দৈনন্দিন জীবনে ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য (পর্ব-১)

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৬ ১৪২৬,   ১৫ শা'বান ১৪৪১

Akash

দৈনন্দিন জীবনে ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য (পর্ব-১)

মুয়াজ বিন জামাল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৪৮ ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২০:৫২ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

‘ইনশা আল্লাহ’- ছবি: সংগৃহীত

‘ইনশা আল্লাহ’- ছবি: সংগৃহীত

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা মানবজাতীকে আশরাফুল-মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। বিবেক-বুদ্ধি, ইচ্ছা শক্তি এবং পথ চলার জন্য দিয়েছেন স্বাধীনতা। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে মানবজাতি কোনো কাজ করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

অর্থ: ‘তোমরা ইচ্ছা পোষণ করতে পার না, যদি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করেন ‘ (সূরা: তাকভীর, আয়াত: ২৯)।

যেহেতু বান্দা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো কাজ করতে পারে না, তাই তার উচিত প্রতিটি কাজ সম্পাদনের সংকল্প করার পূর্বে  إن شاء الله ‘ইনশা আল্লাহ’ বলা। 

আরো পড়ুন>>> দৈনন্দিন জীবনে ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য (শেষ পর্ব)

إن شاء الله ‘ইনশা আল্লাহ’ এর অর্থ: বাক্যটি তিনটি শব্দ দ্বারা গঠিত। ‘ইন’ অর্থ: যদি, ‘শা’ অর্থ: ইচ্ছা করেন, ‘আল্লাহ’ অর্থ: আল্লাহ অর্থাৎ: যদি আল্লাহ চান। আরবি ব্যাকরণে বাক্যটি শর্তবাচব বাক্য। যার পরে বক্তার ইচ্ছাকৃত কাজটি উহ্য আছে। যেমন: কোনো ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছা করে বলল, ‘ইনশা আল্লাহ’ অর্থাৎ যদি আল্লাহ চান তবে আমি হজ করবো। পবিত্র কোরআনে এসেছে,

وَإِنَّا إِن شَاء اللَّهُ لَمُهْتَدُونَ

অর্থ: ‘ইনশা আল্লাহ (আল্লাহ চাহে তো) আমরা অবশ্যই সঠিক পথের দিশা পাব।’ (সূরা: বাকারাহ, আয়াত: ৭০)।

‘ইনশা আল্লাহ’ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য: ইসলামী শরীয়তে ভবিষ্যতে কোনো কাজ বাস্তবায়নের দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করার সময় ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
           
وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا

إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ

অর্থ: (হে নবী) কখনোই তুমি কোনো বিষয়ে এ কথা বলো না যে, আমি এটা আগামীকাল করবো, যতক্ষণ না ‘ইনশা আল্লাহ’ বল।’(সূরা: কাহফ, আয়াত: ২৩,২৪)।

‘ইনশা আল্লাহ’ বলার স্থান ও সময়: বাক্যটি শর্তবোধক হওয়ায় তা ভবিষ্যত কালের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সূরা কাহফের ২৩ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত শব্দের দ্বারা ভবিষ্যৎ বুঝানো হয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যৎ কালে কোনো কাজ সম্পাদনের দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করার সময় ‘ইনশা আল্লাহ’ বলতে হবে।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য: মূলত এই বাক্যটি বলার মাধ্যমে বান্দা তার সব কর্মকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ ও সোপর্দ করে নিজেকে তাঁর সমীপে দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করে। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাকে এভাবেই বলার নির্দেশ দিয়েছেন।

মহান  আল্লাহ তায়ালার বাণী,

وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ

অর্থ: ‘আমি আমার বিষয় আল্লাহর নিকট অর্পণ করছি।’ (সূরা: মু‘মিন,আয়াত: ৪৪)।

‘ইনশা আল্লাহ’ না বলার পরিণাম: বান্দার ইচ্ছার বাস্তবায়ন যেহেতু আল্লাহর চাওয়া এবং তাওফিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার মাধ্যমে সেই তাওফিক কামনা করা বাঞ্ছণীয়। অন্যথায় তার ইচ্ছায় বাস্তবায়ন অসম্ভব। যার বহু দৃষ্টান্ত কোরআন, সুন্নাহ এবং বাস্তব জীবনে পরিলক্ষিত হয়। এরুপ কিছু ঘটনা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো-

(ক) মক্কার মুশরিকরা রাসূল (সা.)-কে আসহাবে কাহফ, রুহ এবং বাদশা যুলকারণাঈন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি ‘ইনশা আল্লাহ’ না বলেই তাদের আগামীকাল জবাব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। নবী রাসূলদের সামান্য ভুলও বড় হিসেবে দেখা হয়। যার প্রেক্ষিতে ১৫ দিন যাবৎ ওহি আসা বন্ধ থাকে এবং তিনি পরের দিন 
জবাব দিতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে প্রশ্নের জবাব দিতে ওহি নাজিল হয়। সেই সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.)-কে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 

وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا

إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ

অর্থ: (হে নবী) কখনো তুমি কোনো বিষয়ে এ কথা বলো না যে, আমি এটা আগামীকাল করবো, যতক্ষণ না ‘ইনশা আল্লাহ’ বলো। (সূরা: কাহফ, আয়াত: ২৩, ২৪)।

(খ) সূরা ক্বলামে বর্ণিত বাগানের মালিকদের ঘটনা। তারা মিসিকিনদের ফল না দেয়ার উদ্দেশ্যে বাগানের ফল প্রাতঃকালে আরহণ করবে বলে রাতে কসম করে। কিন্তু তারা ‘ইনশা আল্লাহ’ বলতে ভুলে যায়। যার কারণে আল্লাহ তায়ালা সেই রাতেই তাদের বাগান ভস্মিভূত করে দেন এবং সকালে তারা ছাই রুপে দেখতে পায় ‘ (সূরা: ক্বলাম, আয়াত ১৭-৩৩)।

(গ) একদা সুলায়মান (আ.) এ মনোভাব ব্যক্ত করলেন যে, রাতে আমি আমার সব স্ত্রী (৯০ কিংবা ১০০ জন) এর সঙ্গে মিলিত হবো। যেন প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভ থেকে একটি করে পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে এবং তারা আল্লাহর পথে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে জিহাদ করে। কিন্তু এসময় তিনি ‘ইনশা আল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলেন। নবীর এ ক্রটি আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করলেন না।

ফলে মাত্র একজন স্ত্রীর গর্ভ থেকে একটি অপূর্ণাঙ্গ ও মৃত শিশু ভূমিষ্ঠ হলো। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, যদি সুলায়মান (আ.) ‘ইনশা আল্লাহ’ বলতেন, তাহলে তিনি যা চেয়েছিলেন তাই হত। (মুক্তাফাকুন আলাই, বুখারী হা: ৬৬৩৭)।

(ঘ) ইয়াজুজ মাজুজকে অবরুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে গোটা বিশ্ব শাসনকারী মুসলিম বাদশা যুলকারণাঈন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীর তারা প্রতিদিন খনন করতে থাকেন। যখন তারা এটাকে ভেদ করার কাছাকাছি এসে যায়। তখন তাদের সর্দার বলে, ফিরে চল, কাল সকালে এটাকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে ফেলব। একথা বলে তারা চলে যায়। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রাতে প্রাচীরকে পূর্বের ন্যায় পূর্ণাঙ্গ করে দেন। তারা প্রতিদিন এভাবে এই প্রাচীর খুঁড়তে থাকে। অবশেষে কিয়ামতের পূর্ব মূহর্তে আল্লাহ যখন তাদের মুক্তি দিতে চাইবেন, তখন তাদের সর্দার বলবে, আজ চল ‘ইনশা আল্লাহ’ আগামীকাল আমারা এই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলব। ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার ফলে গতকাল দেয়ালটি তারা যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিল, ফিরে এসে ঠিক সে অবস্থায় পাবে এবং দেয়াল ভেঙ্গে জনপদে ছড়িয়ে পড়বে। (তিরমিযী-৩১৫৩, ইবনে মাজাহ-৪০৮০)।

‘ইনশা আল্লাহ’ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কতিপয় ঘটনা: বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে ‘ইনশা আল্লাহ’ শব্দটি পবিত্র কোরআনে ছয় বার এবং হাদিসে বহু জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। যা ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার দিকে ইঙ্গিত করে।

কয়েকটি ঘটনা নিম্নরুপ:

(১) বনী ঈসরাইলের জনৈক যুবক চাচার অগাধ সম্পত্তির লাভের আশায় একমাত্র চাচাত বোনকে বিবাহ করে। কিন্তু চাচা সম্পদ প্রদানে রাজি না হওয়ায় গোপনে তাকে হত্যা করে নিজেই বাদী সেজে মূসা (আ.) এর নিকট মোকাদ্দামা পেশ করে। মূসা (আ.) আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক ফায়সালা দেন যে, তোমরা একটি গাভী জবেহ করে এক টুকরো গোশত দ্বারা মৃতের শরীরে আঘাত কর। কওমের লোকেরা গাভীর রং, ধরন ও আকৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে কয়েক দফা জিজ্ঞাসা করে সর্বশেষ বলল,

وَإِنَّا إِن شَاء اللَّهُ لَمُهْتَدُونَ

অর্থ: ‘ইনশা আল্লাহ’ এবার আমরা অবশ্যই সঠিক দিশা পেয়ে যাব।’(সূরা: বাকারাহ, আয়াত ৬৭-৭১)।

অতঃপর তারা নির্দেশিত বৈশিষ্টের গাভী পায় এবং তা জবেহ করে হত্যাকারীকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

(২) আবুল আম্বিয়া এবং মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর জীবনের অন্যতম একটি পরীক্ষা ছিল স্থহস্তে পুত্র কোরবানী করা। স্বপ্নাদেশ অনুসারে তিনি যখন ১৩/ ১৪ বছরের কলিজার টুকরা পুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে বোরবানগাহ মিনায় উপস্থিত হলেন। সেখানে পৌঁছে পিতা পুত্রকে তার স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন এবং পুত্রের অভিমত জানতে চাইলেন। পুত্র তার অভিমত ব্যক্ত করে বলেন,

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ

অর্থ: ‘হে পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে তা কার্যকর করুন, ‘ইনশা আল্লাহ’ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভূক্ত পাবেন।’ (সূরা: সাফফাত, আয়া: ১০২)। চলবে...

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে