Alexa দেশ হোক উদার সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রভূমি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২০ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৫ ১৪২৬,   ১৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

দেশ হোক উদার সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রভূমি

 প্রকাশিত: ১৫:৩৯ ২ আগস্ট ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

‘ঘটনা’, সে ইতিবাচকই হোক কিংবা নেতিবাচক; প্রতিটি ঘটনা-ই মানুষের চিন্তাকে উসকে দেয়। ঘটনাগুলো কখনো নির্মল বিনোদনের খোরাক হয়ে আসে, কখনো আশা জাগিয়ে দেশপ্রেম-মানবপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে, আবার কখনো বা বেদনাবোধে তলিয়ে দেয়। 

কিছু ঘটনা এমন সাড়ম্বরে, চারদিক তোলপাড় করে, উলোট-পালট করে আসে যে সে বিষয়ে কিছু না বলেও থাকা যায় না। যেহেতু চিন্তা মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হিসেবে চিন্তালব্ধ উপলব্ধি প্রকাশেরও দায় থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা, বিশেষ করে ‘প্রিয়া সাহা’র বিষয়টির পরিপ্রেক্ষিতে আমার চিন্তা-উপলব্ধি প্রকাশেই এই নিবন্ধের অবতারণা। 

স্বাধীনতার এই ৪৮ বছরে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে হতে পারতো উদার সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রভূমি। যেখানে ধর্ম নিয়ে কোনো বাড়াবাড়ি কিংবা সংঘাত থাকবে না। কিন্তু সেটি না হয়ে পরিণত হয়েছে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিময় একটি দেশ হিসেবে। এ দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শুরু হওয়ার অর্থই হচ্ছে, ‘নন-মুসলিম ক্লিনজিং অপারেশন’-এর মতো একটি সাম্প্রদায়িক ব্যাপার। এটি ‘উস্কানি’ হিসেবেও গণ্য হতে পারে। রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা পাওয়া এই দেশে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ জাগ্রত থাকতে কেন এমনটি ঘটেছে তা বিশদ গবেষণার দাবি রাখে। আবার ‘জাতীয়তাবাদ’ ধারণাটি নিয়েও রয়েছে রকমফের। জটিল ও বহুমুখী ব্যাখ্যার কারণে ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দটিও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। যে যেভাবে পারছে এ শব্দটির অপব্যাখ্যা করে নিজেদের করে নিতে চাইছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে কৌশলগত কারণেই বারবার ধর্মকে টেনে এনে জাতিকে বিভক্ত করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ‘বর্ণবাদ’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। পরিস্থিতি পাল্টে দিতে ‘পলিসি মেক’ করছে রাজনীতির আড়ালে ঘাপটি দিয়ে থাকা আন্তর্জাতিক মদদপুষ্ট বুদ্ধিজীবী নামধারীরা। ফলে দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের পরিধিও বাড়ছে। কিন্তু কেন এমনটি ঘটছে-সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। 
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এক দিনে সৃষ্টি হয়েছে এমনটি নয়। রাজনীতিবিদদের ক্ষমতালিপ্সু মনোবৃত্তির কারণে এই ৪৮ বছরে কীভাবে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বাস্তবতা যে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হচ্ছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। দেশে যে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে কিংবা বিশ্বের অন্য দেশের জাতিগত কোনো সঙ্কটকালেও এদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হন। ঘটনার গভীরে না গিয়ে প্রথমে আঘাত আসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জান-মালের ওপর। যে কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট-সম্পাতে সংখ্যালঘু নির্যাতন এক ধরনের মেনিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশে। 

অতীতের নানান প্রসঙ্গ বাদ দিলেও স্বাধীনতার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বড় আঘাতটি আসে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের ঘরবাড়ি পোড়ানো থেকে শুরু করে লুটপাট ও হিন্দু নারীর সম্ভ্রমহানি এসময়ে টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মিডিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এসময় বাংলাদেশের তীব্র সমালোচনা করে। নির্লজ্জভাবে তখনো এদেশের সরকার মিডিয়াকে দোষারোপ করে ‘অতিরঞ্জিত’ সংবাদ পরিবেশনের দায়ে। তখন সংখ্যালঘুদের অপরাধ ছিল তারা আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছিল। ২০১২ সালের অক্টোবরে পাশ্ববর্তী দেশ মায়ানমারের জাতিগত দাঙ্গার কারণে কক্সবাজারের রামুতে ঘটানো হয় ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা। ফেসবুকে ধর্মীয় উস্কানিমূলক একটি পোস্ট দেয়ার গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির রোষানলে পড়ে শত শত বছর ধরে এ অঞ্চলে বসবাস করা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা। পুড়িয়ে দেয়া হয় বৌদ্ধবসতিসহ তাদের প্রার্থনার মন্দিরগুলো। পুড়ে যায় শত বছরের বৌদ্ধবিগ্রহ, সেই সঙ্গে পোড়ে মানবতা। কিন্তু কেন এই নৃশংসতা? কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও চট্টগ্রামের পটিয়ার অসহিষ্ণু ঘটনার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশের মানুষের লালিত অহংকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। এ জঘন্যতম কাজ করেছে বিভেদকামী অপশক্তির কুশীলবরা। রামুর ওই ধ্বংসযজ্ঞের পর একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে স্বাধীন দেশের ইতিহাসে বৃহৎ গণজাগরণ ‘প্রজন্ম চত্বর’ শুরুর পরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামলা করা হয়েছে হিন্দু পরিবারের ওপর। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশের প্রতিবাদে দেশব্যাপী জামায়াত-শিবির সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে।

দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে আগুন দেয়া হয়েছিল মঠ-মন্দিরে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল বাড়িঘর। হামলা-অগ্নিকাণ্ডের পর নোয়াখালীর ৫০টি পরিবারের শত শত মানুষকে খোলা আকাশের নিচে দিনযাপন করতে হয়েছিল। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় সার্বজনীন পূজা মন্দিরে হামলা চালিয়ে প্রতিমা ভাঙচুর এবং লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় দুটো মন্দিরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। কুমিল্লায় গাড়ি ও প্রতিমা ভাংচুর হয়েছিল। গাজীপুরের সদর উপজেলায় নামাবাজার কালীমন্দির, বরিশালের গৌরনদী সর্বজনীন পূজা মন্দির, নেত্রকোনা পূর্বধলায় কালী মন্দির ভাংচুর, লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছিল। এসব তথ্যই দৈনিকে প্রকাশিত খবরের সূত্রে পাওয়া। দেশে রাজনৈতিক বিভেদ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকে বলেই রাজনৈতিক দলও ভিন্ন হয়। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং তাদের মন্দির ভাঙার প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? এটা কি এক ধরনের অপকৌশল নয়? 

বাংলাদেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে হাজার বছর ধরে পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে এবং অনাগত দিনগুলোতেও তারা একই সঙ্গে বসবাস করবে। সাম্প্রতিক সময়ে যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটছে তার দাগ মুছতে অনেক সময় প্রয়োজন হবে, কিন্তু সঠিক ও দ্রæত শাস্তির ব্যবস্থা করলে এ ক্ষত থেকে জন্ম নেয়া ব্যথা একটু হলেও উপশম হতে পারে। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ ‘সা¤প্রদায়িক’ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হলে তা কি লজ্জাজনক হবে না- ‘সংবিধান’ এর মর্যাদা রক্ষা করতে না পারার কারণে? অস্বীকার করা যাবে না যে, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা কর্তাব্যক্তিরা বারবার সংবিধান সংশোধন করেছেন। সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মাশ্রয়ী উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোকে (জামায়াতে ইসলামীসহ) স্থায়ী বৈধতা দেয়া হয়েছে। যা এদের ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’-এ সহায়ক হয়েছে। সংশোধনীতে ১৯৭২-এর সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মৌলনীতির বিসর্জন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধ এবং ভাষা আন্দোলনের চেতনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহের প্রতি বিন্দুমাত্র মর্যাদা প্রদর্শন করা হয়নি বলেই জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের সব সাম্প্রদায়িক শক্তি আজ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। সঙ্গত কারণে এসব অপশক্তি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে কলুষিত করার সাহস পাচ্ছে। বেপরোয়া এই অপশক্তিগুলো দেশের মানুষের সর্বজনীন দাবি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর বিচারকার্যক্রম বিঘ্নিত ও বানচাল করতে দেশব্যাপী সহিংসতা চালিয়েছে। ঘটনা পরম্পরায় বলা যায়, এসব ধ্বংসাত্মক কাজে এরা সহযোগী এবং সক্রিয় সহায়তাকারী হিসেবে পেয়ে যাচ্ছে আমাদের শক্তিশালী আমলাতন্ত্রের একাংশ, ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহিভর্‚ত রাজনীতিবিদের অংশবিশেষ, দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ী ও এক শ্রেণির সাংবাদিকদের। এছাড়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ ও পাকিস্তানের আইএসআই-ও শুরু থেকে নানাভাবে এদের সহযোগিতা করে চলেছে বলেও বিভিন্ন সময়ে উচ্চারিত হয়ে আসছে। সুতরাং এ দেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠিত খুব একটা সহজ নয়। কিন্তু সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এ প্রবণতা রুখে দিতে পারে। 

উনসত্তরের গণআন্দোলন এবং নব্বইয়ের ‘স্বৈরাচার বিরোধী’ আন্দোলনের কথা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণ করা যেতে পারে। রাজনৈতিক নেতারা ‘ক্ষমতার লোভ’ কিংবা ‘ভোটের রাজনীতি’ পরিহার করলে অপশক্তি কখনো এদেশে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহস পায় না। সুতরাং শাহবাগ গণজাগরণের মতো তরুণ সমাজের বৃহৎ অসাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশ থেকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির মূলোৎপাটনে আন্তরিক হতে হবে রাজনীতিকদেরই। সেবার আদর্শ থেকে ছিটকে পড়া এক শ্রেণির রাজনীতিকদের হীন স্বার্থ রক্ষায় একদিন যে রাজনৈতিক দুর্বত্তায়নের সূচনা হয়েছিল তা ‘আদর্শিক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা’ দিয়েই রোধ করতে হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics
Best Electronics