দশ টাকা ধার নিয়ে যুদ্ধে যাই

ঢাকা, সোমবার   ১৭ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৩ ১৪২৬,   ১২ শাওয়াল ১৪৪০

দশ টাকা ধার নিয়ে যুদ্ধে যাই

আসহাবুর ইসলাম শাওন, কমলগঞ্জ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২০:৪২ ১৪ মার্চ ২০১৯  

মুক্তিযোদ্ধা রাকেশ শব্দকর

মুক্তিযোদ্ধা রাকেশ শব্দকর

২১ বছর বয়সের মুক্তিযোদ্ধা রাকেশ শব্দকর। গরিব হলেও মনের দিক থেকে ছিল অনেক বড়। কেননা যেদিন তার বাড়ির সামনে পাকহানাদার বাহিনীরা একজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে সেদিন থেকে তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন দেশের জন্য কিছু করবেন। কিন্তু অভাবের সংসার যুদ্ধে যেতে হলেও কিছু অর্থের প্রয়োজন আছে।

ডেইলি বাংলাদেশ’র প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের সেই বাস্তব কথাগুলো বলেন কমলগঞ্জ থানার আলীনগর ইউপির নছরতপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা রাকেশ শব্দকর।

মুক্তিযোদ্ধা রাকেশ শব্দকর বলেন, যেদিন পাকহানাদার বাহিনী আমার বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে এলাকার একজনকে ধরে এনে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে এ দৃশ্যটি দেখছিলাম। তখনি সিদ্ধান্ত নেই দেশের জন্য কিছু করবো। এই ঘটনার দু-একদিন পরেই আমার নিকট আত্মীয় নিরদদেব ও বন্ধু দিনু শব্দকর  দুজনকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আমাদের বাড়ির অদূরেই জমির মধ্যে নিয়ে গুলি করে ক্ষত-বিক্ষত লাশ ফেলে রাখে, কিন্তু কেউ সাহস করে লাশ আনতে পারেনি সৎকার করতে। এ থেকেই প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে মনের মধ্যে।  ঠিক করি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে প্রতিশোধ নেব। তাই বাড়ির লোকদের কোনো কিছু না বলেই পাশের বাড়ির ছানায়র উল্যা চাচার কাছ থেকে দশ টাকা ধার নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই।

তিনি বলেন, যেদিন বাড়ি থেকে বের হবো সেদিন মা-বাবার জন্য মনটা মুছর দিয়ে উঠেছে। হয়তো আর মা-বাবার কাছে ফিরে আসতে নাও পারি এই ভেবে। কিন্তু নিকট আত্মীয় হারানোর প্রতিশোধের আগুন আর দেশের মায়ায় ছিলাম বিভোর, তাই মা-বাবার অজান্তেই বাড়ি থেকে যখন লুকিয়ে বের হয়ে যাই তখন বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলাম আর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল আমার। তারপরও সব মায়ার বাধন ত্যাগ করে এগিয়ে চলি সামনের দিকে দেশের জন্য লড়তে। ভগবানকে বলি মা-বাবাকে দিয়ে গেলাম তোমার হাতে। ফিরে আসলে আবার দেখা হবে।

রাকেশ শব্দকর বলেন, সেদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে শরীফপুর সীমান্ত অতিক্রম করে সাথীদের নিয়ে চলে যাই ভারতের কৈলাশহরে। সেখান থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয় আসামের লোহারবন্দ ট্রেনিং ক্যাম্পে। ক্যাম্পে অস্ত্রচালনার প্রশিক্ষণ শেষে আমিসহ ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পাঠানো হয় ধর্মনগর সীমান্তে। তখন দীপু বাবু ও ক্যাপ্টেন মোজাফ্ফরের নেতৃত্বে যুদ্ধ করি কুলাউড়ার কলেজ রোডসহ লংলার বিভিন্ন এলাকায়। আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে সড়কে মাইন পেতে ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে পাক সেনাদের গতিরোধ করা।

তিনি আরো বলেন, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলতার সহিত পালন করেছি। লংলার একটানা তিন দিনের যুদ্ধ আমার জীবনে স্মরণীয়। সেই যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতির পর পাক সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় যুদ্ধের সময় পাক বাহিনী ও দেশীয় দালালরা অনেকবার আমার বাবা-মায়ের উপর অমানষিক নির্যাতন চালিয়েছে। আগুন লাগিয়ে দিয়েছে বসতবাড়িতে। তবুও দেশ মাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করা পিছু হটিনি একটিবারের জন্যও। নয় মাস যুদ্ধ শেষে স্বাধীন হয় দেশ। অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়ি ফিরি।

যুদ্ধে যাওয়ার সময় রেখে গেছেন ফিরে এসে পাননি এমন প্রশ্নের উত্তরে রাকেশ শব্দকর বলেন, আমার খুব কাছের বাল্যবন্ধু ছিল মোড়ালি চক্রবর্তী। যুদ্ধের শেষ হওয়ার পর যখন বাড়িতে ফিরে এসে শুনলাম পাকহানাদার বাহিনীর দল আমার বাল্যবন্ধুটিসহ তার পরিবারের সব লোকজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে তখন আমি খুব মর্মাহত হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম আরেকবার অস্ত্র ধরি।

সংসার জীবন কেমন চলছে এমন প্রশ্নের উত্তরে রাকেশ শব্দকর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষন নীরব থেকে বলেন, আমরা গরীব মানুষ আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে, ছেলে মেয়েকেও হাইস্কুল পর্যন্ত পড়িয়েছি, তারপর আর ঠিকমত লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মত মানুষ করতে পারিনি। সরকারের ঘর থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা হিসেবে পাওয়া ১০ হাজার টাকায় পরিবারের ১৫ সদস্যকে নিয়ে চলাটা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ায় বড় ছেলে দিলীপ শব্দকর, মেজ ছেলে দিপক শব্দকর ও ছোট ছেলে রিপন শব্দকরকে নিয়ে ভাড়ায় রিকশা চালিয়ে যা উপার্জন হয় তা দিয়েই অনাহারে অর্ধাহারে দিনযাপন করছি । এক মেয়ে স্বপ্না শব্দকরকে অনেক কষ্ট করে  বিয়ে দিয়েছি এক রিকশা চালকের কাছে। প্রথম প্রথম মেয়ে স্বপ্না স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকলেও প্রায় বছর খানেক হলো তার স্বামীটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় মেয়েও স্বামী সন্তান নিয়ে চলে এসেছে আমার এখানে। নিজে খাবো কি আর তাদেরকেই বা  খাওয়াবো কি? এটা যেন মরার উপর খড়ার গা হয়ে উঠেছে। আমারও আর আগের মত গায়ে জোর নেই বেশিক্ষণ রিকশা চালাতে পারি না।

মুক্তিযোদ্ধা রাকেশ শব্দকর বলেন, জীবনের শেষ সময়ে চলে এসেছি ছেলে মেয়েগুলোর জন্য কোনো কিছু করে যেতে পারলাম না। বাবু আমরা ছোট মানুষ, বড় কিছুর স্বপ্ন দেখি না। যার নেতৃত্বে দেশকে স্বাধীন করবো বলে লড়াই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছি, সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন ছেলে মেয়েকে সরকারি ছোটখাটো একটি চাকরির সুযোগ করে দিয়ে এক আশাহত অভাগা বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন। পরলোকে যেন শান্তিতে যেতে পারি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআর