দুটি পাতা একটি কুঁড়ির তালিকায় শেরপুর

ঢাকা, শুক্রবার   ২৪ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪২৬,   ১৮ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির তালিকায় শেরপুর

 প্রকাশিত: ১৬:২০ ৬ জুন ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির তালিকায় যুক্ত হলো শেরপুর জেলার নাম।

বন্য হাতির আক্রমণে ফসল ও প্রাণ হারানোর কারণে এক বিশেষ পরিচিতি আছে এ জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার। সেই পাহাড়ি জনপদ এখন নতুন সৌন্দর্যে সাজবে। চায়ের জেলা হিসেবে নতুন পরিচয় পাবে। ক্ষেত্র তৈরি হলো নতুন সম্ভাবনারও।

সবুজের ঢেউ খেলানো মনোরম দৃশ্যের পাশাপাশি বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্দীপনা। অনেক বছর ধরেই শেরপুরসহ বৃহত্তম ময়মনসিংহে চা চাষের উপযুক্ততা নিয়ে কথা বলে আসছিলেন চা বিশেষজ্ঞরা। ৩০ এপ্রিল ঝিনাইগাতীতে শুরু হয় সেই যাত্রা। এখন পর্যায়ক্রমে জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় চলছে চা গাছের চারা বিতরণের কাজ। এ কাজে যুক্ত করা হচ্ছে স্থানীয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার কৃষকসহ ওই এলাকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে।

শেরপুরে এই চা চাষের উদ্যোক্তা গারো হিলস টি কোম্পানি। তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকজনকে এর মধ্যেই চা চাষে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা গেছে চাঞ্চল্য। বাণিজ্যিকভাবে চা চাষের লক্ষ্যে এরই মধ্যে স্থানীয় ২৭ জন কৃষকের মাঝে ২৮ হাজার উন্নত জাতের চা চারা বিতরণ করা হয়েছে। প্রাথমিক লক্ষ্য ছোট আকারের চা বাগান গড়ে তোলা।

গারো হিলস টি কোম্পানির চেয়ারম্যান আমজাদ হোসাইন ফনিক্সের প্রত্যাশা, এখন গারো পাহাড়ের আনাচকানাচে ছড়িয়ে পড়বে চা চাষ। এর মাধ্যমে পাহাড়ি জনপদে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের অনন্য সুযোগ তৈরি হবে। আর উৎপাদিত চা শেরপুর জেলা তথা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি বলেন, সরকার পুরোপুরি সহযোগিতা করলে এ পাহাড়ে চা আবাদ করে বিপ্লব ঘটানো যাবে।

উদ্যোক্তারা জানান, ২০০৪ সালে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল শেরপুরের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে। ওই সময় তারা ঝিনাইগাতী উপজেলায় এক হাজার ৮৫৬ একর, নালিতাবাড়ী উপজেলায় দুই হাজার ৫০০ একর ও শ্রীবরদী উপজেলায় এক হাজার ১৫১ একর জমি রয়েছে যাতে চা চাষ করা সম্ভব বলে মতামত দেয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, উদ্যোক্তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তা গড়ে ওঠেনি। প্রায় ১৪ বছর পর এবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে চা চাষ শুরু করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার, চা চাষের উদ্যোক্তা ও স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, চা চাষের মাধ্যমে পাহাড়ি জনপদে বন্য হাতির তান্ডব কমবে এবং এ অঞ্চলে পর্যটনের বিকাশ ঘটবে।

চা চাষি মোতালেব বলেন, গত বৈশাখ মাসে ফনিক্স সাহেব (কোম্পানির  চেয়ারম্যান) আইসে আমগর পঞ্চগড় নিয়া গেছিলো। ওইখানে গিয়া তেঁতুলিয়া, জিরো পয়েন্ট বেড়াইয়ে দেখলাম চা চাষ করে ওই দেশটা (পঞ্চগড়) খুব উন্নত হইছে। আর আমরা যে ফসলগুলা আবাদ করি তা হাতি খাইয়ে যায় গা। এতে আমরা লাভবান হই না। শুনছি চা গাছটা হাতি খায় না। তাই আমরা এবার চা চাষ করে অনেক লাভবান হব।

চা চাষি আহসান উল্ল্যাহ বলেন, পাহাড়ি এলাকায় ফনিক্স ভাই আমাদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। ইতিমধ্যে আমরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জানতে পেরেছি টহরুই বা কালোগোটা, কালোনেওয়া নামে এ দুই ধরনের গাছ যেসমস্ত মাটিতে জন্মায় সেসমস্ত মাটি চা চাষের জন্য উপযোগী। আমাদের পাহাড়ি এলাকায় ওই সমস্ত গাছ প্রচুর জন্মে। তাই ফনিক্স ভাইয়ের উদ্যোগে চাষ শুরু করেছি। আশা করি আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন সত্যি হবে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নবেশ খকশি বলেন, গারো পাহাড়ে বন্যহাতির আক্রমণে ফসলাদি যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত। আর এজন্য এ এলাকার চাষী ভাইয়েরা ফসল ঘরে তুলতে পারে না। যেহেতু এ এলাকা চা চাষে উপযোগী তাই চা চাষ করতে চাষীরা ব্যাপক আগ্রহী।

পঞ্চগড়ের সবুজ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং পার্টনার শাহিরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমি নিজে একজন চা চাষি। চা চাষে আমার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ এলাকায় টহরুই, কালোগোটা, কালো নেওয়া অর্থাৎ নিশি বৃক্ষ গাছ দেখতে পেলাম। তাই এখানে প্রচুর চা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। চা চাষীদের সাথে উদ্যোক্তা হিসেবে অংশ গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) সাবেক কর্মকর্তা এম এ খালেক বলেন, শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চা চাষাবাদের জন্য মাটির গুণাগুণ পরীক্ষার সময় আমি বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে ছিলাম। এখানকার মাটি, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও অন্যান্য পরিবেশগত অবস্থা চা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানে চা উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

গারো হিলস টি কোম্পানির উদ্যোক্তা আমজাদ হোসাইন ফনিক্স বলেন, পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে চা চাষের অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগানো হবে। এরই মধ্যে কয়েক দফা স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে ক্রস ভিজিট করা হয়েছে। তিনি বলেন, বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্তর্গত শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলা, নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এবং জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার পাহাড়ি জনপদের মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়া চা চাষাবাদের অত্যন্ত উপযোগী। তিনি বলেন, চা চাষ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রচুর মুনাফা অর্জন সম্ভব। তাই স্থানীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে গারো পাহাড় অঞ্চলে চা চাষের সূচনা করা হয়েছে। আশা করি, অচিরেই এর সুফল মিলবে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাদশা বেসরকারি উদ্যোগে চা চাষ শুরু হওয়ায় উদ্যোক্তাদের সাধুবাদ জানান। তিনি বলেন, এখানে চা বাগান গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটকরাও আকৃষ্ট হবে। পাহাড়ি জনপদে কর্মসংস্থানের খুব অভাব। এমন অবস্থায় এগিয়ে এসেছে গারো হিলস টি কোম্পানি। আমরা তাদের সাধুবাদ জানাই। আশা করি, এর মধ্য দিয়ে পাহাড়ি জনপদে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

উপজেলা সহকারী ভূমি কমিশনার  রাশেদুল হাসান বলেন, এক সময় চা চাষ সিলেটেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে ২০০০ সালে সালে পঞ্চগড়ে ও ২০০৫ সালে চট্টগামে চা চাষ শুরু হয়। এখানেও দীর্ঘ দিন গবেষণা ও চেষ্টা করা হচ্ছিল চা চাষের জন্য। আমরা যদি মাটির দিক থেকে চিন্তা করি এখানকার মাটি সিলেট-পঞ্চগড়ের মাটি মোটামুটি একই রকম। সুতরাং এখানে চা চাষ উপযোগী। বেসরকারি উদ্যোগে যে চা চাষ শুরু হওয়ায় সাধুবাদ জানাই। এছাড়া চা চাষে যে কোন ধরনের সহযোগিতা লাগলে আইনের ভেতর থেকে প্রশাসনিক সহযোগিতা করা হবে তিনি জানান।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics