দিনে-রাতে রান্না করে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন ডাকসু সদস্য সৈকত

ঢাকা, রোববার   ০৭ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

দিনে-রাতে রান্না করে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন ডাকসু সদস্য সৈকত

শোয়াইব আহমেদ, ঢাবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১১:৪৮ ৮ এপ্রিল ২০২০  

রান্না করে অসহায়দের মাঝে খাবার পৌঁছে দেন ডাকসু সদস্য সৈকত

রান্না করে অসহায়দের মাঝে খাবার পৌঁছে দেন ডাকসু সদস্য সৈকত

করোনাভাইরাসের ( কভিড-১৯) সংক্রমণ ঠেকাতে ২০ মার্চ ছুটি ঘোষণা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ওই দিনই শিক্ষার্থীরা যার যার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। ঠিক তখনও সৈকত বাড়ি ফিরে যাননি। কেন যাননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আমারও মনে হয়েছিল, বাড়ি চলে যাই। কিন্তু কিসের যেন একটি টান অনুভব করেছি তখন। একরাশ বেদনাও ভর করেছে মনে। এমন সময় ভাবনায় এলো, সংকট যদি গভীর হয়, দেশের সব কাজ যদি থেমে যায়, তাহলে খেটে খাওয়া, শ্রমজীবী, ভবঘুরে, টিএসসির ফুল বিক্রি করা বাচ্চাগুলোর উপার্জন তো বন্ধ হয়ে যাবে। ওদের কি হবে তখন? খাবে কি?

তখনই মনে হলো, থেকে যাই এই শহরে। অনেকতো গল্প দেই, দেশের জন্য এটা করব, সেটা করব, কিছুইতো করতে পারিনি। বরাবরই জেনে আসতাম, দুবেলা ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম হলো আসল সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে মানুষের পাশে থাকতে পারলে সেটাই হবে আমার স্বার্থকতা।

এরপর আর থেমে থাকেননি তিনি। দিনে-রাতে শুরু করে দিলেন কাজ। দিনে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেন আর রাতে খাবার রান্না করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভুক্তদের হাতে হাতে পৌঁছে দেন।

দুস্থদের সাহায্যে কাজ করার এই ধারায় বৈচিত্র আনা হয় ১১তম দিনে। রাতের খাবাবের মেনুতে প্রথম ১০ দিন ছিল খিচুড়ি-ডিম। এই মেনুর পরিবর্তে স্থান পায় ভাত-মাংস। প্রতিদিন একই খাবার (খিচুড়ি-ডিম) খেতে সমস্যার কথা জানালে এই উদ্যোগ নেন বলে জানায় ডাকসুর এই সদস্য। ১২তম দিনে দিনের বেলায় যে ২০০ পরিবারকে খাদ্য সামগ্রী নয় বিতরণ করা হবে রান্না করা খাবার।

নিজের কাজের কথা জানিয়ে সৈকত ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ১১তম দিনে (শুক্রবার) দুপুরে রাজধানীর হোসনি দালানের ভেতরে ২০০ পরিবারকে চাল-ডাল বিতরণ করা হয়েছে। আর রাতে খিচুড়ি-ডিমের পরিবর্তে ৫০০ জন ছিন্নমূল মানুষের মাঝে ভাত রান্না করে বিতরণ করেছি।খিচুড়ির পরিবর্তে ভাত রান্নার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন পাগল যিনি আমার থেকে প্রতিদিন খাবার খেয়ে থাকে। সে বলল যে, মামা প্রতিদিন খিচুড়ি খাইতে খাইতে কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই আমিও ভাবলাম যে খাবারে একটু বৈচিত্র্য থাকলে তো খারাপ হয় না। সেই থেকেই আমরা এখন একেকদিন একেকরকম খাবার দেয়ার চিন্তা করছি। ভাত-মাংস বা ভাত-ডিম বা খিচুড়ি-ডিম-সবজি ইত্যাদি একেকদিন একটা দিব।

এ কাজের স্মৃতিচারণ টানলেন এভাবে, নিজের মাসিক খরচের টাকা থেকে চাল, আলু, পেঁয়াজ কিনে টিএসসিতে প্যাকেট করে ২৪ মার্চ ৫০টি অসহায় পরিবারকে দেই। তখন খাবার বিতরণের ছবি ফেসবুকে দিয়ে বলেছিলাম, এরকম শো-অফ করব, আপনারাও করুন। ওইদিনই আমার পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় এক বন্ধু ও টিএসসির একজন স্টাফ মামা। ওই টাকা দিয়ে দুই বন্ধু মিলে পরদিন ১০০ পরিবারকে প্যাকেট করা খাবার পৌঁছে দেই।

কিভাবে খরচের টাকার যোগান শুরু করেন ও এখনও দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কয়েকদিন নিজের কাছে যা ছিল তা নিয়েই সাহস করে কাজ শুরু করি। পরে আমি নানাভাবেই অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি, কারণ প্রতিদিন ১০০ লোককে খাবার দিতে আমার টাকা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত বিভিন্ন শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করি। একজন স্যার ব্যক্তিগতভাবে আমাকে কিছু টাকা দেন এবং আমাদের কার্যক্রমের ছবিসহ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সবাইকে সহায়তার আহ্বান জানান। স্যারের এই পোস্টের পর ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দিয়েছেন। এছাড়াও আমার পরিচিত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং সিনিয়রদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, যারা আমাকে প্রতিদিনের খাবার কিনতে সহায়তা করে যাচ্ছেন। 

তিনি আরো বলেন, ৫০টি পরিবারকে ১ প্যাকেট করে যে খাবার আমরা দিতাম, সবার সহায়তায় মাত্র নয়দিনের ব্যবধানে আমরা এখন প্রতিদিন ২০০ পরিবারকে প্যাকেট করা খাবার দেই এবং প্রতিদিন একবেলা ৫০০ জন মানুষকে খাওয়াই।

অনুভূতি প্রকাশ করে সৈকত বলেন, অল্প কিছু মানুষ আমাকে সহযোগিতা করছে কিন্তু যারাই সহযোগিতা করছে তারা এমন আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছে যে এদের সহযোগিতার গতি দেখে আমার কাজের গতি কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।  

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার টাকার উৎসে ডাকসুকে টেনে আনার বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক মাধ্যমে কাউকে কাউকে দেখলাম পোস্ট দিতে এই বলে যে, আমি এই কাজের জন্য ডাকসুর ফান্ড থেকে দুই লাখ টাকা নিয়েছি। আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি, এটা পুরোপুরি মিথ্যা। আমি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ভালোলাগার জায়গা থেকেই এই কাজটি করছি এবং শিবলী স্যারসহ আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা অনেকেই আমাকে এতে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করছেন। অসহায় মানু্ষের সাহায্যে প্রত্যেকের দেয়া এই অনুদানগুলো আমি ওই অসহায় মানুষগুলোর জন্যই ব্যয় করছি এবং করবো। 

তার এই কাজগুলো থেকে নিবৃত করার জন্য কেউ যাতে খারাপ বা নোংরামির পথ বেছে না নেয় এই আহ্বান করে তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেন, আমাকে ঠেকানোর পেছনে যতোটুকু মেধা বা সময় আপনি বা আপনারা ব্যয় করেছেন, সেটি যদি আমাকে এই কাজে সাহায্য করতে ব্যয় করতেন তাহলে আমরা হয়তো ২০০ পরিবারের জায়গায় ৪০০ পরিবারকে প্রতিদিন খাবার দিতে পারতাম। অথবা আপনি বা আপনারা চাইলে আলাদাভাবে মানুষকে সহায়তা করতে পারতেন, এর ফলে এই অসহায় মানুষগুলোর যেমন উপকার হতো, তেমনি আমাদের মধ্যেও ভালো কাজের একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা হত।

মঙ্গলবার কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে সৈকত ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের প্রতিদিনের কার্যক্রম চলছে। রাতে প্রায় পাঁচ শতাধিক ছিন্নমূল মানুষদের জন্য খাবার তৈরি করি৷ তাদের মধ্যে আবার অনেকে পরিবারসহ আমার খাবার গ্রহণ করে। 

কখন খাবার বিতরণে বের হোন এবং কিভাবে প্রতিদিন বিতরণ শুরু করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা রাত ৮টার দিকে খাবার প্রস্তুত করে বের হই বিতরণের উদ্দেশ্য। প্রথমে টিএসসিতে একসঙ্গে প্রায় এক থেকে দেড়শো' মানুষকে খাবার দেই পরে একটি নির্দিষ্ট এলাকাতে বিতরণের উদ্দেশ্য বের হই।

সাহায্যপ্রাপ্তরা তার এই উদ্যোগে কতটা সন্তুষ্ট জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আসলে তারাই ভালো বলতে পারবে। তবে এখন এমন অনেকেই আছে যারা আমার এই খাবারের অপেক্ষায় থাকে যে আমি কখন খাবার নিয়ে যাব। আর কয়েকটা জায়গায় নিয়মিতই দিতে হয় যারা খাবারের অপেক্ষায় প্রতিদিনই থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম