দ্রুত ও ব্যাপক পরীক্ষাই করোনা নিয়ন্ত্রণের প্রধান কৌশল 
SELECT bn_content.*, bn_bas_category.*, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeInserted, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeInserted, DATE_FORMAT(bn_content.DateTimeUpdated, '%H:%i %e %M %Y') AS fDateTimeUpdated, bn_totalhit.TotalHit FROM bn_content INNER JOIN bn_bas_category ON bn_bas_category.CategoryID=bn_content.CategoryID INNER JOIN bn_totalhit ON bn_totalhit.ContentID=bn_content.ContentID WHERE bn_content.Deletable=1 AND bn_content.ShowContent=1 AND bn_content.ContentID=193623 LIMIT 1

ঢাকা, শনিবার   ০৮ আগস্ট ২০২০,   শ্রাবণ ২৫ ১৪২৭,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

দ্রুত ও ব্যাপক পরীক্ষাই করোনা নিয়ন্ত্রণের প্রধান কৌশল 

 প্রকাশিত: ১৮:০৮ ১২ জুলাই ২০২০  

ডা. মো. সোহরাব হোসেন

ডা. মো. সোহরাব হোসেন রোগ নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য ভাইরাল জুনোস বিশেষজ্ঞ। কাজ করেছেন জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ পরামর্শক হিসেবে। বর্তমানে রেবিজ ইন এশিয়া ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। রেবিজ টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্যও তিনি। লেখালেখিতেও রয়েছে বিশেষ ঝোঁক। স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা পরামর্শমূলক লেখা নিয়ে সরব রয়েছেন গণমাধ্যমে।

দ্রুত ও ব্যাপক পরীক্ষা, কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান কৌশল। কোনো এলাকা বা দেশে পর্যাপ্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সেখানকার সকল করোনা আক্রান্ত রোগীকে যদি সনাক্ত করে সাধারণ মানুষ থেকে পৃথক করা সম্ভব হয় তাহলে সেখানে রোগ বিস্তার বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে দ্রুত পরীক্ষার মাধ্যমে রোগী পৃথক করা হলে আক্রান্ত রোগী অন্য কাউকে এ রোগ ছড়াতে পারে না। 

দ্রুত রোগ নিরূপণের আরেকটি সুবিধা, আক্রান্ত রোগীর যথাশীঘ্র এবং যথার্থ চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং আরোগ্য লাভের সম্ভবনা বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীর যে সকল দেশ এ রোগ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে তারা সকলেই এ কৌশলসমূহ অবলম্বন করেছে। পৃথিবীর সর্বপ্রথম করোনা দেখা দেয় চীনের উহান প্রদেশে। চীন সরকার উহাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোভিড-১৯ রোগী সনাক্ত করাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সমগ্র চীনে ৮৩,৫৫৭ জন  সনাক্তকৃত রোগীর মধ্যে ৪,৬৩৪ জন মারা যায়। কিন্তু তারা ৯,০৪,১০,০০০ নাগরিককে কোভিড-১৯  পরীক্ষা করে (worldometers ০৬.০৭.২০২০) । উহানে দ্বিতীয় পর্যায়ে করোনা দেখা দিলে সরকার ব্যাপক পরীক্ষা ( Mass test system) প্রয়োগ করে সকল তথা ১,১০,০০,০০০ নাগরিকের মধ্য হতে মাত্র দশ দিনে ১,০৯,০০,০০০ জনকে করোনা পরীক্ষা করে (BBC - ০৮ জুন ২০২০) এবং আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গ কে আলাদা করে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান  করা হয়। ফলে করোনা সংক্রমণ বাধাগ্রস্থ হয়ে নিয়ন্ত্রণে আসে। পক্ষান্তরে আমেরিকায় ২৯,৮৫,৪৯০ জন কোভিড-১৯ সনাক্তকৃত রোগীর মধ্যে  ১,৩২,৬১০ জন  মারা যায় এবং পরীক্ষা করা হয় ৩,৭৬,০২,৪৭১ জন (Worldometers-৬,জুলাই,২০২০ )। কোভিড-১৯ সংক্রমিত রোগী ও মৃতের সংখ্যা চীনে, আমেরিকা অপেক্ষা অনেক কম হলেও পরীক্ষার সংখ্যা অনেক বেশি, যা সেখানে জথাশীঘ্র এ রোগ  নিয়ন্ত্রণের সহায়ক হয়েছে। 

কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে পৃথিবীর সবচাইতে সফল দেশ দক্ষিণ কোরিয়া এবং নিউজিল্যান্ডও ইহা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পরীক্ষা এবং আক্রান্ত রোগীকে সাধারণ মানুষ হতে আলাদা করে রাখাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া মাত্র তিন সপ্তাহে ২,৭০,০০০ নাগরিককে পরীক্ষা করে ১০,৭২৮ জন করোনা রোগী সনাক্ত ও চিকিৎসা প্রদান পূর্বক তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগীর সনাক্তের সংখ্যা প্রথম হতেই  সংক্রমণের তুলনায় অপ্রতুল। যদিও বাংলাদেশ সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বর্তমানে পরীক্ষার সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তার পরিমাণ আক্রান্তের তুলনায় যথেষ্ট নয়। আর বিলম্বিত পরীক্ষার ফলে রিপোর্ট প্রাপ্তির পূর্বেই রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। অনেকক্ষেত্রে  হাসপাতালে নেয়ার পথে বা সেখানে গিয়েই  মৃত্যু বরণ করে  (হাসপাতালে মৃত্যুর ৩৫% ভর্তির প্রথম দিনে - প্রথম আলো- ০৩ জুলাই ২০২০)।
 
 করোনা পরীক্ষার জন্য সরকারি বা স্বাস্থ্য বিভাগের অনেক নীতিমালা রয়েছে কিন্ত তা কাঙ্খিত চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। সেই প্রেক্ষাপটে আমি  ব্যক্তিগত কিছু পরামর্শ সদয় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি:

ক.  করোনা পরীক্ষার সার্বিক ক্ষেত্রে ফি আরোপ, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রোগ নিরূপণের উপর ঋণাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পরীক্ষার সংখ্যা হ্রাস রোগ ও সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে। সুতরাং বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করতঃপরীক্ষার  সুযোগ ধনী- দরিদ্র সকলের সক্ষমতার মধ্যে আনায়ন করা। 

খ. করোনা সনাক্তকরণ বিষয়টি মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভরশীল না করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা বাধ্যতামূলক করা। আর এ জন্য ব্যাপক পরীক্ষা পদ্ধতি অবিলম্বে চালু করা। 
  
গ. কোভিড-১৯ সনাক্তকৃত ব্যক্তির পরিবার এবং বিগত কয়েকদিনে সে যাদের সংস্পর্শে এসেছে তাদের মধ্যে সন্ধেহভাজনদেরকে পরীক্ষা ও সঙ্গনিরোধ করতে বাধ্য করতে  হবে। 

ঘ.  বিগত এক বা দুই সপ্তাহে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিবর্গের তালিকা বিশ্লেষণ পূর্বক যেসকল এলাকায়  সংক্রমণ বেশি সেগুলোকে চিহ্নিত করা। এ বিষয়ে যদিও আংশিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে পুরো দেশের জেলা সমূহকে বিভিন্ন জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। তবে গৃহীত ব্যবস্থা হতে পূর্ণ সুবিধা পেতে তথাকার করোনা আক্রান্ত রোগীদেরকে কার্যকরী ভাবে পৃথক করতে হবে এবং সন্দেহ ভাজন বা রোগীর সংস্পর্শে আশা ব্যক্তিবর্গকে পরীক্ষা ও সঙ্গনিরোধে থাকতে বাধ্য করতে হবে। 

ঙ. কোভিড-১৯ তে আক্রান্ত রোগীদেরকে শ্রেণীবিন্যাস করে মৃদু আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাসায় রেখে চিকিৎসকের দেয়া পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা এবং তীব্র ও অতিতীব্র সংক্রমৃত ব্যক্তিবর্গকে হাসপাতালে এনে যথার্থ চিকিৎসা প্রদান। 
    
চ.  র‍্যাপিড টেস্ট কিট দ্বারা এন্টিজেন ও এন্টিবডি দুটিই নির্ণয় করা যায় এবং ইহা দ্বারা খুবই দ্রুত ও সহজে রোগ নিরূপণ করা যায়। পৃথিবীর অনেক দেশ এখন ইহা ব্যবহার করে সফলতা লাভ করছে। দক্ষিণ কোরিয়া ১২০ টি দেশে র‍্যাপিড টেস্টকিট রফতানি করছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের পরীক্ষা সুযোগের যে অপ্রতুলতা বিদ্যমান তাতে যথাশীঘ্র  র‍্যাপিড টেস্টকিট সংগ্রহ করে দ্রুত পরীক্ষার ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা। 

ছ.  উপরোল্লিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করে করোনা সংক্রমণ রোধ ও মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করার জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের দ্বারা একটি Time Bound Road Map প্রস্তুত করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাস্তবায়ন করা।  

জ.  বর্নিত বিষয়াবলী দেশব্যাপী বাস্তবায়ন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পৃথিবীর অন্য দেশও তা পারেনি। সুতরাং তাদের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তর, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সমন্বয় করে করোনা যুদ্ধের মোকাবিলা করা একান্ত আবশ্যক।  

ঝ.  কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী অধিকাংশ ক্ষেত্রে জ্বর, রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং ফুসফুসের অস্বাভাবিক চিত্র পরিলেক্ষিত হয়। তাই এন্টিজেন বা এন্টিবডি পরীক্ষার সুযোগ পাওয়া না গেলে এসকল ক্ষেত্রে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা উচিত। এ বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন করা।  

করোনা সংক্রমণের বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আঠারোতম (Worldometers ০৩ জুলাই ২০২০)। যার বর্ধনশীল হার লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার দূরন্ত গতির মতো বাড়ছে এবং মৃত্যুর মিছিল যেভাবে বাড়ছে তাতে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতার আশঙ্কা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনার এ ভয়ংকর থাবা থামাতে, আমাদের ব্যর্থতা দেশকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা কি ধারনা করার মতো? অথচ বাঙালি তো সেই জাতি যারা ১৯৭১ সালসঙ্কুর্ধর্ষ পাকিস্তানি বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্থ করে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল। যারা কলেরা, বসন্ত, পোলিওসহ জনস্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক রোগ ব্যাধিকে নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয় অর্থনীতির তেজী ঘোড়াকে উজ্জেবিত করে দারিদ্র্য ও জরাগ্রস্থ এদেশটিকে উন্নতির স্বর্ণশিখরের দিকে ধাবিত করে আসছিল। আমাদের জাতীয় জীবনে এ দুর্লভ সফলতা প্রাপ্তি সম্ভব হয়েছিল এদেশের জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও অংশীদারিত্ব। কিন্তু সেই জাতি দুর্ধর্ষ করোনার ভয়ঙ্কর থাবায় পর্যুদস্ত হতে চলেছে। এর অন্যতম কারণ দেশের সকল নাগরিককে করোনা নিয়ন্ত্রণে অংশীদারিত্ব গ্রহণে উজ্জেবিত করতে ব্যর্থ হওয়া। করোনা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় অতি সাধারণ স্বাস্থ্য বিধি সমূহ মানাতে সমর্থ না হওয়া। 

এদেশকে করোনা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম করতে পরীক্ষার ব্যাপকতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মানুবর্তিত চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশে কোভিড -১৯ শুরু হয়েছে প্রায় ৫ মাস। দিনের পর দিন বিপদ বৃদ্ধিই পাচ্ছে। এ মুহূর্তেই অভূতপূর্ব এ মহা দুর্যোগ মোকাবিলায় এদেশের সরকার ও জনগণের এক সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়া একান্ত আবশ্যক, আর তা এখনো অসম্ভব নয়। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর