Exim Bank Ltd.
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯, ১১ মাঘ ১৪২৫

নাইক্ষ্যাং: পাহাড়ে স্বচ্ছ সবুজাভ জলের ধারা

সিদরাতুল সাফায়াত ড্যানিয়েলডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
নাইক্ষ্যাং: পাহাড়ে স্বচ্ছ সবুজাভ জলের ধারা
নাইক্ষ্যাং খুমে মাছশিকারী। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

রাতের প্রথমভাগে বেশ বৃষ্টি হলো, আমরা ভাবলাম ভাগ্য বুঝি সত্যিই সহায় নেই। তবে শেষ রাতে বৃষ্টি হলো না। খানিকটা আশঙ্কা নিয়ে ভোরে উঠে আমরা যেতে উদ্যোগী হলাম! আমাদের গাইড দুজন স্থানীয় ছেলেকে সঙ্গে দিলো গাইড হিসেবে। নাইক্ষ্যাং-এ যেতে স্থানীয় গাইড নেয়া বাধ্যতামূলক। তাদের নিয়েই রওনা দিলাম আমরা।

প্রথম পর্ব পড়ুন: স্বর্গরাজ্য নাইক্ষ্যাং

পুুরু কুয়াশার চাদরে মোড়া পাহাড়গুলো দেখতে টিভি স্ক্রিনে দেখা অন্যকোনো দেশের দৃশ্যই মনে হয়। হাঁটতে হাঁটতে যখন হাঁসফাস করে উঠি, তখন একটু দাড়িয়ে এই বিশাল পাহাড়ী অরণ্যের মাঝে নিজের অস্তিত্বকে একটু উপভোগ করে নিই। মনের ভেতরে একটাই বাক্য ঘুরে ফিরে তখন- ‌'এ আমি কোথায়!'

শামুক সংগ্রহে যাচ্ছে আদিবাসীরা

একটা পাহাড় ডিঙানোর পর আমরা দেবতার পাহাড়ের চুড়ায় এসে পৌঁছাই। এই পাহাড় থেকে নামতে হবে আমিয়াখুমসহ আরো দুটা খুম দেখতে। আর এই পাহাড়ে ওঠা-নামাটাই হলো ভয়ানক। নামতে শুরু করে প্রথমদিকে তেমন কিছুই মনে না হলেও কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো গাইড একটু সামনে এগিয়ে গাছে দঁড়ি বাঁধছে। বুঝলাম এবার হেঁটে না, ঝুলে নামতে হবে। পাহাড় খাড়া নেমে গেছে যেখানে পা দেবারও জায়গা নেই। গাইডের সাহায্য নিয়ে একে একে নামতে থাকি আমরা। এমন বেশ কয়েক জায়গায় গ্রুপের সবাই একে অন্যের সাহায্য নিয়ে, কখনো স্পাইডারম্যান স্টাইলে পাহাড়ের গা বেয়ে, কখনো মুগলীর মত শেকড় ধরে ঝুলে আমরা নামতে থাকলাম দেবতার পাহাড়। দেবতা পাহাড়ের গহীন জঙ্গল পার হতে হতে মনে পড়ে যাচ্ছিলো জেমস্ রোলিন্সের আমাজনিয়া বইটার কথা আর নিজেকে নাথান র‍্যান্ডের সাথে তুলনা করে রোমাঞ্চকর একটা ভাব মনে আনার লোভ সামলাতে পারি নি!

এসব ভাবতে ভাবতে আমরা পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের নিচে। অপরুপ সৌন্দর্যে সেজে আছে নাইক্ষ্যাং খুম। দু-পাশে উঁচু পাহাড়, তার মাঝ দিয়ে এঁকেবেকে চলে গেছে খুমটা। খাঁজকাটা ধুসর কালো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে স্বচ্ছ সবুজাভ জলের ধারা চলে গেছে যতদূর চোখ যায়। সামনের দৃশ্যটুকু বর্ণনা করতে সুনীল গাঙ্গুলীকে প্রয়োজন। আমার পক্ষে সম্ভব না! খুমের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ভেলার কাছে এলাম যেখান থেকে ভেলাখুমে যাবো। দুইটা ভেলায় করে আমরা চড়ে বসলাম খুমের বুকে। নিচে সচ্ছ সবুজ জল আর দু পাশে অসাধারন টেক্সচারের খাঁজকাটা আকাশচুম্বী পাহাড়ের মাঝ দিয়ে চলতে সত্যিই শিহরণ বয়ে দেয় শরীরে। মুগ্ধ হতে হতে শরীর-মন ক্লান্ত যেন!

শীতকাল হবার কারণে ভেলাখুমের জলপ্রপাতে তেমন পানি নেই। কিছু সময় কাটিয়ে আবার ঘুরে চলা আমিয়াখুমের দিকে। এক বিশাল জলপ্রপাত আমিয়াখুম। উচ্চ শব্দে জল পড়ে চলেছে অবিরাম গতিতে। ভাবলাম শীতকালেই এমন, না জানি বর্ষায় এটা কি রূপ ধারণ করে। ট্রাইপড বের করে ক্যামেরা বসিয়ে দিলাম। আমিয়াখুমের পারফেক্ট একটা ছবি না নিলে কি চলে!

শীতে আমিয়াখুমের সৌন্দর্য

এ দিন আমিয়াখুমে আমরাই ছিলাম একমাত্র গ্রুপ। আমিয়াখুমের পাশেই সাতভাইখুম। ভেলায় করে রওনা দিলাম সেটার উদ্দেশ্যে। শীতে জল কমের কারণে সাতভাইখুমের শেষ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। আমরা কিছুদূর ভেলায় ঘুরে ফিরে এলাম। সুযোগ বুঝে খুমের মধ্যে মন ভরে সাঁতার কাটলাম। তিন খুম ভ্রমন শেষে এবার পাড়ায় ফেরা।

দেবতার পাহাড় থেকে নামতে যতটা কষ্ট ছিলো উঠতে ততটা না। বেশ তাড়াতাড়ি উঠে গেলাম আমরা সবাই। এর মধ্যে অনেককেই জোঁকে আক্রমন করেছে। আমাকে কখন জোঁকে ধরে রক্ত খেয়ে নেমেও গেছে জানি না। স্যান্ডেল খুলে দেখি গলগল করে রক্ত বেরিয়ে যাচ্ছে পায়ের দুটা আঙুল দিয়ে। গাইডের পরামর্শে একটা গাছের পাতা বেটে রস লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে সেই রক্ত বন্ধ করলাম। প্রায় ৯ কিলোমিটার ট্রেকিং শেষ করে বিকাল চারটা নাগাদ আবার থুইসা পাড়ায় আমরা।

স্নান সেরে খেয়ে নিয়ে পাড়ায় ঘোরাঘুরি করলাম। আদিবাসী জীবন-ধারা দেখতে দেখতে ছবিও তুললাম মন মতো। একটা জায়গায় দেখি পুঁতে রাখা বাঁশের ওপর মোবাইল বসিয়ে কথা বলছে কয়েক-জন। জানলাম শুধুমাত্র বাঁশের ওপর ফোন রেখে নেটওয়ার্ক সার্চ দিলেই রবির নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তখন ওই অবস্থাতেই ডায়াল করে লাউড স্পিকারে কথা বলে যোগাযোগ করে থাকে তারা।

অভিনব উপায়ে চলছে সেলুলার যোগাযোগ

এই অভিজ্ঞতা নেবার লোভ সামলাতে না পেরে টিপু ভাইয়ের রবি সিম দিয়ে বাড়িতে কথা বলে নিলাম। আর জানিয়েও দিলাম এখনো একখণ্ডে আছি এবং সবকিছু কুশলেই যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামলে পাহাড়ের কোলে একটা মাচায় বসে আড্ডা দিতে দিতে দেখলাম কিভাবে কুয়াশা এসে দূরের পাহাড়গুলোকে গিলে ফেলে! কিভাবে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে মায়ানমার সীমান্তের একটা পাহাড়ী জনপদে! এ দৃশপট কি সচারচার চোখের ভাগ্যে জোটে?

নাইক্ষ্যাং থেকে খুম দর্শন শেষে দ্বিতীয় দিনই শরীর বলতে শুরু করেছে, আমি আর পারছি না! সেটা যেন বেশি জানান দিলো ৩য় দিন সকালে ঘুম ভেঙে। শররীটা যেন লেগে আছে বিছানার সাথে। উঠতেই মন চাইছিলো না। অথচ এ দিনই গত দুই দিন থেকে বেশি দূরত্ব হাঁটার কথা। ভেবেই যেন কুঁকড়ে গেলাম। তাও কি করা! সকালের নাস্তা সেরে বিদায় জানালাম আমরা যে ঘরের আতিথ্যে ছিলাম এই দুদিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেলো আমাদের দলটা সারি বেঁধে হাঁটতে হাঁটতে থুইসা পাড়া থেকে জঙ্গলে মিলিয়ে গেলো!

কিছুদূর এগিয়ে আমরা এসে পড়লাম জিনা পাড়ায়। সুন্দর গোছানো একটা আদিবাসী গ্রাম এটা। টং ঘরগুলো সুন্দর আর বেশ লোকসমাগমও আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা মেয়েদের একটা গ্রুপও দেখলাম এই পাড়ায় উঠেছে। এটা ভেবে ভালো লাগলো যে, এমন দুর্গম ট্রেইলে শুধু ছেলে ট্রেকারদেরই পা পড়বে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

সবে সকালের ব্যস্ততা শুরু হওয়া পাড়াটার কিছু ছবি তুলে আমরা আবার হাঁটতে থাকি। উদ্দেশ্য নাফাখুম। বেলা ১১ টা নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই বিখ্যাত নাফাখুমে। শুধু নাফাখুম তুলনামূলক সহজ ট্রেইল। তাই এখানে ভিড়ও বেশি। সাঙ্গু নদী দিয়ে রেমাক্রি ফলস পর্যন্ত এসে ২-৩ ঘন্টা ঝিরি পথ দিয়ে হাঁটলেই নাফাখুমের দর্শন পাওয়া যায়। তাই অনেক ছেলে-বুড়োরও দেখা মিললো। অনেকেই পুরো পরিবার নিয়ে এসেছে নাফাখুম জলপ্রপাত দেখতে। ভিড় বাঁচিয়ে জলপ্রপাতের একটা পারফেক্ট ছবি পাওয়াই দুষ্কর হয়ে দাঁড়ালো। পাহাড়ের ওপর থেকে বেশ কয়টা ঝাঁপ দিলাম নাফাখুমের ঠান্ডা জলে। ৩ দিনের অমানুষিক হাঁটার ক্লান্তি নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো।

ট্রেডমিলে যেমন দৌড়ানো যায় সামনে না এগিয়ে, তেমন জলপ্রপাতের অভিমুখে সাঁতার কাটলাম কিছুক্ষণ। সাঁতরে যতো সামনে যাবার চেষ্টা করি, ততোই পিছিয়ে যেতে থাকি। এটা ছিলো অসম্ভব মজার অভিজ্ঞতা। (শেষ অংশ আগামীকাল)

ডেইলিবাংলাদেশ/এনকে

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
নতুন হাইস্পিড রেলে ঢাকা থেকে ৫৪ মিনিটে চট্টগ্রাম
নতুন হাইস্পিড রেলে ঢাকা থেকে ৫৪ মিনিটে চট্টগ্রাম
সেলফিতে মাশরাফী দম্পতি
সেলফিতে মাশরাফী দম্পতি
বাংলাদেশের মাঝে এক টুকরো ‌'কাশ্মীর'!
বাংলাদেশের মাঝে এক টুকরো ‌'কাশ্মীর'!
বঙ্গোপসাগরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার যন্ত্রযুক্ত কচ্ছপ উদ্ধার
বঙ্গোপসাগরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার যন্ত্রযুক্ত কচ্ছপ উদ্ধার
‘মা’ গানে মাতালেন নোবেল, কাঁদালেন মঞ্চ (ভিডিও)
‘মা’ গানে মাতালেন নোবেল, কাঁদালেন মঞ্চ (ভিডিও)
মদের চেয়ে দুধ ক্ষতিকর: মার্কিন পুষ্টিবিদ
মদের চেয়ে দুধ ক্ষতিকর: মার্কিন পুষ্টিবিদ
বিয়েতে সৌদি নারীদের পছন্দের শীর্ষে বাংলাদেশি পুরুষরা!
বিয়েতে সৌদি নারীদের পছন্দের শীর্ষে বাংলাদেশি পুরুষরা!
পাসওয়ার্ড না দেয়ায় স্বামীকে পুড়িয়ে মারল স্ত্রী
পাসওয়ার্ড না দেয়ায় স্বামীকে পুড়িয়ে মারল স্ত্রী
স্ত্রীর ‘বিশেষ’ আবেদনে মলম মাখিয়ে বিপাকে স্বামী!
স্ত্রীর ‘বিশেষ’ আবেদনে মলম মাখিয়ে বিপাকে স্বামী!
সোমবার ‘চন্দ্রগ্রহণ’
সোমবার ‘চন্দ্রগ্রহণ’
স্ত্রীকে ভালোবাসার বিরল ঘটনা: ৫৫ হাজার পোশাক উপহার
স্ত্রীকে ভালোবাসার বিরল ঘটনা: ৫৫ হাজার পোশাক উপহার
মৃত মানুষের বাড়িতে কান্না করাই তাদের পেশা!
মৃত মানুষের বাড়িতে কান্না করাই তাদের পেশা!
শুধুই নারীসঙ্গ পেতে পর্যটকরা যেসব দেশে ভ্রমণ করেন
শুধুই নারীসঙ্গ পেতে পর্যটকরা যেসব দেশে ভ্রমণ করেন
পালিয়ে বিয়ে করলে আশ্রয় দেবে পুলিশ
পালিয়ে বিয়ে করলে আশ্রয় দেবে পুলিশ
বিয়ের খবর প্রকাশ করলেন সালমা
বিয়ের খবর প্রকাশ করলেন সালমা
বৃক্ষমানবের হাতে পায়ে ফের শেকড়
বৃক্ষমানবের হাতে পায়ে ফের শেকড়
বিষ খেয়ে হাসপাতালেই বিয়ে!
বিষ খেয়ে হাসপাতালেই বিয়ে!
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ কাল
পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ কাল
স্থগিত শনিবারের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন
স্থগিত শনিবারের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন
শাহনাজের দুই মেয়ের দায়িত্ব নিচ্ছে উবার
শাহনাজের দুই মেয়ের দায়িত্ব নিচ্ছে উবার
শিরোনাম :
আগামী ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান; ভোটগ্রহণ চলবে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আগামী ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান; ভোটগ্রহণ চলবে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কুমিল্লার হত্যা মামলায় খালেদা জিয়ার আবেদন নাকচ, ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের কুমিল্লার হত্যা মামলায় খালেদা জিয়ার আবেদন নাকচ, ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ হাইকোর্টের খুলনায় বিশেষ অভিযানে ১২ জন মাদক ব্যবসায়ীসহ অর্ধশতাধিক আটক খুলনায় বিশেষ অভিযানে ১২ জন মাদক ব্যবসায়ীসহ অর্ধশতাধিক আটক মণিরামপুরে যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার মণিরামপুরে যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরে ট্রাকের ধাক্কায় একই পরিবারের ছয় জনসহ প্রাণ গেল ৭ জনের লক্ষ্মীপুরে ট্রাকের ধাক্কায় একই পরিবারের ছয় জনসহ প্রাণ গেল ৭ জনের