দখল-দূষণে মরছে করাঙ্গী! 

ঢাকা, মঙ্গলবার   ৩১ মার্চ ২০২০,   চৈত্র ১৭ ১৪২৬,   ০৬ শা'বান ১৪৪১

Akash

দখল-দূষণে মরছে করাঙ্গী! 

জাকারিয়া চৌধুরী, হবিগঞ্জ  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৪ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৫:২১ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

দূষণে বিপর্যস্ত করাঙ্গী নদী

দূষণে বিপর্যস্ত করাঙ্গী নদী

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে গেছে এক সময়ের খরস্রোতা ঐতিহ্যবাহী করাঙ্গী নদী। সময়ের পবিরর্তনে আর অব্যাহত দখল ও দূষণে মরতে বসেছে নদীটি।

নদীটি এখন প্রায় মরা একটি খালে পরিণত হতে চলেছে। এছাড়া ক্রমাগত শিল্পবর্জ্য নদীতে অপসারণের ফলে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে নদীর পানি। পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমির উর্বরতা।

জানা যায়, জেলেদের মৎস আহরণসহ এলাকার কৃষিকাজের পানির জন্য এই নদীর উপরই নির্ভরশীল ছিল উপজেলার হাজারো মানুষ। সম্প্রতি ওই এলাকায় গড়ে উঠা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের দূষিত পানি নদীতে ফেলায় বিষাক্ত হয়ে উঠেছে নদীর পানি। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করাতো দূরের কথা পানিতে নামতেই পারছেন না নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা। নদীর পানিতে নামলেই বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। নদীর পানিতে পৃহপালিত পশুপাখি নামলে মারা যাচ্ছে। প্রায় মরে ভেসে উঠছে মাছসহ বিভিন্ন জলজপ্রাণী।

প্রতিনিয়ত করাঙ্গী নদীতে ফেলা হচ্ছে শিল্পবর্জ্য

স্থানীয়দের অভিযোগ, করাঙ্গী নদীর পানি দূষিত হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ি রাশা ক্যামিকেল কোম্পানি ও ভার্টেক্স পেপার মিলস। ইটিপি প্লান্ট ব্যবহার না করে প্রতিষ্ঠানগুলো দূষিত বর্জ্য সরাসরি ফেলছে নদীতে। আর এতে করে পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে নদী পাড়ের কয়েকশত হেক্টর জমি। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে কারখানা মালিকদের সঙ্গে। তবে তারা এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, নিয়মিত পরিবেশ অধিদফতরের তদারকি না থাকায় প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা নদীতে ইচ্ছামতো রাসায়নিক বর্জ্য ফেলছে। সঠিকভাবে আইনের বাস্তবায়ন না করায় দিনের পর দিন দূষিত বর্জ্য ফেলে নদীর পানি দূষিত করছে নদীপাড়ের শিল্পকারখানাগুলো। এখনই যদি এর কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হয় তবে দিন দিন বিষয়টি আরো জটিল হয়ে উঠবে।

স্থানীয় কৃষক রহমান মিয়া বলেন, ‘একটা সময় ছিল যখন করাঙ্গী নদী দিয়ে বড় বড় নৌকা চলত। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না। বড় নৌকাতো দূরের কথা এখন করাঙ্গী নদীটি একটি মরা খালে পরিণত হতে চলেছে। এছাড়া অব্যাহত দখল আর দুষণ তো রয়েছেই। তাই এখন যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তা হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে করাঙ্গী নদী’।

কৃষক আব্দুল মোতালিব মিয়া বলেন, ‘নদী পাড়ে আমার বেশ কয়েক বিঘা কৃষি জমি রয়েছে। আগে যেখানে প্রচুর পরিমাণ শস্য উৎপাদন হতো এখন তা নেমে এসেছে শূন্যের কোটায়। নদীর পানি এতটাই খারাপ হয়ে গেছে যে জমিতে ওই পানি ব্যবহার করলে জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া জমির মাটিও যেন পোড়া পোড়া লাগে’।

তিনি আরো বলেন, শুধু তাই নয় করাঙ্গী নদীর পানি মানুষের শরীরে লেগে অনেকের আবার বিভিন্ন চর্মজাতীয় রোগও দেখা দিয়েছে’।

বৃদ্ধ ইমান আলী বলেন, ‘আমরা ছোট বেলায় দেখেছি নদীতে ঝাকে ঝাকে মাছ ধরা পড়ছে। কিন্তু এখন মাছ নয় নদীতে ভাসতে দেখা যায় বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, গৃহস্থালি আবর্জনা ও বিভিন্ন প্রাণীর বিষ্ঠা।

করাঙ্গী নদী বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আউয়াল তহসিলদার বলেন, ‘জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতা ও শিল্পকারখানা মালিকদের অসহযোগিতার কারণেই মরতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী করাঙ্গী নদী। তাই এখনই যদি প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নদীটির জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয় তা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নদীটি রক্ষায় বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে’।

বাহুবল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমরা নদীটি রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। তবে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কিছু প্রভাবশালী লোক রয়েছে যারা কারখানা মালিকদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে নদীটিকে ধ্বংসের মুখে ঢেলে দিচ্ছে’।

জেলা বাপা’র সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জুল সোহেল বলেন, ‘আমাদের নদীটি বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। তাই কিছু অসাধু ব্যক্তিদের কারণে আমরা নদীটিকে হারিয়ে ফেলতে পারি না। এ বিষয়ে বাপা’র পক্ষ থেকে যা যা করা প্রয়োজন সবকিছুই আমরা করব’।

বাহুবলের ইউএনও স্নিগ্ধা তালুকদার জানান, নদীটির নাব্য ফেরাতে শিগগির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এরইমধ্যে পরিবেশ অধিদফতরকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। নদীটি দখলমুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ