Alexa দশ টাকা নিয়ে যুদ্ধে যাই

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৬ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

দশ টাকা নিয়ে যুদ্ধে যাই

মশিউর রহমান কাউসার, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:৩৪ ২০ মার্চ ২০১৯   আপডেট: ১১:০৮ ২১ মার্চ ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

১৯৭১ সালে বয়স আমার কুড়ি। তখন আমি গৌরীপুর কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কলেজের ডিগ্রী ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে ও ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকবাহিনী কর্তৃক বাঙ্গালীর ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে প্রতিজ্ঞা করি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। এরপর সুযোগ খুঁজছিলাম যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য।

কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ। তিনি গৌরীপুর উপজেলার বেকারকান্দা গ্রামের জোবেদ আলী সরকার ও আমেনা বেগমের ছেলে। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম মুহাম্মদ আজাদ বলেন, এরপর একদিন শনিবার বাবাকে বললাম পাশের গ্রামে বেড়াতে যাচ্ছি, এই বলে কাপড়ের ব্যাগ গুছিয়ে ঘরে থাকা দশ টাকা নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে পায়ে হেঁটে বিজয়পুর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যাই। ভারতের মেঘালয় প্রদেশে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় যুদ্ধ করি। এরপর ৫ নভেম্বর গৌরীপুর ফিরে আসি। ৮ই ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গৌরীপুর হানাদার মুক্ত করি।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐত্যিহাসিক ভাষণ শোনার পর আওয়ামী লীগ নেতা হাতেম আলী মিয়া এমপিএ’র নেতৃত্বে আমরা ২০/২৫ জনের একটি দল যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সংঘবদ্ধ হতে থাকি। ২৬ মার্চ শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৬ এপ্রিল হাতেম আলী ভাইয়ের নির্দেশে আমরা কয়েকজন সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাটের কুদরত আলী মণ্ডল এমপিএ’র কাছে যাই অস্ত্র আনার জন্য। কিন্তু কুদরত ভাই অস্ত্র না দিয়ে ভারত চলে যান। তাই আমাদেরকে খালি হাতে ফিরতে হয় গৌরীপুরে। 

এদিকে গৌরীপুর ফিরে এসে দেখি হাতেম আলী ভাই তার লোকজন নিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ভারত চলে গেছেন। মন খারাপ হয়ে যায় তখন। কিন্তু আমিও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। প্রতিজ্ঞা করি যেভাবেই হোক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করব।

ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় আমার সঙ্গে ছিলেন- স্থানীয় কনু মিয়া, নূরুল আমিন ও একটি হিন্দু ছেলে। দূর্গাপুর থানার কাকুড়াকান্দা গ্রামে পৌঁছলে পথিমধ্যে একদল সশস্ত্র দুস্কৃতিকারী আমাদের গতিরোধ করে মারধর করে বেঁধে রেখে মালামাল ল্টু করে নিয়ে যায়। একদিন পর দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে আমরা দুর্গাপুরের বিজয়পুর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের বাঘমারা বিএসএফ ক্যাম্পে পৌঁছায়। সেখানে দেখা হয় গৌরীপুরের হাতেম আলী ভাই, ফজলুল হক, ডা. এম এ সোবহান, নজমুল হুদা এমপিএ, তোফাজ্জল হোসেন চুন্নু, হাসিম ভাইসহ পরিচিত অনেকের সঙ্গে। 

মেঘালয় ক্যাম্পে আমরা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেই। ইংরেজি ও হিন্দী ভাষায় দক্ষতা থাকায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে আমি দু’ভাষীর দায়িত্ব পালন করতাম। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শেষে আমিসহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সশস্ত্র দল মেঘালয় সীমান্তের জক্স গ্রামে আস্তানা করে। মুক্তিযোদ্ধাদের ওই দলটির কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন চুন্নু। ভারত থেকে বাংলাদেশের সীমান্তে ঢুকে প্রায়ই ওই দলটি পাকিস্তানি ক্যাম্পে হামলা করে আস্তানায় ফিরে আসতো। 

যুদ্ধের ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবুল কালাম বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ জুন।  ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন মুরারি আমাদের নিয়ে বিজয়পুর পাকিস্তানি ক্যাম্প আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। ২৬ জুন ভোর ৬টায় বিজয়পুর বাঘমারা এলাকার মধ্যবর্তী পাহাড়ে আমরা ৭২ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি দল ভারী অস্ত্র, গোলাবারুদসহ সশস্ত্র অবস্থান নেই। সাড়ে ৬টায় দু’পক্ষের মাঝে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের সময় একটি গাছের আড়াল থেকে আমি ও সহযোদ্ধা সন্তোষ পাকবাহিনীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছিলাম। এসময় পাকবাহিনীর একটি মর্টার শেল সন্তোষের মাথায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান। ওই যুদ্ধে অর্ধশতাধিক পাকসেনা আমাদের হাতে মারা যায়। আমরা জয়ী হয়ে বিজয়পুর ক্যাম্পে লাল সবুজ পতাকা উড়াই। তবে প্রতিকূল পরিবেশের কারণে সেদিন সন্তোষের মৃতদেহ ধর্মীয় রীতিনীতি ছাড়াই পুড়িয়ে ফেলতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, বিজয়পুর ক্যাম্প দখলের কিছুদিন পর দুর্গাপুর থানার কলসিন্দুর গ্রামে আমার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাকবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। ওই যুদ্ধে নয়জন পাকসেনা মারা যায়। আগস্ট মাসে আমরা তোফাজ্জল হোসেন চুন্নুর নেতৃত্বে দুর্গাপুরের ঘোঁষগাও গ্রামে পাকিস্তানী ক্যাম্পে হামলা চালাই। দেড় ঘন্টার যুদ্ধে আমাদের দু’জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারান।

গৌরীপুর হানাদার মুক্তকরন বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে ৫ই নভেম্বর। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল নিয়ে গৌরীপুর আসেন তিনি। পাকিস্তানী দোসর ও রাজাকাররা তখন গৌরীপুর থানায় অবস্থান করে মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি পাকবাহিনীকে অবহিত করতো। ১৯৭১ সনের ৮ ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় কোম্পানি কমান্ডার রফিকুল ইসলাম ও আমাদের দল যৌথ অভিযান পরিচালনা করে গৌরীপুর থানা দখল করে লাল সবুজ পতাকা উড়াই। এসময় পাকিস্তানি দোসর ও রাজাকাররা মুক্তিবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। অনেকে পালিয়েও যায়। হানাদার মুক্ত হয় গৌরীপুর। এ ঘটনার পর পাকবাহিনী যেন এলাকায় না ঢুকতে পারে সেজন্য ৮ই ডিসেম্বর রাতে গৌরীপুর-ময়মনসিংহ রেলপথের একটি ব্রিজ ও ৯ই ডিসেম্বর গৌরীপুর-ময়মনসিংহ সড়কপথের গুজিখা ব্রিজ বোমা মেরে ধ্বংস করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই। ১০ ডিসেম্বর ব্রহ্মপুত্র নদী পাড় হয়ে জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ময়মনসিংহ হানাদার মুক্ত করি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় নভেম্বর মাসে গৌরীপুরে এসে জানতে পারেন গাভীশিমুল গ্রামের গুঞ্জর আলী চেয়ারম্যান বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন। এ আত্মহত্যার পেছনে কারণ ছিল, পাকবাহিনী তার কাছে স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর তালিকা চেয়েছিল। তালিকা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকিও প্রদান করেছিল পাকবাহিনী। গুঞ্জর আলী চেয়ারম্যান তখন মুক্তিবাহিনীর তালিকা না দিয়ে নিজেই আত্মহত্যা পথ বেঁছে নেন। তার এ আত্মত্যাগ এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। ২১ আগস্ট শালীহর গ্রামে ১৪ জন বাঙ্গালীকে হত্যা করে পাকবাহিনী। এছাড়া সাংবাদিক সুপ্রিয় ধর বাচ্চুর বাবা মধু সূধন ধরসহ আরো বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে পাকবাহিনী। ৩০ নভেম্বর পলাশকান্দা যুদ্ধে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন সিরাজ, মঞ্জু, মতি ও জসিম।

যুদ্ধে যাবার সময়ে অনুভূতি সম্পর্কে তিনি বলেন, জীবনের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কোনদিন কল্পনা করেনি জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারব। তখন স্বপ্ন ছিল একটাই, নিজের জীবন দিয়ে হলেও এদেশকে শত্রু মুক্ত করব।

যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন তা পূরণ হয়েছে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে আবুল কালাম বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে ওঠছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সুখ-শান্তিতে বসবাসের জন্য সম্মানী ভাতাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সম্মানিত করেছেন, এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

দেশকে কেমন রূপে দেখতে চান এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধামুক্ত হিসেবে দেখতে চাই। কারণ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টির কারণে বর্তমানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানহানী হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় বর্তমানে সোনার মানুষের খুব অভাব। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সবাইকে সোনার নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার আহ্বান জানান তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম