নারীর নিরাপত্তা কেন প্রশ্নবিদ্ধ!

ঢাকা, শনিবার   ৩০ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৬ ১৪২৭,   ০৬ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

নারীর নিরাপত্তা কেন প্রশ্নবিদ্ধ!

 প্রকাশিত: ১৫:৪৭ ১৪ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:৪৮ ১৪ জানুয়ারি ২০২০

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

‘চলন্ত বাসে ধর্ষণ’ এক নতুন আতঙ্ক নিয়ে আমাদের সমাজে হাজির হয়েছে। সম্প্রতি চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে ধামরাইয়ের এক বাস চালকের বিরুদ্ধে। 

পুলিশ তাকে আটকও করেছে। লক্ষ্যণীয় যে, সমাজে নিত্যই ব্যভিচার ও ধর্ষণকামিতার ঘটনা ঘটছে। কিছুতেই এ জঘন্য ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। যৌন নির্যাতন করছে কলেজ শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাক্তার, কর্মচারী, পুলিশ, আত্মীয়, চাচা-মামা-খালু, দুলাভাই, আমলা, ধনীর দুলাল, বাস চালক, ভবঘুরে, সবাই। এদের লালসা থেকে কেউ বাদ যাচ্ছে না। ধর্ষিত হচ্ছে ছাত্রী, শিশু, যুবতী, আয়া, বুয়া, গৃহবধূ, শ্রমিক। রাস্তাঘাটে, রেস্তোরাঁয়, চলন্তবাসে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গৃহে, পথে ঘটছে এই পৈশাচিক ঘটনা। এতে স্পষ্ট হতে পারে, আমাদের দেশের নারীরা এখন আর কোথাও নিরাপদ নন। আমাদের নারী, শিশুরা যৌন নির্যাতন এমনকি ধর্ষণের পর খুন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে থাকছে না বয়স, স্থানকালপাত্র ভেদ। দেশব্যাপী শুরু হয়েছে ব্যভিচারের চূড়ান্ত প্রকাশ্য ধর্ষণকামিতা। রাত-বিরাতে নয় শুধু, দিনদুপুরে প্রকাশ্য ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। শুধু ধর্ষণই নয়, রীতিমতো গণধর্ষণ হচ্ছে। অপসংস্কৃতি আর ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদের সমাজকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করছে তা হাল আমলের ধর্ষণের চিত্র থেকে স্পষ্ট হতে পারে। প্রশ্ন হলো, এমন ধর্ষকামী সমাজই কি আমরা চেয়েছি?

অস্বীকারের করা যাবে না যে, কিছু মানুষরূপী নরপশু সভ্যতার ভাবধারাকে পাল্টে দিতে হায়েনার নখ মেলে বসেছে। আমাদের সমাজে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না, এমন অভিযোগও রয়েছে। বিশ্লেষকরা অনেকবার বলেছেন যথাযথ শাস্তি না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণ, নির্যাতন, অতঃপর হত্যার প্রবণতা বাড়ছে। নারী ধর্ষণের পাশাপাশি শিশু ধর্ষণ এমনকি ছেলে শিশুদের বলাৎকারের ঘটনাও সামনে এসেছে। একেকটি ঘটনা ঘটার পর কিছুদিন মিছিল, মিটিং, আন্দোলন, প্রতিবাদ সভা হয়। দেশ সরব হয়। কিছু দিন পরই সব থেমে যায়। থেমে যায় প্রতিবাদের ঝড়। কিন্তু থামে না শুধু নির্যাতিত নারীর কান্না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রশ্রয় পেলে ধর্ষণের মতো অপরাধ ফেঁপে উঠবে, এটি নিরেট সত্যকথন হলেও বিচার যে আদৌ হচ্ছে না তেমনটি নয়। আমরা রূপা ধর্ষণ হত্যা মামলার বিচারের কথা জানি, জানি ফেনীর নুসরাত হত্যার বিচারের বিষয়টিও। সুতরাং ঢালাওভাবে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ বলে সরকারকে চাপে না রেখে আমরা বরং এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকারকে কঠোর হতে বলতে পারি।

বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা যে, বাসের ভেতরে ধর্ষিত হচ্ছে মেয়েরা, শিক্ষাঙ্গনে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা, এমপির কথিত এপিএসের দ্বারাও এ দেশে ধর্ষিত হচ্ছে যুবতী। ধর্ষণ কোনো নতুন বিষয় নয়, এটা যেমন সত্য; তেমনিভাবে এটাও মানতে হবে যে, আমরা নিজেদের সভ্য দাবি করছি এবং প্রতিনিয়ত নারীদের মর্যাদা এবং স্বাধীনতার কথা বলছি। একটি দেশে যখন নারী নির্যাতন, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর খুনের ঘটনা বেড়ে চলে; তখন সে সমাজ যে বসবাসের অযোগ্য একটি পঁচনশীল সমাজ, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকা উচিত নয়। স্বাধীনতার এই ৪৯ বছরে এসে যেখানে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে চলেছি সেখানে আমাদের মাননিক উৎকর্ষতার এহেন চিত্র দেখে হতাশ হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। 

তবে সাম্প্রতিক সময়ে চলন্ত বাসে ধর্ষণ এক কঠিন ও কুৎসিত বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদের। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ঢাকা আরিচা মহাসড়কের পাশে ডাউটিয়া এলাকায় প্রতীক সিরামিক কারখানায় প্রায় সাত মাস ধরে শ্রমিকের কাজ করে আসছিলেন মমতা আক্তার। প্রতিদিনের মতো শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তার মা জুলেখা বেগম কারখানার শ্রমিকদের ভাড়া করা বাসে কালামপুর-মির্জাপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের কাঠালিয়া এলাকা থেকে তাকে বাসে তুলে দেন। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেন নি। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে ওইদিন রাতে তার বাবা শাহাজাহান খাঁ ধামরাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। আর রাত ১১টার দিকে মমতার মৃতদেহ তার স্বজনরা দেখতে পান একই সড়কের পাশে হিজলীখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিমে পরিত্যক্ত ভিটার জঙ্গলের মধ্যে। পুলিশকে খবর দেয়া হলে, তারা লাশ উদ্ধার করেন এবং রাতেই বাসচালক সোহেলকে তার শ্বশুড়বাড়ির জেঠাইল থেকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তারকৃত সোহেলের ভাষ্যমতে পুলিশ জানিয়েছে, মমতা বাসে উঠার পর থেকেই তার মাথায় কু-মতলব দারা বাঁধে। ওই সময় মমতা একাই বাসে ছিলেন। চালক বাস থামিয়ে, বাসের লাইট বন্ধ করে মমতাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। মমতা প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করেন এবং এক পর্যায়ে সোহেলের আঙ্গুল কামড়ে দেন। এরপরও রেহাই মেলেনি ওই নরপিশাচের হাত থেকে। মমতা চিৎকার দিয়ে বাস থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে সোহেল। পরে তার লাশ টেনে নিয়ে সড়কের পাশের একটি পরিত্যক্ত ভিটার জঙ্গলে রেখে দেয়। শুধু এ ঘটনাটিই নয়, এর আগেও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার ও ময়নমনসিংহে বাসে, মাইক্রোবাসে পোশাক শ্রমিক ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের সামাজিক সুস্থতা এবং নারীর নিরাপত্তা দুটোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই জঘন্য অপরাধ যে মাত্রায় দেখা দিয়েছে, তাতে অচিরেই এর লাগাম টেনে না ধরা গেলে তা সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেবে, এমন আশঙ্কা করা দোষের হতে পারে না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এটা ঠিক। পাশাপাশি রাষ্ট্রের একজন সভ্য নাগরিক হিসেবে যার যার অবস্থান থেকেও এই জঘন্য ব্যভিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোরও বিকল্প থাকা উচিত নয়। 

যৌন হয়রানি শুধু নারী, শিশুর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধেও চরম অপরাধ হিসেবে গণ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়। এ দেশে ধর্ষণের পাকাপোক্ত আইন আছে ঠিকই, কিন্তু আইনেকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। আইনের যারা প্রয়োগ করবেন তারা ওই আইনের পথে হাঁটেন না; কখনো অর্থের লোভে, কখনো বা হুমকি ধমকিতে শুরুতেই গলদ দেখা দেয়। এ অভিযোগও অনেক পুরনো। আর তাই ধর্ষিত কিংবা নির্যাতনের শিকার নারীরা সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন। ধর্ষণ যেহেতুক মস্ত বড় অপরাধ এসব মামলার ক্ষেত্রে চার্জশিট গঠনের সময় কোনো ম্যাজিস্ট্র্রেট অথবা পুলিশের কোনো পদস্থ কর্মকর্তার নজরদারিতে করা যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রিপোর্টের সময় ভিক্টিমের সাক্ষাৎগ্রহণ করা যেতে পারে। তাতে করে গোপনে চার্জশিট দাখিলের ফলে যে জটিলতা তৈরি হয় তা কমে আসবে। তবে ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগেও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যার যার পারিবারিক বলয়ে শালীন সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা, আইনের শাসন প্রয়োগ বা ফতোয়া দিলেই চলবে না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থানে থেকে স্কুল-কলেজ মাদরাসা-মক্তব-মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সমাজের অন্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি কঠোর শাস্তির বিধান ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মর্যাদার আসনে বসাতে হবে। 
সর্বোপরি কথা হলো, নারীর জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। নারী নির্যাতনের বিচার দ্রæত এবং দায়ী ব্যক্তির কঠোর শাস্তিই প্রত্যাশা করে সমাজের প্রতিটি মানুষ। পাশাপাশি সাধারণভাবে পুরুষমাত্রের মধ্যে সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা তৈরির জন্য কাজ করতে হবে। শুধু সরকার কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে রুখে দাঁড়াতে হবে এই জঘন্য ব্যাভিচার ও সর্বগ্রাসী ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর