দৈনন্দিন জীবনে ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য (শেষ পর্ব)

ঢাকা, রোববার   ২৯ মার্চ ২০২০,   চৈত্র ১৫ ১৪২৬,   ০৪ শা'বান ১৪৪১

Akash

দৈনন্দিন জীবনে ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য (শেষ পর্ব)

মুয়াজ বিন জামাল  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৪৯ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

‘ইনশা আল্লাহ’- ছবি: সংগৃহীত

‘ইনশা আল্লাহ’- ছবি: সংগৃহীত

ইসলামী শরীয়তে ভবিষ্যতে কোনো কাজ বাস্তবায়নের দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করার সময় ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا

إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ

(হে নবী) কখনোই তুমি কোনো বিষয়ে এ কথা বলো না যে, আমি এটা আগামীকাল করবো, যতক্ষণ না ‘ইনশা আল্লাহ’ বল।’(সূরা: কাহফ, আয়াত: ২৩,২৪)।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা মানবজাতীকে আশরাফুল-মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। দিয়েছেন বিবেক-বুদ্ধি ইচ্ছা শক্তি এবং পথ চলার জন্য দিয়েছেন স্বাধীনতা। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে মানবজাতি কোনো কাজ করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَمَا تَشَاؤُونَ إِلَّا أَن يَشَاء اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

‘তোমরা ইচ্ছা পোষণ করতে পার না, যদি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা না করেন ‘ (সূরা: তাকভীর, আয়াত: ২৯)।

যেহেতু বান্দা আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোনো কাজ করতে পারে না, তাই তার উচিত প্রতিটি কাজ সম্পাদনের সংকল্প করার পূর্বে  إن شاء الله ‘ইনশা আল্লাহ’ বলা।

(২) আবুল আম্বিয়া এবং মুসলিম জাতির পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর জীবনের অন্যতম একটি পরীক্ষা ছিল স্থহস্তে পুত্র কোরবানী করা। স্বপ্নাদেশ অনুসারে তিনি যখন ১৩/ ১৪ বছরের কলিজার টুকরা পুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে বোরবানগাহ মিনায় উপস্থিত হলেন। সেখানে পৌঁছে পিতা পুত্রকে তার স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন এবং পুত্রের অভিমত জানতে চাইলেন। পুত্র তার অভিমত ব্যক্ত করে বলেন,

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ

অর্থ: ‘হে পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে তা কার্যকর করুন, ‘ইনশা আল্লাহ’ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভূক্ত পাবেন।’ (সূরা: সাফফাত, আয়া: ১০২)।

আরো পড়ুন>>> দৈনন্দিন জীবনে ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার গুরুত্ব ও তাৎপর্য (পর্ব-১)

১ম পর্বের পর থেকে...

(৩) মূসা (আ.) এর জীবনের একটি অন্যতম পরীক্ষা ছিল জন্মভূমি মিসর হতে মাদায়েনে হিজরত করা। মাদায়েনে  প্রবেশের পর ক্ষুর্ধাত এবং পিপাসার্ত মূসা পানির আশায় একটি কূপের নিকট গেলেন। সেখানে মানুষের ভিড়ের অদূরে দু‘টি মেয়েকে তাদের তৃষ্ঞার্ত পশুসহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি পশুগুলোকে পানি পান করালেন। মূসার এই ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মেয়েদ্বয়ের বৃদ্ধ পিতা মাদায়েন বাসীদের নিকটে প্রেরিত বিখ্যাত নবী শুয়ায়েব (আ.) মূসাকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে বললেন, আমি আমার এই কন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার বাড়ীতে কর্মচারী হিসেবে থাকবে। তবে যদি দশ বছর পূর্ন করো, সেটা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। তিনি আরো বলেন,

‘ইনশা আল্লাহ’ তুমি আমাকে সদাচারী হিসাবে পাবে। (সূরা: কাসাস, আয়াত ২৫-২৭)।

মূসা শর্ত মেনে নিয়ে তার মেয়েকে বিবাহ করলেন এবং উক্ত শর্ত পূর্ণ করলেন।

(৪) একদা মূসা (আ.) বনী ইসরাঈলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন এমন সময় জৈনক ব্যক্তি প্রশ্ন করল মানুষদের মাঝে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ আছে কি? ওই সময় যেহেতু মূসা (আ.) ছিলেন শ্রষ্ঠ নবী এবং তার জানা মতে আর কেউ তার চেয়ে অধিক জ্ঞানী ছিল না, তাই তিনি সরলভাবে না সূচক জবাব দিলেন। জবাবটি আল্লাহর পছন্দ না হওয়ায় তিনি বললেন, হে মূসা! দুই সমুদ্রের সংযোগস্থলে আমার এক বান্দা আছে যে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী। (তার নাম খিজির (আ.) আল্লাহর অনুমতিক্রমে মূসা (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। সালাম ও মতবিনিময়ের পর তিনি তার নিকট আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান অর্জনের আবেদন জানালেন। খিজির (আ.) বললেন, আপনি আমার সঙ্গে ধৈর্য়ধারণ করে থাকতে পারবেন না। জবাবে মূসা (আ.) বললেন,

قَالَ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللَّهُ صَابِرًا وَلَا أَعْصِي لَكَ أَمْرًا

‘মূসা বললেন, আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশ অমান্য করব না।’ (সূরা: কাহফ, আয়াত: ৬৯)।

অবশেষে মূসা (আ.) খিজির (আ.) এর নিকট কিছু সময় অবস্থানের তাওফীক পেয়েছিলেন। (বুখারী-৪৭২৫,মুসলিম-৬১৬৫)।

(৫) ইবতান বিন মালেক (আ.) বার্ধক্যজনিত কারণে মসজিদে যেতে সক্ষম না হওয়ায় রাসূল (সা.) এর নিকট আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আমার বাড়িতে গিয়ে সালাত আদায় করতেন, তবে আমি উক্ত স্থানকে সালাত আদায়ের স্থান হিসেবে গ্রহণ করতাম। রাসূল (সা.) বললেন,

‘ইনশা আল্লাহ’ আমি অচিরেই তা করব। অতঃপর  তিনি তার বাড়িতে গেলেন এবং সালাত আদায় করলেন। (মুত্তাফাক ‘আলাইহি, বুখারী হা: ৪২৫)।

‘ইনশা আল্লাহ’ এর ভুল ব্যবহার:

‘ইনশা আল্লাহ’ বাক্যটি ব্যবহার কেবল ভবিষ্যৎ কালের জন্য প্রযোজ্য। যা পূর্বের আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। আমাদের সমাজের অনেকেই এর ভুল ব্যবহার করে থাকে। যেমন: কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ভাই কেমন আছেন? জবাবে সে বলল, ‘ইনশা আল্লাহ’ ভালো আছি। অনুরূপ আপনি কি ভাত খাচ্ছেন? ‘ইনশা আল্লাহ’ খাচ্ছি, ইত্যাদি। যা নিতান্তই ভুল। কারণ এটা কেবল ভবিষ্যৎকালে কোনো কাজ সম্পাদন করার দৃঢ় সংকল্প প্রকাশকালে বলতে হয়।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা এবং তাওফিক ছাড়া বান্দা কোনো কিছুই করতে পারে না, তাই আমাদের উচিত ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার মাধ্যমে সব কর্ম আল্লাহর ওপর ন্যস্ত করা। যদি তা কল্যাণ কর হয়, তাহলে তিনি তা পূর্ণ করবেন। অন্যথায় তা থেকে ফিরিয়ে রাখবেন।

অতএব, প্রত্যেকের মাঝে ‘ইনশা আল্লাহ’ বলার অভ্যাস চালু করা উচিত। মহান আল্লাহ আমাদের উক্ত আমলটি যথাযতভাবে করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে