Exim Bank Ltd.
ঢাকা, বুধবার ২৪ অক্টোবর, ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫

দেবদাসী উপাখ্যান

১ম পর্ব
তুনাজ্জিনা জাহান রেমিডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
দেবদাসী উপাখ্যান
ছবি: সংগৃহীত

দেবদাসী অর্থাৎ দেবতার দাসী। বর্ধিত অর্থে মন্দিরাঙ্গণের বারাঙ্গনা, দেহোপজীবিনী বা গণিকা। প্রাচীন ভারতে মন্দিরের দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এক বিশেষ শ্রেণীর নর্ত্তকীদের নিযুক্ত করা হত যাদের দেব-দাসী বলা হত। অবশ্য এদের মূল কাজ ছিল, পুরোহিতদের শয্যাসঙ্গিনী, যৌন লালসার শিকার হওয়া। “The insignia of the temple dancers according to the Kanjeedharam records, consist of the figure of Cupid, marriage to a sword, a dagger of the temple…..” (B.E Thurston)

শুধু ভারতেই নয়, এর শুরুটা বেশ পুরানো। প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মকে উপজীব্য করে গড়ে তোলা হয় এ প্রথা। তখনকার সময়ে পবিত্র এ গণিকাবৃত্তি বেশি মাত্রায় হত। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানরা ধর্মীয় যৌনতার কোনো সু্যোগই হাতছাড়া করতো না। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডটাস ইতিহাসলিপিতে বলেন, “ব্যাবলিয়ানদের সবচেয়ে খারাপ রীতি ছিল জীবনে একবার হলেও প্রত্যেক নারীকে বাধ্য করা আফ্রিদিতি মন্দিরে যেতে এবং সেখানে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যৌন কর্মে লিপ্ত হতে। একটু ধনী বা সম্মানিত পরিবারের নারীরা যারা এ কাজ করতে চাইতেন না, তাদের বেঁধে আনা হত মন্দিরে। প্রচুর অনুগামীর সমাগম ঘটত সেখানে।

যৌন কর্মে লিপ্ত না হওয়া পযর্ন্ত নারীরা বাড়িতে ফিরতে পারত না। অপরিচিত লোককে অবশ্যই অর্থ দিতে হত বন্দিনী নারীর আঁচলে এবং তাকে আহবান করতে হত মাইলিত্তা দেবীর নামে। মিলিত হতে হত মন্দিরের বাইরে। অর্থের পরিমাণ যাই হোক না কেনো তা নিতে অস্বীকার করা ছিল মূলত পাপ। সুন্দরী নারীরা সহজেই মুক্তি পেত অল্প দিনে। অসুন্দরীদের থাকতে হত দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত কোনো লোকের সঙ্গে মিলনের আগ পর্যন্ত”। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৪ বছর আগে গ্রিসে জেনোফন নামের একজন অলিম্পিক বিজয়ী দেবীর মন্দিরে ১০০ জনের মতো তরুণীকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ উপহার হিসেবে দান করেন। করিন্থ শহরে দেবী আফ্রিদিতির মন্দির ছিল। রোমান যুগে ঐ মন্দিরে প্রায় হাজারের উপর দেবদাসী ছিল।

এটি শুরু থেকেই নারী নির্যাতনের নির্মম এক ধর্মীয় প্রথা। মানব সম্প্রদায়ের সবচেয়ে আদিম পেশা গণিকাবৃত্তি। যুগে যুগে তা শুধু রূপ আর নাম বদলেছে। ধর্মীয় প্রথার আড়ালে নারীকে ভোগ করাই ছিল দেবদাসী প্রথার মূল উদ্দেশ্য। সবসময় দেহকে মূলধন করলেও প্রাচীনকালে দেহ ব্যবসার অনেক রূপ ছিল। রামায়ণে বলা হয়েছে‚ ‘গণিকা’ ছিলেন রাজসভার বিনোদনের জন্য। আর ‘রূপোজীবী’রা মনোরঞ্জন করতো সেনাদের কঠোর জীবন থেকে ক্ষণিকের মুক্তি দিতে। মহাভারতেও এদের বর্ণনা রয়েছে। অপ্সরা-গণিকা মিলিয়ে মোট ৪২ জনের নাম পাওয়া যায়।

বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’তে দেহজীবীদের উল্লেখ থাকবে সে তো বলাই বাহুল্য। গণিকাদের জীবন কীরকম হবে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন বিষ্ণুশর্মা। পাশাপাশি গণিকালয়ে যারা যায় তাদের জন্যেও রয়েছে ‘কোড অফ কন্ডাক্ট’। সমাজের আর দশটি জায়গার মত এখানেও শ্রেণি বৈষম্য অবস্থান করত। ছিল উঁচু নিচুর তারতম্য। দেবতাদের জন্য যারা কাজ করবেন তারা তো অন্যদের থেকে আলাদা হবেন। পুরাকাহিনীতে দেখেছি রম্ভা, ঊর্বশী, মেনকা বা তিলোত্তমা দেবরাজ ইন্দ্রের সভায় নাচ-গান করতেন‚ দেবতাদের মনোরঞ্জন করতেন। কিন্তু তাদেরকে কেউ ‘বেশ্যা’, ‘গণিকা’ বা ‘ যৌনকর্মী’ বলবে না। ঠিক একইভাবে মন্দিরে নাচগান করলে তাদের বলা হবে ‘দেবদাসী’। যতই তাদেরকে পুরোহিতরা ভোগ করুক না কেন!

দক্ষিণ ভারতে ‘দেবদাসী’ বলা হলেও উত্তরভারতে এই রীতির নাম ছিল ‘মুখি’। এই প্রথা যখন প্রচলিত হয়, তখনই প্রথা এবং প্রথার সঙ্গে জড়িত দেবদাসীদের অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে দেখা হত। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে অর্থ, জমি বরাদ্দ থাকত। তারা হয়ে উঠেন মন্দিরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের নাচ-গান ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল দেবতাদের আরাধনা। সমাজের উচ্চবর্ণের মানুষ নিজেদের কন্যাকে উৎসর্গ করতেন দেবদাসী হওয়ার জন্য। বয়ঃসন্ধির আগেই করা হত উৎসর্গ। তারা যেন ভালো দেবদাসী হয়ে উঠতে পারে তাই ছোটবেলা থেকেই নিতে হত নাচ গানের কঠোর প্রশিক্ষণ। কন্যা উৎসর্গ করার রীতি দক্ষিণ ভারতে ‘মুট্টুকাট্টুভাডু’ এবং ‘দেভারিগে বিদুভাদু’ নামে পরিচিত। ‘মুট্টুকাট্টুভাডু’ মানে দেবতার সঙ্গে বিয়ে এবং ‘দেভারিগে বিদুভাদু’ এর অর্থ নিজেকে দেবতার কাছে উৎসর্গ করা।

ইতিহাসখ্যাত নরপতি কৃষ্ণদেব রায় রাজত্বকালেই বিজয়নগর পরিভ্রমণে আসেন। তার বিবরণ ১৫২০ সন থেকে ২২ সনের মধ্যে লেখা। “বিজয়নগর এবং তার অধিপতি কৃষ্ণদেব রায় তখন গৌরবের শীর্ষে। সম্ভবত, রাজধানীর নর্তকীরাও! শুধু মন্দিরে নয়, রাজকীয় অনুষ্ঠানে, ধর্মীয় উৎসবে সর্বত্রই তারা। পুরোহিতের মত নর্তকীও যেন তখন যাবতীয় শুভ অনুষ্ঠানে অপরিহার্য। মাথায় সুবর্ণ ঝারি, তাতে মুক্তোর ঝারল। অপূর্ব সেই ভাণ্ডের ভিতরে একটি করে প্রদীপ জ্বলছে। একের পর এক, ওরা সার বেঁধে আসতে লাগল। সবসুদ্ধ ষাটজন হবে হয়তো। প্রত্যেকেই তরুণী, প্রত্যেকে রূপসী। সব ক’টিরই বয়স ষোল থেকে কুড়ির মধ্যে। ওদের অঙ্গে কি পরিমাণ সোনাদান কার সাধ্য তার হিসেব করে। কারো কারো হাতে এমন ভারি গহনা যে রূপসীরা নিজের হাতের ভার নিজে বইতে পারছে না। দু’পাশে ছ'জন পরিচারিকা নিয়ে হাটছে!”

এদের ধন দৌলতের বিবরণ দেয় কার সে সাধ্য! গলায় মণি-মুক্তে-হিরেখচিত চিক, হাতে জড়োয় বাজুবন্ধ, কঙ্কণ, বালা, চূড়া; কোমরে বিছে, পায়ে মল, নূপুর। পেশায় ওরা নর্তকী, কিন্তু তবুও কি ঐশ্বর্য। অনেকেরই আপন ভূ-সম্পত্তি আছে। সেগুলো তারা উপহার হিসাবে পেয়েছে। অনেকের পালকি আছে। শুধু কি পালকি? আরো কত কি যে আছে তার কোন হিসেব নেই। বিজয়নগর এক অবিশ্বাস্য রাজ্য। তার হাতিশালে হাজার হাজার হাতি, ঘোড়াশালে লাখ ঘোড়া। কৃষ্ণদেব রায় যখন রাইচুর অভিযানে যাত্রা করেন তখন তার বাহিনীতে ছিল না-কি সাত লাখ তিন হাজার পদাতিক, বত্ৰিশ হাজার ছয় শ’ অশ্বারোহী। এই বিরাট বাহিনীর সঙ্গে প্রমোদ-কন্যা দেবদাসী না-কি ছিল কুড়ি হাজার। কিন্তু এক ব্যাপারে কৃষ্ণদেব রায় রীতিমত সদাচারী ছিলেন বলা চলে। তার অন্দরে রানীদের বারে হাজার দাসী এবং সহচরী থাকলেও বিজয়নগর অধিপতির পত্নী ছিল মাত্র বারোজন। বলা অনাবশ্যক, তার পূর্বসূরীরা সবাই কিন্তু এমন সদাচারী নরপতি ছিলেন না।

দেবদাসীর নাচ কার্যত নিত্য-পুজোয় অন্যতম উপচার। তার নূপুর ঝঙ্কার কানে না এলে দেবতার ঘুম ভাঙে না, তার হাস্যলাস্ত চোখের সামনে না থাকলে তিনি ভোগ গ্রহণে উৎসাহ পান না। মন্দিরে দেবদাসীর উপস্থিতি, অতএব পুরোহিতের মতই জরুরি। ফারনো মুনিজের (১৫৩৫-৩৭) দেবদাসীর গল্পের একটি কথাই যথেষ্ট, এক সময় হাজার রূপসী নাচতে নাচতে চলে গেল রাজার সামনে দিয়ে! শুধু বিজয়নগরে নয়, দেবদাসী সেদিন দিকে দিকে, সর্বত্র। যেখানে জনপদ, সেখানেই মন্দির; আর যেখানে মন্দির সেখানেই দেবদাসী। বিজয়নগরের মন্দির নর্তকীদের কেউ দেবদাসী’ বলে উল্লেখ করেননি। কিন্তু তারা যে জীবনাচারে দেবতাদের দাসী ছিল সে বিষয়েও কোনো সমসাময়িক বিবরণ সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ রাখেনি। নামে কিছু আসে যায় না। মধ্যযুগীয় লৌকিক বিবরণ থেকে জানা যায়, গুজরাটের চার হাজার মন্দিরে দেবদাসী ছিল কুড়ি হাজার। দিনে তারা বিভিন্ন মন্দিরে ছ’বার নাচত। একবার ভোগের সময়, আর একবার আরতির সময়।

এটি ছিল প্রথম দিকের অবস্থা। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই সম্মানের উৎসর্গ আর এর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। পুরোহিতদের অবক্ষয় আর যৌন-লালসার কারণে মেয়েদের কেনা বেচা শুরু হল। এমনকি লুঠ করে পর্যন্ত নিয়ে আসা হত। আর এর পেছনে দারিদ্র্যতা মূল হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতো। হতদরিদ্র ও নীচু জাতের মা বাবা’রা তাদের কুমারী মেয়েকে ঋতুবতী হওয়ার আগেই নিয়ে আসত মন্দিরে। সেখানে প্রথমে কুমারী মেয়েদের নামমাত্র মূল্যে নিলাম করা হত। তারপর মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ভগবানকে উৎসর্গের নামে কল্পিত দেবতার সঙ্গে কুমারী মেয়েদের তথাকথিত বিয়ে দিয়ে দেন। উৎসর্গের পর দেবদাসীকে ভোগ করার প্রথম অধিকার থাকত মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের।

(পরবর্তী অংশ দ্বিতীয় পর্বে)

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
নোবেলের সঙ্গে যা করতে চান মোনালি
নোবেলের সঙ্গে যা করতে চান মোনালি
আজো হিমঘরে সন্তানের প্রতীক্ষায় ‘বাবা’!
আজো হিমঘরে সন্তানের প্রতীক্ষায় ‘বাবা’!
আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন
আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সময়সূচি
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সময়সূচি
‘গোপন বিয়ে’ মুখ খুললেন রোদেলা
‘গোপন বিয়ে’ মুখ খুললেন রোদেলা
না ফেরার দেশে সালমানের ‘শেষ প্রেমিকা’
না ফেরার দেশে সালমানের ‘শেষ প্রেমিকা’
তুরস্কে দূতাবাস থেকে হেঁটে বেড়োলেন খাশোগি!
তুরস্কে দূতাবাস থেকে হেঁটে বেড়োলেন খাশোগি!
যেভাবে প্রথম বুবলীর ‘ভাই’
যেভাবে প্রথম বুবলীর ‘ভাই’
স্ত্রী ফিরে দেখে বাসায় অন্য নারী!
স্ত্রী ফিরে দেখে বাসায় অন্য নারী!
অনেকেই সাবান জমান কেউ গোসলই করেন না!
অনেকেই সাবান জমান কেউ গোসলই করেন না!
আর নিজেকে ‘কুমারী’ দাবির সুযোগ নেই দীপিকার!
আর নিজেকে ‘কুমারী’ দাবির সুযোগ নেই দীপিকার!
মৃত্যুর আগে কোথায় ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু?
মৃত্যুর আগে কোথায় ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু?
ধর্ষণ থেকে বাঁচতে ঝাঁপ দিল তরুণী, অতঃপর...
ধর্ষণ থেকে বাঁচতে ঝাঁপ দিল তরুণী, অতঃপর...
কাদের ওপর চটেছেন জেমস?
কাদের ওপর চটেছেন জেমস?
তারেককে ধ্বংসে ড. কামাল ইন: মইনুল
তারেককে ধ্বংসে ড. কামাল ইন: মইনুল
এক উঠোনে মসজিদ-মন্দির, প্রার্থনায় নেই বিবাদ
এক উঠোনে মসজিদ-মন্দির, প্রার্থনায় নেই বিবাদ
দুলাভাইয়ের কাছে শ্যালিকার আবদার!
দুলাভাইয়ের কাছে শ্যালিকার আবদার!
এবার মেয়েকে নিয়ে মারাত্মক কথা বললেন ঐশ্বরিয়া!
এবার মেয়েকে নিয়ে মারাত্মক কথা বললেন ঐশ্বরিয়া!
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাচ্চুর ৬০টি গিটার!
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাচ্চুর ৬০টি গিটার!
বন্ধুর ‘অকাল প্রয়াণে’ যা বললেন হাসান
বন্ধুর ‘অকাল প্রয়াণে’ যা বললেন হাসান
শিরোনাম:
ঐক্যফ্রন্টের জনসভা ঘিরে বিএনপির ১০ নেতা আটক ঐক্যফ্রন্টের জনসভা ঘিরে বিএনপির ১০ নেতা আটক