Alexa ধর্ষণ: এর চেয়ে লজ্জার কিছু নেই

ঢাকা, রোববার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৮ ১৪২৬,   ২৩ মুহররম ১৪৪১

Akash

ধর্ষণ: এর চেয়ে লজ্জার কিছু নেই

 প্রকাশিত: ১৭:২৪ ২৮ মে ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

যেভাবেই দেখি না কেন এটা অত্যন্ত লজ্জার কথা যে, আমাদের দেশে প্রতিদিনই নতুন ভয়াবহতা নিয়ে এক বা একাধিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। খবরের কাগজ ওল্টালেই ধর্ষণের খবর পাচ্ছি আমরা।

শতবর্ষী বৃদ্ধা থেকে শুরু করে এক বছরের শিশুও রেহাই পাচ্ছে না বিকৃতরুচির পুরুষের হিংস্র থাবা থেকে। বিষয়টি এতটাই উদ্বেগের যে, পরিবারের নারী সদস্যদের শিক্ষাসহ অন্যান্য কর্মতৎপরতা সংকুচিত করে এনেছেন অনেকে। বাড়ির পাশে কিংবা নিজ ঘরে পুরুষ শিক্ষক রেখে কন্যা সন্তানকে পড়াতেও ভয় পাচ্ছেন ভভিভাবকরা। কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনে যৌন সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার আতঙ্কে নৈশকালীন কর্মজীবী নারীরা অনেকেই স্বেচ্ছায় কর্মস্থল থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এতে দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চলতি মে মাসের প্রথম আট দিনে রাজধানীসহ সারা দেশে ৪১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং এর মধ্যে তিনজন শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও তিন কন্যাশিশু। 

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেই ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামের মানবাধিকার সংগঠনটি তৈরি করেছে এই প্রতিবেদন। অন্যদিকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে সারাদেশে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার ৩ হাজার ৯১৮ শিশু-নারী। এদের মধ্যে ধর্ষিত ৬৯৭ জন; গণধর্ষণের শিকার ১৮২ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৬৩ জনকে। শ্লীলতাহানি ও যৌন নিপীড়িত হয়েছেন ২১৭ জন; হত্যা করা হয়েছে ৪৮৮ শিশু-নারীকে। এসব প্রতিবেদন কী এটাই প্রমাণ করে যে, ধর্ষণ আমাদের সমাজে ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে? 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের এ ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মূল্যবোধের অবনতি আর অপরাধীর শাস্তি না হওয়া। অথচ নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের দেশে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন রয়েছে। আমরা জানি, বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। একই আইনের ৯(২) ধারায় আছে, ‘ধর্ষণ বা ধর্ষণ-পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে।’ একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, ‘যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ওই ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে।’ নারী নির্যাতন প্রতিরোধে শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণ কেন প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে- এর কারণ খতিয়ে দেখার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। 

প্রশাসনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মাদকসন্ত্রাসের মতো যৌন সন্ত্রাসও এখন সরকারের দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি নারী-শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও গণধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনার যে হিড়িক পড়েছে তা দ্রুত সামাল দেয়া না গেলে পরিস্থিতি ভিন্নরূপ নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

সঙ্গত কারণে সরকারের নীতি-নির্ধারক মহল থেকে এ ব্যাপারে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ তৎপর ও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আবার এটাও জানা যাচ্ছে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এরই মধ্যে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন করতে নির্দেশনা জারি করেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর এবং এর আওতাধীন অফিস ও দেশের সব সরকারি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করতে বলা হয়। সরকারের এ উদ্যোগ অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। তবে সম্প্রতি ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় অপরাধ বিশেষজ্ঞরা আইনি দুর্বলতা, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতাকে প্রধানভাবে দায়ী করেছেন। তাদের ভাষ্য, এ গণ্ডি থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে ভিন্ন কোনো কৌশলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা কঠিন হবে। 

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে অযোগ্য লোক থাকায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়াও এর আরেক কারণ। এছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এরা শাস্তি পাবে। শুধু আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মহামারী ব্যাপক রূপ নিয়েছে। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান বেশ কঠিন। সব কিছুতেই আজ দলবাজি চলে। তাতে কিছু মানুষ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। যৌন নির্যাতনের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। নারীর ওপর বলপ্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটতে পারে। কখনও দেখা যায়, সামাজিকভাবে কোণঠাসা কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার আশায় অলীক কল্পনা করতে থাকে। কিন্তু কাঙ্খিত সমাধান না পেয়ে, বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। ঘরে-বাইরে নারীর ওপর আগ্রাসী যৌন আচরণ, যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ সবই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোতে নারীর অধস্তনতাই প্রকাশ করে নানারূপে। তাই ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন, নারীর সম্মতি ছাড়া তার ওপর যে কোনো ধরনের আগ্রাসী যৌন আচরণ ক্ষমতা প্রদর্শনের, দমন-পীড়নের, কর্তৃত্ব করার কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষতান্ত্রিক বলেই নারীকে তারা গণ্য করে অধস্তন লৈঙ্গিক পরিচয়ের বস্তু হিসেবে, যা পীড়নযোগ্য। এটা খুবই আশঙ্কার কথা যে, সমাজে বেশিরভাগ নারীই নিরাপদ নয়। 

প্রকৃত প্রস্তাবে ধর্ষণ রোধে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে, তেমন কাজ বর্জন করতে হবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যৌন শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। বাজে সঙ্গ ও নেশা বর্জন করতে হবে। ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগেও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নিজ নিজ পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, অশ্লীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতিচর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধ তদন্তে ও অপরাধীদের বিচারাধীন রায় পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ধর্ষক যে-ই হোক তাদের দ্রুত আটক করতে হবে।

পরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, সরকারকে নারীর মর্যাদার আসন নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বদলে যেতে হবে। আসুন আমরা নারীর ওপর লোলুপ দৃষ্টি নয়; মায়া-মমতার দৃষ্টিতে তাকাই। পরনারীকে কখনও মা, কখনো বোন, কখনো বা মেয়ে হিসেবে দেখি। এছাড়া স্বল্প সময়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সমতাভিত্তিক আইননীতি বাস্তবায়ন করা গেলে এবং অপসংস্কৃতির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারলে ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতন কমে আসবে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর