দেবী সরস্বতী: পৌরাণিক ও লোকজ 

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৬ ১৪২৬,   ১৫ শা'বান ১৪৪১

Akash

দেবী সরস্বতী: পৌরাণিক ও লোকজ 

 প্রকাশিত: ১৬:২২ ৩০ জানুয়ারি ২০২০  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

জ্ঞানপিপাসু ভক্তের কাছে বিদ্যা, জ্ঞান, শিল্প, কলা ও সংগীতের দেবী হিসেবে পূজিত মাতা সরস্বতী। 

সরস্বতী জ্ঞানদায়িনী অর্থাৎ কল্যাণ ও শান্তি বিধায়িনী। তিনি বরদা এবং জাগতিক মোহ ধ্বংসকারী। সুপ্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বিশেষত বেদ-এ মাতা সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে সুপরিচিত। ‘সরস’ শব্দের অর্থ জল। অতএব সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। সরস্বতী শব্দটির বুৎপত্তিগত অর্থে সরস+বতু আর স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে সরস্বতী। তিনি বীণাপাণি, কুলপ্রিয়া, পলাশপ্রিয়া নামেও অভিহিতা। তার এক হাতে বীণা অন্য হাতে পুস্তক। 

ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু সাহিত্যিক রমেশচন্দ্র দত্তের মতে, আর্যাবর্তে সরস্বতী নামে যে নদী আছে তাই প্রথমে দেবী বলে পূজিত হয়েছিল। বর্তমানে গঙ্গা যেমন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উপাস্য দেবী হিসেবে পূজা পেয়ে থাকে তেমনি সরস্বতী হল জ্ঞানের দেবী। সরস্বতীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে সূর্যাগ্নির জ্যোতিতে। সূর্যাগ্নির তেজ, তাপ ও চৈতন্যরূপে জীবদেহে বিরাজ করায় চেতনা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী। অন্যদিকে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে উল্লেখ আছে, গোলোকে বিষ্ণুর তিন পত্নী লক্ষ্মী, সরস্বতী ও গঙ্গার মধ্যে বিবাদের ফলে গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী নদীরূপ পরিগ্রহ করে পৃথিবীতে সরস্বতী দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত হন। স্কন্দ পুরাণের প্রভাসখণ্ডেও দেবী সরস্বতীর নদীরূপে অধিষ্ঠানের কাহিনি বর্ণিত আছে। কাহিনিতে নদী সরস্বতীর ভৌগোলিক অবস্থানকে স্পষ্ট করা হয়েছে। বৈদিক জ্যোতিরূপা সরস্বতী ও নদী সরস্বতী সম্মিলিতভাবে জ্ঞানের দেবীরূপে পুরাণতন্ত্র ও সাহিত্যে বিপুল শ্রদ্ধা ও ভক্তির অধিকারিণী হয়েছেন। পুরাণে বলা হয়েছে- ‘দেবী সরস্বতী আদ্যা প্রকৃতির তৃতীয় অংশজাত। তিনি বাক্য, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিদ্যা ইত্যাদির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। গ্রন্থ অনুযায়ী, সরস্বতী পূজার প্রবর্তক হলেন ব্রহ্মা এবং শ্রীকৃষ্ণ।’ তবে পণ্ডিতেরা অনেকেই মনে করেন, সরস্বতী প্রথমে ছিলেন নদী, পরে হয়েছেন দেবী। 

শাস্ত্রমতে, বৈদিক ঋষিরা বিভিন্ন ধ্যান মন্ত্রে সরস্বতীয় বন্দনা করেছেন। পুরাণে বলা হয়েছে, দেবী সরস্বতী ব্রহ্মের মুখ থেকে সৃষ্টি। দেবীর সকল সৌন্দর্য ও দীপ্তির উৎস মূলত ব্রহ্মা। পঞ্চ মস্তকধারী দেবী সরস্বতী। পূজার জন্য দেবী সরস্বতীর মূর্তি শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে থাকে যা পবিত্রতার নিদর্শন। দেবীর আসনকে পুষ্পশোভামণ্ডিত করে রাখা হয়। সরস্বতী পূজার একটি বিশেষ অর্ঘ্য পলাশ ফুল। মার্কণ্ডেয় পুরাণে শ্রীশ্রীচণ্ডী উত্তরলীলায় শুম্ভ-নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে মূর্তির কল্পনা করা হয়েছিল তা ছিল মহাসরস্বতী। এ মূর্তি অষ্টভূজা: বাণ, কার্মূক, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘণ্টা ছিল তার অস্ত্র। দেবীর এই সংহারলীলাতেও কিন্তু জ্ঞানের ভাবের হানি ঘটেনি। কেননা তিনি ‘একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়াকা মমাপরা’ বলে মোহদুষ্ট শুম্ভকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করেছিলেন। 

হিন্দুদের দেবী হয়েও বৌদ্ধ বা জৈনদের কাছ থেকে পূজা পেয়েছেন সরস্বতী। এর প্রমাণ মেলে গান্ধারে পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে। অনেক বৌদ্ধ উপাসনালয়ে পাথরের ছোট ছোট মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, অবিকল সরস্বতীমূর্তি। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন কীর্তির আবিষ্কৃত নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে, সেখানেও দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, তার এক হাতে বই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদন ছিল। জৈনদের চব্বিশজন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ষোলজন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতমা হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর উভয় জৈন সম্প্রদায়েই সরস্বতীর স্থান হয়ে গেল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীতা একজন প্রধান দেবীরূপে।

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালে সরস্বতী পূজা সম্পন্ন হয়। সরস্বতীর পূজা সাধারণ পূজার নিয়মানুসারেই হয়। তবে এ পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়। যেমন অভ্র-আবীর, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ। পূজার জন্য বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুলেরও প্রয়োজন হয়। লোকাচার অনুসারে, শিক্ষার্থীরা সরস্বতী পূজার আগে কুল খাওয়া থেকে বিরত থাকে। আবার পূজার দিন কিছু লেখা, গান গাওয়া, পড়াশোনা এবং বাদ্যযন্ত্রও নিষিদ্ধ। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার (দোয়াত-কলম), পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করারও প্রথা প্রচলিত আছে। পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি দেয়ার প্রথাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। পূজার দিনে শিশুদের পাঠসূচনা বা হাতেখড়ি দেয়া হয়। পূজা শেষে অঞ্জলি দেয়াটা খুব জনপ্রিয়। যেহেতু সরস্বতী বিদ্যার দেবী তাই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ উৎসব অনেক বড় করে পালিত হয়। আর সেখানে দল বেঁধে অঞ্জলি দেয় শিক্ষার্থীরা। মানুষের ভেতরের পশুকে নিবৃত্ত করে জ্ঞান দান করেন বিদ্যার দেবী সরস্বতী। 

প্রচলিত আছে, হংসবাহনা সরস্বতীর হংসকে দুধ ও জলের মিশ্রণ পান করতে দিলে সে অনায়াসে জল রেখে সারবস্তু দুধ গ্রহণ করে থাকে। অন্যদিকে সার ও অসার মিশ্রিত এই জগৎ সংসারে মানুষ যেন সারবস্তুই গ্রহণ করে, এমন নির্দেশনাও পাওয়া যায়। সরস্বতীর হাতের পুস্তক জ্ঞানচর্চার প্রতীক। বলার অপেক্ষা রাখে না, জ্ঞানের মতো পবিত্র এ জগতে আর কিছুই নেই। এই জ্ঞান সব যোগের পরিপক্ব ফল। সংযতেন্দ্রিয় ও তৎপর হয়ে তত্ত্ব জ্ঞানে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞানলাভ করেন। সরস্বতী দেবীর হাতের বীণা সংগীতবিদ্যার প্রতীক।

অনেকে বলেন, হাতে বীণা ধারণ করেছেন বলেই দেবীর অপর নাম বীণাপাণি। বীণার সুর মধুর। পূজার্থী বা বিদ্যার্থীর মুখ নিঃসৃত বাক্যও যেন মধুর হয় এবং জীবনও মধুর সংগীতময় হয় এ কারণেই মায়ের হাতে বীণা। আবার, মনের ভাব প্রকাশ হয় ভাষায়, আর প্রাণের ভাবের উৎসারণ ঘটে সুরের সম্মিলনে। সুর মানুষকে বিমোহিত করে, আন্দোলিত করে। প্রাণে অপার আনন্দের সঞ্চার ঘটায়। সুরের লহরি শুনতে চায় না এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। সরস্বতীর হাতের বীণা-কে এভাবেও বিবেচনা করেন ভক্তরা। সরস্বতী শ্বেত পদ্মের ওপর উপবিষ্টা। সাধকদের মতে, দেহে ছয়টি পদ আছে। বিশুদ্ধ পদে আরোহণ করলে সারস্বত জ্ঞান লাভ হয়। সরস্বতীকে পদ্মাসীনা দেখিয়ে দেহস্থ প্রাণবায়ুকে উত্তোলন করার কৌশল নির্দেশ করা হয়েছে। তিনি শুভ্রবর্ণা। তার এই শুভ্রবর্ণ শুচিতা, শুভ্রতা, শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক, যা আমাদের মনকে শুচি, শুভ্র ও শুদ্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। মন শুদ্ধ না হলে চিত্ত শুদ্ধ হয় না, আর চিত্ত শুদ্ধি ছাড়া জ্ঞানলাভ করা যায় না।

বর্তমানে সরস্বতী প্রায় সব জায়গায়ই দ্বিভুজা। আচার্য যোগেশচন্দ্র রায়ের মতে, ‘দ্বিভুজা বীণাপাণি সরস্বতী প্রতিমা গত ১৫০ বছরের মধ্যে কল্পিতা হয়েছেন।’ তবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিদ্যা ও সংগীতের এই দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সরস্বতী পূজা। মানুষ অজ্ঞাতসারে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। জ্ঞানের আলো অন্ধকার দূর করে। ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যংদেহী নমোহস্তুতে’। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এভাবেই জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর আরাধনা করে। তারা প্রত্যাশা করে, জীবের অন্তঃস্থলের সব অন্ধকার দূরীভ‚ত হয়ে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ তার মনের কলূষতা দূর করে জ্ঞানের আলোয় নিজেকে ও অন্যকে আলোকিত করুক, মা সরস্বতীর কাছে এই প্রার্থনা সতত।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর