Alexa দেশের কুলাঙ্গারদের জন্যই সব হারান শাহিনুর

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৫ ১৪২৬,   ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

দেশের কুলাঙ্গারদের জন্যই সব হারান শাহিনুর

 প্রকাশিত: ১০:০৬ ২৭ এপ্রিল ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

 

শাহিনুর বেগম। পিতা সিদ্দীকুর রহমান, মাতা ছেনোয়ারা বেগম। পিতা-মাতার তিন ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তিতাস উপজেলার পুরান বাতাকান্দি তার বাবার বাড়ি। স্বাধীনতা সংগ্রামের বছরের শুরুতেই একই উপজেলার জগতপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে  ডা. মোহাম্মদ আলমগীর হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বর্তমানে তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। এর মধ্যে বড় মেয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে ঘরের ভিতরই দুঃসহ জীবন-যাপন করছে।

শাহিনুর বেগমের ভাষায়, ডোবার পানিতে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে কতদিন লুকিয়ে ছিলাম তার হিসেব নেই। যখনি শুনেছি পাঞ্জাবিরা আসছে তখনি যে যেভাবে পারছে পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। এমন অনেক দিন গেছে, তারা আসেনি কিন্তু গ্রামের কোনো অংশ থেকে যে আওয়াজ এল সেই আওয়াজে গ্রামকে গ্রাম নীরব, নিস্তব্ধ হয়ে যেত। খাল, ডোবা কিংবা পুকুরের পানিতে ডুব দিয়ে মাথার উপর কচুরীপানা দিয়ে থাকতে হতো। কিছুক্ষণ পর পর মাথা বের করে নিঃশ্বাস নিতাম আবার ডুব দিতাম। এ অবস্থা শুধু আমার ছিল তা নয়। আমাদের গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় সকল মেয়ে কিংবা  বিবাহিত মহিলাদেরও একই অবস্থা ছিল। বিশেষ করে যাদের ঘরে সুন্দরী মেয়ে-বউ ছিল তাদের ঘুম হারাম হয়ে যেত। যারা পেরেছে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা যারা গরীব ছিলাম আমরা কোথায়ও না গিয়ে ঘরেই পড়ে থাকতাম। আর তাদের আসার কথা শুনলে ডোবার পানিতে কিংবা ঘরের কারে আশ্রয় নিয়ে নিজকে রক্ষা করতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এ দেশের কিছু কুলাঙ্গারদের জন্য। এখন বয়স হয়েছে। ঘটনারও ৪৭ বছর পার হয়েছে। সন্তানরা বড় হয়েছে। তাই এ কথাগুলো বলতে লজ্জা লাগে বলেই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল বীরাঙ্গনা শাহিনুর বেগম। অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল তার দুটি চোখ।

৭১’র ঘটনার কথা জানতে চাইলে প্রথমে বড্ড অপ্রস্তুত হয়ে যান শাহিনুর বেগম।  পুরানো ক্ষত যেন তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হল। মুহূর্তেই চোখ ছল ছল করে উঠল তার।

শাহিনুর বেগম জানালেন, সবে আমার বিয়ে হয়েছে। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে যুদ্ধ। জুলাই-সেপ্টেম্বরের দিকে দেশের পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপ হতে লাগল। প্রতিদিনই শুনি আজ এ গ্রাম তো কাল ঐ গ্রামে পাঞ্জাবিরা আসছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছেছ। গোয়ালের গরু নিয়ে যাচ্ছে। আর যুবতী মেয়েদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করছে।

শ্বশুর হাফিজ উদ্দিন আর শাশুড়ি আজমুদা খাতুন আমাকে বড় আদর করতেন। এই পরিস্থিতিতে চোখেচোখে রাখতেন। কোনো খবর এলেই যতটুকু সম্ভব আমাকে নিরাপদ জায়গায় রাখতেন। দেখতে শুনতে কিছুটা সুন্দরী ছিলাম বলে তাদের টেনশন ছিল আরো বেশী। একদিন খবর এল কেশবপুরে আর্মি আসছে। এই খবর পেয়ে আমরা যেই মাত্র পালাতে বের হবো ঠিক তখনি দেখি আমাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে পাঞ্জাবিরা। কোনো কিছু না ভেবে শ্বশুরের কথা মত দ্রুত বাড়ির পাশের ডোবার পানিতে নেমে ডুব দিলাম।

তখন ডোবায় বড় বড় কচুরিপানা ছিল। শ্বশুর কৌশলে ঠিক আমার মাথা বরাবর কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিলেন। পাঞ্জাবিরা ডোবার সামনে দিয়ে আমার শ্বশুরকে কি যেন জিজ্ঞাসা করে দ্রুত চলে গেল। তারা সামনে যাওয়ার পর আমি ডোবা থেকে উঠি।

আমার ব্যাপারে পাঞ্জাবিদের সব তথ্য দিয়ে রাখতো স্থানীয় দালালরা। একদিন দুপুর বেলা ঘরে কেউ ছিল না। এমন সময় দেখি পাঞ্জাবিরা আসছে সঙ্গে আমাদের দেশী কিছু দালাল। দূর থেকে তাদের দেখে আমি এক লাফ দিয়ে ডোবায় ডুব দেই। কিন্তু‘ কিভাবে  তারা দেখে ফেলে।পরে তারা আমাকে ডোবা থেকে উঠিয়ে ঘরে নিয়ে নির্যাতন করে। এর কয়েকদিন পর আবার এসে নির্যাতন করে। সেদিন আমার শাশুড়িকেও বেধরক মারধর করেছিল। বাবা বলেছি, মেয়ে হিসেবে আমার দিকে তাকাতে বলেছি কিন্তু তারা শোনেনি। অসহায় হয়ে এক পর্যায়ে তাকিয়ে রয়েছি।

একজন মুসলমান হয়ে আরেকজন মুসলমানের উপর নির্যাতন করতে বিবেক তাদের বাধে নি। লজ্জা অপমানে পরদিন বাপের বাড়ি চলে যাই। ১৬ ডিসেম্বরের পর আমার শ্বশুর শাশুড়ি ও স্বামী এসে আমাকে নিয়ে যান।

এলাকায় আমার স্বামীর পল্লী চিকিৎসক হিসেবে নাম ডাক ছিল। সবাই ভালবাসত। কিন্তু আমাদের জন্য কিছু রেখে যেতে পারেন নি। যে ঘরটি আমাদের বাড়িতে এটিই আমার শেষ সম্বল। বড় মেয়েটি প্রতিবন্ধী হয়ে আছে ঘরে। আর দু’টি ছেলে আর একটি মেয়ে আছে। সবাই পড়াশুনা করে। টাকার অভাবে তাদের চালাতে পারি না। স্বামী নেই, জমি নেই, ব্যবসা নেই। মানুষের কাছে গিয়ে হাতও পাততে পারি না। কি যে করুণ অবস্থায় আছি তা কাউকে বোঝাতে পারব না।

শাহিনুর বেগম বলেন, শুনেছি, সরকার বীরাঙ্গনাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। সরকার যেন আমাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বীরাঙ্গনা শাহিনুর বেগম  বলেন, ৭১’এ যা হারিয়েছি এই জীবনে তো আর তা ফিরে পাব না। একা একা যখন বসে থাকি তখন পুরানো কথা মনে হলে আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। আবার ভাবি, আমি যদি না থাকি আমার এতিম ছেলে মেয়েদের কে দেখবে।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ কুমিল্লার যে ১৫ জন বীরনারীকে সংবর্ধনা ও খাস জমি বরাদ্ধ দিয়েছেন এর মধ্যে শাহিনুর বেগম অন্যতম। তাকে তিতাস উপজেলার মোহনপুর মৌজার ১নং খতিয়ানের ৫৭৮নং দাগে ০.১০ শতক জমি দিয়েছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ