ঢাকা, রোববার   ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৫ ১৪২৫,   ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪০

দ্যা ক্যাসিনি মিশন

সিফাত সোহা

 প্রকাশিত: ১২:৫৫ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১২:৫৫ ৮ ডিসেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

শনি গ্রহ নিয়ে আমরা আগেও অনেক আলোচনা করেছি। বিজ্ঞানিরাও এই গ্রহ নিয়ে অনেক পরিক্ষা নিরীক্ষা করছেন। এই শনি গ্রহ কে জানার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় হাতিয়ার ছিল দ্যা ক্যাসিনি মিশন। আমরা বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানুষের দ্বারা শেষবারের মতন ক্যাপচার করা শনিগ্রহের ফটো দেখতে পেয়েছি বিভিন্ন অনলাইন বা সোশ্যাল মিডিয়াতে। আজ আমরা ক্যাসিনি মিশন থেকে পাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আলোচনা করব। 

২০১৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর যখন ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুযায়ী সময় ছিল সকাল সাতটা পঞ্চান্ন। দ্যা ক্যাসিনি স্পেস ক্র্যাফট যা ২০ বছর আগে পৃথিবী থেকে যাত্রা শুরু করেছিল শনি গ্রহের উদ্দেশ্যে। সেই মুহুর্থে শনি গ্রহের অ্যাটমস্ফিয়ারে প্রবেশ করে। দ্যা ক্যাসিনি ছিল এমন  একটি স্পেস ক্রাফট যা প্রথম বার শনি গ্রহের অরবিটকে প্রদক্ষিণ করেছিল এবং আমি আপনাদের জানিয়ে রাখি এই স্পেস মিশন এর দরুন ক্যাসিনি নামক স্পেস ক্র্যাফটটি শনি গ্রহের ৪৫০০০০ ছবি ধারণ করেছিল। কিন্তু স্পেস মিশন থেকে আমরা কি পেয়েছি? কেন দ্যা ক্যাসিনি স্পেস মিশন এত বেশি দরকারি ছিল? আমাদের আজকের এই পর্বে এই বিষয়বস্তু নিয়ে আমরা আলোচনা করব। 

১৯৯৭ সালের ১৫ অক্টোবর প্রথম ক্যাসিনি স্পেইস ক্রাফট পৃথিবী থেকে লঞ্চ করে। যার মধ্যে ছিল টাইটান ফোর নামক একটি রকেট। এই সময় ক্যাসিনি ছিল প্রথম স্পেইসক্রাফট যা শনি গ্রহের দিকে রওনা হয়। ক্যাসিনির ওজন ছিল ৫৫০০ কিলোগ্রাম যা ক্যাসিনিকে তখন কার দিনে সব থেকে ভারী স্পেস ক্র্যাফট বানায়। ১৯৯৭ সালে  যাত্রা শুরু করার পর এই স্পেস মিশনে হয়ত এত সময় লাগত না। কিন্তু এই স্পেস যাত্রাই ক্যাসিনি স্পেস ক্রাফট পৃথিবী, ভেনাস এবং জুপিটারের অরবিটকে প্রদক্ষিণ করে। শনি গ্রহে পৌছানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে গতি প্রাপ্ত করার জন্য এই যাত্রাপথে ক্যাসিনি যখন জুপিটারের অরবিটকে প্রদক্ষিণ করছিল তখন অনেক হাই ডেফিনেশন ফটো ক্যাপচার করে, যা  আজ আমাদের কাছে এক মূল্যবান সম্পদ। কিন্তু এরপর ক্যাসিনি যখন প্রথমবার শনি গ্রহের  কাছাকাছি গিয়ে পৌছায়, ২০০৪  সালে তখন প্রথম শনি গ্রহের ছবি ধারণ করে।  

আপনাদের জেনে রাখা ভাল যে এই মিশনে কিন্তু নাসা একা ছিল না। এই মিশনটির পুরো নাম  ছিল ক্যাসিনি-হুয়েগেন্স মিশন এবং এই স্পেস মিশনে নাসার সাথে ইউরোপিয়ান এবং ইটালিয়ান স্পেস এজেন্সিও যুক্ত ছিল। একদিকে যেমন নাসা ক্যাসিনি স্পেইসক্রাফট দায়িত্ব নিয়েছিল, অন্যদিকে ইউরোপিয়ান এবং ইটালিয়ান স্পেস এজেন্সি হুয়েগেন্স মডিউলে দায়িত্ব নিয়েছিল। এই হুয়েগেন্স মডিউলের দায়িত্ব ছিল শনির চাঁদ টাইটানকে নিয়ে রিসার্চ করা। ২০০৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ক্যাসিনির একটি অংস টাইটানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এই হুয়েগেন্স মডিউলটি ২০০৫ সালের ১৪ জানুয়ারি টাইটানের   ক্লাউডি অ্যাটমস্ফেয়ারের মধ্যে দিয়ে গিয়ে তার মাটিতে গিয়ে পৌঁছায়। 

টাইটানে পৌঁছানো মাত্রই এই মডিউলটির দায়িত্ব  ছিল টাইটানের মিথেন এবং নাইট্রোজেনে ভরা অ্যাটমস্ফেয়ারকে নিয়ে রিসার্চ করা। পরিকল্পনা ছিল এই হুয়েগেন্স মডিউলটি টাইটান থেকে ৭০০টির মতন ফটো ক্যাপচার করবে। কিন্তু এই মিশনের দরুণ অর্ধেক ফটো হারিয়ে যায়। কিন্তু কেন হারিয়ে গেল এই সব মূল্যবান ছবি? এই প্রশ্ন হয়ত সবার মনেই আসতে পারে। আসলে হুয়েগেন্সের মধ্যে একটি রেডিও ট্রান্সমিটার লাগানো ছিল। যার সাইজ ছিল খুবই ছোট। সুতরাং এই ট্রান্সমিটারটি সরাসরি পৃথিবীতে ডাটা ট্রানস্ফার করতে পারত না। তার মানে ট্রান্সমিটারটি প্রথমে ছবিগুলোকে ক্যাসিনিতে পাঠাতো আর সেখান থেকে পৃথিবীতে। এই ট্রান্সমিটারটি মধ্যে দুটি চ্যানেল ছিল 'এ' এবং 'বি'। কিন্তু ক্যাসিনির মধ্যে কিছু সফটওয়্যারে সমস্যা হওয়ায় ক্যাসিনি এই ট্রান্সমিটারটি বি চ্যানেল থেকে কোন ডাটা রিসিভ করেনি এবং সেই কারণে টাইটানের ৭০০ ছবির মধ্যে থেকে মাত্র ৩৫০টি ছবি  ক্যাসিনির সফটওয়্যারে গিয়ে পৌছায়। 

হুয়েগেন্স  টাইটান থেকে ৯০ মিনিট ধরে ডাটা সংগ্রহ করেছিল এবং তার পরেই এর ব্যাটারী শেষ হয়ে যায় এবং এটি ডিসচার্জ হয়ে যায়। এসময় এটা ছিল মানুষের দ্বারা করে থাকা পৃথিবী থেকে সবথেকে দূরে ল্যান্ডিং। কিন্তু শুধুমাত্র টাইটেনকে পর্যবেক্ষণ করাই এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল না। তাই ২০০৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যাসিনি প্রথম বার শনির চাঁদ আন্সেলেডাস এর অরবিটকে প্রদক্ষিণ করে। এই সময় ক্যাসিনি থেকে এমন কিছু সিগন্যাল পৃথিবীতে আসে যা তার মিশনকে  সম্পূর্ণরূপে পাল্টে দেয়। এই সিগন্যালগুলো থেকে মনে করা হচ্ছিল এন্সেলেডাস এর মধ্যে ও থিন অ্যাটমস্ফেয়ার থাকতে পারে। তাই মার্চ এবং এপ্রিল মাস ধরে তানা ক্যাসিনি আন্সেলেডাসের অরবিটকে প্রদক্ষিণ করে এবং কিছু অদ্ভুত তথ্য সংগ্রহ করে।  

ক্যাসিনি যখন আন্সেলেডাসের সাউথ পোলে গিয়ে পৌঁছায় তখন দেখা যায় যে জলীয় বাষ্প আকাশের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার ধরে ছড়িয়ে গেছে। নাসার এই খোঁজ দাবানলের মতো পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায় এবং এন্সেলেডাসের এই জলিয় বাষ্প দেখে ধারণা করা হয় যে সেখানেও পানির সোর্স থাকতে পারে। তার মানে এন্সেলেডাসেও প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা ছিল এবং এই জলিয়বাস্প থেকে সংগ্রহ করার পানি ছিল নোনতা। সুতরাং ধারণা করা হচ্ছিল এন্সেলেডাসের মধ্যে পৃথিবীর মতো সমুদ্র থাকতে পারে এবং এটা ছিল ক্যাসিনির বিশ বছরের স্পেস মিশনের সব থেকে বড় খোঁজ।  

প্রশ্ন হল এন্সেলেডাসের মধ্যে কি  প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে? যদি সেখানে সত্যিই পানির কোন উৎস থাকে তাহলে সম্ভব। ক্যাসিনি মিশন থেকে জানা যায় শনির মধ্যে সাত টি রিং থাকে।  এ, বি, সি, ডি, ই, এফ এবং জি। যেগুলো তিনশো হাজার কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত। দূর থেকে শনি গ্রহের এই রিংগুলোকে সলিড বলে মনে হয়। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে পুরো ব্যাপারটাই আলাদা। আরো কাছ থেকে যদি দেখা হয় তাহলে বোঝা যাবে এই রিংগুলো ধুলো, পাথর এবং বরফ দিয়ে তৈরি। এই সাতটি রিং এর মধ্যে ই রিং সবথেকে উজ্জ্বল এবং বড় এবং রি রিং এর মধ্যে থাকা পারটিকালগুলো অন্যান্য রিঙের তুলনায় আকার আকৃতিতে অনেক বড়। ই রিং এর মধ্যে থাকা ইস্টন এবং অন্যান্য পার্টিক্যালগুলো এত বৃহৎ যে এর উপর একটি স্পেস ক্রাফটকে রীতিমত ল্যান্ড করানো যেতে পারে। আর এই পারটিক্যাল গুলি তাদের অরবিটের মধ্যে প্রতি সেকেন্ডে ১৮ কিলোমিটার গতিবেগে ঘুরছে। 

এই পুরো মিশনের দরুন ক্যাসিনি শনি গ্রহে এমন কিছু ফটো তুলে যা নিঃসন্দেহে আজ অব্দি মানুষের নেয়া এক অন্যতম খোঁজ এবং এভাবে ক্যাসিনি টানা বিশ বছরের স্পেস মিশনের শেষ সময় এসে গেছিল মানে গ্র্যান্ড ফিনালে। ১৯৯৭ সালে পৃথিবী থেকে লঞ্চ হওয়ার পর টানা বিশ বছর ধরে স্পাচে মিশন করে এই ক্যাসিনি স্পেইসক্রাফট, যা নিঃসন্দেহে মানুষের দ্বারা করে  থাকা এক অভূতপূর্ব স্পেস মিশন। অবশেষে ২০১৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর যখন ক্যাসিনি স্পেইসক্রাফট এর ফিউল সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়, ধ্বংসের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত শনি থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ক্যাসিনি পৃথিবীতে পাঠিয়েছিল। 
ভেবে দেখলে এই পুরো মিশনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল। কিন্তু এই মিশনটি করতে সময় লেগেছিল বিশ বছর এবং এই যাত্রাই ক্যাসিনি স্পেইসক্রাফট টোটাল আট বিলিয়ন কিলোমিটার পথ ট্রাভেল করে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ