Alexa তৌহিদুল শিকলে বাঁধা ২ বছর

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৫ ১৪২৬,   ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

তৌহিদুল শিকলে বাঁধা ২ বছর

 প্রকাশিত: ১০:১৩ ২৭ এপ্রিল ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে ছেলেকে পশু পাথির মতো বাড়ির পাশে  গাছের সঙ্গে শিকলে বেঁধে রেখেছেন এক অসহায় পিতা। দায়-দেনা শোধ করতে বৃদ্ধা মা চাকুরির খোজে চলে গেছেন সৌদি আরব।

বনের কিংবা গৃহপালিত পশু পাখিরা যেখানে রাতের বেলা নিরাপদ আশ্রয়ে ঘুমানোর সুযোগ পায়,আজ সেখানে মানসিক ভারসাম্যহীন তৌহিদুলের  প্রায় ২ বছর যাবৎ রাত কাটে ঘরের পাশের একটি কাঁঠাল গাছের সাথে শিকল বাঁধা অবস্থায়। এরই মধ্যে বয়ে যাওয়া ঝড়-বৃষ্টি, প্রচন্ড শৈত্য প্রবাহসহ নানা রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক মুহূর্তের জন্যেও ২২ বছর বয়সী এই যুবককে ঘরে নিয়ে রাখা হয়নি। এই অবস্থা থেকে আর কোনো দিন তার মুক্তি হবে কিনা তারও নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছেনা।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার পাঁচুয়া গ্রামের হাজার হাজার গ্রামবাসীর চোখের সামনে এই অমানবিক ঘটনা ঘটলেও তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না কেউ।

তৌহিদুলের বাবা জজ মিয়া জানান, মাত্র ১০ কাঠা ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমিজমা না থাকায় অনেক কষ্টে দিন কাটে তার পরিবারের সদস্যদের। প্রতিদিন তিন বেলা খাবারও জোটেনা ৬ সদস্যের এই পরিবারে। তাই দারিদ্র্যের কারণে ডানপিটে স্বভাবের তৌহিদুলের ৫ম শ্রেণির পর আর পড়ালেখা চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন দুই ছেলে আর বাবা মিলে অনেক পরিশ্রম করে প্রায় এক লাখ টাকা সঞ্চয় করে। পরে ২০১৫ সালের শেষ দিকে স্থানীয় ব্রাক ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে এবং বাকি টাকা সুদের মাধ্যমে গ্রহণ করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে পাঠায় তৌহিদুলকে। কিন্তু সেখানে গিয়ে অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ করতে সে আপত্তি জানিয়ে মালিক পক্ষের সাথে মারামারি করে।  সেখানের মালিক পক্ষের অমানুষিক নির্যাতনে ৪-৫ মাস পরে একেবারে শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসে তৌহিদুল।

তৌহিদুলের বড় ভাই রুহুল আমিন জানান, দেশে আসার কয়েক মাস পরেই  তৌহিদুল মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণের বোঁঝা মাথায় নিয়েও তাকে বেশ কয়েকবার একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে টাকার অভাবে তার চিকিৎসা আর চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি।

গাছে বেঁধে রাখার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের একটি মাত্র ঘরে পরিবারের সব সদস্যদের থাকতে হয়। রাতের বেলা সে কখন ঘর থেকে বের হয়ে যায় তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঘরের ভিতরে এমন কিছু নেই যার সঙ্গে তাকে শিকল দিয়ে আটকে রাখা যায়। তাছাড়া সে ছাড়া পেলেই সামনে যাকে পায় তাকেই  মারপিট করে। তাই ঘরের সামনে একটি টিনের চাল তৈরি করে তাকে ঐ গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল। কিছুদিন যেতে না যেতেই সে ঐ চাল ও খুটিগুলো উপড়ে ফেলে দেয়। টাকার অভাবে একটু ভালভাবে বারান্দা করে দেয়ারও সুযোগ হচ্ছে না। ধার-দেনা শোধ করতে নিরুপায় হয়ে তার মাকে চলতি মাসের ১ তারিখে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে কোনোভাবেই ভাইয়ের চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছেনা।

ভারসাম্যহীন তৌহিদুলের চাচি আকলিমা খাতুন জানায়, সে প্রায় সময়ই ভাল আচরণ করে। হঠাৎ করে যখন পাগলামী উঠে তখন তাকে কেউ ধরে রাখতে পারেনা।  সে এক রাত ঘুমালে পরের রাত জেগে থাকে। তাই তার অশ্লীল গালিগালাজ আর চিৎকার-চেঁচামেচিতে আমরা অনেক রাতেই ঘুমাতে পারিনা।

টাকার অভাবে ছেলের চিকিৎসা করাতে না পারার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন পিতা জজ মিয়া। চোখের সামনে ছেলের এমন কষ্টের জীবন চেয়ে দেখা ছাড়া তার যেন আর কোনো উপায় নেই। তাই ছেলের চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি সরকার ও বিত্তবান ব্যক্তিসহ দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ