ঢাকা, শুক্রবার   ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯,   ফাল্গুন ৯ ১৪২৫,   ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪০

তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা, মন জানো না

মেহজাবিন তুলি

 প্রকাশিত: ১১:৪১ ১০ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১১:৪১ ১০ আগস্ট ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ইমন আর সিন্থিয়ার জানাশোনা সেই ছোট্টবেলা থেকে। স্কুল, কলেজে এক সাথে পড়তে পড়তেই দুজনের ভেতর ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্কুলের বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু করে পরিবারের ভেতরেও অনেকে জানত ওদের ব্যাপারটা। এইচএসসি’র পর দুজনে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। 

ইমনের পরিচয় হলো নিতিশার সাথে। ক্লাসে একসাথে বসা, ক্লাসের পর আড্ডা, এমনকি কখনো সন্ধ্যা হয়ে গেলে নিতিশাকে বাড়িতে পৌছনোর দায়িত্বও ইমনের। কখন যে ওরা দুজন দুজনের প্রতি দুর্বল হয়ে গেল তা নিজেরাও বুঝতে পারল না। নিতিশা কিন্তু সিন্থিয়ার সবটাই জানত। তবু ইমনের প্রতি অসম্ভব নির্ভরশীলতা তার আবেগকে বাঁধ মানতে দেয়নি। আর ইমন! সিন্থিয়ার চাইতেও বেশি টান বোধ করতে লাগল নিতিশার প্রতি।  

সিন্থিয়ার সাথে ইমনের রোজই যোগাযোগ হয়। ইমন জানে ওর ভবিষ্যত সিন্থিয়ার সাথেই সাজানো, এই মেয়েটাকে ও কখনো ওকে ছাড়তে পারবে না। কিন্তু নিতিশাকে ছাড়াও ইমন কিছু ভাবতে পারেনা আজকাল। ওকে ভার্সিটির অন্য কারো সাথে কথা বলতে দেখলেই ওর মাথায় রক্ত চড়ে যায়। 

নিতিশার প্রতি এই অনুভূতি ওর নিজের কাছেই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে। প্রতিদিন  ইমন নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকে যে ও আসলে কাকে চায়! উত্তর মেলে না, কারণ ওর দ্বন্দ্বটা নিজের মনের সাথেই।   

সম্পর্ক প্রতিনিয়ত চর্চা এবং পরিচর্যার বিষয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে সম্পর্ক হয়তো অপ্রয়োজনীয়ও হয়ে উঠে। কারো সাথে পাকাপাকিভাবে প্রেমের সম্পর্কে যাবার আগে কিছু ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নিন-

-অপর মানুষটির কাছ থেকে জানুন এই সম্পর্ক থেকে তার প্রত্যাশাগুলো কী কী এবং সেটার সাথে নিজেকে আপনি কতটা এডজাস্ট করতে পারবেন। 

-প্রেমের অনেক পর্যায় থাকে। একটা প্রেমে ভাল সময় থাকে, কখনো খারাপ সময় আসে। পরস্পরের অনুভূতি এই পর্যায়গুলোকে কীভাবে সামাল দিচ্ছে সেটা একটু খেয়াল করুন। 

ধরুন, কাল আপনার মফস্বলে কোথাও পোস্টিং হয়ে গেল কিংবা ছয়মাস পর আপনার দেশের বাইরে পড়তে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। এ বিষয়গুলো আপনার সঙ্গী কীভাবে দেখছে তা যাচাই করুন।  

-যদি আপনি আর আপনার সঙ্গী বুঝতে পারেন যে কোন একটা বিন্দুতে এসে দুজনের আর মিলছে না, তাহলে সেটি নিয়ে কথা বলুন খোলাখুলি। সমস্যা সমাধানে দুজনেই এগিয়ে আসুন। 

দয়া করে অনুমান করতে যাবেন না। ‘আমি ভেবেছিলাম’, ‘আমার কাছে মনে হয়েছিল’, ‘আমি ভাবলাম ,তুমি এমনটা  ভাববে’ এই ব্যাপার গুলো এড়িয়ে চলুন।  
 
সব কিছুই দারুন চলতে লাগল। আপনিও পছন্দের মানুষটির সাথে সুখী। কিন্তু তারপর এক সময় ঘটে গেল সেই ‘অঘটন’ । অফিসের প্রেজেন্টেশন রেডি করতে গিয়ে, ক্যাম্পাসে দুপুরের খাবার খেতে খেতে, কোন ভ্রমণে কিংবা বাস বা ব্যাংকের লাইনে  দাঁড়িয়ে থাকতেই থাকতেই হঠাৎ আপনার কাউকে আলাদা করে চোখে পড়ে গেল। 

আপনার মনে সেই অনুভূতিটা এসে উঁকি মারতে লাগল যা আসলে আপনার অনুভব করা উচিত নয়। কারণ, ভাল তো আপনি ইতোমধ্যে বাসছেন অন্য কাউকে! 


দুই নৌকায় পা চাইলেই রাখা যায় না
একজন মানুষের একসাথে দুজনকে ভালবাসা মানেই তার চরিত্রে সমস্যা আছে, তার মনটা কুৎসিত এমন ভাবা ঠিক নয়। কেউ খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারে, কেউ গুছিয়ে চলে ভীষণ, কেউ অনেক কেয়ারিং, কেউ আবার দারুণ সাপোর্টিভ, আমরা একেকজন মানুষের ভেতর একেকটি গুণ দেখে আকৃষ্ট হই। 

নিজের পছন্দের মানুষের ভেতর চাই সে সব গুণগুলো এসে জুটুক। যখন দেখি আমাদের কোন একটা প্রত্যাশার দিক ভালবাসার মানুষটির ভেতরে ঠিক মিলছে না, তখনই আমরা অন্যের সাথে নিজের মানুষটির তুলনায় চলে যাই।  

‘মন কী যে চায় বলো/যারে দেখি লাগে ভাল’-মানুষের মন মানুষ নিজেই বুঝতে পারে না। প্রতিদিন শত মানুষের ভিড়ে আপনার তো একই সময়ে একাধিক মানুষকে ভাল লাগতেই পারে, কিন্তু সে ভালোলাগাটায় আপনি কতটুকু সাড়া দেবেন সেটাই বিবেচ্য।

তৃতীয় কোন ব্যক্তির শুধু উপস্থিতি এবং তার সাথে সময় কাটানো যদি আপনার ভাল লাগে, তবে আপনি তাকে শুধুই পছন্দ করেন। কিন্তু যদি আপনি ঐ মানুষটির প্রতি অন্তরঙ্গতা এবং তার সাথে সংযোগের গভীর আকাঙ্ক্ষা বোধ করেন, তাহলে বলতেই হচ্ছে আপনি তাকে ভালবাসেন। 

প্রথমে হয়তো শুধুই সময় কাটাতে কথা বলা শুরু করেছিলেন দুজনে। বাড়তে থাকা মেসেজিং, ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনালাপ, অনেকগুলো বিকেল একসাথে দেখা করা, একদিন যোগাযোগ না হলে অস্বস্তি বোধ ...এভাবে আর পেছনে ফিরে আসার পথ থাকে নি।  

এ অবস্থায় একসময় আপনার নিজের ভেতরেই একটা দ্বন্দ্ব তৈরী হবে। আপনি দুজনের কাউকেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না, আবার ঠিক কোন সীমা পর্যন্ত সম্পর্ক দুটোকে টানবেন সেটাও বুঝবেন না। তৃতীয় মানুষটির প্রতি অনুভূত অসীম টান আপনাকে এতোদিনের সঙ্গীর প্রতি যে বিশ্বাসঘাতক করে তুলছে সে বোধ আপনার যতদিনে হবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে (কারো কারো যদিও সে বোধ আজকাল আর হয়না! তাদের কথা একটু পরেই থাকছে)। আপনি বুঝতে পারছেন,  দুজনকেই আপনি ভালবাসেন;এটা হওয়া উচিত ছিল না, দুর্ভাগ্যক্রমে  হয়ে গেছে।  

সম্পর্কে  কমিটমেন্ট বা প্রতিশ্রুতি ভীষণ দৃঢ় একটা ঢাল। যেসব প্রেমিক-প্রেমিকারা দীর্ঘ সময় একত্রে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তাদেরকেই বলা হয় ‘কমিটেড’। এক্ষেত্রেও একটা জিনিস বলে রাখা ভাল যে, একজন ব্যক্তি শুধু ভালবাসার অনুভূতি ছাড়া কোন ব্যক্তির উপর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে থাকতে পারেন না। 

যেখানে শুধু কমিটমেন্ট রয়ে যায়, ভালবাসার স্থান থাকে না, সে ধরনের ভালবাসাকে বলা যায় Empty/Cold love। কেননা এ পর্যায়ের ভালবাসায় আর কোন আগ্রহ বা অন্তরঙ্গতার প্রয়োজন নেই। শক্তিশালী ভালবাসাও ক্ষয় হতে হতে তখন এই শূন্য ভালবাসায় পরিণত হয়।

একই সময়ে আপনি যদি সত্যিই একাধিক মানুষের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে তাদের প্রত্যেকের সেটা জানা থাকতে হবে। কাউকে কিছু লুকিয়ে তার অনুভূতি বা বিশ্বাসের সাথে প্রতারণা করার অধিকার আপনার নেই। আপনার  মিথ্যে অভিনয় এক সাথে তিনটি জীবনের সাথে খেলবে। যে আছে তাকেও আপনি হারাতে চান না,আবার নতুন যে এসেছে তাকেও ধরে রাখতে চান! 

বাইরে বের হবার সময় আপনি দুই পায়ে তো দুই রকম জুতা পরে বের হোন না তাইনা? জীবনেও একইভাবে দুজন মানুষকে সাথে নিয়ে সমভাবে চলা যায় না। দুই নৌকায় পা যে চাইলেই রাখা যায় না, এটুকু আপনাকে বুঝতেই হবে।

ওপরেই উল্লেখ করেছি, লেখার শেষে এক শ্রেণির মানুষের কথা বলব যাদের ভেতরে মানুষকে ঠকানো আর প্রতারণার প্রবণতা প্রবল। এরা সম্পর্কের ব্যাপারে উদাসীন। আজকাল তাই এক সম্পর্ক থাকতেও আরেকটা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার উদাহরণ চারপাশে প্রচুর। ‘Two-timing’ বা ‘Double-timing’ করতে গিয়ে অপর মানুষগুলোর  জীবনে এরা কতটা  নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সে বোধ তাদের নেই।
 

নদীর পানি বৃষ্টি হয়ে নদীতেই ফিরে যায় 
এবার ত্রিভুজের অন্যকোণে চলে আসি। বেশ কয়েকদিন যাবতই দেখছেন আপনার বন্ধু বা সঙ্গীটি বদলে গেছে। সে আগের মত আপনাকে সময় দিচ্ছে না, অবসরের পুরোটা সে থাকছে ফোন বা ইন্টারনেটের পেছনে, কোন না কোন অজুহাতে আপনাকে এড়িয়ে যাচ্ছে, অকারণে খিটখিটে হয়ে উঠছে। অর্থাৎ আপনি বুঝতে পারলেন আপনার তার  ‘ইমোশনাল এটাচমেন্ট’টা কমে আসছে। দিন যেতে যেতে এক সময় সে নিজেই হয়তো স্বীকার করবে, সম্পর্কটা আর দুজনের ভেতর নেই। চলে এসেছে তৃতীয় পক্ষ।

জীবনটা তখন খুব এলোমেলো লাগে তাই না! রাতগুলো দীর্ঘ হয়ে যায়, চোখের পানি বাঁধ মানতে চায় না, সিলিং ফ্যানের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা হয়! নিজেকে বড্ড অসম্পূর্ণ, অপরিণত মনে সে সময়টাতে। কী নেই আমার মধ্যে, কেন পারলাম না ধরে রাখতে এ ধরনের অনেক হীনম্মন্যতাবোধ এসে ঘিরে ফেলে। 

চেষ্টা করুন আপনার সঙ্গীটিকে ফেরানোর। খোলাখুলি কথা বলার সুযোগটুকু করে দিন তাকে। হয়ত সে আপনাকে কিছু বোঝাতে চাচ্ছে অনেকদিন ধরে, আপনিই খেয়াল করেননি। এবার তবে দু’জনে একান্তে কথা বলুন। প্রথমেই হাল ছাড়বেন না। সে আপনাকে যার বিষয়ে বলছে তাকে নিয়ে সে কতটুকু সিরিয়াস সেটা যাচাই করুন।

তার প্রেম কী বাস্তবিক আপনার চাইতেও গভীর নাকি এটা কেবলই মোহ তা জানুন। যদি বুঝতে পারেন, আপনাদের পথ আলাদা হবার সময় সত্যিই এসেছে তাহলে তাকে বরং যেতেই দিন। 

তাকে ক্ষমা করে দিন আর ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন। নিজের মনে এবং জীবনে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি মনে করে কষ্ট পাওয়ার কোন অর্থ নেই। একজন মানুষ পুরোপুরি চোখের আড়াল হয়ে গেলে মন থেকে মুছে যেতে খুব দেরি লাগে না। 

কোন ধরনের যোগাযোগের পথই খোলা রাখবেন না। আপনি বরং নতুন করে ভালবাসুন, নতুন কিছু ভাল স্মৃতি গড়ে নিন, যা আপনার পুরনো স্মৃতিকে ভুলিয়ে দেবে।
 
আর আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকা যদি দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের গোত্রীয় হয় যাদের কাছে প্রেমটা শুধুই একটা খেলা, সময় কাটানোর মাধ্যম, যারা দিনের পর দিন মানুষকে ভালবাসার নাম নিয়ে ঠকিয়েই যাচ্ছে তার সাহচর্য নিজ থেকে ত্যাগ করুন। কেবল একজন দুজন নয়, সে সবার সাথে খেলা করে আনন্দ পায়। শুধু ভাবুন বেঁচে গেছেন! 

বিয়ের পরও যদি এমন দ্বৈত চরিত্র দেখতে হতো তার, তবে কতটা কষ্ট পেতেন। এ মানুষটি যে আপনার ভালবাসাকে সম্মান করেনি, আপনার বিশ্বাসকে প্রতারণা করেছে, সে কি আসলেই আপনার ভালবাসা পাবার যোগ্য! 

এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনার হিসাব মিলে গেছে। সুতরাং নিজের আবেগ, অনুভূতি, সম্মান, মনের ভাবনা সব কিছুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাকে ত্যাগ করুন।

আর সত্যিই যদি ‘শিক্ষা’ দিতে চান, তাহলে এমন কিছু করুন যেন সে অনুতপ্ত হয়। আপনি তার ক্ষতি করার চেয়ে তার নিজের কাছে লজ্জাবোধ করালে সেটাই বেশি কষ্টকর হবে মানুষটার জন্য। অনুশোচনার চেয়ে বড় শাস্তি আর নেই।  

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস