নিরাশ্রয় মানুষের বেদনা
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=161243 LIMIT 1

ঢাকা, বুধবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০,   আশ্বিন ৮ ১৪২৭,   ০৫ সফর ১৪৪২

নিরাশ্রয় মানুষের বেদনা

 প্রকাশিত: ১৫:১১ ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

আফরোজা পারভীন
আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

পথ চলতে ওদের দেখা আমরা প্রতিদিনই পাই। দেখি কাউকে ভিক্ষার থালা হাতে, কেউ বিক্রি করছে ফুল, কেউ পানি, কেউ বই। 

কারো হাতে সফেদা বা কুল, কারো কাঁধে তোয়ালের বোঝা। বাচ্চাদের ছোট্ট ছোট্ট পিঠ বেঁকে যাচ্ছে তোয়ালের ভারে। এরা সবাই ভাসমান মানুষ, নিরাশ্রয়। নিরাশ্রয় বলতে যদি বোঝায় পরিপূর্ণ আশ্রয়হীনতা তবে এরা সবাই তা নয়। কেউ যথার্থ নিরাশ্রয়। থাকে খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে, কারো গাড়ি বারান্দায় বা গ্যারেজে। কেউ কেউ অবৈধ জায়গায় খুপরি ভাড়া করে মানবেতরভাবে আট-দশজন মিলে। মাঝে মাঝে সেই খুপরি ভেঙে দেয় সিটি কর্পোরেশনের লোকজন। তখন এরা এসে ওঠে ফুটপাতে। পলিথিনে মুড়ে ছোট্ট এটা ঘর বানাতে পারে কেউ কেউ। হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকে সে ঘরে। কেউ কেউ তাও পারে না। 

রোদে জলে হাওয়ায় ওরা থাকে ফুটপাতে-রাস্তায়, মানুষের অশ্রাব্য কটুবাক্য সহ্য করে। এর মধ্যে নারীর অবস্থা আরো করুণ। পুরুষ যেখানে সেখানে রাত কাটাতে পারে। নারী তা পারে না। এই ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে আছে বিভিন্ন বয়সের নারী। উঠতি বয়সের নারীও আছে। থাকার জায়গার অভাবে অনেকে খারাপ পুরুষের কবলে পড়ে। হারিয়ে ফেলে তাদের সম্ভ্রম। কেউ কেউ অন্তঃসত্তা হয়ে পড়ে। সমাজের চোখে হয় অসতী। অনিবার্য পরিণতি নিষিদ্ধপল্লীতে গমন। কিন্তু কেউ ভেবে দেখে না, আশ্রয়হীনতাই ওর এই বিপর্যয়ের কারণ। এই বৈষম্যপূর্ণ সমাজই ওকে অসতী বানিয়েছে।

সারা দেশে ভাসমান মানুষ থাকলেও ঢাকায় এদের সংখ্যা অনেক। এরা সারা দেশ থেকে এসে জড়ো হয় ঢাকায়। এরা কেউ কেউ জন্মগতভাবে দরিদ্র, গৃহহীন, কেউ নদীভাঙনের শিকার, কেউ ধনী লোকের লোভের আগ্রাসনের শিকার হয়ে সম্পদ খুইয়েছে, আশ্রয় খুইয়েছে। এই ভাসমান মানুষেরা কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসে। তারা মনে করে ঢাকায় এলেই কাজ জুটবে, খাবার জুটবে, আশ্রয় জুটবে। বাস্তবে ঘটে বিপরীত। ঢাকা শহরেও তো কাজ আর সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। এখানেও আছে পেশীশক্তিসম্পন্ন লোভী মানুষ। যারা চায় সবকিছু কুক্ষীগত করে রাখতে!  
কেন এই বৈষম্য! সৃষ্টির আদিতে কারো কোনো একক সম্পদ বা মালিকানা ছিল না।  বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে আবির্ভুত হয় মানুষ। প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল। মানুষ তখন  উলঙ্গ থাকত। আগুনের আবিষ্কার আর আস্তে আস্তে সভ্যতার উন্মেষের ফলে পুরুষ-নারী আবিষ্কার করল ‘লজ্জা’ নামক শব্দটিকে। লজ্জাস্থান ঢেকে রাখার প্রয়োজন থেকে প্রথমে গাছের পাতা ছাল বাকল তারপর আস্তে আস্তে বস্ত্র এলো। একসময় মানুষ উপলব্ধি করল নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন। জীবজন্তু আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষারর জন্য আশ্রয় চাই তাদের। আর যখন থেকে এই প্রয়োজনগুলির সৃষ্টি হলো তখন থেকেই মানুষের মনোজগতে উদ্ভব হল মালিক হবার প্রবণতা। সেই প্রবণতার পথ বেয়ে পৃথিবী এখন অনেকগুলো মহাদেশে খণ্ড-বিখণ্ড। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য, হ্যাভ আর হ্যাভনটসদের কাতারে বিভক্ত। 

আমরা যদি আমাদের এই ভূখণ্ডের দিকে তাকাই তাহলে দেখব বৃটিশ শাসনের অবসান হবার পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্ম হলো সেই পাকিস্তানের পূর্ব আর পশ্চিম অংশের মধ্যে ছিল সুযোগ সুবিধার বিরাট বৈষম্য। পশ্চিম পাকিস্তানের দু-তিনটে পরিবারের দখলে ছিল বিপুল পরিমাণ সম্পদ। পূর্ব পাকিস্তানের পাট তুলা আর এদেশের শ্রমিকের রক্ত ঘাম শ্রমে গড়ে উঠেছিল আধুনিক পশ্চিম পাকিস্তান। সুসজ্জিত হচ্ছিল ইসলামবাদ করাচী লাহোর। কেরাণী পিয়নের চাকরি থেকে শুরু করে সিভিল সার্ভিস, দেশরক্ষা বাহিনিতে বাঙালিদের অবস্থান ছিল নিতান্তই নাজুক। প্রতি পদে বৈষম্যের শিকার ছিল বাঙালিরা। চাল ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল দ্বিগুণ।

সেই বৈষম্যের অবসান ঘটাতে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। কিন্তু অতীতের সেই বৈষম্যের বোঝা এখনো সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৫-এর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বার বার ক্ষমতার পালাবদলের কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের মতো একই চিত্রের পুনরার্বিভাব ঘটে বাঙলার মাটিতে। কিছু মানুষের কুক্ষীগত হয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ। তারা সম্পদের পাহাড় গড়ে দেশে বিদেশে পাচার করতে থাকে সে সম্পদ। একটি পরিবার যখন ধনী হয় তখন সে তার নিজেরজন-আত্মীয়স্বজনকে ধন সম্পদ কুক্ষীগত করার মন্ত্র শেখায়। এভাবে আরো আরো মানুষের হাতে চলে যায় ধন সম্পদ। আর কিছু মানুষের হাতে ধন সম্পদ পুঞ্জীভূত হলে অনেক মানুষ সম্পদহীন হয়ে পড়ে। কারণ সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে এই নতুন দেশে। তখন সেই সম্পদহীন মানুষেরা অন্ন বস্ত্র শিক্ষা স্বাস্থ্য আশ্রয়ের অভাবে পথে নামে। চরম হতাশা অনিশ্চয়তা নিরাপত্তাহীনতা তাদের একটা শ্রেণিকে নিয়ে যায় অন্যায় পথে। বাঁচার প্রয়োজনে তারা চুরি ডাকাতি ছিনতাই রাহজানির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ আরো এগিয়ে খুন জখম সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।  মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে অনেকে। এইসব হতাশাগ্রস্ত মানুষ নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলে দল। দলবদ্ধ হয়ে অন্যায় করে অনেকে। আর এক শ্রেণির খারাপ মানুষ এদের ব্যবহার করে তাদের নিজ প্রয়োজনে। এদের দিয়ে ক্যাসিনো, মদের ব্যবসা চালায়। রাজনৈতিক প্রয়োজনেও ব্যবহার করে এদের। টাকার বিনিময়ে এদের দিয়ে প্রতিপক্ষকে খুনও করায়। এরা মিটিং মিছিলে ট্রাক-বাস ভরে মানুষ আনে, মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দেয়। জীবনও দেয়। 

এই যে সামাজিক অসাম্য এর জন্য দায়ি ওই নিরাশ্রয় মানুষেরা নয়। জন্মগতভাবে একজন মানুষের কিছু অধিকার প্রাপ্য হয়। অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের অধিকার তার অন্যতম। এগুলি তার মৌলিক অধিকার। একজন মানুষ সে প্রাসাদেই জন্মাক আর কুঁড়েঘরেই জন্মাক এ জন্মের দায় তার নয়, দায় রাষ্ট্রের। প্রতিটি নাগরিকের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব সে যে গোত্রের যে বর্ণের যে সম্প্রদায়েরই হোক না কেন। আর যখন সেই সুবিধা নিশ্চিত হয় না তখনই সৃষ্টি হয় নানাবিধ সমস্যার। 

আমরা বলি দেশ অনেকদূর এগিয়েছে, ডিজিটাল হয়েছে । দৃশ্যত হয়েছেও। একের পর উড়াল সেতু, মেট্ররেল, অবকাঠামোগত উন্নয়নে সেটাই দৃশ্যমান। কিন্তু সব শ্রেণির মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে সেটার জরিপ হয়েছে কি? 

রাস্তাঘাটে ফুটপাতে ভাসমান মানুষ আগের চেয়ে বেশি বৈ কম দেখি না। আশি বছরের বৃদ্ধকে যখন লাঠি নিয়ে ভিক্ষা করতে দেখি, আট বছরের বাচ্চাকে যখন পার্কে বোতল কুড়াতে দেখি তখন সত্যিই কষ্ট হয়। সরকার নিরাশ্রয় মানুষের জন্য কিছু আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছেন। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। আর সেই আশ্রয়কেন্ত্রগুলিতে সত্যিকার নিরাশ্রয় মানুষরা আশ্রয় পায় নাকী সেগুলিও রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা পরিচালিত হয় আমাদের জানা নেই। এসব আশ্রয়কেন্দ্র বছরের পর বছর সংস্কার করা হয় না। তাই রোদ বৃষ্টির পুরোটাই ঘরের মধ্যে পড়ে। আর শুধু আশ্রয় দিলেই তো হবে না, তাদের স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে না পারলে নিরাশ্রয় মানুষের বোঝা গাণিতিকভাবে বাড়বে। তাদের কারিগরি শিক্ষাদান, কর্মসংস্থান আর তাদের সন্তানদের যথোচিত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা জরুরি। জরুরি তাদের সন্তানদের মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা শরীরচর্চা বিনোদনের ব্যবস্থা করা। না হলে তারা নিজেদের বন্দি মনে করবে। এই নিরাশ্রয় মানুষের ছেলে মেয়েরা যাতে চাকরি বাকরিতে ঢুকতে পারে সেদিকেও নজর দেয়া জরুরি।

দেশে ‘ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি পুনর্বাসন আইন-২০১১’ নামে একটি আইন আছে। এই আইনে পুলিশকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পুলিশ ইচ্ছা করলে যে কাউকে ভবঘুরে আইনে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু ভবঘুরে কাকে বলে, কোনো কোনো কারণে একজনকে ভবঘুরে বলা হবে তার ব্যাখ্যা এই আইনে নেই। অন্তঃসত্তা নারী ও শিশুদের সম্পর্কেও এই আইনে নেই যথোচিত নির্দেশনা। ৭ বছর বয়স হলেই একজন শিশুকে তার মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে এ আইনে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এ আইন প্রবর্তনের পর এক আলোচনা সভায় আইনটিকে সংবিধান ও মানবাধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক দেশে ভবঘুরে আর নিরাশ্রয় মানুষ থাকবে কেন? কথাটা যৌক্তিক।  

দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধিরা যথাযথ ভূমিকা ও দায়িত্ব পালন করেন না। তারা জনপ্রতিনিধি কিন্তু একমাত্র ভোটের সময় ছাড়া তারা জনগণের কাছে যান না। দেশের সুষম উন্নয়ন, ন্যায্যতা আর সাম্যের জন্য জনগণের কাছে যাওয়া, তাদের কাছে জবাবদিহিতা করা জরুরি। এই জবাবদিহিতার সংস্কৃতি যতদিন চালু না হবে এদেশে নিরাশ্রয় মানুষের সংখ্যা বাড়বে বৈ কমবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর