নারায়ণগঞ্জে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের তিন কারণ

ঢাকা, শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২০,   কার্তিক ৯ ১৪২৭,   ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের তিন কারণ

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৩:০০ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ০৩:০৪ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

মসজিদে বিস্ফোরণের ফাইল ফটো

মসজিদে বিস্ফোরণের ফাইল ফটো

নারায়ণগঞ্জে তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদের ভয়াবহ সেই বিস্ফোরণের নেপথ্যে তিন কারণ রয়েছে বলে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো জানিয়েছে। তিতাস, ফায়ার সার্ভিস, ডিপিডিসি ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত চার তদন্ত কমিটির নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। লিকেজ হওয়া মিথেন গ্যাস, আবদ্ধ (এয়ার টাইট) কামরা আর বৈদ্যুতিক লাইনের পরিবর্তন এ তিন বিষয়কে দায়ী করছে কমিটিগুলো।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে মসজিদ কমিটি, ডিপিডিসি ও তিতাস কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও গাফিলতির বিষয়ও এড়ানো যাবে না।

কমিটির সূত্রগুলো বলছে, নাশকতার যেই আশঙ্কা বা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল তদন্তে এর কোনো আলামত এখনো পাওয়া যাচ্ছে না।

ডিপিডিসির গঠিত কমিটি রোববার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন এর সদস্য ও নির্বাহী প্রকৌশলী (পশ্চিম) আনিসুর রহমান।

তিনি জানিয়েছেন, আগুনের মূল কারণ হিসেবে তিতাসের লিকেজ হওয়া গ্যাসকেই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।  জানা গেছে, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়েই গঠিত বাকি তদন্ত কমিটিগুলো নিজ নিজ দফতরে তাদের রিপোর্ট জমা দেবে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, এরইমধ্যেই নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি বৈদ্যুতিক স্পার্ক থেকেই আগুনের বা বিস্ফোরণে সূত্রপাত বলে মনে করছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে ওই কমিটির প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা ছিল। পরে কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববির আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রতিবেদন জমা দিতে আরো পাঁচ কার্যদিবস সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলা প্রশাসনের তদন্তে পাওয়া গেছে, দেড় যুগেরও বেশি আগে পশ্চিম তল্লা জামে মসজিদটির পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। মসজিদে প্রবেশ পথে একটি কলাপসিবল গেট, দুটি কাচের টানা দরজা ছিল। মসজিদের বারান্দা থেকে ভেতরের অংশ থাই গ্লাস দিয়ে সাঁটানো ছিল। থাই গ্লা দিয়ে ঘেরা অংশের ভেতরে ১৫টি জানালা, ছয়টি এয়ারকন্ডিশন, ২৬টি সিলিং ফ্যান, ৭০টি সুইচ সকেট ছিল।

তাদের তদন্তে আরো উঠে এসেছে, মসজিদের বিদ্যুৎ প্যানেল বোর্ড ও ডিস্ট্রিবিউশনের দুটি লাইন ব্যবহার করা হতো। যার একটি লাইন ছিল বৈধ, অন্যটি অবৈধ। একটি লাইন ম্যানুয়ালি এবং একটি লাইন অটো বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবহার হতো। যা মসজিদ কমিটির স্বাক্ষ্যসহ অনেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তদন্তে জানা যায়, ঘটনার দিন শুক্রবার সকাল থেকেই মসজিদে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। মসজিদের মুসল্লিরা এশার নামাজের ফরজ আদায় করে অনেকে মসজিদ থেকে বের হয়ে যান। আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটের সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। এ সময় অনেক মুসল্লি সুন্নতসহ অন্যান্য নামাজ আদায় করছিলেন। মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন এ সময় বিদ্যুতের লাইন চেঞ্জ করতে গেলে স্পার্ক হয়। এ সময় দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় মসজিদে জমে থাকা গ্যাসের কারণে আগুন ধরে যায়। এতে মসজিদের ভেতরে থাকা মুসল্লিদের শরীরে আগুন ধরে যায়।

এ ছাড়া মসজিদটি যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে সেই রাস্তাটি অনেক সরু এবং নিচু এলাকা হওয়ায় দগ্ধ ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কমিটির প্রধান খাদিজা তাহেরা ববি বলেন, তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। অনেক তথ্য আমরা পেয়েছি। আমরা বিদ্যুৎ, তিতাস গ্যাস, মসজিদ নির্মাণে ত্রুটিসহ সব বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

অপরদিকে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটিতে একই রকম কারণ উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।

ওই সূত্র জানায়, তারা অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার করে এবং বেশ কিছু বিষয় নিরীক্ষণের মধ্য দিয়েই তদন্ত করছে। বিশেষ করে বিস্ফোরণ বা আগুনের ঘটনার পরপরই তারা ঘটনাস্থলে গেছে। সেখানকার পরিস্থিতি খুব ভালোভাবেই নিরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করেছে।

ওই সূত্র আরো জানান, তিতাসের লিকেজ হওয়া গ্যাস থেকেই আগুনের ঘটনা ঘটেছিল সেটি প্রাথমকি পর্যায়ে তারা ২টি বিষয় দিয়ে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলাম। একটি হলো, পুরো বিস্ফোরণের এলাকাটিতে অর্থাৎ মসজিদের অভ্যন্তরে ছাই বা কালো দাগ ছিল না, যেটি গ্যাস থেকে আগুন লাগার কারণেই হওয়া সম্ভব। দ্বিতীয়টি হলো, পানি জমার পর মসজিদের ফ্লোর থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের নির্গমন বুঝা যাচ্ছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির এক সদস্য বলেন, যেহেতু তদন্ত চলছে তাই সরাসরি কোনো মন্তব্য করব না। কিন্তু ঘটনার পর আমরা গ্যাস ডিটেক্টর মেশিনে ওই মসজিদে ১৭ শতাংশ মিথেন গ্যাসের অস্তিত্ব পেয়েছি। যেখানে কোনো বদ্ধ কামরায় ৫ শতাংশ মিথেন গ্যাস ও ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কোনো স্ফুলিঙ্গ পেলে আগুন জ্বলে ওঠে।

তিনি বলেন, সেখানে ছয়টি এসি চলমান ছিল। ফলে আগুনের ব্যপ্তি কয়েকশ গুন বাড়িয়ে দেওয়া মতো রুম টেম্পারেচার (তামপাত্রা) ছিল। আবদ্ধ কামরা হওয়ায় সেখানে বিস্ফোরণের আগে আরও কয়েক গুণ বেশি গ্যাস ছিল। ওই অবস্থায় বৈদ্যুতিক স্পার্কের ফলেই ভয়াবহ এ বিস্ফোরণ হয়েছে বলে আমাদের অনুসন্ধানে এখনও পর্যন্ত ধরা পরেছে।

এদিকে তিতাস ও ডিপিডিসি’র তদন্ত কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বললে তারাও প্রায় একই ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তিতাস গ্যাসের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার বলেন, আমরা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে চার কার্যদিবস বাড়িয়েছি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে। তদন্তে তিতাসের কারো গাফিলতি থাকলে সেটি অবশ্যই প্রতিবেদনে দেয়া হবে।

তিনি বলেন, অনেকগুলো মানুষ মর্মান্তিকভাবে মারা গেছে। অনেকগুলো পরিবারের কান্না থামছে না। আমরা অত্যন্ত পেশাদারত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তদন্ত করছি। দোষী কাউকেই বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়া হবে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ