Exim Bank Ltd.
ঢাকা, শনিবার ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১ পৌষ ১৪২৫

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিউক্লিয়ার বোমার প্রয়োজন ছিল কী? (পর্ব ১)

নিয়াজ মাহমুদডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নিউক্লিয়ার বোমার প্রয়োজন ছিল কী? (পর্ব ১)
ফাইল ছবি

পারমাণবিক বোমা হামলা হবে কী হবে না? হিরোশিমা- নাগাসাকিতে আক্রমণ হবে কী হবেনা, এরকম একটা দ্বিধা ১৯৪৫ সালের দিকে আমেরিকান কর্তাব্যক্তিদের মাথায় যে কাজ করেনি, এমন কিন্তু নয়। তারা যে একটা দোলাচলে ভুগছিলেন ঐতিহাসিক সব পাণ্ডুলিপি আর প্রমাণ ঘাটলে তা স্পষ্টতই বোঝা যায়। বারাক ওবামাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম এবং একমাত্র প্রেসিডেন্ট যিনি কিনা জাপান সফরে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কি ‘লিটল বয়’ আর ‘ফ্যাটম্যান ‘ যথাক্রমে হিরোশিমা আর নাগাসাকির প্রান্তরে ভূপাতিত করার জন্য জাপানের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল না?

মুলধারার যে একটা দৃষ্টিভঙ্গী এই হিরোশিমা-নাগাসাকি আক্রমণ নিয়ে বিশ্বে প্রচলিত ছিল, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এখনো অনেকেই এই মূল ধারার মতামত কে সমর্থন করে থাকেন।

মতবাদটা অনেকটা এরকম ই ছিল যে, এই যুদ্ধের তথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটা ইতি টানতে হলে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। যদি দরকার পড়ে তাহলে জাপানকে বল প্রয়োগ করতে হবে। বল প্রয়োগের মাধ্যমেই আত্মসমর্পণ করিয়ে এই যুদ্ধের ইতি টানতে হবে।

কিন্তু যদি আপনি ইতিহাসের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন যে, ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সেনা প্রধান, মিলিটারি কমান্ডার এবং রাজনীতিবিদগণ এই মতবাদের সঙ্গে একমত পোষণ না করে একটু ভিন্নধারায় ভেবেছেন। তাই এই সপ্তাহে, বাস্তবতার নিরিখে আমাদের প্রশ্ন, হিরোশিমা নাগাসাকিতে যে পারমাণবিক আক্রমণ হয়েছিল ১৯৪৫ এর ৬ ই এবং ৯ ই আগস্ট, সেই আক্রমণে ওই নিউক্লিয়ার বোমাগুলোর কী সদ্ব্যবহার হয়েছিল? আর ওই বোমাবর্ষণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন এবং ওই নগ্ন হামলার শিকার হয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কী তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত?

অবাক করার বিষয় হলো যে, পিউ ২০১৫ এর তথ্য অনুযায়ী, এখনো অধিকাংশ আমেরিকানই বিশ্বাস করে যে, মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এবং যুদ্ধের ইতি টানার জন্য জাপানে ওই নৃশংস বোমা হামলা পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য। ৩৪ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন যে, এ হামলা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর দশ শতাংশ নাগরিক কোনো ধরনের উত্তর দিতেই অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন।

তবে জাপানের একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, সাদাও আসাদা, দ্যা প্যাসিফিক হিস্টোরিক্যাল রিভিউ (১৯৯৮) এ বলেছেন যে, জাপানের আসলেই আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেবার জন্য পারমাণবিক বোমার আদলে একটু বাড়তি চাপের দরকার ছিল।

এখানেই পুরো গল্পের শেষ নয় কিন্তু! তবে আপনি জানেন কী? বেশ কিছু সংখ্যক ইউএস মিলিটারি কর্মকর্তা এবং ওই সময়কালীন রাজনীতিবিদরা পারমাণবিক বোমা হামলার নেপথ্যে যারা ছিলেন তাদেরকে বেশ ভালোভাবেই ধবল ধোলাই দিয়েছেন। বিশেষ করে ট্রুম্যান এর এই সিদ্ধান্তকে কেউই সঠিকভাবে গ্রহণ করেননি। এমনকি কেউ কেউ নিজের ও সমালোচনা করেছেন।

উইলিয়াম লিইহি, ট্রুম্যানের অধীনস্ত চীফ অব স্ট্যাফ, ১৯৫০ সালে ট্রুম্যানের কড়া সমালোচনা করেই বলেছেন যে, ওই সময়ের আমেরিকানরা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের যাযাবরদের নৈতিক মূল্যবোধকেই দত্তক নিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রসিডেন্ট হারবারট হুভার বলেছেন যে, পারমাণবিক এই বোমা হামলা যেভাবে নির্বিচারে গণহত্যা চালানোর মেশিন স্ট্র্যাটেজি হয়েছে, তা যেন আমার আত্মার সঙ্গে বিদ্রোহ করে চলছে।

এথিক্যাল ডিবেট সোসাইটি ও প্রশ্ন তুলেছিল, যুদ্ধের ইতি টানতে পারমাণবিক বম্ব বিস্ফোরণের আদৌ কি কোনো প্রয়োজন ছিল? তৎকালীন সাত জন ফাইভ স্টার আর্মি জেনারেল এর ছয়জন জেনারেল তারা হলেন, ডগ্লাস ম্যাকআরথার, জেনারেল ডুইট এইজেনাওয়ার, জেনারেল হেনরি হ্যাপ আরনোল্ড, অ্যাডমিরাল উইলিয়াম লিহি, অ্যাডমিরাল চেস্টার নিমিটজ, অ্যাডমিরাল, আরনেস্ট কিং একবাক্যেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, ওই সময়ে পারমাণবিক বোমা হামলার একদমই কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ জাপানিজদের আত্মসমর্পণ করা অনেকটা ‘আনএভয়েডেবল’ ছিল।

জেনারেল ডুইট আইজেনাওয়ার, যিনি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি বলেন, জাপান আসলে ততক্ষণে পুরোপুরি হেরে গিয়েছিল, তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল, তাই তখন বোমা বর্ষণের সিদ্ধান্ত আদতে পুরোপুরি প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছিল।

আর এ ধরনের বিরোধিতাপূর্ণ মন্তব্য করতে অনেককেই দেখা গিয়েছিল। তিনি একা ছিলেন না। আর এতেই হিরোশিমা নাগাসাকি আক্রমণের যৌক্তিকতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আর ধোয়াশা রয়ে গেছে তা যেন আরো মজবুত হলো। এমনকি যুদ্ধ পরবর্তী ১০০০ জন এর প্যানেল, যেই প্যানেলে বেচে যাওয়া জাপানিজ নেতৃবৃন্দ ও অন্তর্ভুক্ত ছিল তাদের এক রিপোর্টে বলছেন, জাপান এমনিতেই আত্মসমর্পণ করত। তা বোমা বর্ষণ না করলেও। তাই জাপানিজদের আত্মসমর্পণে পারমাণবিক বোমা হামলা ঠিক ততটা গুরুত্ব বহন করেনা।

আর বর্তমানে একের পর এক ইতিহাসবিদ আমেরিকানদের এই হামলার প্রথাগত আরগ্যুমেন্টগুলোকে প্রশ্নের বাণে জর্জরিত করেই যাচ্ছে। যাদের মধ্যে জাপানের আরেকজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ঠসি হাসেগাওয়াও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

তিনি বলছেন, কোর্ট মারশাল্ড কম্পেলিং (বাধ্য হয়ে কিছু করা) এভিডেন্স আছে তার কাছে। যা বলে যে, প্যাসিফিক অঞ্চলীয় এই দবন্দে সোভিয়েট এর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, যে কারনেই জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল, এই আত্মসমর্পণের পেছনে হিরোশিমা আর নাগাসাকির কোনো ঘটনার হাত নেই।

আর তারপর আরেকটা প্রশ্ন উঠল ন্যয্যতার স্বার্থে যে, কেন দুটো বোমা বিস্ফোরণ করা হলো? আমেরিকান ইতিহাসবিদ বারটন বারনস্টাইন বলছেন যে, প্রথম বোমা বর্ষণের কী এবং কতটুকু প্রয়োজনীয়তা ছিল, তা নিয়ে অনেকেই অনেক রকম ভাবতে পারে, তবে দ্বিতীয়টা যেটা নাগাসাকিতে ফেলা হলো, তা অত্যাবশ্যকীয়ভাবেই অপ্রয়োজনীয় ছিল।

কমপক্ষে ৩৯,০০০ মানুষ স্পটে মুহূর্তেই নিহত হয়েছিল, যাদের মধ্যে ছিল অগণিত নারী ও শিশু। মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যেই যেন ক্ষত বিক্ষত, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ম্যানহ্যাটান প্রোজেক্ট, ইউ এস,ডিপারট্মেন্ট অফ এনার্জি, এর সূত্রমতে, প্রায় ৬০,০০০ এর মতো মানুষ বোমা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের পলকের ব্যবধানে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করে।

আর এই শতাব্দীর ভয়াবহ যুদ্ধ শেষ হবার পর ওবামাই ছিলেন প্রথম প্রেসিডেন্ট ,যিনি যুদ্ধ পরবর্তীকালীন জাপান সফর করেন। তবে সে যে ক্ষমা চাইতে পারে এমন আশা কেউ কেউ করছিলেন। আর তাদের এই আশা যে বোকামো ছিল তা তো পুরো বিশ্বই জানে। কারন ঔদ্ধত্য নিয়ে বেচে থাকাটা যেন কোন বিশেষ এক জাতির রাষ্ট্রপ্রধানদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্বভাব।

১৯৮৮ সাল, প্রেসিডেন্সাল ক্যাম্পেইন চলছিল যুক্তরাষ্ট্রে, একজন ইরানিয়ান এয়ারলাইনারকে যান্ত্রিক ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, তা বিবেচনায় না নিয়ে ভূপাতিত করে অনুমোদিত সীমানা থেকে অন্যায়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আর এই সময়েই জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ বলে উঠলেন, No matter what, I will never apologize on behalf of the United states, no matter what the fact is” যাই হোক, যে বিষয় ই হোক না কেন, কোনো কিছুর বিনিময়েই আমি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে কারো কাছে ক্ষমা চাইবোনা।

যাই হোক, হয়তো সে থোরাই কেয়ার করতো। কিন্তু আমাদেরই কেউ কেউ হয়তো করি। বিশেষ করে আমাদের মধ্যেই যারা বিশ্বের প্রথম নিউক্লিয়ার আক্রমণের সাক্ষী হয়েছিল এবং যারা শিকার হয়েছিল সেদিনের সেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের, তাদের স্বজনেরা। আর পুরো বিশ্ব মানবতা। আর আমরা যারা হৃদয়ে মানবতাকে ধারণ করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
ঈশা আম্বানিকে শ্বশুরের আকাশ ছোঁয়া উপহার!
ঈশা আম্বানিকে শ্বশুরের আকাশ ছোঁয়া উপহার!
৭ দিনের নিচে কোন ইন্টারনেট প্যাকেজ নয়
৭ দিনের নিচে কোন ইন্টারনেট প্যাকেজ নয়
জনসম্মুখে পুরুষ নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল!
জনসম্মুখে পুরুষ নির্যাতন, ভিডিও ভাইরাল!
ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা
ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা
‘বিশ্ব সুন্দরী’র মুকুট পড়া হলো না ঐশীর
‘বিশ্ব সুন্দরী’র মুকুট পড়া হলো না ঐশীর
ক্যান্সার শনাক্তে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর সাফল্য
ক্যান্সার শনাক্তে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর সাফল্য
সানি লিওনের সঙ্গে হিরো আলম!
সানি লিওনের সঙ্গে হিরো আলম!
২০১৯ নিয়ে অন্ধ নারীর ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী!
২০১৯ নিয়ে অন্ধ নারীর ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণী!
পাপ যেন পিছু ছাড়ছে না নিকের!
পাপ যেন পিছু ছাড়ছে না নিকের!
গিন্নিকে বিয়ে করলেন কপিল শর্মা
গিন্নিকে বিয়ে করলেন কপিল শর্মা
‘যৌন মিলন দেখিয়ে আনন্দ পাই’
‘যৌন মিলন দেখিয়ে আনন্দ পাই’
সোমবার রাতের মধ্যেই ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ
সোমবার রাতের মধ্যেই ঢাকা ছাড়ছেন এরশাদ
বই পড়ানো ইউসুফ এখন দুদকে!
বই পড়ানো ইউসুফ এখন দুদকে!
আইপিএলের চূড়ান্ত নিলামে দুই বাংলাদেশি
আইপিএলের চূড়ান্ত নিলামে দুই বাংলাদেশি
উত্তেজনা ধরে রাখতে পারছেন না সাইফ কন্যা সারা!
উত্তেজনা ধরে রাখতে পারছেন না সাইফ কন্যা সারা!
২ তারিখ খালেদা জিয়াকে বের করে আনবো
২ তারিখ খালেদা জিয়াকে বের করে আনবো
বিবাহবার্ষিকীতে শাওনের আবেগঘন স্ট্যাটাস
বিবাহবার্ষিকীতে শাওনের আবেগঘন স্ট্যাটাস
বিএনপির বিরুদ্ধে লড়বেন হিরো আলম
বিএনপির বিরুদ্ধে লড়বেন হিরো আলম
বিএনপির হয়ে লড়বেন পার্থ
বিএনপির হয়ে লড়বেন পার্থ
শাকিবের সঙ্গে প্রেম বিষয়ে মুখ খুললেন রোদেলা
শাকিবের সঙ্গে প্রেম বিষয়ে মুখ খুললেন রোদেলা
শিরোনাম :
চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন আর নেই চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন আর নেই উইন্ডিজকে ৮ উইকেটে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ উইন্ডিজকে ৮ উইকেটে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জিতল বাংলাদেশ হার্ডিঞ্জ ব্রিজে গার্ডারের ধাক্কায় ট্রেনের ৩ যাত্রী নিহত হার্ডিঞ্জ ব্রিজে গার্ডারের ধাক্কায় ট্রেনের ৩ যাত্রী নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিতে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা