দীর্ঘ সময়ে যেভাবে তৈরি হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত করোনার ভ্যাকসিন

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০,   আশ্বিন ১৭ ১৪২৭,   ১৪ সফর ১৪৪২

দীর্ঘ সময়ে যেভাবে তৈরি হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত করোনার ভ্যাকসিন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:৪৪ ৮ আগস্ট ২০২০   আপডেট: ১৮:৪৭ ৮ আগস্ট ২০২০

করোনাভাইরাসের প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাসের প্রতীকী ছবি

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের আতঙ্কে রয়েছে পুরো বিশ্বের মানুষ। ভাইরাসটির বিস্তার রোধে নানা দেশে চলছে লকডাউন। কঠোরভাবে মানা হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি। তবে ভবিষ্যতে করোনাকে ধ্বংস বা রুখতে দুটি পথ রয়েছে। প্রথমত, কার্যকরি ভ্যাকসিন প্রয়োগ বা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি। এরইমধ্যে বিশ্বে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রক্রিয়া দীর্ঘ বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আবার করোনাকে দ্রুত ধ্বংস করতে পারে একমাত্র ভ্যাকসিনই বলে জানায় সংস্থাটি।

কিন্তু কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করতে কয়েক বছর চলে যায়। এ সময় লাগার অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা, বড় আকারে কার্যকর পরীক্ষা ও সহজে উৎপাদনের বিষয়টি জড়িত থাকে। ভ্যাকসিন থেকে ভ্যাকসিন বা ল্যাব থেকে ল্যাবের ওপর উন্নয়নের প্রক্রিয়ার দ্রুততা নির্ভর করে। কিন্তু বেশির ভাগ ভ্যাকসিন তৈরিতে সাধারণত বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় অনেক প্রতিষ্ঠানে করোনার ভ্যাকসিন হিউম্যান (মানব) ট্রায়ালের শেষ ধাপে রয়েছে।

১. গবেষণা ও উন্নয়ন 

একটি ভ্যাকসিনকে কার্যকর করতে প্রাথমিক স্তর থেকেই নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়। প্রথম ধাপে ভাইরাস বা সংক্রমক রোগকে বিশ্লেষণ অথবা গবেষণা করা হয়। সম্ভব হলে অ্যান্টিজেন চিহ্নিত করা হয় যা দ্বারা ভাইরাসের জেনেটিক শনাক্ত হয়। সার্স ও মার্সের মতোই করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে গবেষণা করা হয়েছে। জানুয়ারিতেই ভাইরাসটির জেনেটিক ধারা জানায় চীনের সরকার। চিহ্নিত অ্যান্টিজেন হতে পারে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম। এসব অ্যান্টিজেন ভাইরাসের ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটিনকে ধ্বংস করে অথবা ভাইরাসই নিজেদের দুর্বল করে। তবে অ্যান্টিজেন মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও অনুমোদনের লক্ষ্যে কাজ করে।

২. প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল

একটি তাৎপর্যপূর্ণ গবেষণা ও উন্নয়ন সম্পন্নের পর ভ্যাকসিন তৈরি হয়। তখন কঠোরভাবে পরীক্ষা করতে হয়। পরে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রাণীর দেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। এতে মানুষের দেহে ভ্যাকসিনের কার্যকরিতা কেমন হবে তা ধারণা মেলে। সাধারণত ইঁদুরের দেহে ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হয়। কারণ মানুষের সঙ্গে এ প্রাণীর সিংহভাগ জেনেটিক মিল রয়েছে।

এ সময় সর্বোচ্চ কার্যকরিতার জন্য ভ্যাকসিনের বিকল্প, খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা বা পরিমার্জন করা হয়। এতে ভ্যাকসিন সফলভাবে অতীতের ধাপকে ছাড়িয়ে যায়। পরে এটি মানব দেহে প্রয়োগের ধাপে যায়।

৩. মানব দেহে ট্রায়াল

মানব দেহের ট্রায়াল একটি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মানব দেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার বিষয়টি দেখা হয়। তবে মানব দেহে তিনটি ধাপে পরীক্ষা করা হয়।

প্রথম ধাপ

মানব দেহে ভ্যাকসিন পরীক্ষার প্রথম ধাপ অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়। এতে ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা যাচাই হয়। কয়েকটি বিষয়কে প্রথম ধাপে বাছাই করা হয়। সাধারণত মানব দেহে করোনার পরীক্ষার প্রথম ধাপে কয়েকজন বা এক ডজন লোক অংশ নেয়। এ ধাপে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সক্ষমতা, অ্যান্টিবডি তৈরি ও ভ্যাকসিন গ্রহণকারীর মনের অবস্থা দেখা হয়।

দ্বিতীয় ধাপ

মানব দেহে প্রথম ধাপ সফলের পর দ্বিতীয় ধাপে স্থানাস্তর হয়। এ ধাপে শত শত বিষয় পরিচালনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যাকসিনের জন্য নির্ধারিত লোক যারা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাত্বক ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ধাপে একটি আদর্শিক বা উত্তম পদ্ধতিতে ভ্যাকসিনের গবেষণা পরিচালনা করা হয়।

তৃতীয় ধাপ

মানব দেহে ভ্যাকসিন পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে প্রয়োজন হয় হাজার হাজার লোকের। এ ট্রায়াল বিশাল সংখ্যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করা হয়। এখানে বিরল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া মেলে। এ ধাপে শনাক্তকরণ নিশ্চিত করা হয়। ধাপটিতে প্ল্যাকেবোর সঙ্গে একক, জোড়া ও ব্লাইন্ড পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় যাতে ভ্যাকসিনের কার্যকরিতা নিশ্চিত করা যায়।

৪. অনুমোদন

নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো ভ্যাকসিনের অনুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া গণহারে উৎপাদন ও বাণিজ্যকরণকে সমর্থন করে না সরকার।  গবেষণা সফল, নিরাপদ ও নৈতিকভাবে সম্পন্ন হলেই কেবল সরকার ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়। অনুমোদনের পরই ভ্যাকসিন বিশাল আকারে উৎপাদন শুরু হয়।

৫. ব্যাপক উৎপাদন

পরীক্ষার জন্য সামান্য মাত্রার ভ্যাকসিন উৎপাদনের পর লাইসেন্স প্রাপ্ত হয়। সামান্য মাত্রার উৎপাদনে ক্ষুদ্র অণুজীব, প্রোটিন এক ধরনের আচরণ করে। আবার বড় আকারের উৎপাদনে ভিন্ন আচরণ পরিলক্ষিত হয়। এটি ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারীদের কঠিন চ্যালেঞ্চের মুখে ফেলে। ভ্যাকসিন প্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠান নিশ্চিতভাবে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এছাড়া ভ্যাকসিনের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে কম মূল্যের বিষয়টি বিবেচনা করা হয় যাতে ভ্যাকসিনের উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

আমেরিকায় বিশাল সংখ্যক ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণ করছে এফডিএ। ভ্যাকসিনের ডেভেলপার বায়োলজিক্যাল লাইসেন্সের আবেদন জমা দেন। ভ্যাকসিন তৈরির কারাখানার প্রক্রিয়া ও পরীক্ষা পরিদর্শন শেষে অনুমোদন দেয় এফডিএ।

ভারতে ভ্যাকসিনের অনুমোদন পেতে ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়ার (ডিসিজিআই) দ্বারস্থ হতে হয়। ভ্যাকসিন উৎপাদনের জন্য ডিসিজিআই স্ট্যান্ডার্ড, গুণাগুণ ও নিয়ম নির্ধারণ করে। এফডিএ’র মতো ভারতে ভ্যাকসিনের অনুমোদন নিয়ম প্রাধান্য পায় না। ভ্যাকসিন প্রার্থী অবশ্যই সঠিক নিয়মের মধ্য দিয়েই যেতে হয়।

সুতরাং পৃথিবীজুড়ে শত শত কোম্পানি, গবেষক, ল্যাবে কাজ করার সত্ত্বেও এখনো করোনার ভ্যাকসিন না পাওয়ায় আশ্চর্যের কারণ নেই। একটি ভ্যাকসিন উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে, ভ্যাকসিনে অকার্যকর বা অনিরাপদ হলেই সেখান থেকে গবেষক নতুন ভ্যাকসিন পান।তবে ভ্যাকসিন উৎপাদনে কোনো ধরনের ভুল করা যাবে না। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে। তাই ভ্যাকসিন পাওয়ার আগ পর্যন্ত নিরাপদ থাকতে হবে। মাস্ক পরার পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে।

সূত্র- টাইমস নাওনিউজ।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ