবার ভোটে বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে তরুণ ভোটাররাই মূল ফ্যাক্টর হতে চলেছে জয় পরাজয় নির্ধারণে।  

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ভোট পেয়েছিল ৩০.৮ শতাংশ আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩০.১ শতাংশ। ওই নির্বাচনে বিএনপি পায় ১৪০টি আসন, আওয়ামী লীগ ৮৮টি। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩৭.৪ শতাংশ এবং বিএনপি ৩৩.৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আওয়ামী লীগের আসন ছিল ১৪৬টি এবং বিএনপির ১১৬টি। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৪১.৪০ শতাংশ ভোট নিয়ে ১৯৩টি আসন পায়। আর আওয়ামী লীগ ৪০.০২ শতাংশ ভোট নিয়ে আসন পায় মাত্র ৬২টি। এই নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ বুঝেছিল একার জোরে আর ক্ষমতায় আসা যাবে না। তাই তারা তৈরি করে মহাজোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ৪৯.০ শতাংশ ভোট নিয়ে আসন পায় ২৩০টি। অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট ৩৩.২ শতাংশ ভোট নিয়ে আসন পায় মাত্র ৩০টি। অর্থাৎ আসন ভাগাভাগির সঠিক অঙ্কে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এবারেও সেই অঙ্কের খুব একটা হেরফের হয় নি। কূটনৈতিক যুদ্ধে আওয়ামী লীগের কাণ্ডারী শেখ হাসিনা ভারতের নরেন্দ্র মোদিসহ বিশ্বের তাবড় দেশের নেতাদের যেখানে একঘাটে জল খাইয়েছেন সেখানে অন্য দলের নেতারা তো নেহাত দুগ্ধপোষ্য শিশু। কিন্তু বিএনপি লড়ছে দূরাগত নির্দেশের ভিত্তিতে।

ইদানীং বিভিন্নভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে সাধারণ আলোচনায় মনে হয়েছে যে তরুণেরা ক্রমেই একদিকে যেমন ভোট প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন, তেমনি দেশের রাজনীতির বিষয়ে বেশ উদাসীন। এ ধরনের মনোভাব সাধারণত শহুরে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে দৃশ্যমান। কিন্তু মফস্বলের তরুণরাও এ ব্যাপারে ভালই গা এলানো। এক্ষেত্রে ‘না’ ভোট চালু করা যেত। তাতে বুথমুখী জনতার সংখ্যাবৃদ্ধি হত। প্রার্থীরাও বুঝত তাদের জনপ্রিয়তার দৌড় কতটা। ‘না ভোটের’ উদ্দেশ্যই তরুণ ভোটারদের তাদের মৌলিক অধিকারকে নিশ্চিত করার একটা প্রয়াস। কিন্তু সেটা হয় নি। কিন্তু আজ এই তরুণ ভোটাররাই আগামী নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে চলেছেন।

কাজেই এই নবীন প্রজন্মের কাছে নিজেদের বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে পৌঁছে দেওয়া খুব জরুরী। এবারের ভোটে ফ্লেক্স, ব্যানার বা কাগুজে অস্ত্র খুব একটা কাজ করবে না। মিছিল মিটিং দরকার হবে পেশী প্রদর্শনের জন্যে যাতে নিজেদের সমর্থকরা নির্ভরতা পায় ভোট দেওয়ার জন্যে বুথে যাওয়ার। তাহলে প্রচারের রূপরেখা কি হওয়া উচিৎ? ইতোমধ্যে তরুণদের টার্গেট করে রাজনৈতিক দলগুলো ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব এবং ই-মেইলের মাধ্যমে প্রার্থী এবং দলের ক্যাম্পেইন করছে। ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার বা প্রচারণার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম-কানুন না থাকায় তুমুল পাল্টাপাল্টি প্রচার-প্রচারণা চলছে এ প্লাটফর্ম ব্যবহার করে। কিন্তু কোন প্রচারই স্ট্রাকচারড পথে নয়। নেহাতই ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় কাভার ফটোই করা হয়েছে শেখ হাসিনার ছবি দিয়ে আর সেখানে লেখা রয়েছে ‘নৌকা জনগণের মার্কা জননেত্রী শেখ হাসিনা’। এ পেজটিতেই একটি ইভেন্ট পেজ খোলা হয়েছে - যার শিরোনাম ‘৩০ ডিসেম্বর সারাদিন নৌকা মার্কায় ভোট দিন’। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের নানা বিষয় উল্লেখ করে ডিজিটাল প্রচারণা চালানো হচ্ছে এ পেজ থেকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নৌকার প্রচারণার জন্য ছবি, ভিডিও, লোগোসহ নানা ধরণের কন্টেন্ট দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ওয়েবসাইটে ডিজিটাল প্রচার তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় কাভার ফটো হিসেবে খালেদা জিয়ার নি:শর্ত মুক্তি চেয়ে একটি ব্যানার রয়েছে। তারপর ২০০৫ সালে একটি অনুষ্ঠানে দেয়া দলের নেতা তারেক রহমানের একটি বক্তব্য রয়েছে। সাথে রয়েছে ধানের শীষ হাতে তারেক রহমানের একটি ছবি। এছাড়া পেজটিতে বিএনপির নির্বাচন সম্পর্কিত নানা ব্রিফিংয়ের ছবি ও বক্তব্য রয়েছে। বিএনপির অফিশিয়াল ওয়েব ও ফেসবুক পেজ রয়েছে। বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা ফেসবুকে প্রার্থীর ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। এতে লাইক কমেন্ট করছেন অন্যরা। পড়ছে নেতিবাচক মন্তব্যও। বিভিন্ন প্রার্থীর কার্যক্রমের ওপর ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেগুলি তরুণ ভোটারদের টানতে আদৌ কোন কার্যকরী ভূমিকা নেবে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ বিরোধীদের অপকর্ম জনগণকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ায় ব্যস্ত, সাথে ‘স্বাধীনতার চেতনা’ নামক দেশাত্মবোধক কনসেপ্টটি। ১৯৭১, শেখ মুজিব, ১৯৭৫ এর মুজিব হত্যা – এর ওপরেই জোর দেওয়া হচ্ছে বেশি। ওদিকে বি এন পি বলছে যে তারা বিএনপির ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবেন।

প্রচারের খেলাটা এখানেই। ব্রিটেনের নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ২০১৫ র নির্বাচনী লড়াইয়ে কনজারভেটিভ পার্টি ডিজিটাল প্রচারণায় খরচ করেছিল ১২ লক্ষ পাউন্ড। সে তুলনায় ডিজিটাল প্রচারণায় লেবার পার্টির ব্যয় ছিল এক লক্ষ ৬০ হাজার পাউন্ড আর লিবারেল ডেমোক্রাটের মাত্র ২২ হাজার পাউন্ড। ফলাফল সেইমতোই হয়েছে। সে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী টেরেজা মে-ও ফেসবুক লাইভে ভোটারদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। দেখুন, ভোটের প্রচারণা  এটি একটি প্যাকেজ প্রোগ্রাম। যার মধ্যে রয়েছে মানুষের ঘরে ঘরে যাওয়া, মুখে হাসি মেখে চেনা-অচেনা সবার সঙ্গে কথা বলা, জনসভা-পথসভায় বক্তব্য দেওয়া, মানুষকে ভোট দিতে রাজি করানো, ভোটের দিন ভোটারদের কেন্দ্রে আনা, বুথে অবস্থান করা। সব শেষে সব কিছু সুষ্ঠুভাবে শেষ হলো কি না, তা নিশ্চিত করা। ভারতেও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশে এ রকম পেশাদার জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান কোনো দলের পক্ষে রাজনৈতিক প্রচারণার দায়িত্ব নেয়। নির্বাচনে দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালায়। বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেয়। গণমাধ্যমে তথ্য সরবরাহ করে তাদের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন থেকে শুরু করে ট্রেড ইউনিয়ন, স্থানীয় সরকার, সংসদ নির্বাচন, সব ধরনের নির্বাচনেই এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচারণার কাজ করে। নির্বাচনের যথেষ্ট আগে থেকে শুরু হয় তাদের কাজ। ভোটারদের ডাটা বেইস তৈরি, ঠিকানা যাচাই, দলের সমর্থন যাচাইয়ের জন্য জনমত জরিপ, জনসম্পৃক্ত সমসাময়িক ইস্যু চিহ্নিত করে দলের অবস্থান নির্ধারণের পর প্রচারণার বার্তা ও কৌশল তৈরি, ভোটের কাজে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ ও পরিচালনা, প্রচারণার প্রভাব বিশ্লেষণ, নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহ ও দৈনন্দিন খরচের প্রতিবেদন প্রণয়ন করার দায়িত্ব নেয় 

সম্প্রতি ভারতের নির্বাচনে ‘লিডটেক ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং’ ঘরে ঘরে গিয়ে জরিপ ও প্রচারণা, দলবদ্ধ এসএমএস ও আইভিআর কল করা, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর পক্ষে জনমত গঠনে তারা গবেষণা করে থাকে। ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচনে কংগ্রেস ডিজিটাল প্রচারে খরচ করেছিল ১০০ কোটি টাকা। ভারতের গত নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির বিজেপির পক্ষে প্রচারণার কাজটি করেছিল ‘ওগিলভি অ্যান্ড ম্যাথার’সহ কয়েকটি পিআর ফার্মের জোট।

বাংলাদেশের পিআর ফার্মগুলোর পেশাদারি কার্যক্রম এখনো তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেনি। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজের উদ্যোগে সার্বিক নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় প্রার্থীকে। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের ভোট টানতে গেলে পেশাদার জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আওয়ামী লীগের প্রচারণায় শেখ হাসিনার মুখ দেখতে আম জনতা অভ্যস্ত। অথচ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরে সজীব ওয়াজেদ জয় যে ইংরেজিতে ভাষণ দিয়েছিলেন তা শুনেছেন এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষ। কারা তারা? মূলত তরুণ প্রজন্ম যারা ইংরেজি ভাষায় অভ্যস্ত। এই সজীব ওয়াজেদ জয়কে অবিলম্বে এই দলের নবীন প্রজন্মের কাছে দলের মুখ হিসেবে তুলে ধরলে দলের লাভ বৈ ক্ষতি হবে না। অনেকেই বলতে পারেন যে জয়ের বাংলা ততটা স্বচ্ছন্দ নয়। সেটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা। ইংরেজিঘেঁষা বাংলা উচ্চারণ এখন বিজ্ঞাপন জগতে তুমুল জনপ্রিয়। তরুণ প্রজন্ম এই জগাখিচুড়ি ভাষায় কমিউনিকেশন ভয়ংকর লাইক করেন।

অতএব তরুণ সমাজের কাছে বার্তা পৌঁছতে হলে এখন মোবাইল, ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যমের আশ্রয় নিতে হবেই। সেইজন্যে অবিলম্বে প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলির পি আর বিশেষজ্ঞদের হায়ার করা। না’হলে কোন সময় কোন নেপোয় দই মেরে যাবে সে হিসেব অ্যাকাইন্টেসির বাইরেই থেকে যাবে। নির্বাচনের পরে প্রার্থী দেখবে যে সে নিজেই সিলেবাসের বাইরে।

বিঃ দ্রঃ এই নিবন্ধতে আমি প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছি এই জন্যে যাতে পাঠক বুঝতে পারেন যে কোন বাংলায় তরুণ প্রজন্মর কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন।    

Best Electronics
Best Electronics