‘নাফ’ তীরের কথকতা

ঢাকা, রোববার   ১২ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৮ ১৪২৭,   ২০ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

‘নাফ’ তীরের কথকতা

 প্রকাশিত: ১৫:০১ ১৭ জুন ২০১৭   আপডেট: ১৭:৩৩ ২৯ আগস্ট ২০১৭

"বসতি ফুরিয়ে গেছে, ঘন হয়ে বসেছি ক’জন
আমাদের ঘিরে আছে ঘনতর দেড় শ’ মন্দির!”

———————————————————শঙ্খ ঘোষ

পৃথিবীর ইতিহাস তথা সাহিত্য মানুষের স্থানান্তরের ইতিহাস! বন-পাহাড় থেকে লোকালয়ে। গুহা থেকে গৃহে। পাড়া গাঁ ছেড়ে গঞ্জে বা শহরে। নদীর এপার থেকে ওপারে। দেশ থেকে দেশান্তরে। এমনকি এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। এভাবেই কাল নিরবধি পর্যন্ত!

তবে আমার বিশ্বাস মানুষ সাধারণত নিজ জন্মস্থান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে অন্যত্র বসতি স্থাপন করতে চায় না। বাধ্য না হলে। কারণ স্থানান্তর মাত্রেই মানুষের ভেতরে অতীতহীনতার সৃষ্টি করে! যা এক অভিনব পরিস্থিতি। অতীতের সবকিছুই সেখানে তার কাছে অনাবশ্যক হয়ে পড়ে। নিজের জন্মস্থান, প্রিয় পরিচিত নেইবারহুড, গ্রাম, লোকালয়, পূর্ব-পুরুষের বাসস্থান বা ভিটেমাটি, প্রিয়-পরিচিতদের স্মৃতি। সব কিছুই। এক সময়ে বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায় তার সমস্ত অতীত!

নাফ। বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যবর্তী একটি সীমান্ত নদী। উৎসস্থল মায়ানমারের আরাকান পর্বত। বাংলাদেশের টেকনাফ উপজেলার হোয়াক্যাং ইউনিয়নের পূর্ব দিকে মায়ানমার থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ দিকে সরলভাবে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই স্রোতধারার দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ কিলোমিটার। প্রলম্বিত খাঁড়ি সদৃশ। প্রস্থ সকল স্থানে এক নয়। এক থেকে তিন কিলোমিটার। সাগরের সাথে মিলিত হবার কারণে এই নদীতে জোয়ার-ভাটা হয় নিয়মিত।সাগরের মতোই। সাগরের পানির আধিক্যে পুরো নদীর জল লবণাক্ত। নদীর দুই তীরে দুই উল্লেখযোগ্য বন্দর। বাংলাদেশের বাংলাদেশের টেকনাফ আর মায়ানমারের আকিয়াব।

নাফ নদী নিয়ে যথেষ্ট ছোটবেলায় আমি একটা গল্প পড়েছিলাম। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। ঝাড় কাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নদী আর লাল কাঁকড়ার গল্প। আর কিছুই মনে নাই! আমি আমার সমস্ত মনোযোগ দিয়ে গল্পটার প্লট মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুই মনে পড়ল না। অস্পষ্টভাবে শুধু মনে পড়ল আমাদের পুরনো বাড়ির কথা। এই বাড়িতে আমাদের ঘরের জানালার সামনে একটা বেলিফুলের গাছ ছিল। সারারাত বেলীফুলের গন্ধে সারা বাড়ি সারাক্ষণ মৌ-মৌ করতে থাকত। আমাদের ঘরে একটা কাঁঠাল কাঠের তৈরি আলমারি ছিল। আলমারির ভেতরে ছিল গল্পের বইটা। আমি জানালার পাশে শুয়ে বেলীফুলের গন্ধের ভেতরে গল্পটা পড়েছিলাম। অথচ কি আশ্চর্য! সব মনে আছে। শুধু গল্পটাই মনে আসছে না! অথবা এমনও হতে পারে বাড়ির যে দৃশ্যপট আমার চোখের সামনে ভাসছে, তাও সত্যি নয়! আসলে অতীতের সাথে বর্তমানের অবিরত সম্পর্ক না থাকলে এক সময়ে সব কিছুই বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়!

টেকনাফে আমি প্রথমবার যাই ২০০৩ সালে। টেকনাফ বিজিবি ব্যাটালিয়নে। সরকারী কাজের সুত্রে। এ সময়েই আমার প্রথম নাফ নদী দেখা। খুব কাছে থেকে। প্রথম দেখা লাল কাঁকড়াও! পথে যেতে যেতে আমি দেখেছিলাম উখিয়া নামক স্থানে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয়কেন্দ্র। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে তৈরি করা।

‘রোহিঙ্গা’ মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। জাতিসঙ্ঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত সময়কালে মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের ‘রোহাঙ্গা’ নামক স্বাধীন রাজ্য ছিল। ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের। মায়ানমারের এই সময়কার রাজা বোদাওফায়া কর্তৃক ‘রোহাঙ্গা’ রাজ্য দখল করার পর সেখানে বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। অতঃপর ব্রিটিশদের দখলে আসে মায়ানমার। ব্রিটিশদের কর্তৃক মায়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু এই তালিকায় রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ভুলক্রমে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে!

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মায়ানমার স্বাধীনতা অর্জন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু। এই সময়েও পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। অতঃপর ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন কর্তৃক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। শিক্ষা ও ভোটের অধিকার এবং সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয়। এমনকি যুবকদেরকে বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। সন্তান হলে নিবন্ধন করতে দেওয়া হয় না।

বর্তমান রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু ১৯৯১ সাল থেকে। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপরে নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু করে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তখন থেকেই বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করে। অধিকাংশকেই পরবর্তীকালে পুশব্যাক করা হলেও মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিপীড়নের কারণে পুনরায় তারা বারংবার বাংলাদেশে প্রবেশ করে বা করার চেষ্টা করে।

বাংলাদেশ বিগত তিন দশক যাবত নির্যাতনের কারণে দেশত্যাগী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে মায়ানমার সরকারের সাথে আলোচনাও করেছে বহুবার। কিন্তু মায়ানমার সরকারের নিঃস্পৃহতা ও অনমনীয়তার কারণে সফলতা আসেনি। বরং ২০১৬ সালে রাখাইনের নাসাকা বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপরে গণহত্যা সঙ্ঘটন করে। যা ১৯৭১ সনের পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যার কথাই পুনঃ স্মরণ করিয়ে দেয়।

জানা গেছে, সর্বশেষ গত ২৪/২৫ আগস্ট ২০১৭ রাতে রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের পুলিশের ২৪টি চেক পোস্টে হামলা চালালে কমপক্ষে ৩২জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে ১১ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। ২১ জন বিদ্রোহী রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের তরফ থেকে এটাই ছিল বড় ধরনের সহিংস প্রতিরোধ।  আরও জানা যায়, নাসাকা বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপরে প্রতি আক্রমণে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় ৮৯ জন নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নারীদের সম্ভ্রম কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে।

ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। আমি নিশ্চিত যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগত নিঃস্পৃহতার কারণেই রোহিঙ্গা সমস্যা তীব্রতর আকার ধারণ করে বর্তমান সহিংস পর্যায়ে এসেছে। কারণ মূলত দেশটির বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। এই সম্পদের ওপরে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর লোলুপ দৃষ্টির কারণে তারা মায়ানমার সরকারের নিপীড়নমূলক কার্যক্রমকে নিশ্চুপভাবে মেনে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে আছে। অথচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকরী হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই শুধুমাত্র এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের সকল অধিকারসমূহ ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই শুধুমাত্র এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।

সহিংসতা কারো জন্যেই কল্যাণকর নয়। সে ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসের বীজ কাউকেই রেহাই দেবে বলে মনে হয় না। যখন সম্বিৎ ফিরবে, তখন আর আমাদের কিছুই করার থাকবে না!

 

ডেইলি বাংলাদেশ/আইজেকে