Alexa নামের সঙ্গে মিথ্যা উপাধি লাগানোর ভয়াবহ পরিণাম (শেষ পর্ব)

ঢাকা, সোমবার   ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ২ ১৪২৬,   ১৭ মুহররম ১৪৪১

Akash

নামের সঙ্গে মিথ্যা উপাধি লাগানোর ভয়াবহ পরিণাম (শেষ পর্ব)

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:২১ ২০ আগস্ট ২০১৯  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

হজরত যায়েদ ইবনে হারেছা (রা.) এর ঘটনা: 
রাসূল (সা.) হজরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)-কে আপন পালকপুত্র বানিয়েছিলেন। ঘটনাটি বেশ বিরল ও আশ্চর্যজনক। হজরত যায়েদ (রা.) জাহেলিয়াতের যুগে কারো গোলাম ছিলেন। 

আরো পড়ুন>>> নামের সঙ্গে মিথ্যা উপাধি ব্যবহারকারীদের প্রতি হুঁশিয়ারি (পর্ব-১)

মহান আল্লাহ তাকে মক্কায় আসার তাওফীক দিয়েছিলেন। মক্কায় এসে রাসূল (সা.) এর হাতে মুসলমান হয়ে  গেলেন। তার পিতা-মাতা ও বংশের লোকেরা তাকে খুঁজে বেড়াতো। এভাবে কয়েক বছর কেটে গেল। কয়েক বছর পর কেউ সংবাদ দিল যে যায়েদ মক্কায় রয়েছে এবং সে মুসলমান হয়ে গিয়েছে। খবর পেয়ে তার পিতা ও চাচা তার খোঁজে মক্কায় আসলেন। এবং রাসূল (সা.) এর সঙ্গে সাক্ষাত করলেন। তারা রাসূল (সা.)-কে বললেন, আপনার নিকট যে যায়েদ রয়েছে সে আমার পুত্র। আমরা কয়েক বছর ধরে তাকে পাগলের ন্যায় খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিন্তু সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে আমরা জানতে পারলাম সে এখানে। আমরা তাকে নিয়ে যেতে এসেছি। 

রাসূল (সা.) ইরশাদ করলেন, ঠিক আছে আপনি তার পিতা, সে আপনার সন্তান। যদি সে স্বেচ্ছায় আপনাদের সঙ্গে চলে যেতে চায় তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই। তারা এ কথা শুনে খুব খুশি হলো। নবী (সা.) এতো সহজে তাকে ছাড়তে রাজী হবেন তারা এমনটি আশা করেনি। পিতা এবং চাচা ভেবেছিল ছেলে কয়েক বছর ধরে বাড়ি ছাড়া। নিশ্চয়ই বাড়ি যাওয়ার জন্যে একেবারে উম্মুখ হয়ে আছে। আমরা গিয়ে বলা মাত্রই খুশি খুশিতেই ফেরার জন্য তৈরী হয়ে যাবে। হজরত যায়েদ তখন হেরেমে অবস্থান করছিলেন। তারা গিয়ে সাক্ষাত করলে যায়েদ (রা.) অত্যন্ত খুশি হলেন। এত বছর পর পিতাকে পেয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে পিতা বললেন, চটজলদি তৈরী হয়ে নাও। আমরা রওয়ানা হব। তখন তিনি বললেন, আব্বাজান আমাকে ক্ষমা করবেন, আমি আপনার সঙ্গে যাব না। কারণ একদিকে আল্লাহ আমাকে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য প্রদান করেছেন। অথচ আপনি এখন পর্যন্ত ইসলাম  গ্রহণ করেননি। অপরদিকে এখানে আমি রাসূল (সা.) এর পবিত্র সাহচর্য  লাভ করছি। তার সাহচর্য পরিত্যাগ করে আমি যেতে পারব না। 

পিতা বললেন বেটা, তুমি এতদিন পর আমাদেরকে পেয়েছো তবুও কীভাবে তুমি বলতে পারলে যে আমাদের সঙ্গে যাবে না। তিনি বললেন, ‘আব্বাজান আপনার প্রতি আমার যা কর্তব্য তা আমি যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম আছি। কিন্তু নবী করীম (সা.) এর সঙ্গে আমার আজীবনের সম্পর্ক। এ  জন্য আমি আপনার সঙ্গে যাব না। যখন রাসূল (সা.) এ উত্তর শুনলেন। তখন তিনি বললেন, তুমি আমার সঙ্গে আজীবনের সম্পর্ক কায়েম করেছ, এ জন্য আমি তোমাকে আজ থেকে আমার পুত্র বানিয়ে নিলাম। তখন থেকে রাসূল (সা.) তাকে পালক পুত্র বানিয়ে নিলেন এবং পুত্রের মতোই আচরণ করতেন। এ কারণে লোকেরা তাকে যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ (মুহাম্মদের পুত্র যায়েদ) বলে ডাকা শুরু করেছিল। আল্লাহ এ নিষেধাজ্ঞায় আয়াত নাজিল করলেন।

 أدعوهم لأبائهم هو أقسط عند الله 

‘পালক পুত্রকে তার পিতার নামে ডাকাই শোভণীয় (পালনকারীর নামে ডাকা শোভণীয় নয়)।’

অর্থাৎ: পালকপুত্রকে তার প্রকৃত পিতার দিকে সম্পৃক্ত করা উচিত। অন্যকারো দিকে সম্পৃক্ত করা জায়েয নেই। অপর আয়াত নাজিল হলো-
 
ما كان محمد أبا أحد من رجالكم و لكن رسول الله و خاتم النبيين

অর্থাৎ: ‘মুহাম্মাদ (সা.) তোমাদের কনো বয়স্ক পুরুষের পিতা নন। কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।’ 

এ জন্য তাঁর দিকে কোনো ছেলেকে সম্পৃক্ত করো না। হজরত যায়েদ বিন হারেসা ছাড়াও আরেকজন সাহাবী হজরত সালেম (রা.)-কেও পালকপুত্র বানানো হয়েছিল তার ব্যাপারেও রাসূল (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তাকে পালনকারীর ঘরে প্রবেশ করতে হলে পর্দার সঙ্গে প্রবেশ করতে হবে। এ নির্দেশাবলী প্রদানের অন্যতম কারণ হলো, শরীয়ত বংশ সংরক্ষণের বিষয়টিতে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। যেন কারো বংশ সম্পৃক্ততায় অসত্যের সংমিশ্রন হতে না পারে। যার দ্বরুণ ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা রুদ্ধ হয়ে যায়। এ জন্য যে ব্যক্তি ভুয়া বংশ পরিচয় দেবে সে হাদিসের ধমকীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এবং সে মিথ্যার দুটি কাপড় পরিধানকরী সাব্যস্ত হবে।

নিজের নামের সঙ্গে মাওলানা লিখা:
এমনিভাবে কেউ ইলমে দ্বীন অর্জন করেনি। কিন্তু নিজেকে আলিম বলে সমাজে পরিচয় দেয়। যেমন আজকাল লোকেরা নিজের নামের সঙ্গে মাওলানা লিখে থাকে। অথচ সাধারণ প্রচলনে মাওলানা অথবা আল্লামা শব্দটি তারাই ব্যবহার করে যারা রীতিমত দ্বীনের ধারক বাহক। যদি কোনো ব্যক্তি দ্বীনের ধারক বাহক না হয়েও নামের শুরুতে মাওলানা ব্যবহার করে তাহলে সমাজের লোকেরা বিভ্রান্ত হবে এবং সে ব্যক্তি হাদিসে ধমকীর আওতায় পড়ে যাবে।

নিজের নামের সঙ্গে প্রফেসর লিখা:
এমনি একটি শব্দ হলো প্রফেসর। আমাদের সমাজে প্রফেসর শব্দটি একটি বিশেষ অর্থবহ শব্দ। এর নির্দিষ্ট কিছু শর্তাবলী রয়েছে। সেই শর্তাবলী সাপেক্ষে কাউকে প্রফেসর বলা হয়। কিন্তু আজকাল দেখা যায় অনেক লোক যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার দায়িত্ব পেলেই নিজের নামের আগে প্রফেসর লিখে থাকে। অথচ এ দ্বারা সে এমন একটি পদ নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছে যার যোগ্যতা তার মাঝে নেই। এ জন্য এটি মিথ্যা দাবী এবং এর দ্বারা মানুষকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। অতএব তা হাদিসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। এবং নাজায়েয।

নামের আগে ডাক্তার লিখা:
এমনিভাবে একজন লোক ডাক্তার নয়, কিন্তু নামের আগে ডাক্তার লিখে থাকেন। কিন্তু লোক এমনো আছে যারা কিছু দিন কোনো ডাক্তারের কম্পাউনটার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন যার দ্বরুণ কিছু ওষুধের নাম মুখস্থ হয়ে গেছে। এখন সে নামের আগে ডাক্তার লিখে নিজস্ব ক্লিনিক দিয়ে চিকিৎসার নামে রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। এটাও হাদিসের নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। এটাও হারাম।

আল্লাহ যা দিয়েছেন তাই মানুষকে দেখাও:
এই গুনাহগুলো এমন নয় যে, একবার গুনাহ করে নিল, ব্যস গুনাহের প্রভাব ফুরিয়ে গেল। বরং সে যেহেতু এই মিথ্যা দাবী বা সম্পৃক্ততাকে নিজের নামের অংশ বানিয়ে নিয়েছে। যেমন মাওলানা অমুক, ডাক্তার অমুক, প্রফেসর অমুক। এজন্য এই গুনাহ সার্বক্ষণীক ও স্থায়ী। তা তার জীবনের সঙ্গে চলছে। এ জন্যই হাদিসে এই গুনাহকে মিথ্যার কাপড়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আরে ভাই, নিজের ঢোল নিজে বাজানোর দরকারটাই বা কী? আল্লাহ যেভাবে সৃষ্টি করেছেন তা নিয়েই তুষ্ট থাকো। বরং আল্লাহ তোমাকে যা বানিয়েছেন সমাজে তাই প্রকাশ করো। বাড়তি কিছু প্রকাশ করতে যেয়ো না। এ জন্য যে, মহান আল্লাহ আপন হিকমতে কাউকে কোনো গুণাবলীর অধিকারী বানিয়েছেন আবার অন্য কাউকে সেই গুণের পরিবর্তে অন্য কোনো গুণে গুণান্বিত করেছেন। দুনিয়ার সবকিছু তো আল্লাহর এই কৌশল ও তাঁর হিকমতে চলছে। তুমি মাঝখান থেকে এক মিথ্যা  দাবী করে কর্তৃত্ব খাটাতে চাইলে আল্লাহর তা পছন্দ হবে না।

নিজেকে ধনী প্রকাশ করা:
এমনিভাবে কোনো ব্যক্তি বিত্তবান নয়। কিন্তু সমাজে ধনীদের আলাদা সম্মান ও প্রভাব দেখে সেও নিজেকে ঐশ্বর্যশালী ও বিত্তবান প্রকাশ করে। কথায় কথায় লোকদেরকে নিজ ধনসম্পত্তির মিথ্যা ফিরিস্তি দিতে থাকে। উদ্দেশ্য, সমাজের লোকেরা যেভাবে ধনীদের তোয়াজ করে চলে, সম্মান দেখায়, তাকেও সেভাবে সম্মান দেখাবে। সালাম দিবে। এটাও হাদিসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। 

আল্লাহর নিয়ামতের প্রকাশ ঘটাবে:
নবী করিম (সা.) এর অনুপম শিক্ষার ওপর কোরবান হও। তিনি (সা.) এতো সুন্দর শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন যার গভীরতায় পৌঁছানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। তাঁর শিক্ষার ওপর চিন্তা ভাবনা করলে বুঝা যায়। দুটি নির্দেশ ভিন্ন ভিন্ন। একটি নির্দেশ তো এই যে, তোমার মাঝে যে গুণাবলী নেই তা প্রকাশ করে লোকদেরকে ধোকায় ফেলো না। কিন্তু অপরদিকে তিনি বলেছেন,

 إن الله يحب أن يرى أثر نعمته على عبده

অর্থাৎ: ‘মহান আল্লাহ বান্দাকে যে নিয়ামত দান করেছেন তার চিহ্ন বান্দার মাঝে দেখতে পছন্দ করেন। যেমন কাউকে আল্লাহ বিত্তবান বানিয়েছেন। তার কোনো অভাব নেই। স্বচ্ছলভাবে জীবন যাপনের পদ্বতি এমনভাবে করবে যাতে তাকে প্রদত্ত আল্লাহর নয়ামতের প্রকাশ ঘটে। যেমন সে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পরিপাটি কাপড় পরবে। ঘরটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাজিয়ে গুছিয়ে রাখবে। যদি সে সম্পদের প্রাচুর্যতা সত্তেও বিত্তহীনদের মতো চলাফেরা করে। ছেড়া, ময়লা, মলীন কাপড় চোপড় পড়ে বা নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন তাহলে এটাও শরীয়তে কাম্য নয়। এটাও আল্লাহর নিয়ামতের নাশুকরী। আরে ভাই যখন আল্লাহ নিয়ামত দিয়েই দিয়েছেন তাহলে তার চিহ্ন তোমার জিন্দেগীতে প্রকাশ হওয়া কাম্য। তোমাকে দেখে কেউ যেন ফকীর মনে না করে। জাকাতের উপযুক্ত মনে না করে। এজন্য বাস্তবতার নিরিখে তোমার যতুটুকু সামর্থ রয়েছে তা প্রকাশে কার্পণ্য করো না।

আলেমের জন্য ইলম প্রকাশ করা:
এলেমের বিষয়টিও এমনই। আল্লাহ তায়ালা ইলম দিয়েছেন। এখন তাওয়াযু বা বিনয়ের উদ্দেশ্য এটা নয় যে আলেম সবার থেকে লুকিয়ে থেকে কোনো স্থানে নির্জন বসে জিন্দেগী পার করে দেবে আর মনে করবে যে, যদি আমি মানুষের সামনে নিজেকে আলেম প্রকাশ করি তাহলে লোক আমাকে খুব সম্মান করবে। আর তাতে তো বিনয়ের ব্যাঘাত ঘটবে। অহংকার পয়দা হবে। তার চেয়ে আমি মানুষের সামনে নিজেকে আলেম হিসেবে পরিচয় দিব না। এমনটি কোনো আলেমের চিন্তা চেতনা হওয়া উচিত নয়। যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন তো তার তাকাজা বা দাবী হলো এই ইলমকে এতো প্রকাশ করবে যাতে লোকদের ফায়দা হয়। আর ইলমের নিয়ামতের শুকরিয়াও তাই যে মানুষের সেবায় ইলমকে কাজে লাগানো। ইলম আল্লাহ এ জন্য দেননি যে, তোমরা অহংকার করে ইলম নিয়ে বসে থাকবে। লোকদের মাঝে প্রভাব প্রতিপত্তি সৃষ্টি করবে। বরং ইলম দিয়েছেন তা দ্বারা মানুষের উপকার করার জন্য। অতএব উভয় দিকে ভারসাম্য বজায় রেখে মানুষের চলা উচিত। এগুলো সবই দ্বীনের অংশ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এর ওপর আমল করার তৌফিক দিন। আমীন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে